দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

'আলেমে দ্বীন' অর্থ কি? যেকোনো আলেমই কি 'আলেমে দ্বীন'?

 'আলেমে দ্বীন' অর্থ কি? যেকোনো আলেমই কি 'আলেমে দ্বীন'?

ওয়াজের মৌসুম চলছে। ঢালাওভাবে শুনা যাচ্ছে, 'বক্তব্য রাখবেন আলেমে দ্বীন অমুক', কাল আসবেন আলেমে দ্বীন অমুক, এইমাত্র এসেছেন আলেমে দ্বীন তমুক। আসুন বাস্তবিক অর্থে আমরা দেখি আমাদের দেশের এই আলেমে দ্বীন আসলেই কি আলেম?
পবিত্র কুরআনে বেশ কয়েক জায়গায় (الْعِلْمِ ) ইলম ,(الْعُلَمَاءُ) উলামা শব্দটি এসেছে। আলিম আরবী শব্দ যার অর্থ জ্ঞানী বা পণ্ডিত । এর বহুবচন হলো- আল উলামা । উলামা শব্দটি এসেছে সূরা ফাতির এর ২৮ নং আয়াতে (ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা)- ''আসল ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাঁকে ভয় করে।''
আর ইলম শব্দটি এসেছে 'ওয়ার রাসিখুনা ফিল ইল্ম' শব্দটি যার অর্থ- পরিপক্ষ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর মানে দাঁড়ালো- যারা পরিপক্ষ জ্ঞানের অধিকারী তারা এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তারা আলেম। তাফসীরকারকগণ বলেছেন, আল্লাহর গুন, আল্লাহর ক্ষমতা, আল্লাহর মালিকানা ও আল্লাহ প্রতাপ সম্পর্কে যিনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল তিনি আলেম।
যিনি ইলম রাখেন তিনিই আলেম। হাদীসে ইলমের আরেকটি বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাঁকে তিনি দ্বীনের বুঝ বা ‘তাফাক্কুহ ফি-দ্বীন’ দান করেন।
তাফাক্কুহ ফি-দ্বীন অর্থ হলো দ্বীনের বুঝ। কেউ দ্বীন বুঝলো, দ্বীন মানলো, দ্বীন অনুযায়ী চললো এবং সেই দ্বীন প্রচারের জন্য লোক গঠন করলো।
যেমন উমর রা কাব রহ. কে জিজ্ঞেস করলেন, প্রকৃত আলেম কে? কাব বললেন, ‘যিনি ইলম অনুযায়ী আমল করেন।‘
অর্থাৎ একজন জ্ঞানী যখনই জানবেন ‘’ন্যায়পরায়ন শাসকের একদিনের শাসন ৬০ বছরের ইবাদাতের সমান’’ তখনি তিনি ন্যায়পরায়ন শাসক নিয়োগের চেষ্টা শুরু করবেন। যখন তিনি জানবেন, ‘’অত্যাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলাও জিহাদ তখন তাঁকে সেই অনুযায়ি কাজ করতে হবে।‘’ তাওবার একটি আয়াতে এসেছে, তারা অভিযানে বের হবে, দ্বীনের জ্ঞান লাভ করবে এবং স্বজাতিকে সতর্ক করবে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, যে আল্লাহকে ভয় করেনা সে জ্ঞানী বা আলেম নয়। আরেকটি হাদীস রয়েছে, রাসূল সা. বলেন, লোকজন যদি তোমাদের মধ্যে দূর দূরান্ত থেকে আসে তাহলে তাদেরকে তাই জানিয়ে দাও যা তমরা জানো। সাবধান! জ্ঞান গোপন করবেনা।
কুরআনের এসব আয়াত-হাদীস থেকে তাই বুঝা যায়, যিনি প্রকৃত জ্ঞানী, তিনি সেই অনুযায়ী কাজ করবেন, তিনি ন্যায়পরায়ন শাসক নিয়োগের জন্য কাজ করবেন, লোক গঠন করবেন, প্রশিক্ষণ দিবেন, এই লক্ষ্যে অভিযানে বের হবেন, সেদিকেই মানুষকে সতর্ক করবেন এবং কেউ তাঁর কাছে আসলে তাঁকে তিনি দ্বীনের ইলম দন করবেন। -তাহলেই তিলি আলেম।
মিশকাতুল মাসাবিহতে এসেছে,জালেম শাসকের দরবারে যাওয়া আলেম ও গোমরাহি নেতাদের শাসনই মূলত ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য সহায়ক শক্তি ।
সুতরাং আমাদের দেখার বিষয় হলো- আমাদের সমাজের মধ্যে এরকম আলেম আছেন কিনা? আমরা যাদেরকে আলেম বলি তারা কি আসলেই আলেম? তারা বিনামূল্যে কাউকে দ্বীন শিক্ষা দেন কিনা। আল্লাহ রাসূলকে এই শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, আপনি বলুন এ সত্য প্রচারে আমি কোনো বিনিময় চাইনা।
আর আমাদের কথিত আলেম সমাজ 'বিনিময়' নেন, জালেম শাসকের কাছে যান, না গেলেও তার আচার ব্যবহার সম্মন্ধে আলহামদুলিল্লাহ ধারণ পোষণ করেন,তারা ইসলামী শাসকের জন্যও কাজ করেন না ।
আমাদের জেনে রাখা উচিত , দ্বীনের শুধু জ্ঞান-ই মূল জ্ঞান নয়। দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞানই মূল জ্ঞান। আর প্রকৃত জ্ঞান হলো, জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করা। আর যিনি জ্ঞানী তিনিই আলেম। আর তিনিই আলেম যিনি ইলমের দাবি অনুযায়ী মাঠে ময়দানে ইলম প্রতিষ্টার জন্য কাজ করেন।
সুতরাং মাদ্রাসায় পড়লেই, ওয়াজ করলেই, আলেম সমাজ কাউকে আলেম বললেই আপনারা তাঁকে আলেম বলবেন না। আলেম হতে হলে কমপক্ষে উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো মানতে হবে। এটা হলো সর্বনিম্ন।
আর ‘দ্বীন’ এর আলেম—এটা তো আরো ব্যাপক। শুধু এটুকু বলা যায় দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞান (তাফাক্কুহ ফি দ্বীন) অর্জন করলেও 'দ্বীন' এর আলেম হওয়া যায়না। যিনি কুরআনের সার্বিক বা সামগ্রিক বিষয় প্রতিষ্টার জন্য আন্দোলন করেন তিনিই দ্বীনের আলেম।
রাসূল সা. এর বহুল প্রচলিত হাদীস, আলেমরা নবীর উত্তরাধিকার। তো আপনাদের কি মনে হয় নবী কাদেরকে এই কথা বলেছেন? কে নবীর প্রকৃত উত্তরাধিকার -যিনি অধিক জেনে গুম হয়ে বসে থাকেন অথবা কোনো কিছুর বিনিময়ে জ্ঞান দান করেন তাকে নাকি যিনি অধিক জেনে সেই অনুযায়ী কাজ করে, সেই কাজ প্রতিষ্টার জন্য লোক নিয়োগ করেন এবং জালেমদের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন শুরু করেন তাকে?
আমাদের নবী ছিলেন সর্বশেষ বার্তাবাহক। আর তিনি পরিপূর্ণভাবে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কখনোও আংশিক কাজ সম্পন্নকারীদেরকে নিজের উত্তরাধিকার হিসেবে বলে যাবেন না। তাদেরকেই বলবেন, যারা এই অনুযায়ী কাজ করে এবং প্রতিষ্টার জন্য জান-মাল সপে দেয়।
Share: