দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

গরু কুরবানির সাম্প্রতিক ইতিহাস - মৃত্যুদণ্ডের ভয় আর নেই

 


গরু কুরবানির সাম্প্রতিক ইতিহাস || মৃত্যুদণ্ডের ভয় আর নেই || নাটোর, ১৯৫৬
 
"সামনে ঈদ-উল-আজহা। মানুষের মুখে মুখে চাপা সুরে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে—এ বছর গরু কোরবানী দেওয়া হবে। অন্যদিকে হিন্দু উকিল—মোক্তারদের একটু চিন্তাগ্রস্তই মনে হচ্ছিল। জটাধারী এক সাংবাদিক যিনি ঢাকার ইত্তেফাক ও কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্টার, ঘনঘন কোর্ট বিল্ডিং এর আশে-পাশে ঘুর ঘুর করছেন। সম্ভবত আন্দাজ করতে চেষ্টা করছেন কোরবানীর বিষয়টি। হঠাৎ জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের কাছ থেকে একটা গোপনীয় চিঠি পেলাম। এতে বলা হয়েছে যে, ঈদের নামাজের সময় যাতে শান্তি-শৃংখলা বজায় থাকে এবং বিশেষ করে কোরবানীর ব্যাপারে যাতে শান্তি-শৃংখলা ভঙ্গ না হয় সে দিকে নজর রাখতে হবে। ভাবলাম এখানে এর আগে কোরবানী নিয়ে কোন বিবাদ-বিসংবাদ হয়েছে বলে তো শুনিনি। তাহলে এই অগ্রিম দুঃশ্চিন্তা কেন? যাহোক, আমার নিজের অফিসারদের নিয়ে একটা মিটিং করলাম। নানাভাবে জানবার চেষ্টা করলাম যে, শান্তি ভঙ্গের কোন আশংকা আছে কিনা? কিন্তু কেউই সে রকম কোন কথা বললেন না। ব্যাপারটা নিজের মাথায় রেখে দিয়ে চুপচাপ থাকলাম। মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শহরে গরু কোরবানী হয় কিনা এবং হলে কি রকম হয়, খুব ধুমধাম করে হয় নাকি?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘এটাতো রাণী ভবানীর শহর, এখানে গরু কোরবানী হয় না। যারা পারে ছাগল, ভেড়া কোরবানী করে। গ্রামের দিকেও তেমন একটা শোনা যায় না কোরবানীর কথা।’ সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার কি মতলব?’ তিনি একটু বেকায়দায় পড়ে গেলেন সত্য, কিন্তু তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমি কোরবানী দেব। ঈদের দিন সন্ধ্যায় আমার বাড়ী আপনাকে আসতে হবে।’ ধন্যবাদ জানালাম তাঁকে দাওয়াতের জন্য।
 
ঈদের আর মাত্র তিন দিন বাকী। মিউনিসিপ্যাল চেয়ারম্যান, উকিল, মোক্তার, একজন ডাক্তার এবং সেই জটাধারী সাংবাদিক (চেয়ারম্যান ছাড়া সকলেই হিন্দু) আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। জিজ্ঞেস করলাম-‘কি ব্যাপার?’ তাঁরা বললেন- ‘স্যার, আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আপনার কাছে এসেছি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।’ ‘বলুন।’ ‘স্যার শহরের দক্ষিণ দিকে নোয়াখালী থেকে আসা কতগুলো মানুষ বসতি স্থাপন করেছে। এরা চাষ করে খায়। প্রকাশ্যে এরা গরু জবাই করে কোরবানী দেবে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা ভয় করছি তারা রায়ট বাধাবার ষড়যন্ত্র করছে। স্যার, আমরা যুগ যুগ ধরে এখানে বাস করে আসছি— এরকম অনাসৃষ্টি কোনদিন হয়নি। তাছাড়া এটা রাজা-মহারাজাদের শহর, মিউনিসিপ্যাল এলাকার মধ্যে এই জাতীয় কাজ হলে আমরা সংখ্যালঘুরা বাস করব কিভাবে? আপনি মহকুমার অধিকর্তা, আপনার কাছে আমরা আকুল আবেদন করছি যাতে গরু কোরবানী বন্ধ করা হয়।’ একটা পিটিশনও তাঁরা এনেছিলেন। সেটি আমার হাতে তুলে দিলেন। পড়ে দেখলাম মুখে যা যা বলেছেন মোটামুটি তাই লেখা আছে। আর্জির কপি জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট, বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের বরাবরে পাঠান হয়েছে। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কয়েকদিন আগে আপনারা ডিএম এবং কমিশনার সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন নাকি?’ সকলেই চুপ। একটু পর উকিল বাবু বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার, আমরা গত সপ্তাহে রাজশাহী গিয়েছিলাম। তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য।’ এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। চেয়ারম্যান সাহেব একেবারে চুপ। আস্তে-ধীরে বললাম যে, ‘কোরবানী করা মুসলমান বিত্তবানদের ধর্মীয় অবশ্য কর্তব্য। ছাগল-ভেড়া মাত্র একজন লোক কোরবানী করতে পারে। গরু-মহিষ হলে অন্তত সাত জন ভাগাভাগি করে তাদের এই অবশ্য করণীয় কাজটি সমাধা করতে পারে। তাদের এই ধর্মীয় অবশ্য করণীয় কাজ করতে সরকার বাধা দেবে কেমন করে? তাছাড়া, তারাতো যে যার বাড়ীর সামনে বা কোন খোলা জায়গায় কোরবানী দেবে। আপনাদের তাতে আতঙ্কিত হবার তো কিছু দেখি না।’ হঠাৎ জটাধারী সাংবাদিক বলে উঠলেন, ‘স্যার, গরু হিন্দুদের পূজণীয়, তাদের দেবতাস্বরূপ। সুতরাং গরু হত্যা করলে আমাদের মনে প্রচন্ড আঘাত লাগবে। সেজন্য এটাকে এড়িয়ে গেলে তো সব ঝামেলা চুকে যায়।’ বললাম, ‘দেখুন হিন্দুরা তাদের আদিযুগে অর্থাৎ আর্যদের যুগে মুণি-ঋষিদের যুগে ‘গোমেধ যজ্ঞ’ করতেন, সোমরস আর গো- শাবকদের মাংস ভক্ষণ করতেন। আমি প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে সে কথাইতো বইপত্রে পড়ে এসেছি। আর নিকট অতীতের কথা ধরতে গেলে বলতে হয় গত সাত শত বছর ধরে মুসলমানরা গরু জবাই করে তার গোস্ত খেয়ে এসেছে আর হিন্দুরা সেই গোমাতার পূজা করে এসেছে। এই দ্বন্দ্ব বেচারা নাটোরের এসডিও কিভাবে সমাধান করবে? একদিকে সংযম অন্যদিকে সহনশীলতা সমস্যাটির একমাত্র সমাধান। আমার তো আর কিছু জানা নেই সমস্যাটির সমাধান সম্বন্ধে।’ তাঁরা বললেন, ‘স্যার, এতদিন মুসলিমরা গরু কোরবানী না দিয়ে পারল আর আজ গরু কোরবানীর জন্য জিদ করছে কেন!’
 
—‘দেখুন জিদের ব্যাপর নয়। আপনারা আপনাদের ধর্মীয় অনুশাসন বাদ দেবেন কিনা চিন্তা করে দেখুন। এতদিন তারা ছিল মৃত্যুদন্ডের ভয়ে ভীত। তারপর গরু খেলে রোগ হয়- ভীতিও ছিল। এক কথায় তারা একটা অন্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এখন তারা বুঝতে পারছে যে, ধর্মীয় বিধান পালন করার জন্য সৃষ্টিকর্তা সহজ পন্থা বাতলিয়ে দিয়েছে। সুতরাং সে কাজে বাধাদান কিভাবে সম্ভব? অনেকক্ষণ কথাবার্তা হবার পর তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, রায়ট তারা করবে কেন? তারা তো গরু কোরবানী করে নিয়ম মত অন্যদের দেবে আর নিজেরা খাবে। কেউ যদি সে কাজে বাধা দেয় তখনই রায়টের প্রশ্ন আসে। সুতরাং রায়ট হলে মনে করব তাদের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। এবং সে বাধা নিশ্চয় কোন মুসলমান দেয়নি। তবে আপনাদের বাড়ীর সংলগ্ন জায়গায় বা সাধারণ মানুষ চলাচলের রাস্তার উপর যাতে কোরবানী না দেওয়া হয় সেটা আমরা নিশ্চিত করব।’ যহোক, তাঁরা চলে গেলেন। সিআই পুলিশ ও আনসার এ্যাডজুটেন্টকে ডাকলাম। খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম শহরে এই প্রথমবারের মত গরু কোরবানী হবে।
 
ঈদের দিনের আগের সন্ধ্যায় মুন্সেফ সাহেব ও আমার সেকেন্ড অফিসারকে বলে দিলাম, ‘শহরের প্রধান জামাতে আমি উপস্থিত থাকবো না। সাত-আট মাইল দূরে এক গ্রামের ঈদগাহে নামাজ আদায় করব।’ পরদিন ভোরে চলে গেলাম একটা পিয়নকে সঙ্গে করে ওই গ্রামের ঈদগাহে। এই ঈদগাহটি হল একটা খালের ওপাড়ে। যখন আমি খালের এপাড়ে হাজির হলাম। ওপাড়ের জামাত থেকে মানুষগুলো চিৎকার করছে, ‘এসডিও সাহেব কি জয়।’ খাল পেরিয়ে বকাবকি করলাম এদেরকে। ইমাম সাহেবকে বললাম, তিনি তো এদেরকে একটু নসিহত করলে পারতেন। ঈদের জামাতে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন ছাড়া কারো কোন প্রশংসা একজন মুসলমান কিভাবে করে? তাছাড়া বিগত চল্লিশের দশকের সেই ‘জিন্দাবাদ’ আর ‘জয়’—এর দ্বন্দ্বের পর শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ন’বছর পরেও ঈদের জামাতে ‘জয়’ শোনার জন্য মনটা সত্যিই তৈরী ছিল না। ঈদের জামাত, তাই নিজেকে সংযত করতেই হল। সবাইকে নিয়ে সরবে আউড়াতে লাগলাম ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহ আকবার, আল্লাহ আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ’— মুহূর্তে পরিবেশটি আবেগময় হয়ে উঠল।
 
যথারীতি ঈদের নামাজ পর্ব শেষে শহরে ফিরলাম। সব ঠিকঠাকই আছে। শহরে হ্যাঁ, রাণী ভবানীর শহরে সম্ভবত প্রথমবারের মত তিনটি গরু কোরবানী হল মৃত্যুদন্ডের ভয় ছাড়াই। একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার কাছে হিন্দু প্রতিনিধিরা একথাও বলেছিলেন যে, গরুর মাংস খেয়ে হাড়গুলি যেখানে-সেখানে ফেলে দিলে কাকরা মুখে করে হিন্দুদের বাড়ীতে ফেলতে পারে। এতে হিন্দুদের ধর্ম নষ্ট হয়ে যেতে পারে—তারা মনে আঘাত পেতে পারে। তখন তাদের বলেছিলাম যে, ‘বেচারা এসডিও’র কোন ক্ষমতা কাক-চিলের ওপর নেই— তারা ১৪৪ ধারার তোয়াক্কা করে না।’ এ কথাও অবশ্য বলে দিলাম যে, ‘এত বছর তো মুসলমানরা গরু জবাই করেনি—কিন্তু ভাগাড় থেকে মরা গরুর হাড্ডি কুকুররা হিন্দু—মুসলমান নির্বিচারে সবার বাড়ীর আনাচে-কানাচে এনে খায় এবং ফেলে যায়— এতে তো কারো মনে আঘাত পাবার কথা এ পর্যন্ত শুনিনি।’ সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম। চেয়ারম্যান সাহেব বিজয়ের সুরে বললেন তেবাড়িয়ার হাট থেকে নিজে গিয়ে গরু কিনে এনেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘জবাই দিলেন কোথায়?’ বেচারা একটু সুর নিচু করে জবাব দিলেন, ‘কি করবো স্যার বাড়ীর উঠানে জবাই দিয়েছি।’ বললাম, ‘সর্বনাশ, এখানে আপনার একটা গরু শোয়ানর মত জায়গা কোথায়?’ বললেন, ‘কি করবো স্যার? সবদিক দেখেই তো চলতে হয়।’ বললাম, ‘আপনি, খুব ভাল কাজ করেছেন।
 
অন্যান্যের জন্য দৃষ্টান্ত হবে এটা। নিজের বাড়ীর লোকদের কষ্ট হলেও অন্যের মনে যাতে আঘাত না লাগে সে কাজই আপনি করেছেন।’ নানা আলাপ-আলোচনার মধ্যে হঠাৎ চেয়ারম্যান সাহেব আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘আমার স্ত্রী বলেছেন বাড়ীর ভেতর গরু জবাই দেয়া হল কোন অমঙ্গল হবে না তো?’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘প্রশ্নটা আপনার স্ত্রীর না আপনার?’ ‘না স্যার, আমি তো এসব পাত্তাই দেই না।’ বললাম, ‘আপনার স্ত্রীকে বলবেন, এসডিও সাহেব বলেছেন এ বাড়ীতে যে সব ভূত-প্রেত এতদিন ছিল, আজকের এই গরু কোরবানীর পর সব এই মহকুমা ছেড়ে পালিয়ে গেছে, আর কোন দিন তারা আসবে না।’ গরু কোরবানীর কারণে কোথাও আইন-শৃংখলার কোন রকম ব্যাঘাত ঘটেনি। আর একটি থানায়ও একটি গরু কোরবানী হয়েছিল বলে খবর পেয়েছিলাম।"
_____________
স্মৃতির পাতা থেকে, পি এ নাজির, পৃ. ৩৬—৩৯
Share:

একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ৪

২৪। 


১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাব নিয়া মাঝে-মধ্যেই কথা উঠতে দেখতেছি। বাংলাদেশে এইটা মশহুর হইয়া আছে যে এই প্রস্তাব শেরে বাঙাল এ.কে. ফজলুল হকের। কিন্তু এইটা তারা ভুইলা যান যে এই কারারদাদ (ঘোষণা) শেরে বাঙালের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়।
 
খেয়াল রাখতে হবে যে, এই প্রস্তাব পাশ হইতেছে মুসলিম লীগের অনুষ্ঠানে। হক সাহেব ১৯১০ এর দশকে যুগপৎভাবে লীগ আর কংগ্রেসের নেতা হইলেও ১৯৩৭ —এ প্রধানমন্ত্রী হইছেন কৃষক-প্রজা পার্টির হয়ে। তার পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দিন। এর আগে ১৯২৪ সালে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতি বাদ দিয়া কৃষক দলের দোকান খোলেন, আর ১৯৪৬ সালে তা বন্ধ কইরা পুনরায় মুসলিম লীগে যোগ দেন। অর্থাৎ কারারদাদ-এ পাকিস্তানের সময় তিনি মুসলিম লীগে ছিলেনই না।
 
তাইলে কী হইছিল? পাকিস্তানের প্রস্তাবের উপস্থাপক শেরে বাঙাল এ কে ফজলুল হক এবং খোদ খসড়া প্রস্তুতকারী পাঞ্জবের প্রধানমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান দুইজনই নন-লীগার। মূলত নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত এই প্রস্তাব জনপ্রিয় করতে দুই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সর্বোচ্চ নেতাদের ব্যবহার করছিলেন কায়েদে আযম। একজনরে দিয়া খসড়া লেখাইছেন, আরেকজনরে উপস্থাপন করতে দিছেন।
 
এই প্রস্তাবটি ১৯৪০ সালের ২২-২৪ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ২৭ তম অধিবেশনে পাশ করা হয়। এই অধিবেশনের সভাপতিত্ব করতেছিলেন কায়েদে আযম। এর আগে জিন্নাহ সাহেব একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। স্যার সিকান্দার হায়াত খান, মালিক বরকত আলী এবং নবাব ইসমাইল খানকে নিয়ে এই কমিটি। এই কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে সিকান্দার হায়াত খান ইংরেজিতে একটি খসড়া তৈরি করেন। ২২ মার্চ এই খসড়া মুসলিম লীগের সাবজেক্ট কমিটিতে পেশ করেন কায়েদে মিল্লাত শহীদ লিয়াকত আলী খান। সম্মেলনে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হলে নতুন সংকট দেখা দেয়। নেতৃবৃন্দের অনেকেই ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। এই সময় এই খসড়াটি উর্দুতে লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় মাওলানা জাফর আলী খানকে। তিনি যখন এটি উর্দুতে তরজমা করছিলেন, সিকান্দার সাহেব পাশে বসেই নিরীক্ষণ করছিলেন। 
 
সিকান্দার হায়াত খানের এই প্রস্তাবের উপর বহু কাটাকাটি হয়। উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে খোদ কায়েদে আযম এবং মালিক বরকত আলীসহ আরও অনেকেই সংশোধনী ও সংযোজনী দেন। প্রাথমিক খসড়া মাত্র দুই পাতায় লেখা হয়েছিল। কিন্তু এত বেশি সংশোধনী আর সংযোজনী এসেছিল যে কাটাকাটি ও পুনর্লিখন করতে করতে মোট পৃষ্ঠা দাঁড়িয়েছিল ১৩তে। এভাবেই প্রস্তুত ও গৃহীত হয় লাহোর প্রস্তাব। পরদিন শেরে বাঙাল এ কে ফজলুল হককে দিয়ে এই প্রস্তাব ঘোষণা আকারে পাঠ করান কায়েদে আযম। ২৫ মার্চ উর্দু দৈনিক ইনকিলাবে উর্দু প্রস্তাবটি হুবহু ছাপা হয়। সেখানে 'আজাদ ইসলামী হুকুমাতেঁ' শিরোনামে একটি অনুচ্ছেদ ছিলো। অর্থাৎ বহুবচন, একাধিক রাষ্ট্রের প্রস্তাব।
 
২৫। শেরে বাঙাল খেতাব কি গান্ধী দিছিলেন?
কোন কোন বাঙাল মনে করেন যে হক সাহেবকে শেরে বাঙাল খেতাব দিছিলেন গান্ধী। আসলে ১৯৩৭ সালে লখনৌ অধিবেশনে উপস্থিত হলে জনগণের মধ্যে চঞ্চলতা সৃষ্টি হয়। হিন্দু বিরোধী বক্তব্য দিয়ে তিনি তখন ভারতীয় মুসলমানের কাছে জনপ্রিয়। এই সময়েই অনুষ্ঠান সভাপতি কায়েদে আযম তাকে 'শেরে বাঙাল' বলে অভিহিত করেন। তখন থেকেই তিনি শেরে বাঙাল।
 -কারারদাদ সংক্রান্ত বক্তব্যটি উর্দু দৈনিক দুনিয়া অবলম্বনে লিখিত।
 
২৬।
 
 
 রোহিঙ্গা বিদ্বেষ ছড়ানোর মূলে হলো বাঙালি জাতিবাদ।আজকের জাতিবাদীদের পূর্বপুরুষরাই বিহারী মুহাজিরদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন ও গণহত্যা পরিচালনা করেছিল। এদের একটা অংশ অবাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষবশত পাকিস্তান ভাঙতে গিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য নিজেরাও রিফিউজিতে পরিণত হইছিল। সাথে নিজেদের গুণ্ডাগিরির মধ্য দিয়া আরও বিশাল একটা অংশকেও পরিণত করছিল রিফিউজিতে।

কিন্তু রিফিউজি অবস্থায় তাদের পরিণতি কী ছিল? নেতারা কে কোথায় ছিলেন, সেগুলো মোটামুটি সবাই জানে। কিন্তু নিম্নস্তরের জাতিবাদী, আর বৃহৎ পরিসরে সাধারণ বাঙালির অবস্থা কেমন ছিল? একাত্তরের ৬ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমসের বিশাল খবর। শিরোনাম— 'Bengali Refugees Stirring Strife in India', মানে ‘বাঙালি উদ্বাস্তুরা ভারতে কলহ ছড়াচ্ছে’। চতুর্থ প্যারায় লেখা হয়েছে— ‘There have been clashes and brief riots in which several refugees have been killed by the police or by local people.’
 
এই পরিস্থিতিতে বিশাল অংকের উদ্বাস্তুর ভার যখন সইতে পারছিল না পশ্চিম বাংলা, তখন কেন্দ্রীয় ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল বাঙালদের অন্যান্য প্রদেশে স্থানান্তরের। কিন্তু বাঙালরা রাজি হয়নি। যেমনটা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠাতে গিয়ে ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু কেন? কারণ ‘the refugees, virtually all Bengalis, do not want to leave an area where they are culturally and linguistically at home.’
 
আর কী কী সমস্যা? পড়েন— ‘Refugees complain that camp officials are not giving them their full rations. In some camps, refugees charge that officials are illegally selling relief supplies on the black market.
 
Local Indians, meanwhile, are complaining that they cannot afford to buy the amount of food the refugees are getting free. Refugees and local people clash over the scarce firewood for cooking: fights have also occurred when refugees strip food from orchards.
 
Refugee pressures have driven some food prices up, while wage rates have dropped, particularly for unskilled field hands, as the refugees have entered the labor market—despite a Government prohibition—and have offered to work for extremely low pay.’
 
প্রগতিমারানি বাম ভাদাদের ভূমিকা কী ছিল জানেন? খবর বলছে তারা উস্কানি দিয়ে যাচ্ছিল স্থানীয় আর রিফিউজিদের মধ্যকার বিবাদে। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে— ‘Leftist political parties have begun exploiting the discontent of both the refugees and the local people. Some of the clashes have reportedly been fomented by extremists.’ পরিস্থিতি কি মুহাজির রোহিঙ্গা কওমের চেয়ে উন্নত কিছু ছিল? হ্যাঁ, এই খবরে বাঙালদের ইয়োবা বিক্রির কথা বলা হয়নি। কিন্তু এমন ভান ধরছে এই বাঙালরা যেন মনে হচ্ছে তারা ইয়োবা কী জিনিস, কখনো চেখে দেখে নাই।
 
মোদ্দাকথা, একাত্তরে বাঙাল রিফিউজি আর এখনকার রোহিঙ্গা কিংবা সাতচল্লিশের বিহারী মুহাজিরদের মধ্যকার ক্ষোভ, অসন্তোষ যা; তা উদ্বাস্তু জীবনের স্বাভাবিক বিষয়। এর সমাধান খুঁজতে হবে; বিদ্বেষ, ঘৃণা নয়।
 
২৭। 


'স্বৈরশাসক' আইয়ুব খান তখন ক্ষমতায়। ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখলের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেন। গঠন করেন এসএম শরীফ শিক্ষা কমিশন। ১০ সদস্যের ওই কমিশনে চারজন বাঙালি ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন খুবই পরিচিত। একজন অধ্যাপক মোমতাজ‌উদ্দিন আহমেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য; আরেকজন অধ্যাপক এ এফ আতোয়ার রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক ও ১৯৮৭ সালে জাতীয় অধ্যাপক এবং অন্যজন বুয়েটের প্রথম উপাচার্য এম এ রশীদ, যিনি ৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হন। বাকি একজন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা ছিলেন, আব্দুল হক।
 
এই কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে কিছু সমস্যা ছিল। শিক্ষার ব্যয়-বৃদ্ধি এবং শিক্ষা সংকোচনের মতো ব্যাপার ছিল। ১৯৬২ সালে এই কমিশনের নীতি বাস্তবায়ন শুরু হয়। এতে কথিত কিছু 'মৌলবাদী' ও 'সাম্প্রদায়িক' নীতিও ছিল। এসব সামনে আনার সুযোগ তখন ছিল না। নিষিদ্ধ হয়েও ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন গোপনে ছাত্রদের সংগঠিত করে এই শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন দাঁড় করিয়ে দেয়। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর লাশ পড়লে এর চুড়ান্ত পরিণতি ঘটে। ৬৪ সালে হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করে এর থেকে মুক্তি পায় আইয়ুব।
 
১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামের আলোকে ঢেলে সাজানোর নিয়ত করে। গঠন করে নূর খান শিক্ষা কমিশন। মাদরাসাকে স্কুলের সাথে একীভূত করে সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষা চালুর প্রস্তাব দেয় এই কমিশন। পাশাপাশি বয়স্ক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা ও উর্দুর প্রস্তাব দেয়।
 
কিন্তু দেশের হিন্দু লবি, প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতান্ত্রিক শক্তি ও কথিত 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র ধ্বজাধারীরা এর বিরুদ্ধে হৈচৈ শুরু করে। এর প্রেক্ষিতে জনমত জরিপের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয় সরকার। জরিপের অংশ হিসাবে ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নিপা ভবনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুত্ববাদী ও সমাজতান্ত্রিকদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা সভাপতি আব্দুল মালেক বক্তব্য রাখেন সে সভায়। সেদিন ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে সেই আলোচনা কক্ষে তুমুল ঝড় ওঠে। পরে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ১২ আগস্ট ছাত্রদের নিয়ে সভা ডাকে। সেখানে আব্দুল মালেকসহ ইসলামপন্থীদের উপস্থিতি ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবুও ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার 'ব্রান্ডিং' এর জন্য আব্দুল মালেক ছাত্র সংঘের নেতাদের নিয়ে উপস্থিত হন সেখানে।
 
এই অপরাধে ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় লাল সন্ত্রাসীরা। রেসকোর্স ময়দানে নির্মমভাবে আব্দুল মালেককে শহীদ করা হয়। কথিত 'ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান' এর এই তো ঐতিহাসিক উদ্বোধন। সম্ভবত এই কমিশন আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে পরের বছর 'পাকিস্তান: দেশ ও কৃষ্টি' নামে একটি বই মাধ্যমিক স্তরে চালু করে সরকার। বইটির লেখক মুহম্মদ সিরাজুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ পান।
 
বইটিতে উপমহাদেশে ইসলামের তথা মুসলমানদের ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে আবারও ক্ষিপ্ত হয় রাম-বামরা। ওই বছর এই বইটি বাতিলের দাবিতে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের সূত্রপাত করে তারা। এতে স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাদেরও শামিল করতে সমর্থ হয় আধিপত্যবাদের এই দোসররা। আরেক 'স্বৈরশাসক' ইয়াহিয়াও ভারতের দালালদের চাপে এই বইটি তুলে নিতে বাধ্য হন।
 
এরপর? বাকিটা ইতিহাস। চলতি সময়ে কথা হচ্ছে 'ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান' বইটি নিয়ে। ৬২, ৬৯ আর ৭০’র সেই গেরুয়া আর লাল সন্ত্রাসীরা নিশ্চিন্তমনে সব আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু আজকে শহীদ আব্দুল মালেকের উত্তরসুরীরা কি কোন আন্দোলন গড়তে পেরেছে? সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলতি শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনা সৃষ্টি দূরে থাক, নিজেদের মধ্যেই কি কোন কর্মসূচি নিয়েছে? মালেকের উত্তরসুরীরা কোন 'ঝটিকা' মিছিলও করেছে কি না আমার জানা নেই। আফসোস! তৌহিদবাদী জনপদে হিন্দু লবি কাজ করে, লাল সন্ত্রাসীরা বিষ ছড়ায়; কিন্তু খোদ তৌহিদবাদীরা কিছু করতে পারে না।
 
২৮।  ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য শেষে কায়েদে আযমের সঙ্গে দেখা করতে চায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি দল। তারা প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে করা চুক্তি উপস্থাপন করে বাংলার পক্ষে কথা বলেন। কায়েদ বলেন সেই চুক্তি তিনি মানেন না। কারণ খাজা সাহেবকে বাধ্য করা হয়েছিল এ চুক্তি স্বাক্ষরে। আট দফা চুক্তির আটটি দফাই ছিল সরকারের করণীয়। আন্দোলনকারীদের করণীয় কিছু ছিল না। এটা কোন চুক্তির সংজ্ঞায় পড়ে না।
 
প্রতিনিধি দল কায়েদে আযমের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিল। তারা বলল কানাডা, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে একাধিক রাষ্ট্রভাষা আছে। জিন্নাহ তা অস্বীকার করলেন। তখন অলি আহাদ কায়েদে আযমকে অপসারণের হুমকি দেয়।
অলি আহাদ রাষ্ট্রের গভর্নরকে বলছে- "I also know that you are the Governor General of Pakistan. But we also know that we can appeal to #Queen for your removal."
এ কথা শুনে সম্ভবত কায়েদে আযম ধমক দিছিলেন। তাঁর সেক্রেটারি রিভলবার উঁচিয়ে কামরায় প্রবেশ করেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আবার ফিরে যান।
 
কিন্তু এরপরও জিন্নাহ ছাত্রদের সাথে নমনীয় আচরণ করেন। এত বড় একটা হুমকি পাওয়ার পর তিনি যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তা ঠিক হুঁশিয়ারি মনে হয় না। তিনি 'My Boys' সম্বোধন করে বলেন, "Two men may differ on one point. let us differ respectfully. You can go with point with constitutional way. Any unconstitutional movement will be crushed ruthlessly."
 
ঢাকার নেতা খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
 
 
 ২৯।

গরু কুরবানির সাম্প্রতিক ইতিহাস || মৃত্যুদণ্ডের ভয় আর নেই || নাটোর, ১৯৫৬
 
"সামনে ঈদ-উল-আজহা। মানুষের মুখে মুখে চাপা সুরে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে—এ বছর গরু কোরবানী দেওয়া হবে। অন্যদিকে হিন্দু উকিল—মোক্তারদের একটু চিন্তাগ্রস্তই মনে হচ্ছিল। জটাধারী এক সাংবাদিক যিনি ঢাকার ইত্তেফাক ও কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্টার, ঘনঘন কোর্ট বিল্ডিং এর আশে-পাশে ঘুর ঘুর করছেন। সম্ভবত আন্দাজ করতে চেষ্টা করছেন কোরবানীর বিষয়টি। হঠাৎ জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের কাছ থেকে একটা গোপনীয় চিঠি পেলাম। এতে বলা হয়েছে যে, ঈদের নামাজের সময় যাতে শান্তি-শৃংখলা বজায় থাকে এবং বিশেষ করে কোরবানীর ব্যাপারে যাতে শান্তি-শৃংখলা ভঙ্গ না হয় সে দিকে নজর রাখতে হবে। ভাবলাম এখানে এর আগে কোরবানী নিয়ে কোন বিবাদ-বিসংবাদ হয়েছে বলে তো শুনিনি। 
 
তাহলে এই অগ্রিম দুঃশ্চিন্তা কেন? যাহোক, আমার নিজের অফিসারদের নিয়ে একটা মিটিং করলাম। নানাভাবে জানবার চেষ্টা করলাম যে, শান্তি ভঙ্গের কোন আশংকা আছে কিনা? কিন্তু কেউই সে রকম কোন কথা বললেন না। ব্যাপারটা নিজের মাথায় রেখে দিয়ে চুপচাপ থাকলাম। মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শহরে গরু কোরবানী হয় কিনা এবং হলে কি রকম হয়, খুব ধুমধাম করে হয় নাকি?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘এটাতো রাণী ভবানীর শহর, এখানে গরু কোরবানী হয় না। যারা পারে ছাগল, ভেড়া কোরবানী করে। গ্রামের দিকেও তেমন একটা শোনা যায় না কোরবানীর কথা।’ সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার কি মতলব?’ তিনি একটু বেকায়দায় পড়ে গেলেন সত্য, কিন্তু তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমি কোরবানী দেব। ঈদের দিন সন্ধ্যায় আমার বাড়ী আপনাকে আসতে হবে।’ ধন্যবাদ জানালাম তাঁকে দাওয়াতের জন্য।
 
ঈদের আর মাত্র তিন দিন বাকী। মিউনিসিপ্যাল চেয়ারম্যান, উকিল, মোক্তার, একজন ডাক্তার এবং সেই জটাধারী সাংবাদিক (চেয়ারম্যান ছাড়া সকলেই হিন্দু) আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। জিজ্ঞেস করলাম-‘কি ব্যাপার?’ তাঁরা বললেন- ‘স্যার, আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আপনার কাছে এসেছি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।’ ‘বলুন।’ ‘স্যার শহরের দক্ষিণ দিকে নোয়াখালী থেকে আসা কতগুলো মানুষ বসতি স্থাপন করেছে। এরা চাষ করে খায়। প্রকাশ্যে এরা গরু জবাই করে কোরবানী দেবে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা ভয় করছি তারা রায়ট বাধাবার ষড়যন্ত্র করছে। স্যার, আমরা যুগ যুগ ধরে এখানে বাস করে আসছি— এরকম অনাসৃষ্টি কোনদিন হয়নি। তাছাড়া এটা রাজা-মহারাজাদের শহর, মিউনিসিপ্যাল এলাকার মধ্যে এই জাতীয় কাজ হলে আমরা সংখ্যালঘুরা বাস করব কিভাবে? আপনি মহকুমার অধিকর্তা, আপনার কাছে আমরা আকুল আবেদন করছি যাতে গরু কোরবানী বন্ধ করা হয়।’ একটা পিটিশনও তাঁরা এনেছিলেন। 
 
সেটি আমার হাতে তুলে দিলেন। পড়ে দেখলাম মুখে যা যা বলেছেন মোটামুটি তাই লেখা আছে। আর্জির কপি জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট, বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের বরাবরে পাঠান হয়েছে। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কয়েকদিন আগে আপনারা ডিএম এবং কমিশনার সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন নাকি?’ সকলেই চুপ। একটু পর উকিল বাবু বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার, আমরা গত সপ্তাহে রাজশাহী গিয়েছিলাম। তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য।’ এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। চেয়ারম্যান সাহেব একেবারে চুপ। আস্তে-ধীরে বললাম যে, ‘কোরবানী করা মুসলমান বিত্তবানদের ধর্মীয় অবশ্য কর্তব্য। ছাগল-ভেড়া মাত্র একজন লোক কোরবানী করতে পারে। গরু-মহিষ হলে অন্তত সাত জন ভাগাভাগি করে তাদের এই অবশ্য করণীয় কাজটি সমাধা করতে পারে। তাদের এই ধর্মীয় অবশ্য করণীয় কাজ করতে সরকার বাধা দেবে কেমন করে? তাছাড়া, তারাতো যে যার বাড়ীর সামনে বা কোন খোলা জায়গায় কোরবানী দেবে। আপনাদের তাতে আতঙ্কিত হবার তো কিছু দেখি না।’ 
 
হঠাৎ জটাধারী সাংবাদিক বলে উঠলেন, ‘স্যার, গরু হিন্দুদের পূজণীয়, তাদের দেবতাস্বরূপ। সুতরাং গরু হত্যা করলে আমাদের মনে প্রচন্ড আঘাত লাগবে। সেজন্য এটাকে এড়িয়ে গেলে তো সব ঝামেলা চুকে যায়।’ বললাম, ‘দেখুন হিন্দুরা তাদের আদিযুগে অর্থাৎ আর্যদের যুগে মুণি-ঋষিদের যুগে ‘গোমেধ যজ্ঞ’ করতেন, সোমরস আর গো- শাবকদের মাংস ভক্ষণ করতেন। আমি প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে সে কথাইতো বইপত্রে পড়ে এসেছি। আর নিকট অতীতের কথা ধরতে গেলে বলতে হয় গত সাত শত বছর ধরে মুসলমানরা গরু জবাই করে তার গোস্ত খেয়ে এসেছে আর হিন্দুরা সেই গোমাতার পূজা করে এসেছে। এই দ্বন্দ্ব বেচারা নাটোরের এসডিও কিভাবে সমাধান করবে? একদিকে সংযম অন্যদিকে সহনশীলতা সমস্যাটির একমাত্র সমাধান। আমার তো আর কিছু জানা নেই সমস্যাটির সমাধান সম্বন্ধে।’ তাঁরা বললেন, ‘স্যার, এতদিন মুসলিমরা গরু কোরবানী না দিয়ে পারল আর আজ গরু কোরবানীর জন্য জিদ করছে কেন!’
 
—‘দেখুন জিদের ব্যাপর নয়। আপনারা আপনাদের ধর্মীয় অনুশাসন বাদ দেবেন কিনা চিন্তা করে দেখুন। এতদিন তারা ছিল মৃত্যুদন্ডের ভয়ে ভীত। তারপর গরু খেলে রোগ হয়- ভীতিও ছিল। এক কথায় তারা একটা অন্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এখন তারা বুঝতে পারছে যে, ধর্মীয় বিধান পালন করার জন্য সৃষ্টিকর্তা সহজ পন্থা বাতলিয়ে দিয়েছে। সুতরাং সে কাজে বাধাদান কিভাবে সম্ভব? অনেকক্ষণ কথাবার্তা হবার পর তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, রায়ট তারা করবে কেন? তারা তো গরু কোরবানী করে নিয়ম মত অন্যদের দেবে আর নিজেরা খাবে। কেউ যদি সে কাজে বাধা দেয় তখনই রায়টের প্রশ্ন আসে। সুতরাং রায়ট হলে মনে করব তাদের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। এবং সে বাধা নিশ্চয় কোন মুসলমান দেয়নি। তবে আপনাদের বাড়ীর সংলগ্ন জায়গায় বা সাধারণ মানুষ চলাচলের রাস্তার উপর যাতে কোরবানী না দেওয়া হয় সেটা আমরা নিশ্চিত করব।’ যহোক, তাঁরা চলে গেলেন। সিআই পুলিশ ও আনসার এ্যাডজুটেন্টকে ডাকলাম। খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম শহরে এই প্রথমবারের মত গরু কোরবানী হবে।
 
ঈদের দিনের আগের সন্ধ্যায় মুন্সেফ সাহেব ও আমার সেকেন্ড অফিসারকে বলে দিলাম, ‘শহরের প্রধান জামাতে আমি উপস্থিত থাকবো না। সাত-আট মাইল দূরে এক গ্রামের ঈদগাহে নামাজ আদায় করব।’ পরদিন ভোরে চলে গেলাম একটা পিয়নকে সঙ্গে করে ওই গ্রামের ঈদগাহে। এই ঈদগাহটি হল একটা খালের ওপাড়ে। যখন আমি খালের এপাড়ে হাজির হলাম। ওপাড়ের জামাত থেকে মানুষগুলো চিৎকার করছে, ‘এসডিও সাহেব কি জয়।’ খাল পেরিয়ে বকাবকি করলাম এদেরকে। ইমাম সাহেবকে বললাম, তিনি তো এদেরকে একটু নসিহত করলে পারতেন। ঈদের জামাতে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন ছাড়া কারো কোন প্রশংসা একজন মুসলমান কিভাবে করে? তাছাড়া বিগত চল্লিশের দশকের সেই ‘জিন্দাবাদ’ আর ‘জয়’—এর দ্বন্দ্বের পর শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ন’বছর পরেও ঈদের জামাতে ‘জয়’ শোনার জন্য মনটা সত্যিই তৈরী ছিল না। ঈদের জামাত, তাই নিজেকে সংযত করতেই হল। সবাইকে নিয়ে সরবে আউড়াতে লাগলাম ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহ আকবার, আল্লাহ আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ’— মুহূর্তে পরিবেশটি আবেগময় হয়ে উঠল।
 
যথারীতি ঈদের নামাজ পর্ব শেষে শহরে ফিরলাম। সব ঠিকঠাকই আছে। শহরে হ্যাঁ, রাণী ভবানীর শহরে সম্ভবত প্রথমবারের মত তিনটি গরু কোরবানী হল মৃত্যুদন্ডের ভয় ছাড়াই। একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার কাছে হিন্দু প্রতিনিধিরা একথাও বলেছিলেন যে, গরুর মাংস খেয়ে হাড়গুলি যেখানে-সেখানে ফেলে দিলে কাকরা মুখে করে হিন্দুদের বাড়ীতে ফেলতে পারে। এতে হিন্দুদের ধর্ম নষ্ট হয়ে যেতে পারে—তারা মনে আঘাত পেতে পারে। তখন তাদের বলেছিলাম যে, ‘বেচারা এসডিও’র কোন ক্ষমতা কাক-চিলের ওপর নেই— তারা ১৪৪ ধারার তোয়াক্কা করে না।’ এ কথাও অবশ্য বলে দিলাম যে, ‘এত বছর তো মুসলমানরা গরু জবাই করেনি—কিন্তু ভাগাড় থেকে মরা গরুর হাড্ডি কুকুররা হিন্দু—মুসলমান নির্বিচারে সবার বাড়ীর আনাচে-কানাচে এনে খায় এবং ফেলে যায়— এতে তো কারো মনে আঘাত পাবার কথা এ পর্যন্ত শুনিনি।’ 
 
সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম। চেয়ারম্যান সাহেব বিজয়ের সুরে বললেন তেবাড়িয়ার হাট থেকে নিজে গিয়ে গরু কিনে এনেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘জবাই দিলেন কোথায়?’ বেচারা একটু সুর নিচু করে জবাব দিলেন, ‘কি করবো স্যার বাড়ীর উঠানে জবাই দিয়েছি।’ বললাম, ‘সর্বনাশ, এখানে আপনার একটা গরু শোয়ানর মত জায়গা কোথায়?’ বললেন, ‘কি করবো স্যার? সবদিক দেখেই তো চলতে হয়।’ বললাম, ‘আপনি, খুব ভাল কাজ করেছেন। অন্যান্যের জন্য দৃষ্টান্ত হবে এটা। নিজের বাড়ীর লোকদের কষ্ট হলেও অন্যের মনে যাতে আঘাত না লাগে সে কাজই আপনি করেছেন।’ নানা আলাপ-আলোচনার মধ্যে হঠাৎ চেয়ারম্যান সাহেব আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘আমার স্ত্রী বলেছেন বাড়ীর ভেতর গরু জবাই দেয়া হল কোন অমঙ্গল হবে না তো?’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘প্রশ্নটা আপনার স্ত্রীর না আপনার?’ ‘না স্যার, আমি তো এসব পাত্তাই দেই না।’ বললাম, ‘আপনার স্ত্রীকে বলবেন, এসডিও সাহেব বলেছেন এ বাড়ীতে যে সব ভূত-প্রেত এতদিন ছিল, আজকের এই গরু কোরবানীর পর সব এই মহকুমা ছেড়ে পালিয়ে গেছে, আর কোন দিন তারা আসবে না।’
 
গরু কোরবানীর কারণে কোথাও আইন-শৃংখলার কোন রকম ব্যাঘাত ঘটেনি। আর একটি থানায়ও একটি গরু কোরবানী হয়েছিল বলে খবর পেয়েছিলাম।"
_______স্মৃতির পাতা থেকে, পি এ নাজির, পৃ. ৩৬—৩৯
 

Share:

পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ: পিছনের কারিগরের জবানিতে

 

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পবিত্র শবে কদর রাতে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য নেয়ামত স্বরূপ আসে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র 'পাকিস্তান'। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম বাগানে জগৎশেঠদের ষড়যন্ত্রে স্বাধীনতা হারানোর পর বাংলার মুসলমানরা ১৯০ বছর ধরে যে স্বাধীনতার বীজ বুনে যাচ্ছিল, তারাই এই পাকিস্তান ছিনিয়ে আনার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। বিশ্বের অন্যতম ধনী অঞ্চল বাংলা ব্রিটিশ উপনিবেশকালে অন্যতম গরীব অঞ্চলে পরিণত হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ হওয়ার পাশাপাশি পূর্ব বাংলা পশ্চিম বাংলারও একটি উপনিবেশ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় হালত ছিল মুসলমানদের। কিন্তু পাকিস্তান গঠনের পর এই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তরতর করে শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি, অর্থনীতি সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে থাকে মুসলমানরা। ভারতভাগের সময়কালে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে ভারত-পাকিস্তান ভূখণ্ড ভাগাভাগির সাথে সাথে মানুষও ভাগ হয়ে যেতে থাকে। পশ্চিম বাংলা থেকে, বিহার থেকে, অন্যান্য অঞ্চল থেকে যেমন দাঙ্গার শিকার মুসলমানরা এপারে চলে আসেন, এপারেও দাঙ্গার শিকার হয়ে হিন্দুরা ভারতে চলে যেতে থাকে। তবে অবস্থাপন্ন হিন্দুদের পালিয়ে যাওয়ার পিছনে আরেকটি কারণ বিদ্যমান ছিল: ভয়। ভারত রাণীর ছত্রছায়ায় বহু হিন্দু জমিদার, জোতদাররা এ অঞ্চলের মুসলমানদের যে শোষণ ও নিপীড়ন করেন, তার শাস্তির ভয়।
 
তবে সাতচল্লিশে দেশত্যাগ করে কলকাতায় আশ্রয় নেয়া কালিদাস বৈদ্যরা পাকিস্তানের প্রতি অনাস্থার কারণেই চলে গিয়েছিলেন। হিন্দু অধ্যুষিত দক্ষিণবঙ্গের দাঙ্গা প্রবণ অঞ্চলের সামন্তগাতি গ্রামের ডা. কালিদাস বৈদ্য তখন তরুণ। চোখের পলকে মুসলমানদের উন্নতি, প্রজা থেকে রাজার আসনে উত্থান, অশিক্ষার অন্ধকার থেকে শিক্ষার আলো ছড়াতে দেখে যাদের বুক জ্বলে যেত, তিনি ছিলেন তাদেরই অংশ। ফলে সাতচল্লিশে সপরিবারে কলকাতায় আশ্রয় নিলেও ১৯৫০ সালে তিনি দেশে ফিরে এলেন 'পাকিস্তান ভাঙার ব্রত নিয়ে'। তার সঙ্গী দু’জন; চিত্তরঞ্জন সুতার ও নীরদ মজুমদার। চিত্ত আর নীরদবাবু রাজনীতিতে যুক্ত হলেন। কালিদাস বৈদ্য ভর্তি হলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাঙালির স্বপ্নরাজ্য পাকিস্তানকে বিতর্কিত ও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিলেন 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' এর ধোঁয়া। কিন্তু পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাই শুধু নয়, ভারতভুক্তি অথবা ভারত অনুগত হিন্দু চালিত একটি রাষ্ট্র গড়তেই তারা বাঙালির অন্তরে স্বাধীনতার বীজ বুনতে থাকেন। এসব দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ নিয়েই রচিত হয়েছে কালিদাস বৈদ্যের বই 'বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব'।
 
কালিদাস বৈদ্যের গ্রাম সামন্তগাতি গোপালগঞ্জ ঘেঁষা। শেখ মুজিবুর রহমানের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থেও এই অঞ্চলের হিন্দুদের প্রতিপত্তি ও দাঙ্গা প্রবণতার কথা উল্লেখ আছে। এসব কথা কালিদাস বৈদ্য অস্বীকার করেননি। তবে তার বয়ানটা সেই খাঁজকাটা খাঁজকাটা। প্রত্যেকবারই মুসলমানরা আক্রমণ করে। আর হিন্দুদের স্রেফ 'প্রতিরোধের মুখে' ৫-৬ জন দস্যু মুসলমান মারা যায়, পুড়ে ছাই হয় মুসলমান গ্রাম। কালিদাসের মুসলিম বিদ্বেষ চরমতর। পাকিস্তান ভাঙার স্বার্থে শেখ মুজিবুর রহমানের কৌশলগত আনুগত্য মেনে নিলেও তাকে আগাগোড়াই বিশ্বাসঘাতক হিসাবে মনে করতেন। যেহেতু হিন্দুদের দৃষ্টিতে ৪৬'র কলকাতা দাঙ্গার দায়ভার সোহরাওয়ার্দীর, শিষ্য হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমানও তাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তা কালিদাস জানেন। তিনি শুনেছেন, দাঙ্গার সময় মুজিব 'ছোরা' অথবা নাঙা 'তরবারি' হাতে হিন্দুদের বিরুদ্ধে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
 
মুসলমান মাত্রই কালিদাসের কাছে 'মৌলবাদী' ও 'সাম্প্রদায়িক'। তার দৃষ্টিতে ইসলামপন্থী নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম, সামরিক শাসক আইয়ুব-ইয়াহিয়া আর সেক্যুলার রাজনীতিক ভুট্টো-মুজিবের কোন ফারাক নেই। এমনকি কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যুক্ত কোন মুসলমানকেও তিনি বিশ্বাস করতেন না।
 
এমনই ঘোরতর সাম্প্রদায়িক মানসিকতার ফলে পাকিস্তানকে কোনভাবেই সহ্য করা সম্ভব নয় কালিদাস বৈদ্য কিংবা চিত্তরঞ্জন সুতারদের। একই কারণে বাংলাদেশ গঠনের পরও দক্ষিণ বঙ্গকে বিচ্ছিন্ন করে হিন্দু রাষ্ট্র 'বঙ্গভূমি' গঠন করতে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তারা, গড়েছিলেন স্বতন্ত্র সেনাবাহিনীও।
 
পাকিস্তান গঠন ও বৈদ্যবাবুর অস্বস্তি:
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের পূর্বাপর সময়ে মুসলমানদের পরিস্থিতি একরকম ছিল না। 'বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব' গ্রন্থের সর্বত্রই তিনি এখানকার নমঃশূদ্রকে হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতির 'রক্ষাকর্তা' হিসাবে উল্লেখ করতে চেয়েছেন। বিভিন্ন খেলাধুলার আড়ালে সুসংগঠিতভাবে 'যুদ্ধপ্রস্তুতি' যে থাকত, তা নিয়ে গর্বও করেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টি পর্যন্ত কেবলই মুসলমানদের অবনতির চিত্রই তার গ্রন্থে উল্লিখিত। তার বয়ানেই যদি দেখি— "গ্রামে খেলাধুলো, নাচ গান, আনন্দ উৎসব সবই হত। তবে সব থেকে জনপ্রিয় ছিল হাঁড়ির উপর থালা রেখে তা বাজিয়ে ঢাল, সড়কি ও লাঠির খেলা। এই খেলাটি ছিল আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষার অঙ্গ।"
অন্যত্র— "দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজের মান ছিল খুবই নিচু। হিন্দু সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ ছিল নমঃ সম্প্রদায়। মুসলমানরা ছিল তাদের থেকেও পিছিয়ে। গোটা পূর্ববঙ্গে একজন মুসলমানও পি.এইচ.ডি. ডিগ্রীর অধিকারী ছিল। না। কিন্তু হিন্দু সমাজে তা ছিল ডজন ডজন। ...পূর্ববঙ্গে কোনও মুসলমান এমআরসিপি বা এফআরসিএস ডাক্তার ছিল না। 
 
কিন্তু নমঃ সমাজে তেমন অনেক ডাক্তার ছিলেন। ...কোনো মুসলমান আইসিএস অফিসারও ছিল না। ছিলেন একমাত্র নমিনেটেড আইসিএস নুরনবী চৌধুরী। তিনি যুদ্ধের সময় সামরিক দপ্তরে অফিসার ছিলেন। সেই কারণে তিনি নমিনেটেড আইসিএস হতে পেরেছিলেন। ...মুসলমান সমাজের কেউ আইএফএস (ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস) ছিল না। ...দক্ষিণবঙ্গে কোনো মুসলমান ব্যারিষ্টার ছিল না। কিন্তু নমঃ সমাজে ব্যারিষ্টার ছিলেন ফরিদপুরের ওড়াকান্দির পি আর ঠাকুর. সুরেশ বিশ্বাস, খুলনার শশিভূষণ মন্ডল এবং বরিশালের ভূবন মন্ডল। এঁরা সবাই ত্রিশের দশকের প্রথম দিকেই ব্যারিষ্টার হয়েছিলেন। অথচ সমস্ত পূর্ববাংলার মুসলমানদের মধ্যে তখন একজনও ব্যারিষ্টার ছিল না। এ থেকেই বোঝা পূর্ববাংলার মুসলমানরা শিক্ষা দীক্ষায় কতখানি পিছিয়ে ছিল।
 
ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপারেও সেই একই অবস্থা ছিল। বড় আকারের ব্যবসা বাণিজ্য দূরের কথা, ছোটোখাটো ব্যবসাতেও মুসলমানদের খুঁজে পাওয়া যেত না। ব্যবসা বাণিজ্যের সবটাই ছিল হিন্দুদের হাতে। পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের হাতে নয়টি কাপড়ের কল, চারটি দিয়াশালাই ফ্যাক্টরি, দুইটি চিনির কল, দুইটি গ্লাস ফ্যাক্টরি, অনেকগুলি পাটের প্রেসিং ও রোলিং মিল, হোসিয়ারি কারখানা, চাল ও সরিষার তেলের বড় বড় মিল, একটা সিমেন্ট কারখানা, অনেক চা বাগান ও আমদানী রপ্তানি কোম্পানি। জমিদারদের প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু। জমির মালিকানার শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ ছিল হিন্দুদের হাতে। সে সময় পূর্ববঙ্গের প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল হিন্দু, কিন্তু সম্পদের ৮০ শতাংশ ছিল তাদের হাতে। সাংস্কৃতিক জগতেও মুসলমানদের কোনো অবদান ছিল না। ডাক্তারি, ওকালতি, শিক্ষকতা ইত্যাদির প্রায় সব পেশাই ছিল হিন্দুদের দখলে।"
 
কিন্তু পাকিস্তান গঠনের পর গৃহীত নানান পদক্ষেপে এই অঞ্চলের মুসলমানদের অগ্রগতি হয়। এর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল ১৯৫০ এর প্রজাসত্ত্ব আইন। এই আইনের সুবাদে জমিদারদের কব্জা থেকে ৮০ শতাংশ জমি উদ্ধার হয়ে নিম্নবর্গের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলের হাতে আসে। এছাড়া স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ নানান কারণে 'পিছিয়ে পড়া' মুসলমানদের উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু কালিদাস বৈদ্য আর চিত্তরঞ্জন সুতারদের কাছে মুসলমানদের এসব উন্নতির একমাত্র কারণ 'হিন্দুদের সম্পদ জবরদখল'। এজন্য কলকাতায় বসেই পাকিস্তানকে ভেঙে 'পূর্ববঙ্গ'কে হিন্দুদের জন্য নিরাপদ করতে শপথ নেন তারা।
 
পাকিস্তানের ভেতর পাকিস্তানের অসুখ:
পূর্ব পাকিস্তানে এসে চিত্তরঞ্জন সুতার ও নীরদ মজুমদার রাজনীতি শুরু করলেন। রাজনীতিকদের মধ্যে গোপনে বিচ্ছিন্নতার মনোভাব গড়ে তুলতে মনোনিবেশ করেন তারা। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদে হিন্দু ছাত্রদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে থাকেন কালিদাস বৈদ্য। এতে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আশ্রয় করেন তিনি। যদিও তার কাছে হিন্দু মাত্রেই 'অসাম্প্রদায়িক' এবং মুসলিম মাত্রেই 'মৌলবাদী' ও 'জিহাদী'। মুসলমান ছাত্রদের পাকিস্তান বিরোধী হতে উস্কানি দিতে তিনি পিছপা হননি। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলননে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ দিতেও অবদান রয়েছে তাদের। তিনি তার বইতে স্বীকার করেন— "ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে তখন অল্প সংখ্যক হিন্দু ছাত্র ছিল। তা সত্ত্বেও তারা মুসলিম মৌলবাদী ছত্রেদের রুখে দিত। এই কারণে ঐ সব মৌলবাদী মুসলমান ছাত্ররা কোনোদিনও কলেজের ছাত্র ইউনিয়নটি দখল করতে পারেনি। তার ফলে আমি যতদিন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ও মেডিক্যাল অফিসার ছিলাম ততদিন পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়ন আমাদের মতানুসারেই চলত। মৌলবাদীরা যাতে ছাত্র ইউনিয়নের কর্তৃত্ব না পায় সেজন্য আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হত এবং খাটতেও হত। তবে নির্বাচিত ইউনিয়ন আমাদেরই বেশি সমীহ করত। এই কারণে আমরা ঢাকা ছাত্র আন্দোলনের কর্মকর্তা না হলেও ওই আন্দোলনের নেতারা আমাদের কথা ছাড়া চলতে পারত না।
 
পর্দার আড়ালে থেকেই আমাদের কাজ করতে হত। ঢাকার ছাত্র আন্দোলনের মূল ঘাঁটি ছিল মেডিক্যাল কলেজ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই এটা চলে আসছিল, কারণ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। আমরা জড়িত ছিলাম যুব লিগের সঙ্গে। একদিকে যুব লিগ ও ছাত্রদলের চাপে ফজলুল হক, শহীদ সুরাবর্দি এবং মওলানা ভাসানি এক হয়ে ২১ দফা দাবির ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে পূর্ববঙ্গের বিধনসভার নির্বাচনে নামলেন। সেদিন ঐ তিন নেতার ওপর সব থেকে বেশি চাপ সৃষ্টি করেছিল মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্ররা।"
 
এভাবে ছাত্রদের আবেগ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ব্যাবহার করে পাকিস্তানের প্রতি বিষিয়ে তুলতে কাজ করেন কালিদাস বৈদ্য। অন্যদিকে চিত্তরঞ্জন সুতার রাজনীতিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার মনোভাব তৈরি করতে থাকেন। বৈদ্য আর সুতার পরামর্শ করেই কাজ করতেন। তারা দু’জনে প্রাথমিকভাবে তিনজন রাজনীতিককে বাছাই করেন। তারা হলেন ভাসানী ন্যাপের আব্দুল করিম, জাতীয় লীগের অলি আহাদ এবং আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান তাদের প্রধান টার্গেট হলেও মুজিবের প্রতি তাদের ভয় ছিল। কারণ দাঙ্গার সময় মুজিব 'উন্মুক্ত ছোরা হাতে হিন্দু নিধনে জিহাদে বেরিয়ে পড়েছিলেন', আর পাকিস্তান গঠনের ক্ষেত্রে পূর্ব ফ্রন্টের সম্মুখযোদ্ধা ছিলেন তিনি। তিনি হয়তো পাকিস্তান ভাঙতে রাজি হবেন না। তাই তাকে সায়ত্তশাসনের দাবিতে ফুসলাতে থাকেন চিত্তরঞ্জন সুতার। আর আড়ালে তার সূর্য হাসে! বৈদ্যের ভাষায়— "অনেক আলোচনার পর আমরা দুজনে এই সিদ্ধান্তে এলাম যে, সামরিক শাসন জারি করে আয়ুব খান যখন তাঁর কর্তৃত্ব একবার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, সেই কর্তৃত্ব তিনি সহজে ছাড়বেন না। তাই শীঘ্র আবার গণতন্ত্র ফিরে আসবে এ আশা করা বৃথা। এই সময়ে গোপনে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ব শাসনের দাবিকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তার জন্য প্রাণপন চেষ্টা চালাতে হবে। আমরা এতদিনে বুঝতে পেরেছিলাম যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক মহল কখনোই পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ স্বায়ত্ব শাসন দেবে না। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশি, তাই দাবি উপেক্ষিত হলে তাদের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যাবে। ফলে স্বায়ত্ব শাসনের আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ নেবে।"
 
অন্যদিকে করিম ও অলি আহাদকে সরাসরি 'স্বাধীনতা'র প্রস্তাব দেন তারা। দুজনে রাজিও হন এবং প্রচারপত্র বিলি করতে শুরু করেন। অপরপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬২-৬৩ সালেই দুই দফা আগরতলা হয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। একই সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের নেতৃত্বে নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। তারাও গোপনে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করতে কাজ করছিল। সম্ভবত এই ব্যাপারটি কালিদাস বৈদ্য বা চিত্তরঞ্জন সুতারদের জানা ছিল না। বইতে তাদের কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য বর্ণনা নেই। এ ব্যাপারে জানলে আগরতলা ষড়যন্ত্র পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হত না। এ সময়ে ভিন্ন এক মামলায় চিত্তরঞ্জন সুতারও কারাগারে ছিলেন। সেখানেই শেখ মুজিবুর রহমান তার কাছে পূর্ববঙ্গের 'স্বাধীনতা'র বাসনা প্রকাশ করেন। এরপরই চিত্তরঞ্জন সুতার, শেখ মুজিব আর কালিদাস বৈদ্য পুরোদমে কাজ শুরু করেন। কখনো তারা কলকাতা যান, কখনো যান লন্ডন। এক পর্যায়ে চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে শেখ মুজিবের 'স্বীকৃত প্রতিনিধি' হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
 
কিন্তু শেখ মুজিবকে তাদের বিশ্বাস ছিল না। তাই নিজেরাই হিন্দু বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই 'জাতীয় গণমুক্তি দলে'র ব্যানারে হিন্দুদের একত্রিত করে 'স্বাধীনতা সংগ্রামে' উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। কিন্তু তখনও 'স্বাধীনতা'র কথা প্রকাশ্যে বলা সম্ভব ছিল না খোদ বাঙালির কাছেই।
 
শেখ মুজিবের 'বিশ্বাসঘাতকতা':
কালিদাস বৈদ্য শেখ মুজিবুর রহমানকে আগাগোড়াই বিশ্বাসঘাতক হিসাবে দেখেছেন। তার মতে, ২৫শে মার্চ রাতে মুজিব স্বেচ্ছায় গ্রেফতার বরণ করেন। কারণ তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্বের লোভ ফেলতে পারেননি কিংবা নিজ হাতে গড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে ভারতের তাবেদার ছোট্ট বাংলাদেশ চাননি। তার মতে, ২৪ মার্চ আলোচনাকালে ইয়াহিয়ার সাথে মুজিবের চুক্তি হয় যে শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। উপপ্রধানমন্ত্রী হবেন ভুট্টো। তবে এরজন্য আগে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করতে হবে। নইলে তারা মুজিবকে বাঁচতে দিবে না। পরিস্থিতি শান্ত হলে মুজিব ক্ষমতায় বসবেন।
 
কিন্তু জিয়াউর রহমান না বুঝেই মুজিবের গ্রেফতার ও পাক বাহিনীর 'গণহত্যা'র খবরে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসেন। একইভাবে তাজ উদ্দীন ভারতে গিয়ে প্রবাসী সরকার গঠন করেন এবং দিল্লীর সহায়তা নেন। তারা মুজিবের মনোভাব জানতেন না। ফলে 'বাঙালি সুলভ আবেগে' এসব কাজ করে বসেন। এ কারণে পরে জিয়াউর রহমান ও তাজ উদ্দীন শেখ মুজিবের বিরাগভাজন হন। তাজ উদ্দীনকে তো এক প্রকারে ছুঁড়েই ফেলে দেন মুজিব।
 
একাত্তরে পাক ফৌজে কর্মরত বাঙালি সৈনিক ও সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে প্রবাসী সরকার 'মুক্তিবাহিনী' গঠন করে। কিন্তু কালিদাস বৈদ্যদের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুদের অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছিল না। তাই তারা হিন্দুদের বিশেষ একটি বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। এর আগে সিরাজুল আলম খান দাদাভাইদের কাছে প্রস্তাব দেন মুজিব বাহিনী গঠনের। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছাত্রদের 'চার খলিফা' থাকলেও এর সুতা চিত্তরঞ্জন হয়ে নাটাই ছিল র' প্রধান জেনারেল উবানের হাতে।
 
১৯৭১ সালের বিদ্রোহ কিংবা 'স্বাধীনতা যুদ্ধ'কে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে হিন্দু পুনরুত্থান হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন চিত্তরঞ্জন সুতার আর কালিদাস বৈদ্য; ভারতও এভাবেই দেখতে চেয়েছিল। এজন্যই তো প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, 'হাজার সালকা বদলা লিয়া'। কিংবা তৎকালীন ভারতের পূর্বাঞ্চলের আর‌এস‌এস প্রধান শ্রী ভাওরাজ বলতে পেরেছিলেন, 'মুসলমানদের বিষদাঁত ভেঙে গেছে।' কিন্তু বৈদ্য মশায়রা কোন মুসলমানকেই বিশ্বাস করতেন না। প্রবাসী সরকার, মুক্তিবাহিনী কাউকেই না। তাদের ধারণা মুসলমানরা ক্ষমতা পেলেই অত্যাচার চালাবে হিন্দুদের উপর। এর উপর লক্ষাধিক 'রাজাকার'-'আল বদর'-'আল শামস' তাদেরকে আরও ভীত করে তোলে। এসব মিলিশিয়া যদি তালিকাতেই এক লক্ষ থাকে, তাহলে সমর্থন কোনভাবেই কম না। এই শঙ্কায় হিন্দুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া ভিন্ন আর কোন পথ খুঁজে পেলেন না তারা। শেষ পর্যন্ত ভারত সরকারের অনুমোদন না মেলায় গোপনে গড়ে তুললেন 'গণমুক্তি বাহিনী'। কিন্তু তাদের ট্রেনিং নিতে নিতেই পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয় এবং পাকিস্তান দু টুকরো হয়ে যায়।
 
কালিদাস বৈদ্যের মতে শেখ মুজিবুর রহমান গোপনে 'ইসলামপন্থী' খন্দকার মোশতাকের সাথে যোগাযোগ করেনে। ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় গণ পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়। মোশতাক প্রবাসী সরকারকে কনভিন্স করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ভারতের কাছে এই চাল ধরা পড়ে যায়। ফলে মোশতাককে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যেতে দেওয়া হয়নি। প্রবাসী সরকারকে নজরদারিতে রাখা হয়। একইভাবে যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী ও সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলও এই তালিকায় ছিলেন। গণ পরিষদের অধিবেশন ভেস্তে দিতেই তড়িঘড়ি করে ভারত হামলা চালায়।
 
কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভারতের খেয়ে পরে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করলেও ভারত হামলা করায় নিউক্লিয়াস খুশি হয়নি। ক্ষুব্ধ ও হতভম্ব তোফায়েল এ খবরে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলেন, "ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকবে তা তো আমরা চাইনি।" কিন্তু ভারত বাংলায় প্রবেশের আগে ৭ দফা তাবেদারি চুক্তি করতে হয় প্রবাসী সরকারকে। এ চুক্তিতে চিত্তরঞ্জন সুতার ও বৈদ্যবাবুরা খুশি হয়েছিলেন। তবে পরে শেখ মুজিব তা আমলে নেননি।
 
বাংলাদেশের পর:
১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এদিন দেশের সার্বভৌম দলিল চলে যায় ভারতের হাতে। কালিদাস বৈদ্য তাই মনে করেন বাংলাদেশ সার্বভৌম কোন রাষ্ট্র নয়। কিন্তু শেখ মুজিব ভারতের প্রতি অকৃতজ্ঞ ছিলেন। পাকিস্তান ভেঙে গেলেও তিনি দেশে ফিরে এসে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক তৈরিতে মন দেন। কালিদাস বৈদ্যরা ভেবেছিলেন এদেশে আর মক্তব-মাদরাসা চালু হবে না, নতুন মসজিদ তৈরি হবে না, 'তবলিগ' চলবে না। কিন্তু শেখ মুজিব তার সবকিছুই চালু করেন। ইসলামী ফাউন্ডেশন গঠন করেন, তাবলীগকে জায়গা দেন, কাকরাইল মসজিদ করেন। এসব কিছুই ঢাকার প্রভাবশালী 'হিন্দু লবি', যা কালিদাস বৈদ্যরা গড়ে তুলেছিলেন তার না-পসন্দ কাজ। এজন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বরাবর পত্রও দেন বৈদ্য বাবুরা।
 
পরে চিত্তরঞ্জন সুতার দেশে ফিরে আসেন। 'শেখ মুজিব তাদেরকে হত্যা করবেন' এই ভয় মাথায় নিয়ে চিত্তবাবু আওয়ামীলীগ থেকে সংসদ সদস্য হন, বাকশালে যোগ দেন। তবে এ সময়ও মুজিব হিন্দুদের প্রতি বৈষম্য করেন। এক্ষেত্রে দারুণ একটি তথ্য দিয়েছেন কালিদাস বৈদ্য। সংখ্যা অনুপাতে যতজন হিন্দুর সংসদ সদস্য হওয়ার কথা, কোন সময়েই শেখ মুজিব ততজনকে দেননি। পরবর্তীকালে তার কন্যা শেখ হাসিনাও এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। বৈদ্যবাবুর মতে, নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে হিন্দু এলাকা বেছে নির্বাচন করেন শেখ হাসিনা।
সবশেষ সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড দিয়ে বইটি শেষ হয়েছে। এর আগেই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই নাকি তারা বুঝেছিলেন শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে গণ‌অভ্যুত্থান হবে। কয়েকজনকে এ কথা বলেনও। লেখক ৭৫ এর ১৪ আগস্ট কলকাতায় পৌঁছেন। ওইদিন রাতেই নৃশংসভাবে খুন হন মুজিবুর রহমান। এজন্য কেউ কেউ ওই সময়ে কালিদাস বৈদ্যকে দায়ী করেন। কিন্তু কালিদাস বৈদ্যের মতে, রাশিয়ার আদলে সমাজতন্ত্র কায়েম করায় পাকিস্তানই শেখ মুজিবকে হত্যা করেছে। যদিও বৈদ্যবাবু বাকশালকে 'খেলাফত' বলে মনে করেন।

বইটি পরতে পরতে মুসলিম বিদ্বেষের ছাপ স্পষ্ট। তার লেখনীতে হিন্দুত্বের গৌরব থাকলেও নিষ্পেষিত মুসলমানের আর্তনাদ প্রচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু তার ঘৃণা তাকে তা দেখতে দেয়নি। ওই সময়ে হিন্দু-মুসলমানের কথিত 'সম্প্রীতি'র কথা বলতে গিয়ে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন— "কবিগান ও জারিগানের আসরে নানা বিষয়ের উপর তর্ক যুদ্ধের সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমানদের সম্পর্কেও তর্কযুদ্ধ চলত। কালী ও আালির শক্তি, কৃষ্ণ ও আল্লার দোষগুণ, হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক, হিন্দু দেব-দেবী, রাজনীতি, সমাজ ইত্যাদি নিয়ে তর্ক যুদ্ধ হত। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করত। কাব্যরস পরিবেশনের সঙ্গে অরুচিকর আলোচনাও চলত। কিন্তু কাব্যরসে তা শ্রুতিমধুর হতো। তাই উভয় সম্প্রদায় তা উপভোগ করত। কবিয়াল রাজেন সরকার হয়ত কৃষ্ণের পক্ষ নিয়ে হজরত মহম্মদকে দস্যু সর্দার, কামুক ও পুত্রবধূ প্রেমিক বলে অক্রমণ করে গেলেন। জবাব দিতে দাঁড়িয়ে নকুল দত্ত হয়ত কৃষ্ণকে লম্পট, চরিত্রহীন ও মামীর প্রেমিক বলে গাল দিলেন। হিন্দু মুসলমান এক সঙ্গে বসে এই সব শুনত। প্রতিবাদ করত না। উপভোগ করত।"
 
কিন্তু 'উপভোগ' না করে তখন উপায় ছিল কী? একটি মুসলিম গণহত্যা সম্পর্কে তার নিজেরই দাম্ভিক উচ্চারণ— "তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে উচ্চপদের পুলিশ অফিসাররা ইংরেজ হলেও নিম্নস্তরের প্রায় সব পুলিশ অফিসারই ছিল হিন্দু। কাজেই ব্যাপারটা ওখানেই চাপা পড়ে যায়।"
 
সব মিলিয়ে একজনের কট্টর সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে দেখার সুযোগ মেলে এ বইটিতে। একইসাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আড়ালে ভারতের 'স্বার্থ' আর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ক্রিয়াশীল শক্তিশালী হিন্দু লবির 'আকাঙ্ক্ষা' এবং একটি ভাষা আন্দোলনের ছাইভস্মকে ধীরে ধীরে 'স্বাধীনতা'র দাবিতে বিস্ফোরণের পিছনে তাদের ষড়যন্ত্র কিংবা প্রচেষ্টার চিত্রও বইটিতে পাওয়া যায়। তবে একই লক্ষ্যে, অথচ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে গঠিত নিউক্লিয়াসের (প্রকাশ্য নাম: স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ) অবদান কিংবা ব্যক্তি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অনালোচিত। উল্টো মুজিবকে 'স্বাধীনতা বিরোধী' হিসাবে প্রমাণের চেষ্টা আছে বইটিতে। এটা হয়তো এজন্যই সম্ভব হয়েছে যে, প্রত্যেক মুসলমানই বৈদ্যবাবুর কাছে ইসলামপন্থী, ভারতের অস্তিত্ব বিরোধী।
 
বইটি পড়লে মনে হয়, বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের চেয়ে সাজানো একটি মঞ্চ মাত্র। সত্য-মিথ্যা আর প্রোপাগান্ডা ঝেড়ে ফেলে এর বিচারের দায়ভার পাঠকের।
 
বই: বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব
লেখক: ডা. কালিদাস বৈদ্য
প্রকাশ: ২০০৫, কলকাতা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২২৪
 
Share:

একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ৩

২০। আইয়ুব খানের নগ্ন ছবি খুররম মুরাদের হাত


খুররম মুরাদের হাতে আইয়ুব খানের নগ্ন ছবি তুলে দিয়ে জোটসঙ্গীরা বললেন, এটি ছাপিয়ে ছড়িয়ে দিন সবখানে!
"১৯৬৪ সালের নির্বাচনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত সম্মিলিত বিরোধী জোট (কপ) —এর নেতৃত্ব প্রতি মাসে ভিন্ন ভিন্ন দলের কাছে সোপর্দ করা হতো। নির্বাচন যে মাসে ছিলো, সে মাসে জোটের নেতৃত্বদানের গুরুদায়িত্ব পড়ে নেযামে ইসলাম পার্টির নেতা মৌলভি ফরিদ আহমদের (পরবর্তীতে শহীদ) ওপর। কিন্তু প্রচারণার জন্য তিনি নিজ নির্বাচনি এলাকা কক্সবাজার চলে যান। যাওয়ার সময় আমাকে কপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ঘোষণা করে গেলেন। যদিও ওই সময় পর্যন্ত আমার কোন রাজনৈতিক অবস্থানই ছিলো না। আমি সংকোচ বোধ করছিলাম, পূর্ব পাকিস্তানের বড় বড় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আমার পিছনে দাঁড়াবেন কিভাবে? কিন্তু তারা খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাকে সহযোগিতা করেন। আমিও নিজ দক্ষতা অনুযায়ী ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করি।
ওই সময়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আমার মনে আছে। আমি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আর প্রচারণার শেষ দিন। নির্বাচন যেন একেবারে মাথার ওপরে। কোথা থেকে আমাদের জোটের বন্ধুরা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের একটি নগ্ন ছবি জোগাড় করেন। ছবিটি ব্রিটেনে তোলা হয়েছিল। দেখা গেল, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান একটি সুইমিং পুলের পাশে অতি অল্প পোশাকে (সুইমিং কস্টিউম) ক্রিস্টিনা কেলার নাম্নী এক মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ওই সময়ে ব্রিটেনে ক্রিস্টিনা কেলার খুব বড় স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যাতে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জন ডেনিস প্রোফুমোকে পদত্যাগও করতে হয়েছিল।
 
তারা ছবিটি নিয়ে এসে হাতে তুলে দিলেন। বললেন, ‘এটি ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিন। এতে ভোটে প্রভাব পড়বে। রায় আইয়ুব খানের বিপক্ষেই আসবে।’যদিও পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়েছে যে, এসব কর্মকাণ্ড তেমন একটা প্রভাব রাখতে পারে না। বরং তা বেকার প্রচেষ্টা মাত্র। তবে ওই সময় নৈতিক দিক বিবেচনায় রেখে আমি খুব আপত্তি তুলেছিলাম। এটি প্রকাশ করলে আমরা নগ্ন ছবি প্রচারের কারণ হব, যা কুরআন মাজিদ মোতাবেক অশ্লীলতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যক্তির মোকাবেলা করতে হবে রাজনৈতিকভাবে। একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তার রাজনৈতিক চরিত্রের মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য দলিল তথা তথ্য-প্রমাণেরও প্রয়োজন রয়েছে। ঠিক যেভাবে করেছিলেন মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)। তিনি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় তা পেশ করতেন। নির্বাচনি জমায়েতে বক্তৃতাকালেও তিনি সুন্দর, মিষ্টভাষী এবং দলিল নির্ভর ছিলেন। ঢাকার পল্টন ময়দানেও তিনি একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত চরিত্র, তার লুটপাট এবং তার ছেলেমেয়েদের কীর্তিকলাপ নিয়ে কথা বলব না। বরং তার প্রথম অপরাধ হচ্ছে, তিনি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে দেশটা কব্জা করে রেখেছেন।’ এরপর তিনি প্রতিবেদনটি জনগণের সামনে পেশ করেন।
 
ছবি সংগ্রাহকদের সাথে বাতচিত করে তা ছাপানোর শক্ত বিরোধিতা করলাম। বললাম, ‘নির্বাচনি প্রচারণার জন্য আমাদের এত নিচে নামা ঠিক না। এতে আমাদের নৈতিক স্খলন ঘটবে। আর আমরা যে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রচার করি তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ আল্লাহকে ধন্যবাদ, তারা আমার কথা মেনে নিয়েছিলেন। পরে শুনেছি পশ্চিম পাকিস্তানের কোন কোন শহরে ছবিটি ছাপানো হয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও এটি বিতরণ করা হয়নি। আমি এখনও রাজনৈতিক মোকাবেলার ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার পক্ষে।
 
কয়েক বছর আগে, ১৯৮৮ সালেও এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বেনজির ভুট্টোর পশ্চিমা পোশাক পরিহিত একটি ছবি ছিলো। সেটি অক্সফোর্ড বিশ্বব্যিালয়ে তার পড়াশোনাকালে। ছবিটি করাচির সাপ্তাহিক তাকবির প্রকাশ করে পোস্টার আকারেও বের করে। এই কাণ্ড যেন উল্টো প্রভাব ফেলে। সে বছর সংসদে পিপলস পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আমাদের জোটের কয়েকজন পোস্টারগুলো প্রচারের পক্ষে ছিলো। কিন্তু আমি শক্তভাবে এর বিরোধিতা করে বলি, জামায়াতের কর্মীরা এমন পোস্টার বিতরণ করতে পারবে না। যদিও ইসলামী গণতান্ত্রিক জোটেরই কিছু লোক এমনটা করছিলেন। কথা হচ্ছে, এমন প্রোপাগান্ডা প্রচারকারীরা এর দ্বারা প্রভাবিত হয় বলে ভাবেন যে সবাই প্রভাবিত হচ্ছে। কিন্তু এটি একটি বোঝার ভুল মাত্র। মানুষ অন্যান্য বুনিয়াদের ওপর নিজের ভোট দিয়ে থাকেন।"
 
[ঘটনাটি খুররম জাহ মুরাদের (রহ.) ‘লামহাত’ নামক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ থেকে অনূদিত। খুররম জাহ মুরাদ উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। জামায়াতে ইসলামীর প্রাথমিক যুগের রাহনুমাদের একজন তিনি। ইসলামী ছাত্রসংঘের (জমিয়ত) কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন একেবারে শুরুর দিকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনের সবচেয়ে সংকটকাল কিংবা সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়ে তিনি ছিলেন ঢাকা শহর জামায়াতের আমির। পরে পাকিস্তানে থিতু হন এবং পাক জামায়াতের নায়েবে আমির থাকাকালে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
 
ইসলামী আন্দোলনের অনেকেই প্রতিপক্ষ দল-মতের নানান অশ্লীল-অপকর্ম প্রচার করে থাকেন। তারা হয়তো এটি করেন নেক নিয়তে। ভাবেন- প্রতিপক্ষের অপকর্ম সম্পর্কে জনগণকে জানানো গেল। কিন্তু তা অশ্লীলতার প্রচার ও প্রসার ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিপক্ষের বিরোধিতা করতে হলেও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।]
 
 ২১।  এই লাল রঙ আসলে কিসের প্রতীক?
বাংলাদেশের নাম, পতাকা সবটাই ঠিক করেছে সিরাজুল আলম খানের নিউক্লিয়াস। লাল সবুজের এই পতাকার রহস্য খুব কঠিন হয়ে আসছে আমার কাছে। মিলাতে পারছি না। তবে একটা সূত্র পেয়েছি। যদিও এখনো ধোয়াশা থেকে গেছে। বাংলাদেশের পতাকা অঙ্কিত হয় ১৯৭০ সালের ৬ জুন। কাজেই এর লাল রঙের সাথে পরবর্তী বছরের কথিত তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের মাধ্যমে অর্জিত সূর্যের সম্পর্ক অবাস্তব, অলীক। ফলেই মূলত সৃষ্টি হয়েছে পতাকার এই রহস্যটা। তাহলে এই লাল রঙ আসলে কী? যুদ্ধের এক বছর আগে বানানো পতাকার ব্যাখ্যায় যুদ্ধের কথা বলা হয় কেন? যদিও আরেকটি প্রশ্ন আমার মধ্যে ছিল। মুসলিম বিশ্বে পতাকায় সবুজ রঙ এস্তেমাল হয়েছে ইসলামের নিশান হিসাবে। সোলায়মানের আ. মোহর (যেটা ইসরায়েলের পতাকায় রয়েছে) সেটিকে সবুজ রঙ পরিয়ে ইসলাম হিসাবে উপস্থাপন করেছে মরক্কো, তার পতাকায়। এমনকি বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের পতাকাতেও সবুজের ব্যবহার ইসলাম বুঝাতে; গেরুয়া-হিন্দু, সাদা-শান্তি, সবুজ-ইসলাম। কিন্তু বাংলাদেশের পতাকায় সবুজ কিভাবে জমিন হয়ে গেল তার উৎস খুঁজতেছিলাম।

এই পতাকা রচিত হয়েছে সত্তরের ৬ জুন। এর বর্ণনা দিয়েছেন পতাকা অঙ্কনের সাথে জড়িতদের একজন কাজী আরেফ আহমেদ। তার বক্তব্য—
“৬ জুন ’৭০ সালে ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর রুমে মনিরুল ইসলাম, শাহজাহান সিরাজ ও আ স ম আবদুর রবকে ডেকে আমি ‘নিউক্লিয়াস’-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফ্ল্যাগ তৈরির কথা জানাই।
এ ফ্ল্যাগ পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসাবে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানাই। তখন মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মনি) ও আ স ম আবদুর রব বলেন, এ পতাকার জমিন অবশ্যই বটলগ্রিন হতে হবে। শাহজাহান সিরাজ বলেন, লাল রঙের একটা কিছু পতাকায় থাকতে হবে। এরপর আমি পতাকার নকশা তৈরি করি-বটলগ্রিন জমিনের ওপর প্রভাতের লাল সূর্যের অবস্থান। সবাই একমত হন। তারপর পতাকার এ নকশা ‘নিউক্লিয়াস’ হাইকমান্ডের অনুমোদন নেওয়া হয়।

তখন আমি প্রস্তাব করি, এ পতাকাকে পাকিস্তানি প্রতারণা থেকে বাঁচাতে লাল সূর্যের মাঝে সোনালি রঙের মানচিত্র দেওয়া উচিত।” (বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র, কাজী আরেফ আহমেদ, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ৭৭)

জাসদের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন শাহজাহান সিরাজ। তার প্রস্তাবেই এই পতাকায় লাল রঙ দেওয়া হলো। তবে এই লাল একটি আপত্তিকর রঙ। সারাবিশ্বে লাল রঙ সমাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আমরা রাও ফরমান আলীর একটা বক্তব্য জানি, “পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটি রক্তে লাল করে দেব”; কিন্তু এই বক্তব্যের ব্যাপারে রাও ফরমান বেশ ইন্টারেস্টিং একটা তথ্য দিয়েছিলেন। সৈয়দ মবনু তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে রাও ফরমান আলী তাকে বলেন—
“ঢাকাতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মিটিং ছিলো আনুমানিক নির্বাচনের এক বছর পূর্বে। এটা ভাসানীর দল। বাংলাদেশে দু’জন তোয়াহা ছিলো। একজন ইসলামিক এবং অন্যজন সেকুলার (নোয়াখালীর)। সেকুলার তোয়াহা সেই মিটিং-এ বলেছিলো, “আমি পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটি রক্তে লাল করে দেব।” আমাকে কোর হেড কোয়ার্টার থেকে জেনারেল ইয়াকুব তা জানালো। আমি এই কথাটি স্মরণ রাখার জন্য ডাইরীতে লিখে রাখি এবং তোয়াহা-কে খবর দেই। তাদের সাথে আমার এতটুকু বন্ধুত্ব ছিলো যে, আমি যখন বলেছি তোমাকে গ্রেফতার করা হবে না, তখন সে বিশ্বাস করেছে তাই হবে। সে আসে। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এসব কি বলেছো? সে বললো এটা আমার নয়। কাজী জাফরের বক্তব্য। আমি বললাম, এর অর্থ কি? সে বললো, এর অর্থ এদেশে কম্যুনিস্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করা, লাল হচ্ছে কমুউনিস্টের প্রতীক। সে চলে গেলো। আমার ডাইরীতে কথাগুলো রয়ে গেলো। গুরুত্ব দেইনি। আমাকে গ্রেফতার করার পর তারা আমার ডাইরী নিয়ে গেলো। প্রচার করলো, জেনারেল ফরমান গোটা বাংলার মানুষকে হত্যা করার প্লান করেছিলো। এ কথা শেখ মুজিবও ভুট্টোকে বলেছিলো। তার দাবী ছিলো, সবাইকে ছেড়ে দিলেও ফরমান আলীকে ছাড়া যাবে না। আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটি আমার কাছে এসেছিলো। আমি বিস্তারিত তাদেরকে বললাম। এরপর তা নিয়ে তদন্ত হয়েছে। এমনকি হামিদুর রহমান কমিশনও আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে। আমি বললাম, দেখুন এটা আমার হাতের লেখা সত্য, কিন্তু কথা আমার নয়। একথা ১৯৬৯ ইংরেজীর ১৬ই জুন কাজী জাফর পল্টন ময়দানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মিটিং-এ বলেছিলেন। এরপর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আজো আমি বলছি, ওকথা আমার নয়। কাজী জাফরের কথা।”— (লাহোর থেকে কান্দাহার, সৈয়দ মবনু, আবাবীল পাবলিকেশন্স, আগস্ট ২০০০, পৃ. ১৫৬-১৫৭)

এই কাজী জাফর আহমেদ ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। ষাটের দশকে প্রথমে মার্ক্স আর পরে মাওবাদী ন্যাপে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে জাতীয় পার্টি থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। নিউক্লিয়াসের সাথেও তার সম্পর্ক ছিল।

সার্বিকভাবেই বাম ধারার বিচ্ছিন্নতাবাদী চক্রটি পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে কাজ করছিল, আর তাদের সঙ্গমস্থল নিউক্লিয়াস। বাংলাদেশের নাম, পতাকা, যুদ্ধ পরিস্থিতি সবটা তাদেরই তৈরি। কাজেই বাংলাদেশের পতাকার লাল রঙ কি আসলেই কোন স্বাধীনতার প্রতীক? নাকি কমিউনিজমের লাল সন্ত্রাসের প্রতীক? কাজী জাফরের সবুজ জমিনকে লাল করে দেওয়ার ধারণা নিউক্লিয়াস আর শাহজাহান সিরাজের কাছে পৌঁছানো অস্বাভাবিক না।

তবুও এই প্রশ্নের কোন নিশ্চিত উত্তর কি মিলবে?

২২। 
 
এখনও যারা মনে করেন একাত্তরের যুদ্ধ একটা 'মুক্তিযুদ্ধ' কিংবা এই যুদ্ধ 'বাঙালির যুদ্ধ' তাদেরকে আর কী বলার থাকতে পারে!
 
দেখেন, প্রচলিত বয়ানে বলা হইছে যে ২৫শে মার্চ সেনাবাহিনী অতর্কিত হামলা চালাইছে আর এর ফলে যুদ্ধ শুরু হইছে। অথচ এই যুদ্ধ আসলে শুরু হইছে ৩০ জানুয়ারি, জাস্ট ডিক্লারেশনটা হয় নাই। ৩০ জানুয়ারি ভারতের পরিত্যক্ত একটা বিমান 'গঙ্গা'য় ২৬ গিনিপিগ বসায়া হাইজ্যাক নাটক সাজাইছিল র’। যে বাহিনীটা গঠনই হইছিল পাকিস্তান ভাঙার উদ্দেশে। ওই দিনের পর ভারতের সীমানায় পাক বিমান নিষিদ্ধ হয়। ফলে বিচ্ছিন্ন হয় পাকিস্তান। এরপর-পরই উন্মাতাল হইয়া যায় নিউক্লিয়াস। মুজিবও তাদের সামাল দিতে পারতেছিলেন না। যার ধারাবাহিকতায় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশ্য সশস্ত্র মহড়া, সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, রাষ্ট্রীয় পতাকা অবমাননা, পোড়ানো, বিহারী নিপীড়ন শুরু করে তারা।
 
আর ফেব্রুয়ারিতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম দিয়ে দেশে প্রবেশ করে একটা সিক্রেট অপারেশনাল ফোর্স। নাম 'স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স'। এই ফোর্সের একজন সদস্য 'Dapon Jampa Kalden' এর ভাষায়, "the operation was decided in March (1971) but we were already in Bangladesh in February. I was there two months before the operations were decided."
তার ভাষায়, "The real battle started in March."
 
যুদ্ধাবস্থা তৈরিতে র আর এস‌এফ‌এফের কর্মকাণ্ড খুব সংক্ষেপে পড়তে পারেন সাবেক র অফিশিয়াল আর.কে. যাদবের '1971 Bangladesh war: RAW heroes India forgot to honour' শিরোনামের গর্বিত স্বীকারোক্তিমূলক লেখায়। আর 'Phantoms of Chittagong' তথা এসেফ‌এফের ব্যাপারে জানতে পারবেন 'The Phantoms of Chittagong: The unsung Tibetan heroes of the 1971 Bangladesh liberation war' শিরোনামের এই লেখাটিতে।
 
 
২৩।  ভাষা আন্দোলন: বাঙালি মুসলমানের আদিপাপ
 
আঠারো শতকে ভারতে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগে এদেশের দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফারসি। ধর্মীয় ভাষা আরবি। সাহিত্য ও জনগণের প্রধান ভাষা হিসাবে এখানে বিকাশ লাভ করেছিল উর্দু ও বাংলা। এর মধ্যে উর্দুর বিস্তার ছিল সমগ্র উপমহাদেশে। এ ভাষা দু’টোকে পণ্ডিতরা ‘মুসলমানি ভাষা’ হিসাবে চিহ্নিত করেন। উপনিবেশিক শক্তির সহায়তায় এসব ভাষাকে পরিশুদ্ধতার মিশন নিয়ে তারা কাজে নেমে পড়েন। এমনকি এক পর্যায়ে উর্দু থেকে হিন্দি আলাদাও হয়ে যায়। তাদের প্রবল ভাষিক আগ্রাসনের মুখে উর্দু টিকে যায় মূলত শিক্ষাক্ষেত্রে উর্দুভাষী মুসলমানের সিলসিলা তথা উত্তরাধিকার বহাল থাকার ফলে। কিন্তু বাংলা ভাষা রক্ষা পায়নি। এ ভাষাকে তারা ‘সাধু’ বানায়ে ফেলে। এর পিছনে উপনিবেশিক প্রচেষ্টা ছিল। ১৮৩০ এর দশকে শিক্ষা ও দাপ্তরিক ভাষা থেকে ফারসি কাটা পড়ে, প্রবর্তিত হয় ইংরেজি। কিন্তু শুরুতে এ ভাষা বাংলা করার পরিকল্পনা ছিল কোম্পানির বেনিয়াদের। এ কাজে সহায়তা করেন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের একদল কর্মচারী। যারা পরবর্তীতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ পান। তাদের মানস গঠন ছিল সংস্কৃত অনুগামী।
 
সে সময় বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে পারেনি। কিন্তু ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সময় খোদ বাঙালিদের মধ্য থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে। তা শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্য থেকেই। যারা কেবল বাংলাকে ভালোবেসেছিলেন; বাংলাকে ঘিরে তাদের পিঠেই যে ছুরিকাঘাত করা হবে তা তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
 
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে ১৯১০ এর দশকে। রাষ্ট্রভাষা ঠিক নয়, ‘সাধারণ ভাষা’ (Lingua Franca)। সে সময় পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বারবার বাংলার পক্ষে ওকালতি করেছেন। এর আগে অবশ্য ১৯১১ সালে রংপুরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবি জানিয়েছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী।
 
সে সময় শহীদুল্লাহই একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন যিনি চেয়েছিলেন বাংলা হবে রাষ্ট্রের ভাষা। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতির পিতা গান্ধীকে চিঠি লিখেছিলেন, “The only possible national language for inter-provincial intercourse is Hindi in India.” ১৯১৮ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে সর্বভারতীয় সম্মেলনে ১৯ জন বক্তার মধ্যে একমাত্র শহীদুল্লাহ বাংলার কথা বলেন। তার বক্তব্যকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আবেগবহুল’, ‘এর মধ্যে যুক্তি নেই’। ওই সভায় সুনীতিও ছিলেন। ১৯২০ সালে আবারও সভা হয়। এই সভায়ও হিন্দু পণ্ডিতরা সবাই হিন্দির পক্ষে ছিলেন। তাদের প্রস্তাবিত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ‘হিন্দি’। কারণ তারা জানতেন হিন্দি বা উর্দু উপমহাদেশের সকল অঞ্চলের মানুষ বোঝে। কিন্তু পাঞ্জাবের মানুষের কাছে বাংলা, কিংবা বাংলার মানুষের কাছে পাঞ্জাবীর প্রচলন সম্ভব নয়। সুনীতিকুমার হিন্দির পক্ষে ওকালতি করে তার ‘ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা’ বইতে লিখেছেন, “ভারতের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত হিন্দি।”
অবশ্য এবার ড. শহীদুল্লাহর বোধোদয় হয়। তিনি প্রথমে রাখেন উর্দুকে। তিনি বলেন, “সাধারণ ভাষা হইবার পক্ষে দোষ-ত্রুটি সংশোধনের পরে উর্দুর দাবি অগ্রগণ্য, তারপর বাঙালা, তারপর হিন্দি, তারপর আর কোনো ভাষার দাবি আসতে পারে না।”
 
এরপরেও ১৯২১ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছে বাংলাকে প্রদেশের রাষ্ট্রভাষা করার লিখিত প্রস্তাব দেন। ১৯২৭ সালে আসাম প্রদেশের আইন পরিষদে বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি চান আব্দুল হামিদ চৌধুরী ওরফে সোনা মিয়া। বহু তর্কাতর্কির পরে অবশেষে তিনি সে সুযোগ পান। কিন্তু বাংলা অঞ্চলের মুসলমানের এসব উন্মাদনার বাইরে সমগ্র ভারতে তখন দ্বন্দ্ব হিন্দি আর উর্দুর। হিন্দুরা চাচ্ছে হিন্দি হবে রাষ্ট্রভাষা, মুসলমানরা চাচ্ছে উর্দু। আর এটাই স্বাভাবিক ও সহজাত দাবি। মুসলমান আমল থেকেই উর্দু চলে আসছে ভারতের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসাবে।
 
কিন্তু ১৯৩৭ সালে দাক্ষিণাত্যে প্রাদেশিক সরকার হিন্দি চাপিয়ে দিলে ছাত্র বিক্ষোভ হয়। সেখানে পুলিশি নির্যাতনে ২ জন ছাত্র মারা যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে রচিত ভারতের সংবিধানেও ১৯৬৫ সালের মধ্যে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার বিধান রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে এসে মাদ্রাজে আবার বিক্ষোভ হয়। এ সময় দুই পুলিশসহ সরকারি হিসাবে মারা যায় ৬০ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে মারা যায় ৫০০ ব্যক্তি।
কিন্তু সে সময়েও বাঙালি মুসলমান বাংলার পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েই যাচ্ছিলেন। তবুও এ.কে. ফজলুল হক সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। ১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর নিখিল ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন— উর্দুকেই ভারতের সাধারণ ভাষা (Lingua Franca) করতে হবে। ড. এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন, “ব্রিটিশ ভারতে ভাষা সমস্যার ক্ষেত্রে হিন্দি-উর্দু বিরোধ প্রবল হয়ে উঠেছিল। মুসলমানেরা সর্বত্রই ছিলেন উর্দুর পক্ষে। ব্রিটিশ বাংলার বাংলাভাষী মুসলমানেরাও এর বিরোধী ছিলেন না।”
এর প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। ঢাকার আদি ভাষা ছিল উর্দু। যা ১৯৫২ সালের পরে সৃষ্ট বিকট উগ্র জাতীয়তাবাদের উৎকট আলখাল্লার নিচে বগলদাবা হয়ে যায়। পুরান ঢাকার অলিগলিতে এখনও তার নজির মেলে। এবনে গোলাম সামাদ তার ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভূমি পরিচয়’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “ঢাকার মুসলমানেরা ১৯৪৮ সালে প্রায় সবাই ছিলেন একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। ঢাকার আদি মুসলিম অধিবাসীদের ভাষা ছিল এক ধরণের উর্দু। তাই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাদের মোটেও সমর্থন ছিল না।”
২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার পরে আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মায়ের ভাষার দাবির জন্য ছাত্রদের এভাবে গুলি করে হত্যা করার সংবাদে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভের আগুন দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে উঠে। যে ঢাকার জনসাধারণ ১৯৪৮ সনে উর্দুর পক্ষে থেকে সরকারকে সব রকমের সাহায্য করেছে— তারাও সরকারের উপর ক্ষেপে যায়।”
 
উপরোক্ত উদ্ধৃতাংশ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়ার পক্ষে এক ধরণের জনমত তৈরি ছিল। কিন্তু তা আর থাকেনি। এক পর্যায়ে এমনকি উৎকট বাঙালিয়ানা গিলে ফেলে ঢাকার আদি উর্দুকে। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে বাংলায় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম সম্বলিত একাধিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। এসবের কোন কোনটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির বুক পকেটে। এসব সংগঠনের আড়ালে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। সর্বশেষে শবে কদরের রাতে প্রাপ্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ১ সেপ্টেম্বর ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম। এর দুটি শব্দই আরবি উৎস হতে আগত। কারণটাও এই যে এ সংগঠন ছিল ইসলামপন্থীদের সংগঠন। এটি ছিল খেলাফতে রব্বানি পার্টির টিকি। ১৫ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা বের করে এই সংগঠন। পুস্তিকায় আবুল মনসুর আহমদ, কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল কাসেমের তিনটি প্রবন্ধ স্থান পায়। এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয় উর্দু ও বাংলাকে। আর পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ভাষা বাংলা, দ্বিতীয় উর্দু।
 
এসবে প্রভাবিত হয়ে ওই সময়ের ইসলামপন্থীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন। কবি ফররুখ আহমদ, অধ্যাপক গোলাম আযম, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, শাহেদ আলী, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্নভাবে।
 
অধ্যাপক আবুল কাসেম পরে এসব ইন্টেলেকচুয়াল আলাপকে আন্দোলনে রূপ দিতে চাইলেন। অক্টোবরে গোপনে গড়ে তুললেন ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদের সভাগুলো খুব গোপনে হতো। কারণটা ইন্টারেস্টিং। পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক নূরুল হক ভূঁইয়া বলছেন, “বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষক এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে এগিয়ে আসেননি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমাদেরকে রীতিমত নাজেহাল হতে হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক বাংলার সপক্ষে সাড়া দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট ডক্টর মাহমুদ হোসেন, রে‌আয়ৎ খাঁ, সরদার ফজলুল করিম, আজিজ আহমদ প্রমুখের নাম উল্লেখ করার মত। প্রথম দু’জন ছিলেন অবাঙালি। অথচ উভয়েই ছিলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সরব সমর্থক। এমনকি রে‌আয়ৎ খাঁঁ প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে উর্দুভাষীদের মধ্যে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মনে করতেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করাই ন্যায়সঙ্গত। তাঁরা দেখেছিলেন, পূর্ববঙ্গবাসীরা উর্দু-বিদ্বেষী নয়।”
 
অবশ্য তারা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন না বলেই এমনটা ভেবেছিলেন। অধ্যাপক গোলাম আযম একবার ঢাকাবাসীকে বাংলার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলেন। ড. এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন, “এসময় গোলাম আযম পড়েন ঢাকার একদল মানুষের হাতে; যারা প্রহার করতে চায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি করেছেন বলে। গোলাম আযম তাদের উদ্দেশ্যে বলেন— ভাই, আমাকে মারতে হলে, আমাকে তার আগে কিছু বলতে দিন। তিনি জনতাকে লক্ষ্য করে বলেন, কেন তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে? জনতা তার বক্তৃতা শুনে শান্ত হয়। গোলাম আযম ও তার সাথে আরো যে ক’জন ছাত্র ছিলেন, তারাও সম্ভাব্য প্রহারের হাত থেকে পেতে পারেন রক্ষা।”
 
এক পর্যায়ে ঢাকার জনগণ তমদ্দুন মজলিশের অফিসে হামলাও করে। এরকম পরিস্থিতিতে খুব গোপনে ছড়িয়ে পড়তে লাগল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার অযৌক্তিক দাবি। মুসলিম লীগের মন্ত্রীরাও তাদের পক্ষে আসতে লাগলেন। ১৬ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে যে ১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি স্মারকলিপি পেশ করেন তারা প্রায় সবাই ছিলেন ইসলামমনা। এরা ছিলেন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, জসীমউদ্দিন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, শাহ আজিজুর রহমান, মওলানা মুস্তাফিজুর রহমান, হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, সৈয়দ মুহম্মদ আফজাল, নইমুদ্দীন, সাহিত্যিক আবুল হাসনাত।
 
ইসলামপন্থীদের এসব কর্মকাণ্ডে মুসলিম লীগ বিব্রত। কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট পার্টি সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে দেখে মজলিশকে। তবে এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে রাম আর বামরা। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের করাচিতে গণ-পরিষদের প্রথম অধিবেশনেই উর্দু আর ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণ-পরিষদের ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানিয়ে কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বনে যান হিরো। সে সময় পূর্ব পাক প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নেতা নাজিমুদ্দিন সাহসের সাথে সত্য তুলে ধরে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশই চায় যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।”
 
কিন্তু খাজা সাহেবের এই বক্তব্যে চটে যায় এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা। ১১ মার্চ হরতাল আহ্বান করা হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। যে দেশের মাঁজা তখনও সোজা হয়ে দাঁড়ায়নি, তার জন্য এ শুভ সূচনাই বটে। ততদিনে শেখ মুজিবের সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের জন্ম হয়েছে। ২ মার্চ শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল, মোস্তাক, মানিক মিয়া আর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সার, রণেশ দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরী, কমরেড তোয়াহাসহ আরও কয়েকজন বামপন্থীদের নিয়ে ফজলুল হক হলে গোপন সভা ডাকেন কাসেম সাহেব। নিজ হাতে গড়া রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে তুলে দেন তাদের হাতে। নাম হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। নিজেদেরকে সদ্যপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের সার চেতনার বিরোধী হিসাবে প্রমাণ না রাখার স্বার্থে হিন্দুদের এই কমিটিতে রাখা হয়নি। এদের নেতৃত্বে ৭ মার্চ ঢাকায় আর ১১ মার্চ তামাম প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। ১০ মার্চের সিদ্ধান্ত ছিল অফিস- আদালতেও পিকেটিং চালাতে হবে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে। ১১ তারিখ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সেক্রেটারিয়েটের সামনে পিকেটিং করে এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা। এদিনের পিকেটিংয়ের কারণে ১৪ তারিখ অধ্যাপক গোলাম আযম গ্রেফতার হন।
 
ওইদিন পিকেটিংকারীরা প্রাদেশিক পরিষদের দিকে অগ্রসর হলে এ কে ফজলুল হকসহ বেশ কয়েকজন বেরিয়ে আসেন। তিনি আগেই পঁচে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এবার মিছিলে এসে একাত্মতা ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। অনেককে গ্রেফতার করলেও ৬৯ জন ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেয়। ১৫ মার্চ সৈয়দ নজরুল, কামরুদ্দিন আহমদ আর তোয়াহাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন আবুল কাসেম। তার বেশ কয়েকটা দাবির মধ্যে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও ছিল। আন্দোলনকারীদের মধ্যে কমিউনিস্ট থাকলেও তাদের যেন কমিউনিস্ট বলা না হয় তার আবদারও জানান তিনি। সেদিন নাজিমুদ্দিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বেশ কিছু চুক্তি করতে বাধ্য করা হয়।
 
১৯ মার্চ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রায় তিন লক্ষ জনতার সামনে তিনি ভাষণ দেন। ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনেও একই ঘোষণা দেন তিনি। তাঁর যুক্তি ছিলো উর্দু ভাষা ভারতীয় উপমহাদেশের সকল অঞ্চলের মুসলমানই বোঝে। এজন্য সকলের ঐক্যের স্বার্থে এই ভাষাটিকেই আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা তথা রাষ্ট্রের ভাষা করতে হবে। তাঁর এ বক্তব্যকে সকলেই করতালির মধ্য দিয়ে স্বাগত জানায়। তবে তিনি বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের ভাষা হিসাবে বাংলার কথাও বলেন। তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব এখানকার সরকারের হাতে ছেড়ে দেন। কিন্তু এরপরও এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা কায়েদে আযমের সাথে বৈঠক করে তাঁর সম্মানে বেয়াদবি করেন। অলি আহাদ তাঁকে এই বলে হুমকি দেন যে— "We also know that we can appeal to the Queen for your removal."
 
কিন্তু জিন্নাহ শান্ত ভঙ্গিতে তাদের 'My boys' সম্বোধন করে বলেন, "Two men may differ on one point, let us differ respectfully. You can go with point with constitutional way. Any unconstitutional movement will be crushed ruthlessly." এপ্রিলে পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৯ এপ্রিল তা সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। এরপর আবুল কাসেমের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের সরকারি ভাষা করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আবুল সাহেবের দোকান ততদিনে জনগণ বয়কট করেছেন। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে এই দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও কেন্দ্রে কিংবা আন্তঃপ্রাদেশিক ক্ষেত্রে এর কোনই যৌক্তিকতা নেই।
 
ওই বছরের ২৭ নভেম্বর দেশের প্রধানমন্ত্রী কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। জিমনেসিয়াম হলে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয় তাঁর সম্মানে। ওইদিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পুনরায় স্মারকলিপি দেওয়া হয়। যা তৎকালীন ডাকসু জিএস অধ্যাপক গোলাম আযম পাঠ করেছিলেন। এই স্মারকলিপিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসপ্রকৃতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। লিয়াকত আলী খান আশ্চর্য হয়ে গেছিলেন তা শুনে। তিনি বলেছিলেন— এসব দাবি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়া আর কী?
কিছু সংখ্যক বাঙালির এমন গোঁড়ামি আর মরিয়া আচরণের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারও তখন উদ্ভট আচরণ শুরু করে। বাংলাকে যখন সারা দেশের ভাষা হিসাবে নিতে হবে, তখন তাকে সহজ করেই নেওয়া যাক! তাঁরা বললেন— তাহলে বাংলা লিখতে হবে আরবি হরফে। অবশ্য এ দাবি কথিত পশ্চিম পাকিস্তানিদের না, এ প্রস্তাব করেছিলেন একজন বাঙালিই। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমান। এ দাবি পরে বাস্তবায়িত হয়নি।
লিয়াকত আলীর ঢাকা আগমনের পর স্মারকলিপি প্রদান ছাড়া ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ অব্দি তেমন কিছু ঘটেনি। আবুল কাসেমরা দোকান মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছেন। তারা যে ভুল করেছেন তার খেসারত এবার দেওয়ার পালা। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হাইজ্যাক করা হয়। এর নেতৃত্ব চলে যায় পুরোপুরি বামদের হাতে। নতুন আহ্বায়ক হলেন ভাষা মতিন। তবুও আবুল কাসেম তাদেরকে সহযোগিতা করেন।
 
ওই বছরের ১৬ অক্টোবর কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দিন। পরের বছর ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে তিনি রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে পুনরায় উর্দুর কথা ঘোষণা করেন। তাঁর এই ঘোষণার পর ৩০ জানুয়ারি হরতাল ডাকে নতুন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ৩১ জানুয়ারি আরেক বৈঠকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে আরেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। নতুন কমিটিতে ভাসানীসহ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পাশাপাশি খেলাফতে রব্বানি পার্টির লোকেরা দায়িত্বে আসেন। তারা ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেন। ওইদিনই সিদ্ধান্ত হয় ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে হরতাল পালন হবে।
 
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নুরুল আমিন সরকার পরিস্থিতিকে গুরুতর মনে করে। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে একমাস ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ২০ তারিখ রাতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। কিন্তু ফজলুল হক হলে আলাদা দুইটি সভায় বাম নেতৃত্বাধীন ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন। এতে সমর্থন দিয়েছিলেন মুসলিম লীগের এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তিনি তখন খেলাফতে রব্বানির নেতা।
 
পরদিন দফায় দফায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। দীর্ঘ সময় টানা ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি হয় পুলিশ আর ছাত্রদের। অভিযোগ, বিকাল তিনটার দিকে পুলিষ গুলিবর্ষণ করে। ছাত্রদের টার্গেট ছিল প্রাদেশিক পরিষদ দখল করা। তখন প্রাদেশিক পরিষদের সভা চলছিল। ধীরেন বাবু কী নায়কোচিত বক্তব্য দিচ্ছেন তখন (!) — "I have personal Knowledge that the students obeyed that order and they did not hold any public meetings nor had they taken out any procession in public places. What they did was that they collected in the Medical College compound and shouted the slogan 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' without breaking the orders under section 144."
 
ওইদিন আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেব পদত্যাগ করেন আইন পরিষদ থেকে। বলা হয়, পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। যদিও তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। কিন্তু ওই সময়ে গুজব ছড়ানো হয় পুলিশের গুলিতে দেড়শোর বেশি মানুষ মারা গেছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢামেকের ভবন নির্মাণের জন্য আনা ইট-সিমেন্ট দিয়ে কথিত শহিদ মিনার বানানো হয়। যা উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদের সম্পাদক ও পদত্যাগী সাংসদ আবুল কালাম শামসুদ্দিন। 
 
ভাষা নিয়া এই তুলকালাম ঘটে যাওয়ার পরও ইসলামপন্থী-ইসলামমনারা এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের সমর্থন দেন। তমদ্দুন মজলিশের সৈনিক, আবুল মনসুর আহমদের ইত্তেহাদ, ইনসান, সিলেটের নওবেলাল, মিল্লাত, আমার দেশ, বেগম, দৈনিক আজাদ, মোহাম্মদী, পাকিস্তান অবজারভার —এসব পত্রিকা সমর্থন অব্যাহত রাখে। আন্দোলন সমর্থন না করায় উগ্র জাতিবাদীরা মর্নিং নিউজের অফিস জ্বালিয়ে দেয়। সেই ছাইভস্মে দাঁড়িয়ে মর্নিং নিউজ ব্যানার হেড লাইন করে— Morning News can not die. ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে কবিতা-গল্প প্রভৃতি লিখে এদের আরও উস্কানি দিতে থাকেন ইসলামপন্থী অনেকেই।
 
২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর পাকিস্তানকে অকার্যকর একটা রাষ্ট্রে পরিণত করার আরেক ধাপ পরিকল্পনা নেয় রাম-বামরা। ১৯৫৩ সালের ১২ মার্চ ঢাকা জেলা বার কাউন্সিলে এক সেমিনারে বামপন্থী সংগঠন যুবলীগের আব্দুস সামাদ আজাদ ও সাংবাদিক কে জি মোস্তফা মোট সাতটি ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তবে এ দাবি হালে পানি পায়নি।
 
ভাষা আন্দোলনে রাম-বামদের কূটকৌশলের কাছে হেরে যান পূর্ব বাংলার নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন। নুরুল আমিন তো একেবারে ভিলেন বনে গেলেন। এর ফল হলো ৫৪'র নির্বাচনে। এসবের প্রেক্ষিতে ১৯৫৬ সালে প্রণীত শাসনতন্ত্রে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু খোদ আওয়ামীলীগের গুরু সোহরাওয়ার্দীও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করেননি। তার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ শহরে জিন্নাহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার দিনে তিনি উর্দুকেই দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যোগ্য হিসাবে ঘোষণা করেন।
 
২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি তাজা প্রাণের বিনিময়ে ভাষিক জাতিবাদী সন্ত্রাসীরা বিজয়ী হয়। যে সন্ত্রাস ইসলামপন্থী অথবা মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা শুরু করেছিলেন তা অনেক আগেই হাইজ্যাক করে ফেলেছিল রাম আর বামরা। আর ২১ তারিখের ঘটনার পর পূর্ব পাকিস্তানে অতি দ্রুত পট পরিবর্তন হতে শুরু করে। ঢাকার আদি উর্দুভাষীরা উর্দু বলতে ভয় পান। কেউ বাংলায় বলেন, কেউ বিক্ষিপ্ত হয়ে যান। কিন্তু এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের কাছে উর্দু শত্রু হওয়ায় নতুন করে ব্ল্যাক লিস্টেড হন উর্দুভাষী মুহাজির বিহারীরা। তাদেরও কেউ কেউ ভাষা আন্দোলনে ইন্ধন যুগিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি ধরে বাংলায় জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধের কবর রচিত হয়। জাতীয়তাবাদের আড়ালে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে। হিন্দুত্ববাদী শক্তি আর সমাজতন্ত্রী সন্ত্রাসীদের হাতে লাখো ইসলামপন্থী আর সাধারণ মুসলমানের রক্তে ভেসে চলে ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের এই জমিন। তার সিলসিলা এখনও চলমান। আমরা সাক্ষী।
 
ভাষা আন্দোলনের সূচনাকারীরা অনেকেই ইসলামপন্থী, অন্তত মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী। কিন্তু তাদের হাতেই বীজ রোপিত হয়েছে এ জমিনের রক্তাক্ত ইতিহাসের। যার খঞ্জর ঠিক তাদের বিরুদ্ধ শক্তির হাতে। ইতিহাসের এ এক আশ্চর্য এপিটাফ।
Share: