সে
সময় বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে পারেনি। কিন্তু ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সময় খোদ
বাঙালিদের মধ্য থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে। তা শুধুমাত্র
মুসলমানদের মধ্য থেকেই। যারা কেবল বাংলাকে ভালোবেসেছিলেন; বাংলাকে ঘিরে
তাদের পিঠেই যে ছুরিকাঘাত করা হবে তা তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে ১৯১০ এর দশকে। রাষ্ট্রভাষা ঠিক নয়, ‘সাধারণ
ভাষা’ (Lingua Franca)। সে সময় পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বারবার বাংলার
পক্ষে ওকালতি করেছেন। এর আগে অবশ্য ১৯১১ সালে রংপুরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক
শিক্ষা সম্মেলনে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবি জানিয়েছিলেন সৈয়দ নওয়াব
আলী চৌধুরী।
সে
সময় শহীদুল্লাহই একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন যিনি চেয়েছিলেন বাংলা হবে
রাষ্ট্রের ভাষা। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতির পিতা গান্ধীকে
চিঠি লিখেছিলেন, “The only possible national language for
inter-provincial intercourse is Hindi in India.” ১৯১৮ সালে শান্তিনিকেতনে
রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে সর্বভারতীয় সম্মেলনে ১৯ জন বক্তার মধ্যে একমাত্র
শহীদুল্লাহ বাংলার কথা বলেন। তার বক্তব্যকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,
‘আবেগবহুল’, ‘এর মধ্যে যুক্তি নেই’। ওই সভায় সুনীতিও ছিলেন। ১৯২০ সালে
আবারও সভা হয়। এই সভায়ও হিন্দু পণ্ডিতরা সবাই হিন্দির পক্ষে ছিলেন। তাদের
প্রস্তাবিত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ‘হিন্দি’। কারণ তারা জানতেন হিন্দি বা
উর্দু উপমহাদেশের সকল অঞ্চলের মানুষ বোঝে। কিন্তু পাঞ্জাবের মানুষের কাছে
বাংলা, কিংবা বাংলার মানুষের কাছে পাঞ্জাবীর প্রচলন সম্ভব নয়। সুনীতিকুমার হিন্দির পক্ষে ওকালতি করে তার ‘ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা’ বইতে লিখেছেন, “ভারতের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত হিন্দি।”
অবশ্য
এবার ড. শহীদুল্লাহর বোধোদয় হয়। তিনি প্রথমে রাখেন উর্দুকে। তিনি বলেন,
“সাধারণ ভাষা হইবার পক্ষে দোষ-ত্রুটি সংশোধনের পরে উর্দুর দাবি অগ্রগণ্য,
তারপর বাঙালা, তারপর হিন্দি, তারপর আর কোনো ভাষার দাবি আসতে পারে না।”
এরপরেও
১৯২১ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছে বাংলাকে প্রদেশের
রাষ্ট্রভাষা করার লিখিত প্রস্তাব দেন। ১৯২৭ সালে আসাম প্রদেশের আইন পরিষদে
বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি চান আব্দুল হামিদ চৌধুরী ওরফে সোনা মিয়া। বহু
তর্কাতর্কির পরে অবশেষে তিনি সে সুযোগ পান। কিন্তু
বাংলা অঞ্চলের মুসলমানের এসব উন্মাদনার বাইরে সমগ্র ভারতে তখন দ্বন্দ্ব
হিন্দি আর উর্দুর। হিন্দুরা চাচ্ছে হিন্দি হবে রাষ্ট্রভাষা, মুসলমানরা
চাচ্ছে উর্দু। আর এটাই স্বাভাবিক ও সহজাত দাবি। মুসলমান আমল থেকেই উর্দু
চলে আসছে ভারতের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসাবে।
কিন্তু
১৯৩৭ সালে দাক্ষিণাত্যে প্রাদেশিক সরকার হিন্দি চাপিয়ে দিলে ছাত্র বিক্ষোভ
হয়। সেখানে পুলিশি নির্যাতনে ২ জন ছাত্র মারা যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে
রচিত ভারতের সংবিধানেও ১৯৬৫ সালের মধ্যে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার বিধান
রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে এসে মাদ্রাজে আবার বিক্ষোভ হয়। এ সময় দুই পুলিশসহ
সরকারি হিসাবে মারা যায় ৬০ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে মারা যায় ৫০০
ব্যক্তি।
কিন্তু
সে সময়েও বাঙালি মুসলমান বাংলার পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েই যাচ্ছিলেন।
তবুও এ.কে. ফজলুল হক সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। ১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর
নিখিল ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন—
উর্দুকেই ভারতের সাধারণ ভাষা (Lingua Franca) করতে হবে। ড. এবনে গোলাম
সামাদ লিখেছেন, “ব্রিটিশ ভারতে ভাষা সমস্যার ক্ষেত্রে হিন্দি-উর্দু বিরোধ
প্রবল হয়ে উঠেছিল। মুসলমানেরা সর্বত্রই ছিলেন উর্দুর পক্ষে। ব্রিটিশ বাংলার
বাংলাভাষী মুসলমানেরাও এর বিরোধী ছিলেন না।”
এর
প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। ঢাকার আদি ভাষা ছিল উর্দু। যা ১৯৫২ সালের পরে
সৃষ্ট বিকট উগ্র জাতীয়তাবাদের উৎকট আলখাল্লার নিচে বগলদাবা হয়ে যায়। পুরান
ঢাকার অলিগলিতে এখনও তার নজির মেলে। এবনে গোলাম সামাদ তার ‘রাষ্ট্রভাষা
আন্দোলনের ভূমি পরিচয়’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “ঢাকার মুসলমানেরা ১৯৪৮ সালে
প্রায় সবাই ছিলেন একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। ঢাকার আদি
মুসলিম অধিবাসীদের ভাষা ছিল এক ধরণের উর্দু। তাই বাংলাকে অন্যতম
রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাদের মোটেও সমর্থন ছিল না।”
২১শে
ফেব্রুয়ারির ঘটনার পরে আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব প্রিন্সিপাল আবুল
কাসেম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মায়ের ভাষার দাবির জন্য ছাত্রদের এভাবে
গুলি করে হত্যা করার সংবাদে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভের আগুন দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে
উঠে। যে ঢাকার জনসাধারণ ১৯৪৮ সনে উর্দুর পক্ষে থেকে সরকারকে সব রকমের
সাহায্য করেছে— তারাও সরকারের উপর ক্ষেপে যায়।”
উপরোক্ত
উদ্ধৃতাংশ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার
আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়ার পক্ষে এক ধরণের জনমত তৈরি
ছিল। কিন্তু তা আর থাকেনি। এক পর্যায়ে এমনকি উৎকট বাঙালিয়ানা গিলে ফেলে
ঢাকার আদি উর্দুকে। ১৯৪০
সালে লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে বাংলায় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম সম্বলিত
একাধিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। এসবের কোন কোনটা ছিল
কমিউনিস্ট পার্টির বুক পকেটে। এসব সংগঠনের আড়ালে বাংলাকে পাকিস্তানের
রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। সর্বশেষে শবে কদরের রাতে প্রাপ্ত
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ১ সেপ্টেম্বর ‘তমদ্দুন মজলিশ’
নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম। এর দুটি শব্দই আরবি
উৎস হতে আগত। কারণটাও এই যে এ সংগঠন ছিল ইসলামপন্থীদের সংগঠন। এটি ছিল
খেলাফতে রব্বানি পার্টির টিকি। ১৫ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’
শিরোনামে একটি পুস্তিকা বের করে এই সংগঠন। পুস্তিকায় আবুল মনসুর আহমদ,
কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল কাসেমের তিনটি প্রবন্ধ স্থান পায়। এখানে
কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয় উর্দু ও বাংলাকে। আর
পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ভাষা বাংলা, দ্বিতীয় উর্দু।
এসবে
প্রভাবিত হয়ে ওই সময়ের ইসলামপন্থীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত
দেন। কবি ফররুখ আহমদ, অধ্যাপক গোলাম আযম, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, দেওয়ান
মোহাম্মদ আজরফ, শাহেদ আলী, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, আবুল কালাম শামসুদ্দিন,
মওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা
এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্নভাবে।
অধ্যাপক
আবুল কাসেম পরে এসব ইন্টেলেকচুয়াল আলাপকে আন্দোলনে রূপ দিতে চাইলেন।
অক্টোবরে গোপনে গড়ে তুললেন ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদের
সভাগুলো খুব গোপনে হতো। কারণটা ইন্টারেস্টিং। পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক নূরুল
হক ভূঁইয়া বলছেন, “বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষক এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে
এগিয়ে আসেননি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
আমাদেরকে রীতিমত নাজেহাল হতে হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক
বাংলার সপক্ষে সাড়া দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট
ডক্টর মাহমুদ হোসেন, রেআয়ৎ খাঁ, সরদার ফজলুল করিম, আজিজ আহমদ প্রমুখের নাম
উল্লেখ করার মত। প্রথম দু’জন ছিলেন অবাঙালি। অথচ উভয়েই ছিলেন রাষ্ট্রভাষা
আন্দোলনের সরব সমর্থক। এমনকি রেআয়ৎ খাঁঁ প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম
পরিষদের সদস্যও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে উর্দুভাষীদের মধ্যে কয়েকজন বিশিষ্ট
ব্যক্তি গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মনে করতেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা
করাই ন্যায়সঙ্গত। তাঁরা দেখেছিলেন, পূর্ববঙ্গবাসীরা উর্দু-বিদ্বেষী নয়।”
অবশ্য তারা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন না বলেই এমনটা ভেবেছিলেন। অধ্যাপক
গোলাম আযম একবার ঢাকাবাসীকে বাংলার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে তোপের মুখে
পড়েছিলেন। ড. এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন, “এসময় গোলাম আযম পড়েন ঢাকার একদল
মানুষের হাতে; যারা প্রহার করতে চায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি
করেছেন বলে। গোলাম আযম তাদের উদ্দেশ্যে বলেন— ভাই, আমাকে মারতে হলে, আমাকে
তার আগে কিছু বলতে দিন। তিনি জনতাকে লক্ষ্য করে বলেন, কেন তিনি বাংলা ভাষার
পক্ষে? জনতা তার বক্তৃতা শুনে শান্ত হয়। গোলাম আযম ও তার সাথে আরো যে ক’জন
ছাত্র ছিলেন, তারাও সম্ভাব্য প্রহারের হাত থেকে পেতে পারেন রক্ষা।”
এক
পর্যায়ে ঢাকার জনগণ তমদ্দুন মজলিশের অফিসে হামলাও করে। এরকম পরিস্থিতিতে
খুব গোপনে ছড়িয়ে পড়তে লাগল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার অযৌক্তিক দাবি। মুসলিম
লীগের মন্ত্রীরাও তাদের পক্ষে আসতে লাগলেন। ১৬ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে যে ১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি
স্মারকলিপি পেশ করেন তারা প্রায় সবাই ছিলেন ইসলামমনা। এরা ছিলেন আব্দুল
করিম সাহিত্যবিশারদ, জসীমউদ্দিন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, শাহ আজিজুর
রহমান, মওলানা মুস্তাফিজুর রহমান, হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, সৈয়দ মুহম্মদ
আফজাল, নইমুদ্দীন, সাহিত্যিক আবুল হাসনাত।
ইসলামপন্থীদের
এসব কর্মকাণ্ডে মুসলিম লীগ বিব্রত। কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট পার্টি
সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে দেখে মজলিশকে। তবে এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে
গ্রহণ করে রাম আর বামরা। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের করাচিতে
গণ-পরিষদের প্রথম অধিবেশনেই উর্দু আর ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণ-পরিষদের
ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানিয়ে কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বনে যান হিরো। সে সময় পূর্ব পাক প্রধানমন্ত্রী
জাতীয় নেতা নাজিমুদ্দিন সাহসের সাথে সত্য তুলে ধরে বলেন, “পূর্ব
পাকিস্তানের অধিকাংশই চায় যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র
রাষ্ট্রভাষা।”
কিন্তু
খাজা সাহেবের এই বক্তব্যে চটে যায় এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা। ১১ মার্চ হরতাল
আহ্বান করা হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। যে দেশের মাঁজা তখনও সোজা
হয়ে দাঁড়ায়নি, তার জন্য এ শুভ সূচনাই বটে। ততদিনে শেখ মুজিবের সন্ত্রাসী
সংগঠন ছাত্রলীগের জন্ম হয়েছে। ২ মার্চ শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল, মোস্তাক,
মানিক মিয়া আর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সার, রণেশ
দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরী, কমরেড তোয়াহাসহ আরও কয়েকজন বামপন্থীদের নিয়ে ফজলুল
হক হলে গোপন সভা ডাকেন কাসেম সাহেব। নিজ হাতে গড়া রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম
পরিষদকে তুলে দেন তাদের হাতে। নাম হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম
পরিষদ’। নিজেদেরকে সদ্যপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের সার চেতনার বিরোধী হিসাবে
প্রমাণ না রাখার স্বার্থে হিন্দুদের এই কমিটিতে রাখা হয়নি। এদের নেতৃত্বে ৭
মার্চ ঢাকায় আর ১১ মার্চ তামাম প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। ১০ মার্চের
সিদ্ধান্ত ছিল অফিস- আদালতেও পিকেটিং চালাতে হবে। পুলিশ পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে। ১১ তারিখ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে
সেক্রেটারিয়েটের সামনে পিকেটিং করে এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা। এদিনের
পিকেটিংয়ের কারণে ১৪ তারিখ অধ্যাপক গোলাম আযম গ্রেফতার হন।
ওইদিন
পিকেটিংকারীরা প্রাদেশিক পরিষদের দিকে অগ্রসর হলে এ কে ফজলুল হকসহ বেশ
কয়েকজন বেরিয়ে আসেন। তিনি আগেই পঁচে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও
বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এবার মিছিলে এসে একাত্মতা ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। অনেককে গ্রেফতার করলেও ৬৯
জন ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেয়। ১৫ মার্চ সৈয়দ নজরুল, কামরুদ্দিন আহমদ আর
তোয়াহাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন আবুল কাসেম।
তার বেশ কয়েকটা দাবির মধ্যে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর উপর থেকে
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও ছিল। আন্দোলনকারীদের মধ্যে কমিউনিস্ট থাকলেও
তাদের যেন কমিউনিস্ট বলা না হয় তার আবদারও জানান তিনি। সেদিন
নাজিমুদ্দিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বেশ কিছু চুক্তি করতে বাধ্য করা হয়।
১৯
মার্চ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসেন। ২১
মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রায় তিন লক্ষ জনতার সামনে তিনি ভাষণ দেন। ঘোষণা
করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ২৪ মার্চ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনেও একই ঘোষণা দেন তিনি। তাঁর যুক্তি ছিলো
উর্দু ভাষা ভারতীয় উপমহাদেশের সকল অঞ্চলের মুসলমানই বোঝে। এজন্য সকলের
ঐক্যের স্বার্থে এই ভাষাটিকেই আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা তথা রাষ্ট্রের ভাষা করতে
হবে। তাঁর এ বক্তব্যকে সকলেই করতালির মধ্য দিয়ে স্বাগত জানায়। তবে তিনি
বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের ভাষা হিসাবে বাংলার কথাও বলেন। তা
নির্ধারণ করার দায়িত্ব এখানকার সরকারের হাতে ছেড়ে দেন। কিন্তু এরপরও এই
ভাষিক সন্ত্রাসীরা কায়েদে আযমের সাথে বৈঠক করে তাঁর সম্মানে বেয়াদবি করেন।
অলি আহাদ তাঁকে এই বলে হুমকি দেন যে— "We also know that we can appeal to
the Queen for your removal."
কিন্তু
জিন্নাহ শান্ত ভঙ্গিতে তাদের 'My boys' সম্বোধন করে বলেন, "Two men may
differ on one point, let us differ respectfully. You can go with point
with constitutional way. Any unconstitutional movement will be crushed
ruthlessly." এপ্রিলে
পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলাকে
প্রদেশের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৯ এপ্রিল তা
সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। এরপর আবুল কাসেমের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ
বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের সরকারি ভাষা করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে
চায়। কিন্তু আবুল সাহেবের দোকান ততদিনে জনগণ বয়কট করেছেন। কারণ পূর্ব
পাকিস্তানে এই দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও কেন্দ্রে কিংবা আন্তঃপ্রাদেশিক
ক্ষেত্রে এর কোনই যৌক্তিকতা নেই।
ওই
বছরের ২৭ নভেম্বর দেশের প্রধানমন্ত্রী কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান
পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। জিমনেসিয়াম হলে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয় তাঁর
সম্মানে। ওইদিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পুনরায় স্মারকলিপি দেওয়া
হয়। যা তৎকালীন ডাকসু জিএস অধ্যাপক গোলাম আযম পাঠ করেছিলেন। এই স্মারকলিপিই
ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসপ্রকৃতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
লিয়াকত আলী খান আশ্চর্য হয়ে গেছিলেন তা শুনে। তিনি বলেছিলেন— এসব দাবি
পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়া আর কী?
কিছু
সংখ্যক বাঙালির এমন গোঁড়ামি আর মরিয়া আচরণের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারও
তখন উদ্ভট আচরণ শুরু করে। বাংলাকে যখন সারা দেশের ভাষা হিসাবে নিতে হবে,
তখন তাকে সহজ করেই নেওয়া যাক! তাঁরা বললেন— তাহলে বাংলা লিখতে হবে আরবি
হরফে। অবশ্য এ দাবি কথিত পশ্চিম পাকিস্তানিদের না, এ প্রস্তাব করেছিলেন
একজন বাঙালিই। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমান। এ দাবি পরে বাস্তবায়িত
হয়নি।
লিয়াকত
আলীর ঢাকা আগমনের পর স্মারকলিপি প্রদান ছাড়া ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ অব্দি
তেমন কিছু ঘটেনি। আবুল কাসেমরা দোকান মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছেন। তারা যে ভুল
করেছেন তার খেসারত এবার দেওয়ার পালা। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সভায়
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হাইজ্যাক করা হয়। এর নেতৃত্ব চলে যায় পুরোপুরি
বামদের হাতে। নতুন আহ্বায়ক হলেন ভাষা মতিন। তবুও আবুল কাসেম তাদেরকে
সহযোগিতা করেন।
ওই
বছরের ১৬ অক্টোবর কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর
মৃত্যুর পর পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দিন। পরের বছর ২৭
জানুয়ারি পল্টন ময়দানে তিনি রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে পুনরায় উর্দুর কথা ঘোষণা
করেন। তাঁর এই ঘোষণার পর ৩০ জানুয়ারি হরতাল ডাকে নতুন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম
পরিষদ। ৩১ জানুয়ারি আরেক বৈঠকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে
আরেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। নতুন কমিটিতে ভাসানীসহ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও
ছাত্রলীগের পাশাপাশি খেলাফতে রব্বানি পার্টির লোকেরা দায়িত্বে আসেন। তারা ৪
ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেন। ওইদিনই সিদ্ধান্ত হয় ২১
ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে হরতাল পালন হবে।
তৎকালীন
পূর্ব পাকিস্তানের নুরুল আমিন সরকার পরিস্থিতিকে গুরুতর মনে করে। ২০
ফেব্রুয়ারি থেকে একমাস ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ২০ তারিখ রাতে সর্বদলীয়
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ
করা হবে না। কিন্তু ফজলুল হক হলে আলাদা দুইটি সভায় বাম নেতৃত্বাধীন ছাত্ররা
সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন। এতে সমর্থন দিয়েছিলেন মুসলিম লীগের এক
সময়ের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তিনি তখন খেলাফতে রব্বানির নেতা।
পরদিন
দফায় দফায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। দীর্ঘ সময় টানা ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি
হয় পুলিশ আর ছাত্রদের। অভিযোগ, বিকাল তিনটার দিকে পুলিষ গুলিবর্ষণ করে।
ছাত্রদের টার্গেট ছিল প্রাদেশিক পরিষদ দখল করা। তখন প্রাদেশিক পরিষদের সভা
চলছিল। ধীরেন বাবু কী নায়কোচিত বক্তব্য দিচ্ছেন তখন (!) — "I have personal
Knowledge that the students obeyed that order and they did not hold any
public meetings nor had they taken out any procession in public places.
What they did was that they collected in the Medical College compound
and shouted the slogan 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' without breaking the
orders under section 144."
ওইদিন
আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেব পদত্যাগ করেন আইন পরিষদ থেকে। বলা হয়,
পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। যদিও তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ
আছে। কিন্তু ওই সময়ে গুজব ছড়ানো হয় পুলিশের গুলিতে দেড়শোর বেশি মানুষ মারা
গেছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢামেকের ভবন নির্মাণের জন্য আনা ইট-সিমেন্ট দিয়ে কথিত
শহিদ মিনার বানানো হয়। যা উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদের সম্পাদক ও পদত্যাগী
সাংসদ আবুল কালাম শামসুদ্দিন।
ভাষা
নিয়া এই তুলকালাম ঘটে যাওয়ার পরও ইসলামপন্থী-ইসলামমনারা এই ভাষিক
সন্ত্রাসীদের সমর্থন দেন। তমদ্দুন মজলিশের সৈনিক, আবুল মনসুর আহমদের
ইত্তেহাদ, ইনসান, সিলেটের নওবেলাল, মিল্লাত, আমার দেশ, বেগম, দৈনিক আজাদ,
মোহাম্মদী, পাকিস্তান অবজারভার —এসব পত্রিকা সমর্থন অব্যাহত রাখে। আন্দোলন
সমর্থন না করায় উগ্র জাতিবাদীরা মর্নিং নিউজের অফিস জ্বালিয়ে দেয়। সেই
ছাইভস্মে দাঁড়িয়ে মর্নিং নিউজ ব্যানার হেড লাইন করে— Morning News can not
die. ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে কবিতা-গল্প প্রভৃতি লিখে এদের আরও উস্কানি দিতে
থাকেন ইসলামপন্থী অনেকেই।
২১
ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর পাকিস্তানকে অকার্যকর একটা রাষ্ট্রে পরিণত করার আরেক
ধাপ পরিকল্পনা নেয় রাম-বামরা। ১৯৫৩ সালের ১২ মার্চ ঢাকা জেলা বার
কাউন্সিলে এক সেমিনারে বামপন্থী সংগঠন যুবলীগের আব্দুস সামাদ আজাদ ও
সাংবাদিক কে জি মোস্তফা মোট সাতটি ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার
দাবি জানান। তবে এ দাবি হালে পানি পায়নি।
ভাষা
আন্দোলনে রাম-বামদের কূটকৌশলের কাছে হেরে যান পূর্ব বাংলার নেতা খাজা
নাজিমুদ্দিন। নুরুল আমিন তো একেবারে ভিলেন বনে গেলেন। এর ফল হলো ৫৪'র
নির্বাচনে। এসবের প্রেক্ষিতে ১৯৫৬ সালে প্রণীত শাসনতন্ত্রে বাংলাকে
পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু
খোদ আওয়ামীলীগের গুরু সোহরাওয়ার্দীও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার মতো তেমন
গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করেননি। তার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায়
তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ শহরে
জিন্নাহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার দিনে তিনি উর্দুকেই দেশের একমাত্র
রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যোগ্য হিসাবে ঘোষণা করেন।
২১
ফেব্রুয়ারি কয়েকটি তাজা প্রাণের বিনিময়ে ভাষিক জাতিবাদী সন্ত্রাসীরা বিজয়ী
হয়। যে সন্ত্রাস ইসলামপন্থী অথবা মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা শুরু করেছিলেন তা
অনেক আগেই হাইজ্যাক করে ফেলেছিল রাম আর বামরা। আর ২১ তারিখের ঘটনার পর
পূর্ব পাকিস্তানে অতি দ্রুত পট পরিবর্তন হতে শুরু করে। ঢাকার আদি
উর্দুভাষীরা উর্দু বলতে ভয় পান। কেউ বাংলায় বলেন, কেউ বিক্ষিপ্ত হয়ে যান।
কিন্তু এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের কাছে উর্দু শত্রু হওয়ায় নতুন করে ব্ল্যাক
লিস্টেড হন উর্দুভাষী মুহাজির বিহারীরা। তাদেরও কেউ কেউ ভাষা আন্দোলনে
ইন্ধন যুগিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি ধরে বাংলায় জাতীয়তাবাদের বিকাশ
ঘটে। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধের
কবর রচিত হয়। জাতীয়তাবাদের আড়ালে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক
আধিপত্যের স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১
সালের ১৬ ডিসেম্বরে। হিন্দুত্ববাদী শক্তি আর সমাজতন্ত্রী সন্ত্রাসীদের হাতে
লাখো ইসলামপন্থী আর সাধারণ মুসলমানের রক্তে ভেসে চলে ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের
এই জমিন। তার সিলসিলা এখনও চলমান। আমরা সাক্ষী।
ভাষা আন্দোলনের সূচনাকারীরা অনেকেই ইসলামপন্থী, অন্তত মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী।
কিন্তু তাদের হাতেই বীজ রোপিত হয়েছে এ জমিনের রক্তাক্ত ইতিহাসের। যার
খঞ্জর ঠিক তাদের বিরুদ্ধ শক্তির হাতে। ইতিহাসের এ এক আশ্চর্য এপিটাফ।