দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

জামায়াত কি স্বজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল?

 চিত্র:Bangladesh Jamaat-e-Islami Emblem.svg - উইকিপিডিয়া

জামায়াত কি স্বজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল?
উত্তর হলো, না। ১৯৭১ সালের যে যুদ্ধ তাতে জামায়াত অংশ নিয়েছিল বটে। কিন্তু স্বজাতির বিরুদ্ধে না। কারণ কোন 'স্বজাতি' এখানে যুদ্ধে শামিল হয় নাই। শামিল হইছিল 'স্বজাতি'র ক্ষুদ্রতম একটা অংশ, বিদ্রোহী সেনাবাহিনী এবং ভারত। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত? পরবর্তীতে রক্ষী বাহিনীর উপ-প্রধান আনোয়ার উল আলম শহীদের ভাষ্য হচ্ছে 'দুই লক্ষ—আড়াই লক্ষ'। তখন বাঙালি জনসংখ্যা কত? সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ভোটার ছিল ৫ কোটি ৬০ লাখ। তাইলে জনসংখ্যা আরও বাড়বে। ১৯৬১ ও ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে যথাক্রমে ৫ কোটি ৮ লাখ ও ৭ কোটি ১৪ লাখ।
 
এর মধ্যে একাত্তরের বয়ানে মূল টার্গেট ছিল হিন্দু। ৬১ আর ৭৪ এর শুমারিতে এদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৩ লাখ ৮০ হাজার ও ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার। আর ভারতে শরনার্থী প্রায় এক কোটির মধ্যে ৭০ ভাগ ছিল হিন্দু। মানে সর্বসাকুল্যে ৯৩/৯৪ লাখ হিন্দুর মধ্যে ৭০ লাখই ভারতে পালিয়েছিল। এদের মধ্যে প্রায় ১০-১৫ লাখ আর ফিরে আসেনি দেশে। যার কারণে ৫১ আর ৬১'র ধারাবাহিকতায় ৭৪ এর শুমারিতে তাদের পার্সেন্টেজ কমে আসে। তবে ৮১ পরবর্তী শুমারিগুলোতেও দেখা যায়, দশ বছরে এক লাখ বাচ্চাও তারা জন্ম দিতে পারে না।
 
আর গণহত্যার ব্যাপারে যে বয়ান চালু আছে তা নির্জলা মিথ্যাচার। ৩০ লাখ দূরে থাক, ৩ লাখও না। এমনকি 'পঁচিশে মার্চের গণহত্যা' কোন গণহত্যাই না। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দমন অভিযান মাত্র। একই সাথে সন্দেহপ্রবণ হয়ে বাঙালি পুলিশ, ইপি‌আর আর সেনাবাহিনীকে নিরস্ত্র করতে গিয়ে বিদ্রোহের শিকার হয় পাক ফৌজ। বাঙালিরা বিদ্রোহের প্রস্তুতি আগে থেকেই নিয়ে রেখছিল অবশ্য। আর নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রো-পাকিস্তানি। যতগুলো গণকবর পাওয়া গেছে তার বেশিরভাগই বিহারী বা পশ্চিম পাকিস্তানি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। এদের সাথে কিরকম আচরণ করা হয়েছে তা অকল্পনীয়।
 
তৎকালীন ঢাবি উপাচার্য সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন স্যারের 'একাত্তরের স্মৃতি', কে এম আমিনুল হক সাহেবের 'আমি আলবদর বলছি' পাশাপাশি রেখে এসব ঘটনার ভিক্টিম অথবা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার 'ব্লাড অ্যান্ড টিয়ার্স' (ইংরেজি) পড়লে মাথা হ্যাং হয়ে যাবে। এসবের বাইরে, বাঙালির বৃহত্তর অংশ বিচ্ছেদ চায় নাই। যারা চাইছে, তাদের নিজেদের মধ্যে ছিল বিশাল বিশাল অন্তঃকোন্দল। নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করেছে বহু জায়গায়। এসব যোদ্ধাদের একটা অংশ ছিল সমাজতন্ত্রের আফিম খাওয়া, একটা অংশ ভারত থেকে আসা চুয়ানি খেয়ে মাতাল ছিল। সত্যিকার অর্থে সাধারণ যোদ্ধাদের মধ্যে একটা অংশ ছিল না বুঝে নেমেছে, আরেক অংশ যারা পাক ফৌজের বাড়াবাড়িতে যোগ দিয়েছে। স্বজাতির উল্লেখযোগ্য অংশ প্রটেস্ট করেছে। তবে তারা নির্মম ছিলো না। 
 
একজনকে জানি, তাঁকে দেখি নাই। কিন্তু তাঁর ছেলেদের সাথে, নাতিদের সাথে আলাপ, আড্ডা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের এক সংগঠক একবার ধরা পড়েছিল বাহিনীর হাতে। কিন্তু তিনি তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন। অবশ্য মুজিবের আমলে গ্রেপ্তার হলে সেই সংগঠকও তাঁকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। মূল কথা, স্বজাতির বৃহৎ অংশ যুদ্ধ করে নাই। ছোট্ট একটা অংশ- প্রধানত বিদ্রোহী ফৌজ, লীগ আর বাম কর্মী, দ্বিতীয়ত না বুঝে ফাল পাড়া জনগণ এখনও আছে, তৃতীয়ত পাক ফৌজের বাড়াবাড়িতে ক্ষিপ্ত লোকেরা এতে শামিল হইছে। সব চাইতে বড় ভূমিকা রাখছে ভারতীয় বাহিনী। দৃশ্যত ৭ ডিসেম্বর তারা অভিযান চালাইলেও মূলত এপ্রিল থেকেই গেরিলা অভিযান চালাচ্ছিল র। পার্টির লোকজনের সাথে মিশে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন ছিল না। এমনকি এসব বাহিনী পরিচালনাই হইছে য়ের আন্ডারে। সাবেক র অফিশিয়াল আর.কে. যাদবের '1971 Bangladesh war: RAW heroes India forgot to honour' শিরোনামের গর্বিত এসব স্বীকারোক্তিমূলক লেখাটা গুগলে পাওয়া যাবে।
 
এমনকি যুদ্ধ ২৫ মার্চ দূর কি বাত, শুরু হয়েছে ৩০ জানুয়ারি। ওইদিন পরিত্যক্ত একটা জাহাজে ২৬ গিনিপিগ বসায়া হাইজ্যাক নাটক সাজাইছিল র। যে বাহিনীটা গঠনই হয়েছিল পাকিস্তান ভাঙার উদ্দেশে। ওই দিনের পর ভারতের সীমানায় পাক বিমান নিষিদ্ধ হয়। ফলে বিচ্ছিন্ন হয় পাকিস্তান। 
 
এর পরপরই উন্মাতাল হইয়া যায় নিউক্লিয়াস। মুজিবও তাদের সামাল দিতে পারছিলেন না। যার ধারাবাহিকতায় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশ্য সশস্ত্র মহড়া, সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, রাষ্ট্রীয় পতাকা অবমাননা, পোড়ানো, বিহারী নিপীড়ন শুরু করে তারা। বিপরীতে রাজাকার যুদ্ধে গেছে আগস্টে; আল বদর, আল শামস সেপ্টেম্বরে।
 
যুদ্ধ অবশ্যই হইছিল। কিন্তু স্বজাতির বিরুদ্ধে না, ভারতের বিরুদ্ধে। আর স্বজাতির যে ক্ষুদ্র একটা অংশ ছিল তাও শুরু থেকেও ভারতের নিয়ন্ত্রণেই শুধু ছিল না, ভারতের প্রেসক্রিপশনেই সবকিছু করেছে। এ কথা জামায়াত তখনও বলেছে, এখনও বলেছে। একাত্তরের সব কুশীলব এখনও আছে তো। লীগ আছে, হরেক রঙের বাম আছে, জামায়াতও আছে। এদের কারোরই চরিত্র বদলায় নাই। জাস্ট মিলায়ে দেখেন। যে যে ফ্রন্টে ছিল, সে সে ফ্রন্টেই আছে। এদের মধ্যে কে গণবিরোধী? স্বজাতির বিরুদ্ধে কে? এখনও যারা স্বজাতির বিরুদ্ধে, তখনও তারাই স্বজাতির বিরুদ্ধে ছিল।

Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন