ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্য প্রার্থী এবং নোয়াখালী সরকারী কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। স্কুলে পড়াশোনাকালে একদিন রাস্তায় স্থানীয় দায়িত্বশীল আবু নাসিরের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি জানতে চান 'আপনারা সব সময় কী কাজ করেন? আমাকেও বলেন। আমিও করতে চাই।' রাস্তার এই পরিচয় তাকে সিরাতুল মুসতাকিমের রাহী বানায় এবং সেই পথে চলতে চলতে ডিসেম্বরে শাহাদাতের মঞ্জিলে পৌঁছে যান।
২. শহীদ আবু তাহের আনসারী:
৩. শহীদ আনওয়ার হোসাইন:
আনওয়ার
হোসাইন মাত্র ১৪ বছর বয়সে শাহাদাত হাসিল করেছেন। তিনি তখন নরসিংদী মডেল
স্কুলের ছাত্র। বাবা তাফাসসুল হোসাইনের নির্দেশে ছাত্র সংঘে শামিল হন। কয়েক
মাসের মধ্যেই একাত্তরের রক্তাক্ত পরিস্থিতি শুরু হয়। তিনি প্রথমে রাজাকার
ফোর্সে অংশ নেন। পরে আল বদর গঠন হলে সেখানকার সক্রিয় মুজাহিদ হয়ে ওঠেন।
ডিসেম্বরে
পাকিস্তানি ফৌজ পশ্চাৎপদ হলে বাবা-মাকে নিয়ে নৌকাযোগে তিনি বৈদ্যমারা
যাচ্ছিলেন। এমন সময় মুক্তিবাহিনীর গুণ্ডাদের হাতে পড়ে যান। হাত-পা বেঁধে
স্থানীয় একটি স্কুলে নিয়ে সারারাত মায়ের সামনেই নির্মম নির্যাতন চালানো হয়
তার ওপর। এরপর ছুরির আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত দেহটি মেঘনার স্রোতে ভাসিয়ে
দেওয়া হয়। নির্মম নিপীড়নে মায়ের হাড্ডিও ভেঙে দেয় মুক্তিবাহিনীর গুণ্ডারা।
আজও সেই ভাঙা হাঁড় থেকে মমতার কণ্ঠ শোনা যায়। ঘরের প্রদীপই নিভিয়ে দেয়নি
শুধু, গুণ্ডারা তাদের বাড়িটিও লুটপাট করে বিরান করে ফেলে।
৪. শহীদ মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম:
রাজশাহী
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম ছাত্র সংঘের সাথী
এবং শহরের রানীনগর আবাসিক শাখার ইনচার্জ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে চমৎকার
সাংগঠনিক দক্ষতা দান করেছিলেন। বাগ্মী ছিলেন, ছিলেন সাহিত্যিকও।
হিন্দুস্তানী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জান উৎসর্গ করে খিদমত আঞ্জাম দিয়ে
যাচ্ছিলেন। মুক্তিবাহীনীর চোখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আতঙ্কের নাম। ঢাকার পতন
হলে ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী তাকে ধরে ফেলে। নির্যাতন করতে করতে তাকে শহীদ
করে পদ্মায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
৫. শহীদ নুরুজ্জামান:
দ্বিতীয়
বর্ষের ছাত্র এবং সংঘের সাথী। শাহাদাতের দুই দিন আগে এক সঙ্গীর মাধ্যমে
বাবাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, আমি আল্লাহর রাহে জিহাদ করছি। দুয়া
করবেন, যেন শাহাদাতের মৃত্যু নসিব হয়। এটি সেই মৃত্যু, খালিদ বিন ওয়ালিদের
(র.) মত জেনারেলরা যার কামনা করেছিলেন। নুরুজ্জামানের এই তামান্না
পূরণ হয়। শাহ জালালের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে গিয়ে
ভারতীয় বিমান হামলায় শহীদ হয়ে যান তিনি।
৬. শহীদ মুহাম্মদ ইসমাইল:
নোয়াখালীর
টুমচর বেশ কয়েকজন শহীদকে জন্ম দিয়েছে। তার একজন মুহাম্মদ ইসমাইল। তার বাবা
মাওলানা হাফিজুল্লাহ টুমচরে মাদ্রাসা শিক্ষক ছিলেন। অতিরিক্ত লম্বা আর
স্বাস্থ্যে দুর্বল ছিলেন ইসমাইল। ম্যাট্রিকের সময় তিনি সংঘের কর্মী হন।
প্রথম বর্ষে ভর্তি হন আল বদরে। বিভিন্ন স্থানে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ডিসেম্বরে শত্রু যখন বিজয়ী হয়, তখন তাকে গ্রেফতার করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া
হয়। তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন তার বয়স হয়েছিল ১৮ বছর।
৭. শহীদ আমিনুল ইসলাম:
জামালপুরের
সবচেয়ে ক্রিয়াশীল এবং অস্ত্রচালনায় তুখোড় মেধাবী আমিনুল ইসলামের বাড়ি ছিল
মধুপুরে। ছাত্র সংঘের সাথী ছিলেন। হয়েছিলেন আল বদরের কোম্পানি কমান্ডার। ১৪
ডিসেম্বর ঢাকার দিকে মার্চ করেন। মিরপুর পৌঁছানোর পর মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে
সংঘর্ষ হয়। ওই লড়াইয়ে তিনি শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।
৮. শহীদ ইসমাইল হোসাইন:
কুষ্টিয়ার
আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৫ তে সংঘের কর্মী এবং ৭১
সালে সদস্য হন। ঢাকার আইয়ুব কলোনীর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ইসলামী আন্দোলনের
সুপরিচিত এই যুবক ছিলেন কবি। পুনরুত্থান ও রাহবার সহ তিনটি রচনা প্রকাশ
পেয়েছিল। বিষয়ের দিক থেকে তার গদ্য ছিল ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক। আল বদরের
এক জাগ্রত বিবেক মুজাহিদ ছিলেন তিনি। বাঙালি ও বিহারীদের মধ্যে এক মিশনে
গিয়েছিলেন। বিহারীরা তাকে শহীদ করে।
৯. শহীদ আব্দুস সাত্তার:
কুষ্টিয়ার
কুমারখালীর শহীদ আব্দুস সাত্তার। বাবা আযহার আলী সাহেব ১৯৭০ সালে ইন্তেকাল
করেন। কুমারখালী এমএন হাই স্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা কালেই একজন
দায়িত্বশীল কর্মী হিসাবে ছাত্র সংঘে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন সাত্তার। আল বদরে
অংশ নিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। কুষ্টিয়ার পতনের পর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
অনুমান করা হয় মুক্তিবাহিনীর হাতে তিনি শহীদ হয়েছেন। তিনি তখন ১৭/১৮ সালের
কিশোর ছিলেন।
১০. শহীদ মুহাম্মদ ইলিয়াস:
নোয়াখালীর আহমদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্র সংঘ করতেন। মিছিলে সবার আগে স্লোগান দেওয়া, দাওয়াতি এবং প্রচারণামূলক পোস্টার নিজে প্রস্তুত করে বিভিন্ন জায়গায় লাগানোর জন্য তাকে জানত না এমন কেউ নেই। পড়াশোনা শেষ তখন দু বছর হয়েছে। এক বছর আগে বিয়েও করেছেন। এমন সময় মাতৃভূমির আহ্বানে তিনি ঘর-সংসার ত্যাগ করে আল বদর ক্যাম্পে চলে আসেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া শুরু করেন। ৭ ডিসেম্বর তিনি শত্রুদের হাতে বন্দি হন। তার ঈমানের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। আহমদপুর পর্যন্ত তার উপর লাঠি বর্ষণ হতে থাকে। লাঠির আঘাতেই তাকে শহীদ করা হয়। আহমদপুরে নিজ বাড়ির সামনে তার কবর রয়েছে। শাহাদাতের সময় তার বয়স হয়েছিল ২৫।
১১. শহীদ মুহাম্মদ কামাল:
মেডিকেল কলেজের এই ড্রাইভার আপাদমস্তক ছিলেন একটি আন্দোলন। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক, ইবাদতে মশগুলিয়াত আর সংঘের কর্মীদের স্নেহ তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মিছিল আর সমাবেশ আয়োজন ও এন্তেজামে স্ব-ইচ্ছায় এগিয়ে আসতেন, সব সময় ছিলেন অগ্রগামী। ১৬ ডিসেম্বর তার গ্রাম থেকে মুক্তি বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাকে শহীদ করে পদ্মায় ফেলে দেওয়া হয়। তখন তার বয়স হয়েছিল ২৭ বছর
১২. শহীদ আবুল কালাম:
শহীদ
আবুল কালাম নোয়াখালীর শোলাখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা তাজুল ইসলাম ছিলেন
কৃষক। ফেনী কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আবুল কালাম ইসলামী ছাত্র সংঘে শামিল হন।
লেখালেখি এবং বক্তৃতার দক্ষতা আল্লাহ তাকে অনেক দিয়েছিলেন। ইতিহাসের প্রতি
তার গভীর অনুরাগ ছিল। ১৯৭১ সালে আল বদরে শামিল হন। ৮ ডিসেম্বর তাকে কাজী
বাজার থেকে ধরে ফেলে শত্রুরা। কাছেই একটি কামারের কাছে নিয়ে গিয়ে তার শরীরে
ছ্যাঁকা দেয় তারা। তার শরীর ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে। বইতে থাকে রক্তের
স্রোত। কাছেই মুক্তিগঞ্জে একটি গাছে উল্টা ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ অবস্থায় ৯
ডিসেম্বর তিনি এই নশ্বর দুনিয়া ত্যাগ করেন।
১৩. শহীদ মুহাম্মদ সোহরাব আলী:
মুহাম্মদ
সোহরাব আলীও কুমারখালীর ছিলেন। বাবা ইমান আলী সুতার ব্যবসা করতেন। নবম
শ্রেণিতে থাকতে তিনি ছাত্র সংঘে সম্পৃক্ত হন। ১৯৭১ সালে জেএন হাই স্কুলে
দশম শ্রেণির ছাত্র এবং সংঘের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এ সময়ই আল বদরে শামিল হন।
পাক ফৌজের পরাজয়ের পর পলাতক অবস্থায় মুক্তিবাহিনীর হাতে আটক হন। তাকে ২২
ডিসেম্বর অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে শহীদ করা হয়।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন