দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

শহীদ ইলিয়াসের শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনা ইসলামী আন্দোলনের ত্যাগ ও কুরবানির এক প্রেরণাদায়ক ইতিহাস


১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাস, পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রাদেশিক কনফারেন্সের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রায় তিন হাজার ডেলিগেট ও মেহমানের খাবারের দায়িত্ব আমার উপর ছিল। কিন্তু সময়ের আগে খাবার প্রস্তুত করতে পারিনি। সে সময়ে ইলিয়াস এসে জিজ্ঞাসা করলেন, খাওয়া প্রস্তুত হয়নি কেন? আমি বললাম, ধারণার চেয়ে অনেক বেশি লোক চলে এসেছে। বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। তিনি বেশ ভালো স্বাস্থ্য ও শরীরের অধিকারী ছিলেন। বললাম, "শুধু শরীর থাকলেই হবে না, দক্ষতা লাগবে এ কাজে।" তিনি জবাব দিলেন এভাবে, "দশ জনের কাজ একাই করবো, হবে না কেন?" এরপর তিনি কাজে ডুব দিলেন। দ্বিতীয় দিন পল্টন ময়দানে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর (রহ.) বক্তৃতা ছিল। কিন্তু আওয়ামী গুন্ডাবাহিনী সভা পণ্ড করে দেয়। আমাদের কয়েকজন লোক জখম হয়। শহীদ হয় কয়েকজন। আহতদের মধ্যে ইলিয়াস ছিলেন।

 
১৯৭০ সালের নির্বাচন আসতে আসতেই তিনি যেন দিওয়ানা হয়ে গ্রামে ছুটে গেলেন। যাতে এই নির্বাচনে ইসলামী শক্তিকে বিজয়ী করতে পারেন। এই লক্ষ্যে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল যখন এলো, সবাই তখন ভেঙে পড়েছেন। তবে ইলিয়াসের কপালে তখনিও চিন্তার ছাপ পড়েনি। তার এই কথার উপর বিশ্বাস ছিল যে -

"ইয়ে বাজি ইশক কি বাজি হ্যায়, জো চাহো লাগা দো, ডর ক্যা?
গর জিত গায়ে তো ক্যা কেহনা! হারে ভি তো বাজিমাত নাহি"
 
এই প্রেমের খেলায় যা মন চায় সব বাজি লাগাও। জিতে গেলে তো কথাই নেই। তবে হারলে? বাজিমাত হলো না শুধু।
 
অন্যদিকে বাতিল শক্তি চরম উদ্বিগ্ন ছিল শহীদ ইলিয়াসের কর্মতৎপরতায়। তাগুত সব সময় এমন মানুষদের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ পেলেই আঘাত করে। একইভাবে তারা ইসলামী আদর্শের প্রতিনিধি মেধাবী ও স্বাধীনচেতা মোহাম্মদ ইলিয়াসকে ফাঁসাতে নানা জাল বিছাতে শুরু করে। কিন্তু সতর্ক ইলিয়াস প্রত্যেকবার সে জাল ছিন্ন করতেন। এতে দুশমনের বুকে প্রতিহিংসার আগুন আরও বেশি জ্বলে উঠত। ১৯৭১ সালে ফেনীর পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ ছিল। ভারতীয় ফৌজ প্রথম দিকেই যেসব এলাকা কব্জা করে, তার মধ্যে ফেনী অন্যতম। মার্চে যখন আওয়ামী গুণ্ডারা দেশপ্রেমিক মুসলমানদের রক্তে হোলি খেলা শুরু করে, তখনই সোৎসাহে ইলিয়াসের বাসায় হাজির হয় তারা। কিন্তু ছাত্র সংঘের কর্মীদের অনুরোধে তিনি কিছু দিনের জন্য কুমিল্লা চলে গিয়েছিলেন।
 
পরে ১০ এপ্রিল ফেনীতে ফেরার পথে পাক সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন নাইমের সাথে তার দেখা হয়। নাইম তাকে নিয়ে কুমিল্লায় সেনা ছাউনি যান। ওখানে ফেনীর এসডিএমও উপস্থিত ছিলেন। মুক্তি বাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ এবং প্রবাসী সরকারের ব্যাপারে ইলিয়াসের প্রবল ভিন্নমত লক্ষ্য করেন তারা। ছাত্র সংঘের সহযোগিতাও চাইলেন। আলোচনা শেষে ইলিয়াস ঢাকায় চলে যান। ছাত্র সংঘের দায়িত্বশীলদের সাথে এ নিয়ে আলাপ করেন। মোহাম্মদ ইলিয়াস জরুরি প্রশিক্ষণের পর ফেনীর আল বদর কমান্ডার ঘোষিত হন। এই দুর্জয় সাহসেই তিনি অনেক দুঃসাহসী দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে আল বদর স্বেচ্ছাসেবীরা ভারতের মাটিতে গোরিলা অভিযান চালিয়ে শত্রুকে গুরুতর আঘাত দিয়ে ফিরে আসে।
 
এসব তৎপরতার কারণে ইসলামের এই সাহসী সন্তানের রক্তপিপাসু ছিল মুক্তিবাহিনী। ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় যখন ভারতীয় আর্মি ফেনীতে প্রবেশ করে, আল বদরের স্থানীয় নেতৃত্ব তখন সিদ্ধান্ত নেয় দ্রুতই ইলিয়াসকে একটি চর এলাকায় পাঠানোর। কিন্তু ইলিয়াস তা মানতে পারেননি। তিনি বলছিলেন, "আমার উপর আপনাদের দায়িত্ব রয়েছে। আপনাদের ছেড়ে আমি চলে যাব, এটা কিভাবে সম্ভব! বাঁচলে এক সাথেই বাঁচব, আর মরলেও এক সাথে।" কিন্তু তার সাথীদের অনুরোধ ছিল, "আপনার জীবন আমাদের চেয়ে অনেক দামি।"
 
অবশেষে তিনি রাজি হলেন। তবে নির্ধারিত এলাকায় গেলেন না। আব্দুর রহমান নামে এক সাথীকে সঙ্গে নিয়ে পার্শ্ববর্তী এক গ্রামের দিকে রওনা হলেন। রাস্তা ছেড়ে খেতখামার হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে যেতে যেতে এশার সময় হয়ে গেল। ওই এলাকার একটি ডাক বাংলো অতিক্রম করার সময় কিছু অস্ত্রধারী তাদের ঘিরে ফেলে। দু’জনের কাছ থেকে একশ একশ করে টাকা ছিল। সাথে ইলিয়াসের দামি ঘড়ি। সব ছিনতাই করে নেয় তারা। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। ইলিয়াস এশা নামাজের অনুমতি চাইলেন। আব্দুর রহমান বর্ণনা করেন, “নামাজের সময় তারা বলাবলি করছিল যে, "ফেনীর ইলিয়াসকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে ধরা পড়লেই আমরা বুঝতে পারব ফেনী আমাদের দখলে আছে।"
 
নামাজ শেষ হতেই তাদের উদ্ধত অস্ত্রের মতোই আমরা আল্লাহর দরবার হাত তুললাম। যিনি হাইয়্যু ও কাইয়ুম। জীবন ও মৃত্যু যার অধীনে। নামাজ থেকে ফারেগ হতেই আবারও সওয়াল-জবাব শুরু হলো। এরই মধ্যে এদের সাথে নতুন করে মুক্তিবাহিনীর আরও কয়েকজন সদস্য যোগ দিল। যাদের মধ্যে একজন ইলিয়াসকে চিনে ফেলে। যার রক্তের তৃষ্ণায় তারা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার সন্ধান পেয়েছে জেনেই তারা আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।” মুক্তি বাহিনী আব্দুর রহমানকে নয় বছর বয়সী এক ছেলের দায়িত্বে দিয়ে ইলিয়াসকে মারধর শুরু করে। আর নিজেদের হিংস্রতা চরিতার্থ করতে নতুন পদ্ধতির চিন্তা করে। 
 
তারা ইলিয়াসকে ট্রাকের পিছনে বেঁধে ফেলে ট্রাক স্টার্ট দেয়। দ্রুতবেগে এভাবেই টেনে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। তার রক্ত মাখা শরীরের জায়গায় জায়গায় গোশত ছিঁড়ে যায়। ট্রাক ফেনী পৌঁছানোর আগেই ইলিয়াস শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন। চলে গেছেন তার চির আকাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলের পানে। এরপরও জালিমদের মনে দয়া হয়নি। তার পিঠে জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে 'জয় বাংলা' লেখা হয়। রাহে হকের এই মহান সেনাপতির শরীর অনেক আগেই অবিনশ্বর আল্লাহ তায়ালার কাছে সোপর্দ হয়ে গেছিল, কিন্তু শত্রুদের বুকের উৎকট আগুন তখনও শান্ত হয়নি। এক সন্ত্রাসী সামনে এসে শহীদ ইলিয়াসের দুটি চোখ তুলে নিয়ে তার লাশ বৈদ্যুতিক খুটিতে ঝুলিয়ে দেয়। চার দিন পর্যন্ত এভাবেই ঝুলে থাকে লাশ। ভয় ও ত্রাসের এক অবর্ণনীয় দৃশ্যের সূচনা করেছিল এই ঘটনা। অবশেষে কিছু বয়োবৃদ্ধ মানুষের অনুরোধে লাশ নামানোর অনুমতি মিলে।
 
শহীদ মোহাম্মদ ইলিয়াস নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার রামপুর গ্রামে ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই বাবা হাজি নওয়াজ আলী পাটওয়ারী ইন্তেকাল করেন। মা আছিয়া খাতুন অনেক স্নেহে ছোট ছেলেকে লালন-পালন করেন। বাবার পরিবার স্বচ্ছল হওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়তে হয়নি। বরং শৈশব থেকেই ডানা মেলতে শেখেন তিনি। কুর‌আন কারীম শেখার পর বিশেষ যোগ্যতা পরীক্ষা দিয়ে তিনি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে ফেনী কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পাশ করেন। পরে সেখানে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। ইন্টার পড়াকালে ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীদের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ তৈরি হয় ইলিয়াসের। এর প্রভাবেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় ইসলামী আন্দোলনের দিকে।
 
কিন্তু বড় ভাই মুজিবুর রহমান ছিলেন স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা। তিনি ইলিয়াসকে ছাত্র সংঘের সাথে মিশতে কড়া নিষেধ করেন। কিন্তু ইলিয়াস ততদিনে বুঝে শুনেই এই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। সেখান থেকে পিছপা হয়ে ফিরে যেতে তিনি অস্বীকার করেন। ফলে ক্রুদ্ধ হয়ে বড় ভাই তাকে খালি হাতেই বাড়ি থেকে বের করে দেন। এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তও ইলিয়াসকে থামাতে পারেনি। তিনি বাবার এক বন্ধুর কাছ থেকে মাত্র ১৪শ টাকা ধার নিয়ে পরবর্তী জীবন শুরু করেন। সব সময় চকচকে পোশাক পরা ইলিয়াস এখন সামান্য কাপড়ে আগের তুলনায় আরও অধিক জযবার সাথে মঞ্জিলের দিকে ছুটে চললেন। এই দুঃসময়েই তিনি ইসলামী ছাত্র সংঘের ফেনী শহরের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার দুঃসাহসিকতা ফেনীর রাজনীতিতে বিপ্লবের আভাস দেয়। যার কারণে যুদ্ধের আগেই তাকে বারবার থামানোর পরিকল্পনা করে বাতিল শক্তি। 
 
আব্দুল মালেকের শাহাদাতের পর খুব দ্রুতই ইলিয়াস ঢাকায় পৌঁছান। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখেন মাইয়েত তার গ্রামে রওনা দিয়েছে। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে থেমে থেমে বলতে লাগলেন, "এখানে সাক্ষাৎ হলো না। ঠিক আছে। তার বাড়িতে গিয়েই দেখা করব।" শহীদ মালেকের গ্রামে গিয়ে খুব ধৈর্য্যের সাথেই জানাযায় অংশ নিলেন তিনি। কিন্তু কবরে মাটি দেওয়ার সময় এমনভাবে ভেঙে পড়লেন যে তাকে সান্তনা দেওয়ার মতো ক্ষমতা কারও ছিল না। আব্দুল মালেকের শাহাদাত তার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ সঞ্চার করে। সকল কাজ আগেভাগে করে নিতেন। এভাবে সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন আন্দোলনের কাজে। — শামসুল হক 
 
ফেনীর শহীদ ইলিয়াসের আলোচনা ছাড়া পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের ইতিহাস অপূর্ণ রয়ে যাবে। তার শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনা ইসলামী আন্দোলনের ত্যাগ ও কুরবানির এক প্রেরণাদায়ক ইতিহাস। __ সালিম মানিসুর খালিদের আল বদর বই থেকে অনূদিত।
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন