দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

ঢাকা পতন: সালিম মানসুর খালিদের 'আল বদর' বই থেকে

 ১.
হুকুম এলো, পিছিয়ে যাও
আল বদর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন কামরান। শেরপুর ও জামালপুরে বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছেন, দিয়েছেন নেতৃত্ব। কিন্তু কামালপুরের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিটি হারানোর পর পাক ফৌজের মনোবল ভেঙে গেলে তারা ভারতীয় বাহিনীর সামনে আত্মসমর্পণ করে ফেলে। কামরানের জবানিতে সালিম মানসুর খালিদ তাঁর 'আল বদর' বইতে এর বর্ণনা দিয়েছেন এরকম-
 
২৮ নভেম্বরের পর কামালপুরের সাথে আমাদের আর সংযোগ ছিল না। ৩ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন আহসান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কামালপুর বিওপির সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণ করে। তবে বখশিগঞ্জে আরও দুই দিন যুদ্ধ হয়। ওখানে মেজর আইয়ুব খান কমান্ড করছিলেন। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়তে লড়তে তিনি শহীদ হন। ৫ ডিসেম্বর হিন্দুস্তানি সৈন্যরা পুরো এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। তখন আমরা সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে গাছ-গাছালি আর ক্ষেতের আড়ালে লুকিয়ে গেরিলা আক্রমণ করতে লাগলাম। স্পষ্টতই, ওই পরিস্থিতিতে এটা কোন কার্যকর উপায় ছিল না। ফলে কর্নেল সুলতান আহমদ আমাদের আরও পিছনে সরার নির্দেশ দিলেন। ৭ ডিসেম্বর আমরা জামালপুরে পৌঁছালাম। ৮ ডিসেম্বর শহরের চারদিকে আমরা পজিশন নেই। এখানে পাক ফৌজের পাঁচ ব্যাটালিয়ন আর আল বদরের তিনটি কোম্পানি ছিল।
 
৮ ডিসেম্বর পাক আর্মি অফিসারদের মিটিং হলো। আল বদরের পক্ষে আমি অংশ নিলাম। সভায় সিদ্ধান্ত হলো, গেরিলা যুদ্ধ করতে করতে পুনরায় সেখানে ফিরে যেতে হবে, যেখান থেকে পিছু হটেছিলাম। এ সময়ে ভারতের বিমান হামলা তীব্রতর রূপ নেয়, যাতে আমাদের খুব লোকসান হচ্ছিল। এরকম একটি হামলায় আল বদর ক্যাডেট আব্দুস সামাদ ও তার দুই সাথী শহীদ হয়। তবুও আমরা দশ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত জামালপুর রক্ষা করি। কিন্তু ১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে হুকুম এলো, 'পিছে হাট যাও' (পিছু হটো)। তীব্র শীতের কারণে আমি অসুস্থ ছিলাম। সামান্য নড়াচড়াও আমার জন্য মুশকিল ছিল। এজন্য আমি জামালপুরেই থেকে গেলাম। পাক ফৌজ শহর ছাড়লো, এলো ভারতীয় বাহিনী। আল বদরের স্বেচ্ছাসেবীরা গেরিলা যুদ্ধের জন্য শহর ছেড়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেল। আর আমি শহরে রইলাম, একা। পরদিন সকাল দশটায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে। পরে আল বদরের তিন মুজাহিদ আমার কাছে এসে সাক্ষাৎ করে। তারা মোট পাঁচজন ভারতীয় বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিল। তিনজন কোনমতে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।
 
ছবি: কামালপুর বিওপির সৈন্যদের আত্মসমর্পণের ছবি। এই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ঘাঁটিটি দখলের জন্য জুন থেকে মোট ২০ বার গেরিলা হামলা চালানো হয়েছে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট চারবার নেমেছে সম্মুখ সমরে। যুদ্ধে উভয় পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ৩১ জুলাই প্রথম যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বড় ধরণের মাইর খায় এখানে। কামালপুর এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে এখানে যুদ্ধ করা ২৯ জনকে বীর প্রতীক ও বীর উত্তম খেতাব দেওয়া হয়েছে। একক যুদ্ধক্ষেত্র হিসাবে এটিই সর্বোচ্চ খেতাব নিয়ে গেছে।
 
"শত্রুকে না দিয়ে অস্ত্র আমাদের দিন, আমরা লড়ব"
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণের আগের ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন আশরাফুজ্জামান-
ঢাকা পতনের কিছু দিন আগেও আল বদরের মুজাহিদরা ময়মনসিংহ, চাঁদপুর আর কুমিল্লা প্রভৃতি এলাকায় ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করছিল। পাক ফৌজ তাদের কোন কিছু না জানিয়েই ঢাকায় সরে আসতে থাকে। আমাদের মুজাহিদরা এটা বুঝতে পেরেও কম রসদ নিয়েই শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করে। আর কিছু সদস্য ঢাকায় চলে আসে। ঢাকার বিরূপ পরিবেশে পাক ফৌজ ভারতীয় ফৌজের সাথে লড়াই করছিল। আমরা প্রায় আট-নয়শ আল বদর মুজাহিদ ক্যাম্পে অবস্থান করছিলাম। পাক হেড কোয়ার্টারের কাছেই আমাদের ক্যাম্প বসানো হয়েছিল। ক্যাম্পে রাত-দিন অনেক ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি খবর শোনারও ফুরসত ছিল না।১৬ ডিসেম্বর সকালের ঘটনা। ৯টার সময় হতে পারে। যথারীতি দুই-তিন জায়গায় অপারেশনের পরিকল্পনা নিয়ে ক্যাম্প থেকে রওনা হতেই যাচ্ছিলাম। তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সভাপতি, ঢাকা সভাপতিসহ মোস্তফা শওকত ইমরান গাড়ি নিয়ে আসলেন। তিনি তথ্য বিভাগের ইনচার্জ ছিলেন। সাথে আরও দুয়েকজন ছিল। তিনি বললেন, "রাতে আমরা ভয়েস অব আমেরিকা আর বিবিসিতে শুনেছি যে পাক ফৌজ অস্ত্র সমর্পণ করে ফেলেছে। চলো, আর্মি হেড কোয়ার্টার থেকে আসল সুরতহাল জেনে আসি।" আমি জবাব দিলাম, আমার কাছে সময় নাই। দুয়েকটা জরুরি কাজ করতে হবে। মনে হচ্ছে অস্ত্র সমর্পণের খবর প্রোপাগান্ডা হবে।
 
আমার ধারণা এমনটাই ছিল। কিন্তু তারা আমাকে জবরদস্তি আর্মি হেড কোয়ার্টারে নিয়ে গেলেন। প্রথমে কর্নেল হিজাযীর সাথে সাক্ষাৎ হলো। উনি বললেন, ভালো হয় আপনারা ব্রিগেডিয়ার বশির সাহেবের সাথে কথা বলেন।
ব্রিগেডিয়ার বশির সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি পাক ফৌজ ও আমাদের মধ্যকার লিয়াজো রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। উনি বললেন, রাত আটটার মধ্যে সব কিছু জানা যাবে। মোস্তফা শওকত ইমরান জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা যদি আত্মসমর্পণ করেন তাহলে আমাদের ব্যাপারে কী ভেবেছেন? তিনি জবাব দিলেন, আপনারা সিভিল ড্রেস পরে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে যাবেন। অথবা উর্দি পরে আমাদের সাথে অস্ত্র সমর্পণ করতে পারেন। তারপর যা আমাদের সাথে হবে, আপনাদের সাথেও তাই হবে। কিন্তু আমার ইচ্ছা, আমাদের দুর্ভোগ আপনাদের পোহানোর দরকার নাই। আমি তো এখনও এটা বুঝতে পারছি না। 
 
যে পাক ফৌজ হিন্দুস্তানিদের সামনে অস্ত্র সমর্পণ করছে! ইমরান বললেন, আল বদরের একটা সদস্যও এই বেইজ্জতির জন্য প্রস্তুত না। অন্তত আপনারা যে অস্ত্র দুশমনের সামনে জমা দিচ্ছেন, সেগুলো আমাদের দিয়ে দেন। আমরা লড়বো। ব্রিগেডিয়ার সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন, আমাদের ক্ষমতাই বা কী! না কোন অর্ডার দিতে পারি, আর না হাতিয়ার। উপর থেকে যে হুকুম হয় তারই তামিল করতে হয় আমাদের। হেডকোয়ার্টার থেকে আমরা চলে আসি। ব্রিগেডিয়ার সাহেবের কথায় আমাদের আন্দাজ হয়ে গেছিল যে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ক্যাম্পে পৌঁছে অন্য সাথীদের পরিস্থিতি অবগত করলাম। যতটুকু সম্ভব টেলিফোনের মাধ্যমে ক্যাম্পগুলোতে সতর্ক করে পরামর্শ দিলাম সিভিল ড্রেস পরে আড়াল হয়ে যেতে । এরপর (সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি) খুররম জাহ মুরাদের গাড়িতে ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম। সাথে আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে আসাদুজ্জামান শেষ পর্যন্ত আমার সাথে ছিল। সে ছিল প্লাটুন কমান্ডার, ছাত্র সংঘের সদস্য প্রার্থী। আমরা ধানমণ্ডিতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অফিসে পৌঁছলাম। তখন আমাদের কাছে সর্বসাকুল্যে দু’শ টাকা ছিল। ওটা দপ্তরের এক চাপরাশিকে দিয়ে শহর পর্যবেক্ষণ করতে বিভিন্ন দিকে বেরিয়ে গেলাম। রাত নয়টার দিকে টেলিফোনের সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। হতে পারে পাক ফৌজ অথবা মুক্তি বাহিনী তারগুলো কেটে দিয়েছে।
 
(ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য মোস্তফা শওকত ইমরান মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামীলীগের হাতে আটক হন। অবর্ণনীয় নির্যাতনের পর ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে তাঁর বুক চিরে কলিজা বের করে তাঁকে হত্যা করা হয়।)
 
ফোঁপানি আর অশ্রুর বান
চট্টগ্রামে ১৬ ডিসেম্বরের মূহুর্তগুলোর বর্ণনা দিয়ে মোহাম্মদ মনসুর বলছিলেন-
আমরা চট্টগ্রামের দশ মাইল দূরে একটি সেক্টরের দায়িত্বে ছিলাম। ১৫ ডিসেম্বর রাতে ভয়েস অব আমেরিকায় শুনলাম যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে ফেলেছে। আমাদের সুবেদার গালি দিয়ে উঠলেন। তিনি বললেন, আমরা সারেন্ডার করতে পারি না। এসব বানানো খবর। সকালে ওয়ারলেসের মাধ্যমে হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করলাম। বলা হলো, এরকম কোন তথ্য নাই। যুদ্ধ চালিয়ে যাও। ওই দিনও আমরা যুদ্ধ করছি। কিন্তু সাড়ে বারোটার দিকে ভারতীয় বাহিনী ফায়ারিং বন্ধ করে দিয়েছিল। আমরাও চুপ হয়ে গেছিলাম। পরে ছাত্র সংঘের এক সদস্য আবু সরওয়ার শহর থেকে আমাদের কাছে এলেন। তিনি আল বদরের সকল মুজাহিদকে একত্রিত করলেন। আমরা প্রায় পঞ্চাশ জন মত ছিলাম। জিজ্ঞাসা করলেন, "কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?"
 
ছোট এক মুজাহিদ বলল, "কয়েকদিন ধরে না খেয়ে আছি। খাবার কিছুই নেই। পেটে শুধু পানি পড়েছে।" সরওয়ার হেসে বলল, "আপনার শুধু পেটের চিন্তা!" তার হাসিটা খুব উদাস মনে হল। জানতে চাইলাম, মেহেরবানি করে সাফ সাফ বলেন পরিস্থিতি কেমন। তিনি জবাব দিলেন, তেমন খারাপও না। এরপর সবাইকেই শহরে যাওয়ার হুকুম দিলেন। আমরা পৌঁছলাম। কিন্তু শহরে সেনা ছাউনি ছাড়া আল বদরের ক্যাম্পগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য জামায়াতের দফতরের সামনে খন্দক খুঁড়ে দুইটা মোর্চা লাগানো হয়েছিল। যাতে দুশমন বুঝতে পারে যে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত মোকাবেলা হবে। আমাদের ছাউনিতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। সেখানে আমরা সাত শ আল বদর আর সেনাবাহিনীর সাত হাজার সৈন্য একত্র হলাম।
 
ওখানে পাক আর্মির নওজোয়ান ক্যাপ্টেন অফিসারদের সামনে বক্তব্য রাখলেন। প্রথমে হাতিয়ার রেখে দিতে বললেও কিছুক্ষণ পরেই বললেন, যে যত পার অস্ত্র নিয়ে এয়ারপোর্টে চলে যাও। ওখানে গিয়ে আল বদরের স্বেচ্ছাসেবকদের বলা হল, "যদি বাড়ি যেতে পারো তাহলে চলে যাও। আর সম্ভব না হলে এখানে থাকো।"
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "এখান থেকে আমরা কোথায় যাব?" কারো কাছে এই প্রশ্নের কোন জবাব নেই। ছিল শুধু অশ্রুর বন্যা আর ফোঁপানি; আর আমরা ছিলাম।

 ৪

"নিজেদের হেফাজত নিজেরা কর"
নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে সরতে সরতে দিনাজপুরের খানসামা। বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পরও পাক বাহিনীর আচানক পলায়ন। এসবের বর্ণনা দিয়ে আবু আত্তার বলছিলেন-

৩ ডিসেম্বরের আগে থেকেই এখানে ভারতীয় বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হচ্ছিল। কিন্তু যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের ঘোষণা হলো সেদিন অবিশ্বাস্যভাবে কোন সংঘর্ষ ছাড়াই পাক ফৌজ চিলাহাটি ছেড়ে দিল। নীলফামারী থেকেও ফৌজ সরিয়ে নিল। পিছু সরতে সরতে অবস্থান নিল দশ মাইল দূরে মাজারগঞ্জে। আচমকাই এসব সিদ্ধান্ত নেয় সেনাবাহিনী। আমাদের সাথে কোন পরামর্শ করেনি। আগের যুদ্ধক্ষেত্রের হিসাবে আল বদর বাহিনী চার মাইল সামনে ছিল। যদিও আমাদের রেজিমেন্ট পাক ফৌজের অধীনেই ছিল। নতুন পরিস্থিতিতে আল বদরের মত সেনাবাহিনীর জওয়ানরাও হতাশ ও নাখোশ ছিল। তারাও এটা বুঝতে পারছিল না, কোন কারণ ছাড়া কেন নিজেদের এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে।
 
ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানে প্রবেশ করে ফেলেছিল। দুই দিন ধরে ওই ফ্রন্টে ব্যারিকেডের মত মোকাবেলা করেছে আল বদর। যদিও আল বদরের কাছে শুধু অটোমেটিক রাইফেল ছিল। লড়ায়ের তীব্রতা বেড়ে গেলে আল বদরকে পিছনে সরে আসার নির্দেশ দিয়ে পাক আর্মি অনেক দূর থেকে গোলাগুলি শুরু করে। আমরা পিছে সরতে সরতে ডোমার থানা চলে আসি। কিন্তু ওখানে কেমন একটা নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। সাত দিন আমাদের মধ্যে কোন লড়াই হয়নি। মাঝে মাঝে ভারতীয় হেলিকপ্টার চক্কর লাগিয়ে যেত। কিন্তু আমাদের রাইফেল সেগুলোর কিছুই করতে পারত না। আমরা এখনও পাক ফৌজ থেকে তিন মাইল আগে অবস্থান করছিলাম, খানসামায়। অষ্টম দিন ভারতীয় বাহিনী হেলিকপ্টার আর ট্যাংকসহ আল বদরের ওপর হামলা করে। এসময় ক্যাম্পে শুধু ৯৫ জন ক্যাডেট ছিল। এক ঘন্টা ধরে আমরা প্রতিরোধ করি। গাছ-গাছালির কারণে দুশমন আমাদের শক্তি আন্দাজ করতে পারছিল না। ফলে সামনে আগাতে ভয় পাচ্ছিল।
 
এ সময় আমাদের সাথে পাক আর্মি যোগ দেয়। ট্যাংক ফায়ার করলে বড় সংঘর্ষ শুরু হয়। এ যুদ্ধ চলে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত। পরে ভারতীয় ফৌজের জন্য সাহায্য আসে। তবুও তারা প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু পাক আর্মি আর সামনে এগোল না। এ যুদ্ধে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সিপাহী বাশারাত অনেক দুঃসাহসের সাথে লড়াই করে। সে অ্যান্টি ট্যাংক চায়না গান দিয়ে দুশমনের দুইটি ট্যাংক ধ্বংস করে। কিন্তু একটা গোলা এসে লাগলে সে শহীদ হয়ে যায়। তার সাথে তিন রাজাকার আর সাত আল বদরও শহীদ হয়। পরের দিন বারোটার দিকে আবার যুদ্ধ শুরু হল। কিন্তু পাক আর্মি কোন কারণ ছাড়াই পিছু সরতে লাগল। তারা ওখান থেকে সাত মাইল পিছনে চলে যায়। আর আল বদর চার মাইল আগে ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি। তিন দিন পর পাক আর্মি আরও তিন মাইল পিছনে পালিয়ে দারোয়ানি রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান নেয়। পরদিন কর্নেল সাহেব আল বদর কমান্ডারকে ডেকে বললেন৷ "এখন তোমরা নিজেদের হেফাজত নিজেরা কর। আমরা অস্ত্র সমর্পণ করছি।"
 
তিনি কোন জবাবের অপেক্ষাও করেননি। জিপে সাদা পতাকা উড়িয়ে দুশমনের ক্যাম্পের দিকে চলে গেলেন। এবার যেন পাক ফৌজ আগে চলে গেল। আল বদর পিছে থেকে গেল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ঢাকা রওনা হল। আর আমরা, আল বদর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলাম। কেউ কেউ হিজরত করলাম।
 
সালিম মানসুর খালিদের 'আল বদর' বই থেকে অনূদিত
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন