কী
আশ্চর্য ঘটনা! শহীদ আব্দুল মালেকের পর ছাত্র সংঘের দ্বিতীয় শহীদও ঢাকা
ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন।সৈয়দ শাহ জামাল চৌধুরী ঢাকা ছাত্র সংঘের
সভাপতিত্বের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সেক্রেটারি জেনারেল
ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের
মাস্টার্সের ছাত্র। ইসলামী আন্দোলনে শামিল হওয়ার অপরাধে বাবা-মা তাকে ভালো
নযরে দেখত না। কিন্তু তার মনোবল ও প্রত্যয় এত বেশি ছিল যে তিনি রাত
আড়াইটা-তিনটা পর্যন্ত কাজ করে মেঝেতে বিছানা সাজিয়ে সামান্য ঘুমিয়ে নিতেন।
শাহ জামাল জন্মেছিলেন সিলেটে। ১৯৬৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সদস্য প্রার্থী হন,
আর সদস্য পদ মঞ্জুর হয় ওই বছরেরই ১৮ আগস্ট।
৯
এপ্রিল ১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রাদেশিক পরিষদের সভা
ছিল। এই সভায় উপস্থিতির জন্য ফরিদপুর জেলা সভাপতি আব্দুস সালামকে বিশেষ
দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। সভা শেষে রাত প্রায় ৯টার দিকে শাহ জামাল চৌধুরী ও
আব্দুস সালাম ছাত্র সংঘের দপ্তর (১৫, পুরানা পল্টন) থেকে বের হন। এরপরই
নিখোঁজ হন তারা। পরে জানা গেল, দপ্তর থেকে বের হতেই ওঁৎ পেতে থাকা পাক
ফৌজের জনৈক কাদিয়ানী কমান্ডার তাদের তুলে নেয়। কিছু দূর গিয়ে আরেকজনকে আটক
করা হয়। তিনজনের চোখে কাপড় বেঁধে জিপে নিয়ে অন্যত্র রওনা দেয়। তৃতীয়জন পরে
জানায়— আমার আগে যে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তারা সামরিক সরকারের
দেওয়া পরিচয়পত্র ওই অফিসারকে দেখিয়েছেন। বলেছেন আমরা শান্তি কমিটির সদস্য।
তারা এও বলেছেন যে— ‘যে কোন দেশপ্রেমিক নেতা অথবা উচ্চ পদমর্যাদার
অফিসারদের থেকে এই সত্যতা নিশ্চিত করা হোক।’ কিন্তু সে মানেনি। সম্ভবত
তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
এই
সাক্ষ্য পাওয়ার পর ছাত্র সংঘের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ জেনারেল টিক্কা খান
কর্তৃক তাদের মুক্তির আদেশ জারি করানোর জন্য বহু চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে
কোন সফলতা আসেনি। সৈয়দ শাহ জামাল ও আব্দুস সালামও হকের রাহে নিজেদের জান
কুরবান করে দিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের বাতচিত ও আচরণ থেকে এই
সন্দেহই বিশ্বাসে পরিণত হল! শাহ জামাল চৌধুরী ছাত্র সংঘের জন্য সম্ভাবনাময়
ছিলেন। এভাবে তার হারিয়ে যাওয়ায় ছাত্র সংঘ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছাত্র
সংঘের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী শাহ জামাল সম্পর্কে
লিখেছেন, “পড়ালেখায় শাহ জামাল ছিলেন মধ্যম মানের। কিন্তু তার বড় গুণ ছিল এই
যে, কোন সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে তা বাস্তবায়নে যে প্রত্যয় ও সিরিয়াসনেস
প্রয়োজন, তা তার মধ্যে ছিল। সাংগঠনিক বোঝাপড়া শহীদ আব্দুল মালেকের চেয়েও
ভালো ছিল তার। খোশমেজাজি ছিলেন। এই গুণ আব্দুল মালেকের মধ্যেও ছিল। কিন্তু
আব্দুল মালেকের চেহারায় একটা নিষ্পাপ হাসি ছিল। আর শাহ জামালের হাসিতে
লেপ্টে লেগে থাকত খোশমেজাজ।
যাদের
মধ্যে সাংগঠনিক দক্ষতা বেশি, তাদের মধ্যে আনুগত্যের অনুভূতি কম থাকে।
কিন্তু তার মধ্যে এই দুর্বলতা ছিল না। শাহ জামাল ভাই এক বছর আমার প্রাদেশিক
সেক্রেটারি ছিলেন (শহীদ নিজামী সাহেব তখন প্রাদেশিক শাখার সভাপতি)। পরের
বছরই ঢাকা শহর শাখায় স্থানান্তরিত হন। কাজ করেন শহীদ আব্দুল মালেকের অধীনে।
তার মধ্যে আনুগত্যের যে স্পিরিট ছিল তা অভাবনীয়। এক দফা প্রাদেশিক শাখায়
কাজ করার পর শহর শাখায় শিফট হওয়া! বড় একটা পরীক্ষা। আর তিনি এতে পরিপূর্ণ
রূপে উত্তীর্ণ হন। তাকে যখন সেক্রেটারি বানানো হয়, তখন তিনি ডিগ্রি
পরীক্ষার্থী ছিলেন। অধিক সাংগঠনিক কাজের কারণে তার পরীক্ষার ফল খারাপ হয়।
এজন্য আমরা তাকে এক মাস ছুটি দেই। আর গ্রাজুয়েশনের পর শহর শাখায় শিফট হন।
মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে তার কোন ধরণের জটিলতা বা সমস্যা তৈরি হতো না। তিনি
ছাত্র সংঘের মেজাজ, সঙ্গী-সাথীদের জন্য জান কুরবান আর আন্দোলনের পরিবেশ
তৈরিতে অবদান রেখে গেছেন।
যে
রাতে তিনি শহীদ হন, তার আগের একটি ঘটনা আমাকে খুব হয়রান করে। জানি না তার
মধ্যে এই উপলব্ধি কিভাবে জন্ম নিয়েছিল! সেদিন ঢাকা ছাত্র সংঘের সমস্ত
হিসাব-কিতাব ঠিকঠাক করে যান তিনি। সাধারণত মাস শেষ হওয়ার পরই হিসাব পূর্ণ
করা হয়ে থাকে। হিসাব করতে গিয়ে দুয়েক জায়গায় ঠিকঠাক স্মরণ করতে পারছিলেন
না। এজন্য খুব পেরেশান ছিলেন তিনি। আমার সামনে সেই পেরেশানি ধরা পড়ে। তিনি
বলছিলেন, ‘অমুক অমুককে এই এই কাজের জন্য কিছু পয়সা দিয়েছিলাম। তারা যে
হিসাব দিয়েছে তা তো অপূর্ণ। এতে এখন আমার দায়িত্ব কী হবে!’ অন্যরা অপূর্ণ
হিসাব দিলেও নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি অস্থির ছিলেন। তখন তাকে আমি ভরসা
দেই। আমি জানতাম না যে এখানে অন্য কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এর কয়েক ঘন্টা পরেই এক
কাদিয়ানী সেনা কর্মকর্তা তাকে গুম করে নেয়। ফরিদপুর জেলা সভাপতি আব্দুস
সালাম ভাইও তার সাথে ছিলেন। দুইজনকেই শহীদ করা হয়।”
একটা
গ্রুপ শহীদ সৈয়দ শাহ জামাল সম্পর্কে অপবাদ দেয় যে, তিনি কথিত
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় যুদ্ধে
অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন। ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করে।
কিন্তু
যুদ্ধে অংশ নেওয়া না নেওয়া কিংবা পক্ষ- বিপক্ষ নির্ধারণ এপ্রিলে হয়নি,
হয়েছে মার্চে। ১০ মার্চ থেকে ১৩ মার্চ প্রাদেশিক পরিষদের সভায় এই সিদ্ধান্ত
নেওয়া হয়। ওই সভায় পক্ষে-বিপক্ষে নানান আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে অত
বিস্তারিত জানা যায় না। শাহ জামাল চৌধুরীই শুধু নয়, আরও অনেকেই সেখানে
দ্বিমত করে থাকতে পারেন। কিন্তু সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর
তার মধ্যে কোন পিছুটান লক্ষ্য করা যায়নি। ১৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কেন্দ্রীয় মসজিদে ওই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন খোদ সৈয়দ শাহ জামাল চৌধুরী। তার
আবেগময় বক্তব্য সেদিন ঢাকার কর্মীদের উজ্জীবিত করে বদরের চেতনায়
পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সঙ্গীন হাতে ঝাঁপিয়ে
পড়তে। এখানে সেনাবাহিনীর এই আচরণ ও ছাত্র সংঘ-আল বদরের পরিস্থিতি বুঝতে
আরেকটু যুক্ত করা চলে— “১৯৭১ ইসলামী ছাত্র সংঘের জন্য অত্যন্ত নাজুক একটা
বছর ছিল। আল বদরের একজন কমান্ডার আমাকে জানান—
আমরা
খুবই বাজে পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম। আমাদের সাথীরা এক দিকে ভারতীয় হানাদার
বাহিনী, বাঙালি জাতিবাদী, কমিউনিস্ট আর হিন্দু অন্যদিকে কখনও কখনও খোদ পাক
বাহিনী এবং উর্দুভাষী; এই ছয়টি পক্ষের নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে। যেমনটা
আগেও বলা হয়েছে, উর্দুভাষীদের মধ্যে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যে প্রতি-ঘৃণা জন্ম
নিয়েছিল, তার ফলস্বরূপ বিভিন্ন জায়গায় তারা বাঙালিদের উপর জুলুম চালায়। আর
আল বদরের সকল মুজাহিদ ছিল বাঙালি। কাজেই তারাও বিভিন্ন সময় উর্দুভাষীদের
প্রতিশোধের শিকার হয়। এই চতুর্মুখী সংকটের মধ্যেও আল বদর অটল ও অনড় অবস্থান
ধরে রাখে। কারণ আল বদর ইসলামের নামে অর্জিত পাকিস্তান ও এই দেশের সাধারণ
জনগণকে বাঁচানোর জন্য হাতিয়ার তুলে নিয়েছিল। কারো পুরস্কারের আশায় নয়। আর
তারা কেবল আখিরাতেই এর পুরস্কারের প্রতাশা রাখে।”
সালিম মানসুর খালিদ, আল বদর।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন