১৯৭১
সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি ও ক্ষমতাসীন মার্শাল ল
হুকুমতের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। এতে রাষ্ট্রীয় সংহতি
ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আস্তে আস্তে দেশ উপনীত গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। এই সময়েই
পূর্ব পাকিস্তানে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিদ্রোহের ইশারা বাস্তবে
রূপ নিতে লাগে। পহেলা মার্চ থেকেই অবাঙালি ও দেশপ্রেমিক বাঙালিদের গণহত্যা
শুরু হয়। আর প্রশাসন অকার্যকর তো হয়-ই, বেশ কয়েক জায়গায় প্রশাসনিক
কর্মকর্তারাও বিশৃঙ্খলাকারীদের সঙ্গে মিশে যায়। সমগ্র দেশে ত্রাস সৃষ্টি
হয়। সামরিক আইন হারায় কার্যকারিতা। এই বিপদসংকুল পরিস্থিতিতেও রাজনৈতিক
সমাধান তালাশ করার বিপরীতে সরকার মূর্খতাপূর্ণ আচরণ জারি রাখে। অন্যদিকে
পিপলস পার্টি অব্যাহত উস্কানি আর আওয়ামী লীগ বিদ্রোহের পথে কদম বাড়ায়।
এই
দুঃখজনক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘ ১০ মার্চ
ঢাকায় প্রাদেশিক শুরা এবং জেলা সভাপতিগণের সভা আহ্বান করে। সভায় প্রদেশের
বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর তিনটি সম্ভাব্য পন্থা উপস্থাপন করা হয়।
এর মধ্যে যেকোন একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। এগুলো হলো—
১. পরিস্থিতির স্রোতে মিশে গিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদের সঙ্গ দেওয়া; অথবা
২. পরিস্থিতিকে নিজের মতো চলতে দেওয়া এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা; অথবা
৩. পরিস্থিতির গতিপথ বদলে দিয়ে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা ও মজলুম জনগণের সুরক্ষার জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করা।
এই তিন মতের ওপর বেশ বিতর্ক হয়। এসময় প্রাদেশিক শুরা সদস্য (পরবর্তীতে শহীদ) মুস্তফা শওকত ইমরান যুক্তি উপস্থাপন করে তার পক্ষে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর (রহ.) বক্তৃতার উল্লেখ করে বলেন“আমাদের নেতা ১৯৪৫ সালে বলেছিলেন, আমরা মনে করি এই জমিন, এই ঘর শুধু আমাদের নয়, বরং ইসলামেরও ঘর। শত বছর পর আল্লাহর দ্বীনকে তার আসল সুরতে প্রতিষ্ঠা করে দুনিয়ার সামনে ইসলামের বাস্তব সাক্ষ্য পেশ করার সুযোগ আমরা সুযোগ পেয়েছি। আমরা এর হেফাজতের জন্য যে কোনো মূল্যে প্রস্তুত রয়েছি। আমরা চাই পাকিস্তানের প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়ে এই নিয়ামতের প্রতি জযবা তৈরি হোক এবং কলব ও রুহ দিয়ে তারা এটি উপলব্ধি করুক যে এই নিয়ামতের হেফাজতের জন্য কোন ত্যাগ-কুরবানিই বড় নয়। মনে রাখবেন, আল্লাহ ও তার দীনের জন্য জীবন উৎসর্গের মূল্য নিজের ঘর-দুয়ার ও ধন-দৌলতের জন্য জীবন দেওয়ার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। আর এই জযবার সাথে যে শাহাদাত নসিব হয় তার মাকাম সুউচ্চ।
১৯৬৫ সালের ভারতের হামলার পর মাওলানা বলেছিলেন, পাকিস্তানের প্রতিটি মুসলমান এই দেশ যা উপমহাদেশে ইসলামের দুর্গ এবং যার পুরো জমিন আমাদের জন্য মসজিদের সমান মর্যাদা রাখে তাকে রক্ষা করতে জীবনের বাজি লাগানোর জন্য প্রস্তুতি নিন।” নানান
তর্ক-বিতর্কের পর পাকিস্তানের সংহতি রক্ষায় ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওই সভায়। সভাপ্রধান তা অনুমোদনের সময় তার বক্তব্যে
বলেন “এই
পরিস্থিতিতে যখন ক্ষমতাসীন সরকারের ভুল নীতি এবং অসহিষ্ণু রাজনৈতিক দলগুলো
বিচ্ছিন্নতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, আমাদেরকে পাকিস্তানের এই ভূখণ্ডের
সুরক্ষায় ঠিক সেভাবে ভূমিকা রাখতে হবে যেভাবে মসজিদের সুরক্ষা করা হয়।”
অবশ্য সভায় কয়েকজন শুরা সদস্য নিরপেক্ষ অবস্থানের প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, “পশ্চিম
পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন শক্তি অতীতে কিংবা বর্তমানে কখনোই পূর্ব
পাকিস্তানকে আলাদা করে দেওয়ার কোন পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু দেশ দুই ভাগ হওয়া
কিংবা বাঁচানোর দায়িত্ব দেশের রাজনৈতিক, সামরিক এবং প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের নিরপেক্ষ থাকা দরকার।” তবে
অত্যন্ত তর্ক-বিতর্কমূলক এই সভায় কোন সদস্যই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের
সঙ্গ দেওয়ার পক্ষে মত দেননি। ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের ব্যাপারে সভার সকল
সদস্যই একমত ছিলেন। অবশেষে চার দিনের নানা তর্ক-বিতর্ক ও পর্যবেক্ষণের পর
ছাত্র সংঘের এই শুরা সিদ্ধান্ত নেয়—
“পূর্ব
পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘ, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা এবং নাগরিকদের
জান-মাল ও ইজ্জত রক্ষায় অগ্রসর হবে। পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা দুই
ক্ষতিকর শক্তির লড়াইয়ের মধ্যে অবস্থান করছে। যার একটি অংশ শত্রুভাবাপন্ন;
হিন্দুত্ববাদের এজেন্ট ও রক্তাক্ত বিপ্লবের ঝাণ্ডাধারী কমিউনিস্ট— যারা
এদেশের স্বাধীনতা ধ্বংস করে একে হিন্দুস্তানের অধীনস্ত বানাতে চায়।
অন্যদিকে রয়েছে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের অংশীদার একটি
চক্রের অপকর্ম। এজন্য একদিকে ইসলামী জযবা নিয়ে ময়দানে দুশমনের মুখোমুখি হতে
হবে, অন্যদিকে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে তার সংশোধনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে
হবে। একই সময়ে দুই গ্রুপের বিপক্ষে অবস্থান নিতে হলে এর কোন বিকল্প আমাদের
সামনে নেই। আমাদের এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের বেগুনাহ নাগরিকদের জীবন ও
ইজ্জত রক্ষার সিদ্ধান্ত।”
এই
সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিতে ১৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জামে মসজিদে কর্মী
সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা ছাত্র সংঘের সভাপতি (পরবর্তীতে শহীদ) সৈয়দ শাহ
জামাল চৌধুরী আবেগময় অথচ অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত বক্তৃতার সাথে গৃহীত
সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। বিপদগ্রস্থ ছাত্র সংঘের কর্মীরা এ ঘোষণার পর একত্রিত
হন। ছাত্র
সংঘের এই সিদ্ধান্ত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া বড় কঠিন
কাজ ছিল। ডাক ব্যবস্থা ছিল খুবই নাজুক। টেলিফোন চড়া মূল্যই শুধু নয়,
অনিরাপদও ছিল। আর লিখিত প্রজ্ঞাপন জারি করা এই পরিস্থিতিতে ছিল মৃত্যু ডেকে
আনার শামিল। এজন্য সিদ্ধান্ত হলো চারজন প্রাদেশিক শুরা সদস্য বিভিন্ন জেলা
সফর করবেন এবং কর্মীদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিবেন। একইসাথে তারা এই বাণীও
পৌঁছাবেন যে—
“জনপ্রতিনিধিদের
কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি তুলুন। যতখানি সম্ভব জনগণকে জুলুম ও
নির্যাতন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করুন। পরিস্থিতি শান্ত করতে নিজের সর্বাত্মক
প্রভাব ও প্রতিপত্তি ব্যবহার করুন। ...... দীনি ও পাকিস্তানি দায়িত্ব
সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকেবহাল থাকুন এবং যেকোন ধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলার
জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকুন।” ১৫ মার্চ দিবাগত রাতে ওই চার শুরা সদস্য বেরিয়ে পড়েন এবং সপ্তাহ জুড়ে পুরো পূর্ব পাকিস্তানের বিভাগ ও জেলা কেন্দ্রগুলোতে সফর পূর্ণ করেন। সেখানে কর্মীদের জমায়েত করে এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত করা হয়। আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে ইসলাম আর পাকিস্তানের সুরক্ষার জন্য দোয়া করে বিদায় নেওয়ার সময় তৈরি হতো আবেগঘন মুহূর্ত। একে অপরের থেকে এমনভাবে বিদায় নিতেন যেন দুনিয়ায় দু’জনের আর কখনও মোলাকাত হবে না, আর তারা যাত্রা করতে চলেছেন এক অনিঃশেষ মঞ্জিলের দিকে।
আল বদর, সালিম মনসুর খালিদ

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন