দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ১


 ১। “গোলাম আযম বলেন, আলেম ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর ব্যাপক হারে হামলা না হলে তারা আত্মরক্ষা ও পাকিস্তানের হেফাজতের জন্য রেজাকার, মুজাহিদ ও পুলিশ বাহিনীতে ভর্তি হয়ে সশস্ত্র হবার প্রয়োজন বোধ করতেন না।”
 
২. মহিউদ্দীন আহমদের বই 'পার্বত্য চট্টগ্রাম । শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন', পৃষ্ঠা ৯২।
 
 
৩। রাজাকার হায়দ্রাবাদ, রাজাকার পূর্ব পাক। দুই পরাজিত শক্তি। হায়দ্রাবাদ রাজাকার ছিল মজলিসে ইত্তিহাদুল মুসলিমিনের প্যারামিলিশিয়া। দেশ দখলের সময় দাঙ্গার আগুন থেকে এই ফিনিক্স পাখির জন্ম। প্রায় লক্ষাধিক কুরবানির মধ্য দিয়ে তার মৃত্যু ঘটে। পরে ইত্তেহাদের পুনর্জন্ম হয়। আসাদুদ্দিন ওয়াইসির দাদা আব্দুল ওয়াহেদ ওয়াইসির হাতে ইত্তেহাদের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে যান রাজাকার প্রতিষ্ঠাতা কাসেম রিজভী। ভারতের আধিপত্য বিরোধী এম‌আই‌এম নতুন করে অল ইন্ডিয়া মজলিসে ইত্তিহাদুল মুসলিমিন নামে রাজনীতি শুরু করে। মেনে নিতে হয় ভারতের 'অন্তর্ভুক্তি'।
 
পূর্ব পাক রাজাকার সেনা উদ্যোগে গঠিত হইছিল। রাজাকারের সমোচ্চারিত নাম আল বদর ও আল শামস। যেগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে প্রিয় সংগঠনের নাম। ওসমানাবাদ আর ঢাকার পতনের পর ভারতীয় আধিপত্যের অধীনে রাজনীতি সহজ ছিল না। তবে দৃশ্যমান সাফল্য খুব একটা না থাকলেও ওদিকে ওয়াইসি পরিবার, এদিকে জামায়াত সার্ভাইভাল দিক দিয়ে অবশ্যই বাজিমাত।
 


৪। “এবার যদি নিঃস্বার্থ হক্কানী আলেমদের ভোট না দেন, তবে এই পাকিস্তান হিন্দুস্থান, কিংবা চীন-রাশিয়ায় পরিণত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।” পীর সাহেব চরমোনাই
 

৫। অপারেশন সার্চলাইটের অব্যবহিত পূর্বে ২২ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামের পাশে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের নিয়ে সমাবেশ করেন এম‌এজি ওসমানী। একটি প্ল্যাকার্ডে ট্যাংক দিয়ে দেশকে সেনাবাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। পাশেই একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা 'অনেক রক্ত দিয়েছি এবার শোধ নেব।'


 
৬। "...(বিচারপতি) আবু সাঈদ চৌধুরী (তখন ঢাবি উপাচার্য) ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিকে ঢাকা ত্যাগ করেন সপরিবারে। তিনি তখন পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জেনেভায় জুরিস্টদের সভায় যোগ দিতে গিয়েছিলেন। পরিবারের সবাইকে কেনো নিয়ে গেলেন সেটা বুঝা গেলো যখন ২৫শে মার্চের অব্যবহিত পর তিনি বিবিসিতে এক ইন্টারভিউতে বলেন যে, পাকিস্তান আর্মি তার ইউনিভার্সিটির হাজার হাজার শিক্ষক ও ছাত্রকে খুন করেছে। এরপর তিনি আর ঐ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করতে পারেন না। তার এই চাঞ্চল্যকর বিবৃতিতে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বিশেষভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। কারণ ভাইস চ্যান্সেলর পদের মর্যাদা পাশ্চাত্য জগতে খুব বেশী। তার মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি অতিশয়োক্তি করতে পারেন এটা ওরা ভাবতে পারেন না। আশ্চর্যের কথা ২৫শে মার্চের ঘটনার পর শুধু বিদেশী পাকিস্তান বিরোধী প্রপাগান্ডার উপর নির্ভর করে আবু সাঈদ চৌধুরী যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাতে সন্দেহ হলো যে পূর্বাহ্নেই তিনি টের পেয়েছিলেন যে দেশে একটা গৃহযুদ্ধ বাঁধবে এবং তিনি কোন পক্ষ গ্রহণ করবেন তাও আগে থেকেই স্থির করা ছিলো। আরো বিস্ময়ের কথা ২৫ তারিখের আগেই তিনি তার ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছিলেন। এই ঘটনায় আমার মনে এ সন্দেহ বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা গৃহযুদ্ধ ঘটাবে বলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। শুধু আর্মির এ্যাকশনের আকস্মিকতায় তারা কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়ে।" একাত্তরের স্মৃতি, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
 


৭। আমাদের সামনে যে বয়ান হাজির আছে তাতে মনে হয় যে সাত কোটি বাঙালিই Indiapendence -এর পক্ষে যুদ্ধ করেছে। আর সাত কোটির অতিরিক্ত যে পাঁচ-ছয়জন ছিল তারা ঘাতক দালাল এবং কেবল মাইয়া মানুষ ধইরা নিয়া যাওয়ার কাজ নিছিল তারা। অথচ সাত কোটির মধ্যে Indiapendence বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল দুই লক্ষ। বিপরীতে Indiapendence এর বিপক্ষে ঠিক কতজন যুদ্ধ করেছে সে সংখ্যাটা এখনও জানা যায় না। কিন্তু ইউএস‌এআইডি’র (যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা) রিপোর্ট মতে, স্রেফ 'রাজাকার ফোর্স' -এই এ সংখ্যাটা ছিল ৬০ হাজার। এটা ৫ নভেম্বর পর্যন্ত তালিকা। কম হলেও Indiapendence বাহিনীর এক তৃতীয়াংশ!
 
এর বাইরে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত ছিল আল বদর ও আল শামস। আল শামস সম্পর্কে তেমন নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু আল বদর সারাদেশে সক্রিয় ছিল। আর যুদ্ধ না করা মানুষরে যেভাবে পোট্রে করা হয় যে তারা সবাই Indiapendence এর পক্ষে ছিল তার সত্যাসত্য আমার নানীর থেকে ভালো করে বুঝেছি। Indiapendence বাহিনী এলে 'জয় বাংলা' আর Indiapendence বিরোধী বাহিনী এলে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দিয়ে বের হত তারা।
 

 

৮। “১২ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যার নিউজ উইকে একটি ছবিতে দেখানো হয় একদল লোক হাসিমুখে একটি বিচ্ছিন্ন মাথা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটির শিরোনামে লেখা ছিল বাঙালি বিদ্রোহীরা সরকারি বাহিনীর একজন সৈনিকের বিচ্ছিন্ন মাথা প্রদর্শন করছে, তারা অবশ্যই মরবে। কিন্তু লে. আতাউল্লাহ আমাকে বলেছেন শিরচ্ছেদকৃত যে লোকটির ছবি তিনি ভারতে বন্দি থাকা অবস্থায় দেখেছিলেন তিনি সেনাবাহিনীর কেউ ছিলেন না, ওটি ছিল কুষ্টিয়ায় কর্মরত পশ্চিম পাকিস্তানী সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা ওয়াকার নাসিম বাটের ছবি। বাট পশ্চাদপসরণকারী সেনা ইউনিটের সাথে চলে যেতে অস্বীকার করে বলেছিলেন আমি যাদের সাথে দীর্ঘদিন একত্রে কাজ করেছি ও থেকেছি আমার সেই স্বদেশীরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে না।”
— শর্মিলা বসু, ডেড রেকনিং, পৃ. ৭৮




৯। "৭১-এর জানুয়ারি থেকেই আমার অনার্স পরীক্ষা চলছিল। ১ মার্চ মুহসীন হলের রুমে বসে আমি বইপত্র খুলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় খবর এলো, ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমি বুঝে নিয়েছিলাম, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। খোলা বই বন্ধ করারও সময় না দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে তখনই বেরিয়ে পড়েছিলাম রাজপথে। তখনই শুরু করে দিয়েছিলাম সশস্ত্র সংগ্রামের প্রত্যক্ষ প্রস্তুতি কাজ। মলোটভ ককটেল হাই এক্সপ্লোসিভ, বুবি ট্র্যাম্প ইত্যাদি তৈরির প্রকাশ্য প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে রাইফেল কাঁধে নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের এক বিশাল ব্রিগেড বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ থেকে বের হয়ে ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে সুসজ্জিত প্যারেড সংগঠিত করেছিল।" — কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

১০।  হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় বাঙালির গুরুত্বপূর্ণ দুইটি সিদ্ধান্ত তাকে মুক্তির মোহনায় মিলিত করে। সিদ্ধান্তের একটি সুলতানি ও মোঘল আমলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং অন্যটি সাতচল্লিশ। এর মাধ্যমে উপনিষদের কাল হতে ক্রমাগত আর্য-আগ্রাসনের প্রতি সুদীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম থেকে তার অবসর মেলে। হারানো জমি ফিরে পায় ব্রাহ্মণ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে।
 
কিন্তু মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই একদল কমিউনিস্ট ও রাম কুচক্রীর ফাঁদে পড়ে এই জমিনের সার্বভৌমত্ব পুনরায় আর্য-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের হাতে তুলে দিয়েছে বাঙালি। যারা এই চক্রান্তের বিরোধিতা করেছে, বাঙালিকে পুনরায় আর্য-আগ্রাসী শক্তির করতলে আত্মসমর্পণের মতো বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত কিংবা এই আত্মহত্যা থেকে ফেরাতে চেয়েছে তারা হয়েছে খলনায়ক। একাত্তরকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে। তবে এই জাতীয়-বোধের জায়গা থেকে সামান্য সরে দাঁড়ালে বৃহত্তর সংকট চোখে পড়বে। সাতচল্লিশে পাকিস্তান ইসলামের নামে হয় নাই, তা ঠিক। কিন্তু তা হয়েছিল মুসলমানের নামে। সেই দুর্মূল্যের বাজারে আন্তঃপ্রাদেশিক মুসলিম ঐক্যের দৃষ্টান্ত সামনে হাজির করেছিল পাকিস্তান। বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের ক্ষেত্রে যা আলোকবর্তিকা হয়ে সমগ্র মুসলিম জাহানে আশার আলো সঞ্চার করেছিল। আর তাই বাঙালির সেই পাকিস্তান ভেঙে দেওয়া আর বিশ্ব মুসলমানের সেই আশার, সেই স্বপ্নের ওপর কুঠারাঘাত করার মধ্যে কোন ফারাক নাই।
 
তবে একাত্তর নিজেদের পরে ক্ষতি করেছে প্রথমত পাকিস্তানকে। এই ট্রমা থেকে পাকিস্তান এখনও বের হতে পারেনি। এবং সমগ্র বিশ্বে পাকিস্তান ভিলেন হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আর সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে আটকে পড়া ভারতীয় মুসলমানের। সাতচল্লিশের আযাদীর সময় খণ্ডিত একটা পাকিস্তান কায়েদে আযম মেনে নিয়েছিলেন। মেনে নেওয়ার কারণ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের কবল থেকে মুসলমানকে উদ্ধার করা। কিন্তু বিশাল ভারতের সকল মুসলমানকে হেফাজত করা কিংবা এই খণ্ডিত পাকিস্তানে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব ছিল না। এক্ষেত্রে পূর্ববাংলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বার্গেনিং পয়েন্ট। উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ব্যালেন্স রাখার জন্য পাকিস্তান ছিল জরুরি, তেমনি জরুরি ছিল বাংলায় মুসলিম শাসন। অর্থাৎ এই অঞ্চলের হিন্দুদের উপর মুসলমানের কর্তৃত্ব ছিল আবশ্যিক। কিন্তু বাংলার সার্বভৌমত্ব শত্রুর হাতে তুলে দেওয়ায় এই ব্যালেন্স নষ্ট হয়েছে। ভারতের মুসলমানদের আজকের পরিণতি দিয়ে তাই একাত্তরকে ব্যাখ্যা করতেই হচ্ছে।
 
এ সংক্রান্ত দারুণ একটা অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে বুলবুল সরওয়ারের 'ঝিলাম নদীর দেশ' —এ। ১৯৮৪ সালে তিনি কাশ্মীর সফরে যান। সে সময় তিনি যেখানেই পরিচয় দিয়েছেন সবাই তাকে 'মাশরেকী পাকিস্তান' কিংবা 'ইস্ট পাকিস্তান' —এর ভাই বলে আলিঙ্গন করেছে। কিন্তু একটি জায়গায় তিনি আরেকটু গভীর সত্য উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। 'ঝিলাম নদীর দেশ' থেকেই তুলে ধরছি—
"পশ্চিম পাশে এসে আমি চমকে উঠলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল মসজিদ। এখন শূন্য। আমি মাঠ দৌড়িয়ে সেই মসজিদে পৌঁছলাম। দেখলাম কিছু লোক দীর্ঘক্ষণ সেজদায় পড়ে রয়েছে। কৌতূহলে এগিয়ে যেতেই জনৈক ব্যক্তি দৌঁড়ে এসে বললো, 'মসজিদ! ইয়ে মসজিদ হ্যায় ভাই রোখ যাও।'
আমি জবাব দিলাম, 'ম্যায় হু মুসলমান, ভাই সাব।'
 
সে চমকে দাঁড়ালো। তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, 'সাচ্চা মুসলিম হ্যায়? কোন মুলুক সে আয়া?'
আমি বললাম, 'বাংলাদেশ।'
 
সে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললো, 'ও, মাশরেকী পাকিস্তানী? মিল্লাত কি গাদ্দার! ভাগো ইহাসে। ভাগো।'
আমি অবাক হইনি। লক্ষ্ণৌ, বেনারস, দিল্লী, পাটনা, জম্মু, কাশ্মীর, ধানবাদ, আগ্রা, অমৃতসর- যেখানেই আমি মুসলমানদের সাথে আলাপ করেছি, তারা আমায়
 
গাদ্দার বলে ভর্ৎসনা করেছে। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিলো হাজার বছরের স্বপ্নের ইমারত; তাদের দিল ছিলো সেই ইমারতের কল্যাণ কামনায় পূর্ণ । বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তাই তারা মনে করে ফ্যান্টাসীর মৃত্যু অথবা আমাদের ঈমানী দুর্বলতা। আমি তাদের যতই বুঝাতে চেষ্টা করি, তারা ততই প্রতিবাদে টগবগ করে ওঠে। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের অপমানকে সহ্য করে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম।"
একাত্তরকে এখানেই দেখতে হবে— মুসলিম মিল্লাতের সাথে গাদ্দারী হিসাবে।

১১। "২৫শে মার্চের সেই ভয়াল রাতের হিংস্র ছোবলের সাথে সাথেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী এবং পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যবর্গ কি করে পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে পরিচিত ভারতের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণের জন্য ছুটে যেতে পারল? কোন সাহসে কিংবা কোন্ আস্থার উপর ভর করেই বা তারা দলে দলে ভারতের মাটিতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল? তাহলে কি গোটা ব্যাপারটাই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত? তাহলে কি স্বাধীনতা বিরোধী বলে পরিচিত ইসলামপন্থী দলগুলোর শঙ্কা এবং অনুমান সত্য ছিল? তাদের শঙ্কা এবং অনুমান যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে দেশপ্রেমিক কারা? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা না রাজাকার-আলবদর হিসেবে পরিচিত তারা। এ প্রশ্নের মীমাংসা আমার হাতে নয়, সত্যের উদ্ঘাটনই কেবল এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর নির্ধারণ করবে।" অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা ~ মেজর এম.এ. জলিল

 
১২। 'সামরিক জান্তা' 'স্বৈরশাসক' আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর। এর আগে গণতন্ত্র বহাল থাকা অবস্থায় চার গভর্নরের দুইজন বাঙালি, প্রধানমন্ত্রী ৭ জনের তিন জন। চারটা বছর স্বৈরাচার সইতে পারেননি শেমু। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি প্রথমবার তিনি আগরতলায় যান পাকিস্তান ভাঙতে। ৬৩তে আরেক দফা গিয়ে একদিন আগরতলা জেলেও থেকে আসেন। ২৩ বছরের শোষণের ইতিহাস।


 

১৩। "একবার কর্ণেল ওসমানিকে খোজাডাঙার ওপারে সাতক্ষীরার ভোমরায় নিয়ে যাই। সেখানে একটা মুক্তি ফৌজের ক্যাম্প ছিল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রধান সেনাপতিকে পেয়ে খুসি হল। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে তারা তাকে অভিযোগ জানাল। তারা সবাই বলল যে আধপেটা খেয়ে সেখানে তারা পাহাড়া দিচ্ছে। তারা তাদের প্রধান সেনাপতির কাছে অভিযোগ জানাল সাতক্ষীরার ব্যাঙ্ক লুট করে তারা ৬০,০০০০০ (ষাট লক্ষ) টাকা নেতাদের হাতে দিল। অথচ তারা সেখানে না খেয়ে থাকছে তা দেখতে কোনো নেতা আর সীমান্তে গেল না। এমনকি কোন খোঁজ খবরও নিচ্ছে না।" বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব ~ ডা. কালিদাস বৈদ্য

 
 ১৪। বগুড়া সাত মাথার মোড়। ৬৫'র পাক-ভারত যুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিতে নির্মিত সড়কদ্বীপ। এমন অনেক স্থাপনা তৈরি হয়েছিল ৪৭ থেকে একাত্তরে। সামান্য স্মৃতি জাগতে পারে এমন সব কিছুই মুছে দিয়েছে তারা। এখানেও ডিজাইনটা রদবদল করে এখন সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবি শোভা পায়।

আমাদের বুক ভরা স্মৃতি
নিয়ে গেছে সব তার বানে...


 
 
 লিংক:
Share:

পুর্ব পকিস্থান ছাত্রসংঘের প্রতিষ্ঠাতা খাজা মেহবুব এলাহী রহ. (১৯৩২-২০২৩)

 


১লা মে ২০২৩ ঈসায়ীতে ৯১ বছর বয়সী খাজা মেহবুব এলাহী আল্লাহ তা'লার কাছে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর পারিবারিক আবাস পাঞ্জাবে। সেখানেই তিনি ১৯৩২ ঈসায়ীর জুলাইয়ে জন্ম নেন। তার শৈশব কাটে পাটনা এবং কোলকাতায়। পাকিস্তান আজাদ হওয়ার পর তিনি তিনি তাঁর পিতামাতার সাথে পৈত্রিক নিবাসে ফিরে যান।

ইসলামী ছাত্রসংঘের একদম প্রথম দিককার কয়েকজন সদস্যের মধ্যে খাজা মেহবুব ছিলেন একজন। ১৯৫০ এর দিকে তিনি মাশরেকি পাকিস্তানে থিতু হন। মাশরেকি পাকিস্তানে তাঁর নানা মোহাম্মদ আমিন প্রতিষ্ঠা করেন আমিন জুট মিল। ইসলামী ছাত্রসংঘের [প্রাদেশিক] প্রধান হিসাবে তিনি ১৯৫১ ঈসায়ীতে লাহোরে জামাতে ইসলামীর বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি ধীরে ধীরে স্থানীয় বাঙ্গালীদের হাতে সাংগঠনিক দায়িত্বভার হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেন। খাজা মেহবুব এলাহী যোগ্যতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা অনুসারে মানুষ চিনতেন। এর ফলে মাশরেকি পাকিস্তানে ছাত্রসংঘ মজবুত ভিত্তি পায়। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রথমে সৈয়দ মুহাম্মাদ আলী এবং পরে কুরবান আলী ছাত্রসংঘের [প্রাদেশিক] প্রধান হন। তাঁর দাওয়াতে আব্দুল জব্বার, শাহ আব্দুল হান্নান (পরবর্তীতে সচিব), এবং সৈয়দ ফয়েজউদ্দিন আহমেদ ছাত্রসংঘে যোগ দেন। ছাত্রসংঘের পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও উপকরণে খাজা মাহবুবের ভূমিকা ছিল প্রথম দিকে।
 
খাজা মেহবুব ১৯৫৫-৫৬ ঈসায়ীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং যুক্তরাজ্যে গমন করেন। যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চার্টার্ড একাউন্টেন্ট কোয়ালিফিকেশন লাভ করেন। বেকার স্ট্রিটের ইসলামিক কালচারাল সেন্টারে তিনি একটা কুরানিক দার্‌স চক্র শুরু করেন। এই চক্রে আরব ইখওয়ানি ছাত্ররা অংশ নিত। তিনি ছাত্রসংঘের প্রতিভাবান কুরবান আলীকে লন্ডনে নিয়ে আসার এন্তাজাম করেন এবং ইনস অব কোর্টে আইন শিক্ষার আয়োজন করেন। খাজা মেহবুব কখনো এজন্য কৃতিত্ব দাবী করেন নাই, তবে ব্যারিস্টার কুরবান আলী সর্বদা এজন্য শুকরিয়া এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। লন্ডন থেকে কুরবান আলী নিয়মিত "লন্ডন থেকে চিঠি" শীর্ষক কলাম লিখতেন যা লাহোরের এশিয়া জার্নালে প্রকাশিত হত। বর্তমানে ঐসময়ের হাল হাকিকত জানার জন্য এই কলাম অন্যতম সূত্র হিসাবে বিবেচিত হয়। ১৯৬২ ঈসায়ীতে ইউকে ইসলামিক মিশন প্রতিষ্ঠায় কুরবান আলীর ভূমিকা অসামান্য।
লন্ডনে থাকাকালে ১৯৬০ ঈসায়ীতে খাজা মেহবুব খুবই হৃদয়স্পর্শকারী এক প্রবন্ধ লেখেন (চিরাগ-এ রাহ, নাজরিয়া পাকিস্তান নাম্বার, ১৯৬১, ১৬-২১) যাতে তিনি পাকিস্তান তৈরীর উদ্দেশ্য এবং পাকিস্তান তৈরীর পর সৃষ্ট হতাশা নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি খেয়াল করেন যে লন্ডনে তিনি কিছু পাকিস্তানী দেখেছেন যারা নিজেদের পাকিস্তানী বলতে লজ্জা পেত। তাঁর এই প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন মানুষকে উদ্ধৃত করেন। এতে করে তার নেটওয়ার্কের ব্যপ্তি সম্পর্কেও আমরা ধারণা পাই।
 
ত্রিনিদাদের এক মুসলমানকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেন,
"আমাদের জন্য পাকিস্তান আন্দোলন ছিল আজাদী আন্দোলনের মত। ১৯৪৬-৪৭ ঈসায়ীতে যখন হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব চলছিল তখন ত্রিনিদাদেও হিন্দু এবং মুসলমানরা মারামারি করত। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট আমরা মশাল জ্বালিয়ে আজাদী উদযাপন করেছি এমনভাবে যেন এটা আমাদের নিজেদের আজাদী। আমরা অপেক্ষা করছিলাম যে এবার একটা দৃষ্টান্তমূলক ইসলামিক নেশন হবে। এখন থেকে আমরা পাকিস্তান থেকে দ্বীনী পুস্তক এবং ওস্তাদ পেয়ে ভাল মুসলমান হব। ঐসময় কি আর আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে এসবই ছিল স্রেফ মরীচীকা?"
 
একই প্রবন্ধে খাজা মেহবুব লন্ডনে এক পাকিস্তানী পরিবারের সাথে তাঁর মোলাকাতের বর্ণনা দেন। তিনি পরিবারের কর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে আওলাদদের স্বার্থে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন জরুরী। এর উত্তরে খাজা মেহবুবকে শুনতে হয় যে লন্ডনেই অধিক সততা এবং ভদ্রতা আছে। খাজা মেহবুব এর সত্যতা উপলব্ধি করেন এবং স্বীকার করেন যে উনি নিজেও ভাবেন যে কেন তিনি মাতৃভূমে (ওয়াতান) প্রত্যাবর্তন করবেন-
"এই যে আমরা যেটাকে ওয়াতান বলি সেটা আসলে কি? পরিবার এবং ঘর, কাছের ও আপন, বন্ধু এবং সাথী, মুসলমান জীবন। 
 
পরিবার এবং ঘর? এটা তো যেকোন জায়গাতেই দ্রুত ও সহজে বানানো যায়। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলিতে।
কাছের এবং প্রিয়? মাশরেকি পাকিস্তানের বছরগুলির কারণে এরকম মোলাকাত তো দেখেছি। মোলাকাত তো বিদেশী জমিনে বসেও হতে পারে। বন্ধু এবং সাথী? এটাও তো যেকোনখানেই হতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, আমার এখানকার স্বল্পদিনের যাত্রাতেই আমি অনেক বিশ্বস্ত বন্ধুত্ব তৈরী করেছি। মুসলমান জীবন? এটাও তো যেকোন মুসলমান দেশেই পাওয়া যায়। আপনি যদি আরব জাতীয়তাবাদের ভয়ে মধ্যপ্রাচে না যান, তাহলেও কোন সমস্যা নাই। আফ্রিকাতে অনেক দেশ আছে। দক্ষিনপূর্ব এশিয়াতে অনেক দেশ আছে। খোদার পৃথিবী বিশাল। এই দেশগুলি জেনেরাস এবং আমাদের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দেয়।
 
না, এই সমস্ত কারণের মধ্যে এমন একটা কারণও নাই যার কারণে ওয়াতানে প্রত্যাবর্তন করা যায়। আমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক যার ডিমান্ড সর্বত্র। আমরা যদি পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করি, এটা অনেক বড় কোরবানি হবে। এই প্রত্যাবর্তন থেকে সমমানের কোন ম্যাটেরিয়াল বেনিফিট আমরা পাব না। এই কোরবানির বিনিময় কেবল একটাই হতে পারে। ইসলামের জন্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া জাতিতে ইসলামী হুকমত কায়েম করা। এক নয়া ব্যবস্থা জারি করা। যেই ব্যবস্থা আমাদের নিপীড়ত জনগনকে শান্তি ও আরাম দিবে এবং ভাল রাখবে। আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ায় সফলকাম করবে। এবং আমরা ফখরের সাথে বলতে পারব আমরা পাকিস্তানী..."
খাজা মেহবুব তাঁর ওয়াতানে (মাশরেকি পাকিস্তান) ফিরেছিলেন এবং আমিন জুট মিলের একাউন্টসের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
 
১৯৬৫ ঈসায়ীতে তিনি খুররম মুরাদ এবং অধ্যাপক খুরশিদ আহমেদের কাছে প্রস্তাব রাখেন যে মাওলানা আব্দুর রহীমকে মাশরেকি পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমীরের দায়িত্ব থেকে আজাদ করা হোক যাতে করে তিনি তাফহীমুল কোরানের বাংলা তরজমায় মনোনিবেশ করতে পারেন। খাজা মেহবুব তরজমার যাবতীয় খরচার দায়িত্ব নেন। এই খরচের মধ্যে ছিল প্রতি মাসে ৫০০ রুপি স্টাইপেন্ড মাওলানা আব্দুর রহীমকে দেওয়া। সেই সময়ের বিবেচনায় এটা বিশাল অংক। ১৯৬৬-৬৭ ঈসায়ীতে এই প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং মাওলানা আব্দুর রহীম দ্রুতই এই মহাযজ্ঞ সমাপ্ত করেন খুবই উচ্চমান বজায় রেখে।
 
১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহে আমিন জুট মিল লুট করা হয়। খাজা মেহবুব মাগরেবি পাকিস্তানে ফিরে যান। এখানে তিনি পারিবারিক শিল্প ও ব্যবসার দায়িত্ব নেন। এর মধ্যে Neelam Glass অন্যতম।
 
মাওলানা মওদূদী যে পাঁচ-ছয়জনকে বিশেষভাবে স্নেহ করতেন তার মধ্যে খাজা মেহবুব একজন। অন্যরা ছিলেন ইসরার আহমেদ, জাফর ইসহাক আনসারি, খুররম মুরাদ, খুরশিদ আহমেদ, এবং হুসেইন খান। মাওলানা মওদূদীর হজ্বের সফরসঙ্গী ছিলেন খাজা মেহবুব। জামাতের প্রকাশনা এবং সংবাদপত্রের অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য দায়িত্ব মেটাতে সর্বদা তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর বিবি সালমা ইয়াসমিন নাজমি সাহিবি তাঁর সহায়তায় বুতুল এবং আফত নামক দুইটা নারী ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন। বৈবাহিক সূত্রে তিনি খুররাম জাহ মুরাদের আত্মীয় ছিলেন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।
 
[লাহোর থেকে সেলিম মনসুর খালিদ (সম্পাদক, তরজমানুল কুরআন) এবং লন্ডন থেকে জামিল শরিফ (মুসলিম কাউন্সিল ব্রিটেন) ইংরেজী থেকে অনুবাদ মোঃ আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম]
 
Share: