দ্বীনের (دين) কাজ কাকে বলে? কোন কাজ الدِّیْنَ 'আদ-দ্বীন' এর কাজ?
দ্বীনের (دين) কাজ কাকে বলে? কোন কাজ الدِّیْنَ 'আদ-দ্বীন' এর কাজ?
যে কাউকে ইসলামপন্থী বলা যাবে কি?
ইদানীং 'ইসলামপন্থী' শব্দটাকে এতবেশি পঁচানো হয়েছে যে, একে প্রজেক্ট, মানবসেবা, জীব সেবা ইত্যাদিতে পরিণত করা হয়েছে। যেন ইসলামপন্থী মানে 'জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ইশ্বর।'
ইসলামপন্থী কি? কাকে ইসলামপন্থী বলে? আমরা কি যে কাউকেই ইসলামপন্থী বলতে পারি? যিনি মাজারে গিয়ে ৫ টাকা দান করেন তিনিও বলেন যে, আমি ইসলামের জন্য দিয়েছি। তাহলে তাকে কি ইসলামপন্থী বলা যাবে? প্রকৃত ইসলামপন্থী কে আসলে? কিইবা প্রকৃত ইসলামপন্থা?
যে ব্যবস্থা মুসলমানদের, আইন-আদালত, দর্শন-ধ্যান ধারণা, ধর্ম ও নৈতিকতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, সভ্যতা ও সমাজব্যবস্থা, যুদ্ধ ও সন্ধি, চরিত্র ও আচরণ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক নীতি সহ মানবজীবনের গোটা ব্যবস্থাকে আল্লাহর দাসত্ব ও নবীর হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সেই ব্যবস্থাকেই বলে ইসলামপন্থা।
আর যিনি এই ব্যবস্থাকে মনে প্রাণে ধারণ করেন তিনিই একমাত্র ইসলামপন্থী। সুতরাং বুঝা গেল, ইসলামপন্থা একটা বড় জায়গা ও ইসলামপন্থী একজন মহৎ মানুষ।
সুতরাং যে কাউকে ইসলামপন্থী বলা থেকে দূরে থাকুন।
মরুসিংহ উপন্যাস পিডিএফ
:হা বাবা তোকে ওমর মুখতারের মত দেখাচ্ছে। তুই এ যুগের ওমর মুখতার….
এই উপন্যাসটি আমার জীবনের প্রথম পড়া উপন্যাস। ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় উপন্যাসটি পড়েছিলাম। “মরুসিংহ” উপন্যাসটি শেষ অংশটুকু পড়ার সময় অনেক কেঁদেছিলাম । উপন্যাসটি মূল থিমটি ভুলে লাগিয়েছিলাম কিন্তু শেষ অংশটুকু আমি কখনো ভুলতেপারিনি। অনেকদিন পর উপন্যাসটি খুঁজে পেয়েছি এবং পিডিএফ করেছি। আপনারা চাইলে পড়তে পারেন।
মহান সেনুসি আন্দোলন
পবিত্র নগরীর উত্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আবু কুবাইস পাহাড়-বহু প্রাচীন উপকথাও ইতিকথার কেন্দ্র। এছাড়া , যেখানে ছিল মুকুটের মত দুটি নিচু মীনার সম্বলিত একটি ছোট্ট চুনকাম করা মসজিদ, সেখান থেকি নীচের দিকে তাকালে একটি চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে মক্কা উপত্যকার, যার ঠিক তলদেশেই রয়েছে বর্গাকার কা’বার মসজিদ এবং বার্ণাঢ্য, ইতস্তত ছড়ানো রংগশালার মতো ঘরবাড়ি, যা সকল দিকে পাহাড়ের নগন্ন শিলাময় ঢালু বেয়ে যেনো উঠে আসছে উপরের দিকে। আবু কুরাইস পাহাড়ের চূড়ার নীচেই রয়েছে এক সারি পাতুরে দালান, যা সংকীর্ণ সমতল খাঁজ থেকে ঝুলছে এক গুচ্ছ ঈগলে নীড়ের মতোঃ সেনুসি ভ্রাতৃ-সংঘের মক্কী কেন্দ্র ।
তিনি এমন একটি ভাবাদর্শ , এমন একটি মিশনের উত্তরধিকারী যা কার্যে পরিণত হলে হয়তো বা আধুনিক ইসলামে একটি পুনরুজ্জীবন ঘটতো । বয়সের এবং অসুস্থতা সত্ত্বেও এবং তাঁর জীবননের উদ্দেশ্য বানচাল হলেও উত্তর আফ্রিকার এই মহান বীর তাঁর উজ্বল দীপ্তি হারান নি। তিনি জানতেন, ইসলামের সত্যিকার মর্মানুযায়ী ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের আকাংখা-যা সেনুসি আন্দোলনের লক্ষ্য মুসলিম জাতিগুলির হৃদয় থেকে কখনো তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
সৈয়দ আহমদের দাদা ছিলেন মাহন আলজিরীয় পণ্ডিত মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সেনুসি,(উপনামটি বানু সেনুস গোত্র থেকে গৃহীত, যে গোত্রে জন্ম হয়েছিলো তাঁর) যিনি এই শতকের প্রথমার্ধে স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি ইসলামী ভ্রাতৃসমাজের যা একদিন সত্যিকার এক ইসলামী কমনওয়েলথ(স্বাধীন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী আন্তর্জাতিক সংগঠন) প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দেবে। বহু বছর বহু আরব দেশে ঘুরে বেড়ানো ও পড়াশোনার পর মুহাম্মদ ইবনে আলী সেনুসি তরীকার প্রথম ‘জাভিয়া’ বা মোকাম স্থাপন করেন মক্কায় আবু কুবাইস পাহাড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হেজাজের বেদুঈনদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক অনুসারী পেয়ে যান । অবশ্য তিনি মক্কায় বসে থাকলেন না, তিনি ফিরে গেলেন উত্তর আফ্রিকায়, শেষ পর্যন্ত সাইরেনিকা ও মিসরের মধ্যবর্তী মরুভূমিতে অবস্থিত যাগবু নামক এক মরূদ্যানে, স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। ওখান থেকেই তাঁর বাণী বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো সারা লিবিয়াতে এবং লিবিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে । তিনি যখন ১৮৫৯ সালে ইন্তেকাল করেন, তখন সেনুসিদের (এই তরীকার সকল লোকই এই নামে পরিচিতি হয়ে ওঠে) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এক বিশাল রাষ্ট্র-ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে শুরু করে বিষুব অঞ্চলের আফ্রিকার গভীরে এবং আলজিরীয় সাহারার তুয়ারেগ নামক অঞ্চল অবধি।
অবশ্য রাষ্ট শব্দটি দ্বারা এই অনুপম সৃষ্টির নিখুঁত বর্ণনা হয় না, কারণ মহান সেনুসি কখনো তাঁর নিজের জন্য কিংবা তাঁর বংশধরদের জন্য একটি ব্যক্তিগত শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাননি; তাঁর লক্ষ্য ছিলো ইসলামের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি সাংগঠনিক বুনিয়াদ তৈরি করা। তুর্কীর সুলতানকেই তিনি ইসলামের খলীফা বলে মেনে নিতে থাকেন। তিনি তাঁর সমস্ত প্রয়াস নিয়োজিত করলেন বেদুঈনদের ইসলামের মূল শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে, যা থেকে ওরা দূরে সরে গিয়েছিলো অতীতে, এবং তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সেই উপলব্ধি আনতে যা ছিলো কুরআনের লক্ষ্য, কিন্তু বহু তকের গোত্রীয় দ্বন্ধ সংঘর্ষের ফলে লোপ পেয়েছিলো বহুলাংশে।
উত্তর আফ্রিকার সর্বত্র যে বিপুল সংখ্য জাভিয়া গড়ে উঠলো সেনুসিরা সেগুলি থেকে তাদের বাণী বহন করে নিয়ে গেলো বৃহত্তম অঞ্চলের গোত্রগুলির কাছে এবং কয়েক যুগের মধ্যেই প্রায় এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনে দিলো আরব ও বারবার, উভয়ের মধ্যে। ধীরে ধীরে অতীতের আন্তগোত্রীয় অরাজকতার অবসান ঘটলো এবং মরুভূমির এককালের উচ্ছৃংখল যোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়ে উঠলো পারস্পরিক সহায্যের আন্তরিকতায়, এতোকাল তাদের নিকট যা অপরিচিত। জাভিয়াগুলিতে তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা পেলো-কেবল ইসলামী শিক্ষা নয়, বহু ব্যবহারিক শিল্প এবং হাতের কাজেও , যা আগে নিন্দার চোখে দেখতো যুদ্ধবাজ যাযাবরেরা। শত শত বছর ধরে যেসব এলাকা ছিলো বন্ধ্যা সেসব অঞ্চলে আরো বেশি এবং আরো উন্নত ধরনের কুয়া খনন করতে ওদের উৎসাহিত করা হলো, আর সেনুসি পরিচালনায় ধূসর মরুভূমির বুকে সমৃদ্ধশালী বসতি গড়ে উঠতে লাগলো, দূরে দূরে, একেকটি বিন্দুর মতো। তেজারতিকে উৎসাহ দেওয়া হলো এবং সেনুসি ব্যবস্থার ফলে যে শান্তি-শৃংখলা এলো তার ফলে সে-সব অঞ্চলেও সফর সম্ভব হলো যেখানে অতীতে কোনো কাফেলার পক্ষেই আগানো ছিলো অসম্ভব লুণ্ঠিত না হয়ে।
সংক্ষেপে, এই তরীকার প্রভাব সভ্যতা এবং প্রগতির জন্য এক প্রচণ্ড প্রেরণা হয়ে দাঁড়ালো; অন্যদিকে, ওদের অনঢ় ধর্মনিষ্ঠা, পৃথিবীর এ অংশের লোকদের অতীতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে এই নতুন সমাজের নৈতিক মানকে তা থেকে উন্নীত করলো অনেক উপরে। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ, গোত্র এবং গোত্রের সর্দারেরা স্বেচ্ছায় মেনে নিলো মহান সেনুসির রূহানী নেতৃত্ব; এমনকি, লিবিয়ার উপকূলভাগের শহরগুলির তুর্কী কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত দেখতে পেলো, এ তরীকার নৈতিক নেতৃত্বের ফলে তাদের পক্ষে এককালের ‘দুর্ধর্ষ ’বেদুঈন গোত্রগুলির সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অনেক বেশি সহজ হয়েছে। আল্লামা আবুল আসাদের মতে "রাসূলের সময় থেকে মুসলিম বিশ্বের কোথাও এমন ব্যাপক আকারের কোনো আন্দোলন আর দেখা যায়নি, যা এই সেনুসি আন্দোলনের মতো ইসলামী জীবন পদ্ধতির এতোটা নিকট, এতোটা কাছাকাছি পৌছেছিলো!"
এই শান্তিপূর্ণ যুগ উনিশ শতকের শেষ কোয়ার্টারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো যখন ফ্রান্স দক্ষিণদিকে আগাতে শুরু করলো আলজিরিয়া থেকে বিষুব আফ্রিকার দিকে, আর ধাপে ধাপে দখল করতে লাগলো সেসব অঞ্চল , যা আগে স্বাধীন ছিলো এ তরীকার নেতৃত্বে। ওদের এই আযাদী রক্ষা করতে গিয়ে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার পুত্র এবং উত্তরাধিকারী মুহাম্মদ আল মাহাদী তরবারী ধারণ করতে বাধ্য হন- তাঁর পক্ষে সে তরবারী আর কখনো সংবরণ করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ সংগ্রাম ছিলো সত্যিকার ইসলামী ‘জিহাদ’, আত্মরক্ষার জন্য এক যুদ্ধ । রঞ্জিত ঝাণ্ডা বহন করে নিয়ে গেছে গভীর হতে আরো গভীরে-মুসলিম দেশগুলির ভেতরে।
মুহাম্মদ আল মাহদী যখন ইন্তেকাল করলেন ১৯০২ সালে, তখন তাঁর ভাতিজা সৈয়দ আহমদ তাঁর স্থলে এই তরীকার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। উনিশ বছর বয়স থেকে , তাঁর চাচার জীবৎকালে এবং পরে যখন তিনি নিজেই হলেন মহান সেনুসি, একটানা যুদ্ধ করে চললেন, ফরাসী অনুপ্রবেশে বিরুদ্ধে। ইতালীয়ানরা যখন ১৯১১ সানে ত্রিপলীতানিয়া এবং সাইরেনিকা অবরোধ করে তখন তাঁকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয় দুই ফ্রন্টে। এই নতুন এবং অধিকতরো চাপ তাঁকে তাঁর প্রধান মনোযোগ উত্তর দিকে ফেরাতে বাধ্য করলো। তুর্কীদের সংগে পাশাপাশি এবং পরে তুর্কী কর্তৃক লিবিয়া পরিত্যক্ত হলে একাই সৈয়দ আহমদ এবং তাঁর সেনুসি মুজাহিদীন –এই নামেই এই যোদ্ধরা অভিহিত কতো নিজেদেরকে-সাফল্যের সংগে যুদ্ধ পরিচালনা করেন হানাদারদের বিরুদ্ধে-ইতালীয়রা, তাদের উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র আর বিপুলতরো সংখ্যা সত্ত্বেও মাত্র উপকূলের কয়েকটি শহরেই কোনো রকমে তাদের পা রাখতে সক্ষম হলো!
ব্রিটিশ শক্তি তখন মজবু হয়ে আসন গেড়েছে মিসরে! উত্তর আফ্রিকার অভ্যন্তরভাগে ইতালীয়দের ক্ষমতা বিস্তার করতে দেখে ওরা পষ্টতই তেমনটি উদ্বিগ্ন ছিলো না। এ সব কারনে, সে সময় ব্রিটিশ শক্তি সেনুসিদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিলো না। এই নিরপেক্ষ মনোভাব সেনুসি তরীকার জন্য ছিলো পরম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘মুজাহিদীনে’র সমস্ত রসদ আসতো মিসর থেকে, যেখানে প্রায় গোটা জনগোষ্ঠীয় ছিলো তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এটা খুবই সম্ভাব্য মনে হয় যে, ব্রিটেনের এই নিরপেক্ষতার ফলে শেষ পর্যন্ত সেনুসিরা সাইরেনিকা থেকে ইতালীয়দের সম্পূর্ণভাবে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হতো। কিন্তু ১৯১৫ সনে তুরস্ক মহাযুদ্ধে জার্মানীর পক্ষে অংশ গ্রহণ করে এবং ইসলামের খলীফা হিসাবে উসমানী সুলতান মহান সেনুসিকে আহবান জানালেন মিসরের ব্রিটিশ শক্তির উপর আক্রমণ চালিয়ে তুর্কীদের সাহয্যে করতে।
যেহেতু ব্রিটশ সরকার মিসরে তাদের অধিকারে পশ্চাৎভাগের নিরাপত্তার জন্য অন্য সকল সময়ের চাইতে স্বভাবতই অধিকতর ব্যগ্র ছিলো সে কারণে তারা সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার জন্য অনুরোধ করে। এই নিরপেক্ষতার বিনিময়ে ওরা প্রস্তুত ছিলো লিবিয়ার সেনুসি তরীকাকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে- এমনকি, পশ্চিমাঞ্চলে মরুভূমির কিছু সংখ্যক মিসরীয় ওযেসিসও সেনুসিদের হাতে ছেড়ে দিতে ওরা তৈরি ছিলো।
সৈয়দ আহমদ যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, তাহলে কাণ্ডজ্ঞান যার নির্দেশ দেয় দ্ব্যর্থহীনভাবে, তিনি কেবল তারই অনুসরণ করতেন। তুরস্কের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো আনুগত্য ছিলো না; কারণ এই তুরস্কই কয়েক বছর আগে লিবিয়াকে লিখে দিয়ে দিয়েছিলো ইতালীর হাতে, যার জন্য একা সানুসিকেই দাঁড়াতে হলো ইতালীর বিরুদ্ধে লড়বার জন্য। ব্রিটিশ শক্তি সানুসির বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কোনো কাজই করেনি, বরং তাদের সুযোগ দিয়েছিলো মিসর থেকে রসদ পাবার, আর মিসরই ছিলো তাদের রসদ পাওয়অর একমাত্র উপায়। প্রভাবশালী সেনুসিরা সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের দুর্বল খলীফাকে রক্ষা করার অত্যুচ্চ অথচ অবাস্তব আকাংখাই প্রবল হয়ে দাঁড়ালো যুক্তির নির্দেশের উপর এবং তাঁকে একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে করলো প্ররোচিত। তিনি নিজেকে তুর্কীর পক্ষে বলে ঘোষণা করেন এবং পশ্চিমের মরুভূমিতে ব্রিটিশ শক্তিকে আক্রমণ করে বসেন।
বিবেকের এই দ্বন্দ এবং ঘটনাক্রমে তার পরিণতি সৈয়দ আহমদের বেলায় অধিকতরো করুণ হয়ে উঠলো-কারণ তাঁর ক্ষেত্রে, এ কেবল ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের প্রশ্ন ছিলো না, বরং এতে করে সম্ভবত অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হলো তাঁর সমগ্র জীবনের এবং তাঁর আগের দুই পুরুষের, সকল সেনুসির জীবনের মহৎ লক্ষ্যটিরই। এ কাজের পেছনে যে উদ্দেশ্য ছিলো, তা ছিলো চূড়ান্তভাবেই স্বার্থলেশশূন্য-মুসলিম জাহানের সংহতি রক্ষাকরার বাসনাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে তিনি কুরবানী দিয়েছিলেন সেনুসি তরীকার গোটা ভবিষ্যৎকেই-সে সময়ে তা পুরাপুরি উপলব্ধি না করে।
তিনি বাধ্য হলেন তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধে চালিয়ে যেতে। উত্তরে ইতালয়দের বিরুদ্ধে, দক্ষিণ-পশ্চিমে ফরসীদরে বিরুদ্ধে এবং পূর্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। শুরুর দিকে তিনি কিছু কিছু সাফল্য অর্জন করেন। সুয়েজ খাল অভিমুখে জার্মান-তুর্কীর অগ্রাভিযানে কোণঠাসা হয়ে ব্রিটিশ শক্তি পশ্চিমের মরুভূমির ওয়েসিসগুলি থেকে সরে পড়লে সৈয়দ আহমদ সংগে সংগেই সেগুলি দখল করে নেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই যুদ্ধের গতি বদলে গেলো আকস্মিকভাবেঃ জার্মান-তুর্কী বাহিনীর ক্ষিপ্র অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান রূপ নিলো পশ্চাদ-অপসরণে। কিছু পরেই পশ্চিমের মরুভুমিতে ব্রিটিশ পাল্টা আক্রমণ করে সেনুসি ফৌজকে, সীমান্ত অঞ্চলের মরূদ্যান এবং কূপগুলি দখল করে নেই, আর এমনিভাবে মুজাহিদীনে’র রসদ পবার একমাত্র পথটিকে দেয় কেটে। সাইারেনিকার অভ্যন্তরভাগ একা সক্ষম ছিলো না জীবন-মরণ যুদ্ধে লিপ্ত জনগোষ্ঠীকে রসদ যুগিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে, আর যে স্বল্প কটি জার্মান ও অস্ট্রীয় সাবমেরিন অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ এনে পৌছালো, তারাও নামমাত্র সাহায্যের বেশি কিছু নিয়ে এলো না।
১৯১৭ সনে সৈয়দ আহমদ তাঁর তুর্কী উপদেষ্টাদের পরামর্শে সাবমেরিন করে ইস্তাম্বুল যান অধিকতরো কার্যকরী সাহায্য-সমর্থনের ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু রওনা করার আগেই সইরেনিকায় তিনি তরীকার নেতৃত্ব দিয়ে যান তাঁর চাচাতো ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ আল ইদরিসকে। [১৯৫২ সাল থেকে লিবিয়ার বাদশাহ] প্রকৃতির দিক দিয়ে সৈয়দ আহমদের চেয়ে অধিকতরো আপোসকামী ইদরিস কাল বিলম্ব না করেই ব্রিটিশ এবং ইতালীয়দের সাথে সন্ধি করার প্রয়াস পান। ব্রিটিশেরা তো শুরু থেকেই সেনুসিদের সংগে এই সংঘর্ষ না-পছন্দ করেছে। কাজেই ওরা দ্বিধা না করে সন্ধি করতে ইতালী সরকার সৈয়দ ইদরিসকে ‘সেনুসিদের আমীর’ বলে সরকারীভাবে স্বীকৃতি দান করে। ইদরিস ১৯২২ সন পর্যন্ত সাইরেনিকার অভ্যন্তরভাগে এক টলটলায়মান আধা-স্বাধীনতা বজায় রাকতে সক্ষম হন। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো, ইতালীয়রা আসলে তাদের চুক্তি মেনে চলতে চায়নি, বরং গোটা দেশটিকেই ওদের শাসনের আওতায় আনার জন্য বদ্ধপরিকর, তখন সৈয়দ ইদরিস তার প্রতিবাদে ১৯২৩ ইংরেজির শুরুর দিকে মিসর ত্যাগ করেন এবং উমর আল মুখতার (রহ) হাতে সেনুসিদের নেতৃত্ব তুলে দেন। সাইরেনিকায় যুদ্ধ আবার শুরু হয়ে যায়।
এদিকে তুরস্কে সৈয়দ আহমদ হতাশার পর হতাশার সম্মুখীন হতে লাগলেন । তাঁর ইচ্ছা ছিলো, তাঁর উদ্দেশ্য হাসিলের সাথে সাথে তিনি সাইরেনিকায় ফিরে আসবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য কখনো হাসিল হলো না, কারণ তিনি যেই ইস্তাম্বুল ঢুকলেন, অমনি বিচিত্র-সব ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেলো, যার ফলে তিনি তাঁর প্রত্যাবর্তন স্থগিত রাখতে বাধ্য হলেন হপ্তার পর হপ্তা, মাসের পর মাস । তাঁর কাছে এ প্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠলোঃ সুলতানকে যারা ঘিরে আছে তারা সত্যি চায় না যে, সেনুসিরা সফল হোক, বিজয়ী হোক । তুর্কীদের এ আশংকা বরাবরকার-পাছে নবজাগ্রত আরবেরা মুসলিম জাহানে আবার তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে! সেনুসিদের বিজয়ে অনিবার্যভাবেই ঘোষিত হবে এ জাতীয় আর পুনর্জাগরণের কথা এবং মহান সেনুসিকে-তুরস্কেও যাঁর খ্যাতি অনেকটা রূপকথার মতোই-করে তুলবে খিলাফতের সন্দেহাতীত উত্তরাধিকারী । তাঁর নিজের যে এ ধরনের কেনো উচ্চাকংখাই নেই তাতেও তুরস্কের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারীদের-সন্দেহ দূর হলো না- এবং যদিও তাঁর মর্যাদার উপযোগী পরম সম্মান এবং সকল সম্মানই তাঁকে দেওয়া হলো তবু বিনয়ের সংগে অথচ কার্যকরীভাবেই তুরস্কে আটক করা হরো সৈয়দ আহমদকে। ১৯১৮ সনে উসমানী খিলাফত ভেঙে পড়লে এবং তারপর মিত্র শক্তি ইস্তাম্বুল দখল করে নিলে তাঁর অলীক আসার মৃত্যু –ঘন্টা বেজে উঠলো এবং যুগপৎ তাঁর জন্য সাইরেনিকার সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেলো।
কিন্তু মুসলিম সংহতির জন্য উদ্দাম প্রেরণা সৈয়দ আহমদকে নিস্ক্রিয় থাকতে দিলো না। মিত্র শক্তি যখন ইস্তাম্বুল অবতরণ করছে তখন তিনি সীমান্ত পার হয়ে গিয়ে পৌছুলেন এশিয়া মাইনরে কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য । সেনুসি ভুল করলেন, তুর্কী জনগোষ্ঠীর নেতার মতলব সম্পর্কে। কারণ তাঁর আসল মতলব এবং তাঁর জাতির মধ্যে যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দুয়ের মধ্যে তফাত বিপুল।
আতাতুর্কের ইসলাম-বিরোধী বিভিন্ন সংস্কারে চরম হতাশ হয়ে সৈয়দ আহমদ তুরস্কে সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা থেকে সরে দাঁড়ালেন এবং অবশেষে ১৯২৩ সনে চলে গেলেন দামেশকে-সেখানে আতাতুর্কের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ পলিসির বিরোধী হলেও –তিনি আবার মুসলিম সংহতির লক্ষ্যে তুরস্কের সংগে মিলিত হবার জন্য সিরীয়দের বোঝাবার চেষ্টা করেন। স্বভাবতই ফরাসী ম্যান্ডেটরী সরকার তাঁকে চরম অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করেন। ১৯২৪ সনের দিকে তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা যখন জানতে পারলেন তাঁর গ্রেফতারী আসন্ন, তখন তিনি একটি মোটর গাড়িতে করে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে পৌছুলেন গিয়ে নযদ সীমান্তে আর সেখান থেকে রওয়ানা হলেন মক্কা, যেখানে আন্তরিকতার সংগে তাঁকে গ্রহণ করলেন বাদশা ইবনে সউদ।
আর এদিকে সাইরেনিকার সেই সিংহপুরুষ যাঁর সত্তর বছরে অধিক বয়স শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর দেশের আযাদীর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সুদীর্ঘ দশটি বছর তিনি ছিলেন তাঁর জাতির প্রতিরোধ শক্তির প্রাণ, তার রূহ যে-সব বাধা-বিঘ্ন জয়ের আশা নেই সে-সবের বিরুদ্ধে, তাঁর ফৌজের চাইতে দশ গুণ বেশি ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে .. . যে ইতালীয় ফৌজ আধুনিকতম অস্ত্রশস্ত্রে সাঁজোয়া গাড়ি, উড়োজাহাজ এবং কামানে সজ্জিত-যখন উমর এবং তাঁর অর্ধ-উপবাসী মুজাহিদীনে’র কিছুই ছিলো না রাইফেল এবং কয়েকটি ঘোড়া ছাড়া, যা নিয়ে তাঁকে এমন এক দেশে লড়তে হয়েছে একটি বেপরোয়া গেরিলা যুদ্ধ যে দেশ পরিণত হয়েছিলো একটি বিশাল বন্দী শিবিরে.. .।
সিদি উমর এবং তাঁর বিশ পঁশিচ জন সংগী ছিলেন ইতালী অধিকৃত এলাকার অনেক ভেতরে, যখন তাঁরা স্থির করেন তাঁরা রসূলের সহাবা সিদি রফির মাযারে গিয়ে য়িয়ারত করবেন। মাযারটি ছিলো কাছেই। কোনো না কোনোভঅবে ইতালীয়রা তাঁর উপস্থিতির কথা জানতে পায় এবং বহু লোক দিয়ে উপত্যকার দু’দিকই বন্ধ করে দেয়। পালিয়ে বাঁচার আর কোনো পথ ছিলো না । তিনি যখন হন এবং জীবিত অবস্থায় বন্দী হন । জেনারেল গ্রাৎসিয়ানির সম্মুখে। সে তাঁকে জিজ্ঞাস করেঃ তুমি কী বলবে যদি ইতালী সরকার তার মহৎ করুণ বশে তোমাকে বেঁচে থাকবার অনুমতি দেয়? ‘তুমি কি ওয়াদা করতে রাজী আছো তুমি তোমার জীবনের বাকি বছরগুলো শান্তিপূর্ণভাবে কাটাবে?’ কিন্তু সিদি উমর জবাব দিলেনঃ ‘তোমার লোকসকল আর তোমার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে ক্ষান্ত দেবো না যতক্ষণ না তোমরা দেশ ত্যাগ করছো অথবা আমি আমি আমার জীবন থেকে বিদায় নিয়েছি। মানুষের অন্তরে যা আছে, যিনি তা জানেন, তাঁর নামে কসম করে আমি তোমাকে বলছি, যদি এই মুহূর্তে আমার হাত দুটি বাঁধা না থাকতো, আমি আমার খালি হাত নিয়ে তোমার সংগে লড়তাম যদিও আমি বৃদ্ধ এবং বিধ্বস্ত । তারপরই তাঁকে ইতালীয়রা ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে. .
মক্কার পথ বইয়ের লেখক আবুল আসাদের সঙ্গে সাইয়িদ আহমদ কথোপকথনে ,সাইয়িদ আহমদ বলেন,-হ্যাঁ, আমিও তা জানতাম,.. . আমিও তা বুঝতে পেরেছিলাম খুব দেরীতে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, সতেরো বছর আগে ইস্তাম্বুল থেকে যে আহবান এসেছিলো, তাতে সাড়া দেয়া আমার ভুল হয়েছে.. .‘কিন্তু’, সাইয়িদ আহমদ আবার বলেন, ইসলামের খলীফা যখন আমার কাছে মদদ চাইলেন, তখন অন্য সিদ্ধান্তই আমার পক্ষে কি ক’রে সম্ভব ছিলো? আমি কি ঠিক করেছিলাম, না নির্বোধের মত কাজ করেছি? আল্লাহ ছাড়া আর কে-ই বা বলতে পারে ।
[মক্কার পথ বই থেকে...]
বিষাদ সিন্ধু ,কারবালা ও তাত্বিক পর্যালোচনা-আব্দুল ওয়াহাব
আব্বা প্রায় গল্পটি বলতেন, আজ থেকে প্রায় ৪০-৫০ বছর আগের কথা, ছোটবেলায় আমার আব্বা তার দূর সম্পর্কের এক দাদার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন৷ সময়টা ছিল দশই মহররম৷ সেই বুড়ো ছিলেন গ্রামের মাদবার ৷ বাবা গিয়ে দেখেন যে বাড়িতে মহররমের মিলাদ এর জন্য বিশাল আয়োজন চলছে ৷ সে সময় গ্রামের দুই তিন বাড়িতে গ্রামের বেশ কিছু লোক সারারাত ভর বিষাদ সিন্ধু পাঠ করত ৷
