দ্বীনের (دين) কাজ কাকে বলে? কোন কাজ الدِّیْنَ 'আদ-দ্বীন' এর কাজ?
আকিদার আলাপ উঠেছে। এগুলো আজীবন ই চলবে। এই আলোচনা গুলো এক সময় সীমাবদ্ধ ছিল মুসলমান দার্শনিকদের মধ্যে দর্শনগত আলাপে। যেমন আশয়ারী, মাতুরিদি ও আছারী এই তিনটা শাখাই মূলত তাদের ব্যক্তিগত দর্শন, চিন্তা ও গ্রীকদের পালটা ন্যারেটিভ ডিবেট ছিল।
কিন্তু এখন নৈরাশ্যবাদী, বৈরাগ্যবাদী ও মিশ্র জাহালিয়াত লালনকারী আলেম ওলামা একে করে ফেলেছেন আকিদার অংশ। তাও 'আকিদা' বললে সমস্যা ছিলনা কিন্তু তারা 'আকিদা' নামক এই নবশব্দকে বানিয়ে নিয়েছেন 'দ্বীনের মৌলিক' শব্দ। সমস্যা এখানেই। সবক্ষেত্রেই 'দ্বীন' শব্দ ব্যবহারেই আমার নোকতা।
যেকেউ ধুম করে যেকোনো ব্যক্তি, বা কাজকে দ্বীনি ব্যক্তি, দ্বীনি ভাই,দ্বীনের দায়ী কিংবা দ্বীনের কাজ বলতে পারেননা। ওয়াজ করলেই, ইসলামী বই করলেই, লিখলেই কেউ দ্বীনি ভাই বা দ্বীনের দায়ী হয়ে যেতে পারেন না। কারণ দ্বীন শব্দটা আসলে ব্যপক।
আপনারা যেকোনো জ্ঞানী আলেম, তাহকীক জানেন, উসুল জানেন, মুফাসসির, মাদ্রাসার মুহতামিম কিংবা কোনো ইসলামী চিন্তাবিদকেও 'দ্বীনের দায়ী' বলতে পারেননা। এর কারণ সুক্ষ্মভাবে চিন্তা করা লাগবে।
আরো স্পষ্ট করে যদি বলি যেমন, মাদ্রাসা পাশ কোনো এক হুজুর যখন কোনো এক শায়খকে 'দ্বীনের দায়ী' বলেন। অথবা সালাফী আলেম যখন এ দেশীয় কওমী আলেম কাউকে 'দ্বীনের দায়ী' বলেন। তখনই আমার সমস্যা হয়। কারণ এরা উভয়ই 'দ্বীন' শব্দের ভূল অর্থ ব্যাখ্যা করছেন।
কেন এদেশের অনেক আলেম 'দ্বীনের দায়ী' নয় তা কুরআন দিয়ে বিচার করা লাগবে।
আরবীতে دين শব্দটির কয়েকটি অর্থ আছে। যার এক অর্থ হলো-প্রভূত্ব ও প্রাধান্য, শক্তি ও আধিপত্য। দুই. আনুগত্য ও দাসত্ব। তিন. প্রতিফল ও কর্মফল এবং চার. পথ পন্থা ব্যবস্থা ও আইন।
সূরা আলে ইমরানে যেভাবে এসেছে- ইন্নাদ্দিনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম। অর্থ-ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন বা জীবন বিধান।
এখানে যদি আমরা ভালোভাবে খেয়াল করি তাহলে দেখবো যে, আল্লাহ বলেছেন الدِّیْنَ অর্থাৎ একমাত্র দ্বীন। শুধু দ্বীন বলেননি। যদিও শুধু দ্বীন বললেও হয় তবুও আল্লাহ আদ-দ্বীন বলেছেন। আমি যদি আরোও সহজ করে বুঝাই তাহলে ব্যাপারটি দ্বারায় এভাবে।
আরবীতে যখন আমরা বলি, 'বাইতুন' (بيت) তখন এর অর্থ দ্বারায় 'একটি ঘর'। কিন্তু সেই 'বাইতুন' (بيت) কে যদি আমরা 'আল বাইত' (البيت) বলি তাহলে অর্থ দ্বারায় 'ঘরটি'। অর্থাৎ প্রথমটির অর্থ- একটি ঘর আর দ্বিতীয়টির অর্থ- ঘরটি মানে এটিই একমাত্র ঘর।
ঠিক তেমনি আল্লাহ বলেছেন, আদ-দ্বীন(الدِّیْنَ) মানে হলো- একমাত্র পথ। দ্বীন (دين) অর্থ পথ। যেকোনো পথ হতে পারে। আর আদ-দ্বীন অর্থ একমাত্র পথ। এখন কথা হলো ইসলাম আমাদের জন্য 'একমাত্র পথ' কি- না। জ্বী,একমাত্র পথ। আল্লাহ আদ-দ্বীন বলে আর কোনো সুযোগ রাখেননি।
প্রশ্ন হলো, যদি ইসলাম একমাত্র পথ হয়ে থাকে তাহলে তো সেইপথে সবকিছুই বিদ্যমান থাকবে। ইসলামে কি আসলেই সব কিছুর সমাধান আছে? হ্যা, ইসলামে সব কিছুই বিদ্যমান আছে।
যেমন, ইসলামে আনুষ্ঠানিক ইবাদাত ছাড়াও আছে রাজনীতি, আইন, বিচারনীতি, অর্থনীতি,সমাজনীতি,রাষ্ট্রনীতি, জীবনব্যবস্থা, দর্শন-ধ্যাণ,সাহিত্য, সংস্কৃতি, যুদ্ধ ও সন্ধি,আন্তর্জাতিক নীতি সহ সবকিছুই ইসলামে আছে।
সুতরাং 'দ্বীন' শব্দের মধ্যে সবই আছে। কেউ দ্বীনের দায়ী হতে হলে তাকে প্যাকেজ হওয়া লাগবে। তাকে রাজনীতি করতে হবে। তাকে করতে হবে রাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতির রাজনীতি। তাকে একটা রাষ্ট্র ও সমাজে যা যা ফাংশন করা লাগেব সেই সবকিছুতেই ইনভলভ হওয়া লাগবেই। অন্তত তাকে উক্ত প্যাকেজগুলো ফাংশন করতেই হবে।
আর আমরা জানি একটা রাষ্ট্রের মধ্যে মানুষের যা যা প্রয়োজন সবই বিদ্যমান আছে। সুতরাং আধুনিক সময়ের এই রাষ্ট্রের সব উপাদান ই কুরআনে বর্ণিত 'দ্বীন' শব্দের মোটামুটি কাছাকাছি উপাদান। এর বাহিরে রাষ্ট্র ও পৃথিবী যত বড়ই হবে 'দ্বীন' শব্দটি সেই সব শক্তিকেই কাভার করবে।
এবং যিনিই এই প্যাকেজ কাজ গুলো কায়েম করতে চান, যিনি এইসব কাজকে আল্লাহর রেযামন্দীতে নিয়ে আসতে চান। মানবজীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগকে যিনি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের অনুগত করতে চান, রাসূলের সা. এর নবুয়্যতের হেদায়েত দিয়ে সাজাতে চান তিনিই কেবল 'দ্বীনের দায়ী' হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
এছাড়া ওয়াজ করলে,মাদ্রাসায় পড়ালে, শায়খ লকব ধারণ করলে, মাসয়ালা জানলে, তাহকীক জানলে, হাদীস লিখলে, কুরআন অনুবাদ করলেই তাকে দ্বীনের দায়ী বলা যাবেনা। দ্বীনের দায়ী একমাত্র তিনিই যিনি রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে আবাদ করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেন ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতি করেন এবং পৃথিবীতে ইসলামকে একটি ডমিন্যান্ট পবিত্রতাবাদী শক্তি হিসেবে আবিষ্কার করতে চান।
0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন