ইসলামী
ছাত্রসংঘের একদম প্রথম দিককার কয়েকজন সদস্যের মধ্যে খাজা মেহবুব ছিলেন
একজন। ১৯৫০ এর দিকে তিনি মাশরেকি পাকিস্তানে থিতু হন। মাশরেকি পাকিস্তানে
তাঁর নানা মোহাম্মদ আমিন প্রতিষ্ঠা করেন আমিন জুট মিল। ইসলামী ছাত্রসংঘের
[প্রাদেশিক] প্রধান হিসাবে তিনি ১৯৫১ ঈসায়ীতে লাহোরে জামাতে ইসলামীর
বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি ধীরে ধীরে স্থানীয় বাঙ্গালীদের হাতে
সাংগঠনিক দায়িত্বভার হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেন। খাজা মেহবুব এলাহী
যোগ্যতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা অনুসারে মানুষ চিনতেন। এর ফলে মাশরেকি
পাকিস্তানে ছাত্রসংঘ মজবুত ভিত্তি পায়। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রথমে সৈয়দ
মুহাম্মাদ আলী এবং পরে কুরবান আলী ছাত্রসংঘের [প্রাদেশিক] প্রধান হন। তাঁর
দাওয়াতে আব্দুল জব্বার, শাহ আব্দুল হান্নান (পরবর্তীতে সচিব), এবং সৈয়দ
ফয়েজউদ্দিন আহমেদ ছাত্রসংঘে যোগ দেন। ছাত্রসংঘের পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয়
তহবিল ও উপকরণে খাজা মাহবুবের ভূমিকা ছিল প্রথম দিকে।
খাজা
মেহবুব ১৯৫৫-৫৬ ঈসায়ীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতে এমএ ডিগ্রি লাভ
করেন এবং যুক্তরাজ্যে গমন করেন। যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স
থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চার্টার্ড একাউন্টেন্ট কোয়ালিফিকেশন লাভ করেন।
বেকার স্ট্রিটের ইসলামিক কালচারাল সেন্টারে তিনি একটা কুরানিক দার্স চক্র
শুরু করেন। এই চক্রে আরব ইখওয়ানি ছাত্ররা অংশ নিত। তিনি ছাত্রসংঘের
প্রতিভাবান কুরবান আলীকে লন্ডনে নিয়ে আসার এন্তাজাম করেন এবং ইনস অব কোর্টে
আইন শিক্ষার আয়োজন করেন। খাজা মেহবুব কখনো এজন্য কৃতিত্ব দাবী করেন নাই,
তবে ব্যারিস্টার কুরবান আলী সর্বদা এজন্য শুকরিয়া এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন
করেছেন। লন্ডন থেকে কুরবান আলী নিয়মিত "লন্ডন থেকে চিঠি" শীর্ষক কলাম
লিখতেন যা লাহোরের এশিয়া জার্নালে প্রকাশিত হত। বর্তমানে ঐসময়ের হাল হাকিকত
জানার জন্য এই কলাম অন্যতম সূত্র হিসাবে বিবেচিত হয়। ১৯৬২ ঈসায়ীতে ইউকে
ইসলামিক মিশন প্রতিষ্ঠায় কুরবান আলীর ভূমিকা অসামান্য।
লন্ডনে
থাকাকালে ১৯৬০ ঈসায়ীতে খাজা মেহবুব খুবই হৃদয়স্পর্শকারী এক প্রবন্ধ লেখেন
(চিরাগ-এ রাহ, নাজরিয়া পাকিস্তান নাম্বার, ১৯৬১, ১৬-২১) যাতে তিনি
পাকিস্তান তৈরীর উদ্দেশ্য এবং পাকিস্তান তৈরীর পর সৃষ্ট হতাশা নিয়ে আলোকপাত
করেন। তিনি খেয়াল করেন যে লন্ডনে তিনি কিছু পাকিস্তানী দেখেছেন যারা
নিজেদের পাকিস্তানী বলতে লজ্জা পেত। তাঁর এই প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন মানুষকে
উদ্ধৃত করেন। এতে করে তার নেটওয়ার্কের ব্যপ্তি সম্পর্কেও আমরা ধারণা পাই।
ত্রিনিদাদের এক মুসলমানকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেন,
"আমাদের
জন্য পাকিস্তান আন্দোলন ছিল আজাদী আন্দোলনের মত। ১৯৪৬-৪৭ ঈসায়ীতে যখন
হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব চলছিল তখন ত্রিনিদাদেও হিন্দু এবং মুসলমানরা
মারামারি করত। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট আমরা মশাল জ্বালিয়ে আজাদী উদযাপন করেছি
এমনভাবে যেন এটা আমাদের নিজেদের আজাদী। আমরা অপেক্ষা করছিলাম যে এবার একটা
দৃষ্টান্তমূলক ইসলামিক নেশন হবে। এখন থেকে আমরা পাকিস্তান থেকে দ্বীনী
পুস্তক এবং ওস্তাদ পেয়ে ভাল মুসলমান হব। ঐসময় কি আর আমরা বুঝতে পেরেছিলাম
যে এসবই ছিল স্রেফ মরীচীকা?"
একই
প্রবন্ধে খাজা মেহবুব লন্ডনে এক পাকিস্তানী পরিবারের সাথে তাঁর মোলাকাতের
বর্ণনা দেন। তিনি পরিবারের কর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে আওলাদদের
স্বার্থে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন জরুরী। এর উত্তরে খাজা মেহবুবকে শুনতে হয়
যে লন্ডনেই অধিক সততা এবং ভদ্রতা আছে। খাজা মেহবুব এর সত্যতা উপলব্ধি করেন
এবং স্বীকার করেন যে উনি নিজেও ভাবেন যে কেন তিনি মাতৃভূমে (ওয়াতান)
প্রত্যাবর্তন করবেন-
"এই যে আমরা যেটাকে ওয়াতান বলি সেটা আসলে কি? পরিবার এবং ঘর, কাছের ও আপন, বন্ধু এবং সাথী, মুসলমান জীবন।
পরিবার এবং ঘর? এটা তো যেকোন জায়গাতেই দ্রুত ও সহজে বানানো যায়। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলিতে।
কাছের
এবং প্রিয়? মাশরেকি পাকিস্তানের বছরগুলির কারণে এরকম মোলাকাত তো দেখেছি।
মোলাকাত তো বিদেশী জমিনে বসেও হতে পারে। বন্ধু এবং সাথী? এটাও তো
যেকোনখানেই হতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, আমার এখানকার স্বল্পদিনের যাত্রাতেই আমি
অনেক বিশ্বস্ত বন্ধুত্ব তৈরী করেছি। মুসলমান জীবন? এটাও তো যেকোন মুসলমান
দেশেই পাওয়া যায়। আপনি যদি আরব জাতীয়তাবাদের ভয়ে মধ্যপ্রাচে না যান, তাহলেও
কোন সমস্যা নাই। আফ্রিকাতে অনেক দেশ আছে। দক্ষিনপূর্ব এশিয়াতে অনেক দেশ
আছে। খোদার পৃথিবী বিশাল। এই দেশগুলি জেনেরাস এবং আমাদের চেয়ে অনেক বেশি
টাকা দেয়।
না,
এই সমস্ত কারণের মধ্যে এমন একটা কারণও নাই যার কারণে ওয়াতানে প্রত্যাবর্তন
করা যায়। আমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক যার ডিমান্ড সর্বত্র। আমরা যদি
পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করি, এটা অনেক বড় কোরবানি হবে। এই প্রত্যাবর্তন
থেকে সমমানের কোন ম্যাটেরিয়াল বেনিফিট আমরা পাব না। এই কোরবানির বিনিময়
কেবল একটাই হতে পারে। ইসলামের জন্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া জাতিতে ইসলামী হুকমত
কায়েম করা। এক নয়া ব্যবস্থা জারি করা। যেই ব্যবস্থা আমাদের নিপীড়ত জনগনকে
শান্তি ও আরাম দিবে এবং ভাল রাখবে। আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ায় সফলকাম করবে।
এবং আমরা ফখরের সাথে বলতে পারব আমরা পাকিস্তানী..."
খাজা মেহবুব তাঁর ওয়াতানে (মাশরেকি পাকিস্তান) ফিরেছিলেন এবং আমিন জুট মিলের একাউন্টসের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
১৯৬৫
ঈসায়ীতে তিনি খুররম মুরাদ এবং অধ্যাপক খুরশিদ আহমেদের কাছে প্রস্তাব রাখেন
যে মাওলানা আব্দুর রহীমকে মাশরেকি পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমীরের
দায়িত্ব থেকে আজাদ করা হোক যাতে করে তিনি তাফহীমুল কোরানের বাংলা তরজমায়
মনোনিবেশ করতে পারেন। খাজা মেহবুব তরজমার যাবতীয় খরচার দায়িত্ব নেন। এই
খরচের মধ্যে ছিল প্রতি মাসে ৫০০ রুপি স্টাইপেন্ড মাওলানা আব্দুর রহীমকে
দেওয়া। সেই সময়ের বিবেচনায় এটা বিশাল অংক। ১৯৬৬-৬৭ ঈসায়ীতে এই প্রস্তাব
গৃহীত হয় এবং মাওলানা আব্দুর রহীম দ্রুতই এই মহাযজ্ঞ সমাপ্ত করেন খুবই
উচ্চমান বজায় রেখে।
১৯৭১
সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহে আমিন জুট মিল লুট করা হয়। খাজা মেহবুব মাগরেবি
পাকিস্তানে ফিরে যান। এখানে তিনি পারিবারিক শিল্প ও ব্যবসার দায়িত্ব নেন।
এর মধ্যে Neelam Glass অন্যতম।
মাওলানা
মওদূদী যে পাঁচ-ছয়জনকে বিশেষভাবে স্নেহ করতেন তার মধ্যে খাজা মেহবুব একজন।
অন্যরা ছিলেন ইসরার আহমেদ, জাফর ইসহাক আনসারি, খুররম মুরাদ, খুরশিদ আহমেদ,
এবং হুসেইন খান। মাওলানা মওদূদীর হজ্বের সফরসঙ্গী ছিলেন খাজা মেহবুব।
জামাতের প্রকাশনা এবং সংবাদপত্রের অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য দায়িত্ব মেটাতে
সর্বদা তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর বিবি সালমা ইয়াসমিন নাজমি সাহিবি তাঁর
সহায়তায় বুতুল এবং আফত নামক দুইটা নারী ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন। বৈবাহিক
সূত্রে তিনি খুররাম জাহ মুরাদের আত্মীয় ছিলেন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।
[লাহোর
থেকে সেলিম মনসুর খালিদ (সম্পাদক, তরজমানুল কুরআন) এবং লন্ডন থেকে জামিল
শরিফ (মুসলিম কাউন্সিল ব্রিটেন) ইংরেজী থেকে অনুবাদ মোঃ আশরাফ আজীজ ইশরাক
ফাহিম]