প্রোপাগাণ্ডার শিকার এক বাঙালি নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন। শান্ত-শিষ্টতা, নম্রতা আর ধার্মিকতা ছিল যার দুর্বলতা। বাঙালিরে কলিজা কেটে দিয়েও নুন কম হওয়ার পাহাড় সমান অভিযোগ যার বিরুদ্ধে। আজ ১৫ মার্চ। ১৯৪৮ সালের এই দিনে একদল ভাষিক সন্ত্রাসী পূর্ব পাক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শামসুল আলম। আরও ছিলেন এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের গডফাদার কথিত ইসলামপন্থী তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেম। ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী, নঈমুদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ প্রমুখ রাম-বামরা।
কিন্তু এই 'সভায়' খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন একা। তাঁর চিফ সেক্রেটারিকেও সভাকক্ষে উপস্থিত রাখতে পারেননি তিনি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বলা হয়, এদিন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে আট দফা 'চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এর আট দফা দেখেন! রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ অর্থাৎ দুই পক্ষের অপর পক্ষ কী কী করবেন তার কোন হদিস নেই। শুধু প্রধানমন্ত্রী কী করবেন তা-ই বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
আট দফা হলো
এক. পূর্ববঙ্গ পরিষদের চলতি অধিবেশনেই বাংলাকে পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা এবং সর্বস্তরের শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
দুই. বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ কেন্দ্রীয় সরকারে পাঠাতে হবে।
তিন. গ্রেফতাররকৃতদের মুক্তি দিতে হবে এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
চার. পুলিশি নির্যাতনের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
পাঁচ. ভাষা আন্দোলনকারীরা দেশপ্রেমিক, এ কথা সরকারিভাবে ঘোষণা দিতে হবে।
ছয়. গ্রেফতারি পরওয়ানা প্রত্যাহার করতে হবে।
সাত. আন্দোলনকারীরা কমিউনিস্ট কিংবা দেশের শত্রু— প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
আট. ‘আন্দোলনকারীরা বর্ডার অতিক্রম করে এসেছে’ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই বক্তব্যটি ভুল— তা সরকারিভাবে বলতে হবে।
আট নম্বর দফা মূল প্রস্তাবে ছিল না। বাম তোয়াহা জোর করে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের নিজ হাতে এই দফাটা লিখিয়ে নেয়। এই চুক্তিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের বিপক্ষে সই করে শামসুল আলম। ১৯ মার্চ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এলে ২৪ মার্চ এই সন্ত্রাসীরা তাঁর সাথে দেখা করে। তিনি নাজিমুদ্দিনের সাথে তাদের করা চুক্তি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'তাঁকে (পূর্ব-পাক প্রধানমন্ত্রীকে) uder duress সেটা সই করানো হয়েছে। এর একটা প্রমাণ এই যে, আট দফা চুক্তির মধ্যে শুধু নাজিমুদ্দিন কি করবেন তাই লেখা আছে। কিন্তু অন্য পক্ষের কর্তব্য সম্পর্কে কিছু নেই।’
এর পর কমরেড তোয়াহা, অলি আহাদরা কায়েদে আযমের সাথে বেয়াদবি করে। তাঁকে অপসারণের জন্য ব্রিটিশ রাণীর কাছে আবেদন করারও হুমকি দেয়। বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর একটি জমির অধিকার। খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান হলেও বাঙালিকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তিনিই পালন করেছেন। তাঁর বিশেষ উদ্যোগেই ১৯৩৫ সালে ‘বঙ্গীয় ঋণ সালিশি বোর্ড’ বিল এবং ১৯৩৬ সালে ‘বঙ্গীয় পল্লী উন্নয়ন বিল’ পাস হয়। যার সিলসিলায় ১৯৫০ সালে (তিনি তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল) নুরুল আমিন সরকার জমিদার প্রথা উচ্ছেদ করে বাঙালিকে পূর্ব পুরুষের হারানো জমি ফিরিয়ে দেন।
কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর
কায়েদে আযমের একান্ত স্নেহভাজন ছিলেন নাজিমুদ্দিন। বাংলা অঞ্চলে ত্রিশের দশকে মুসলিম লীগকে পুনর্জীবন দেওয়ার কৃতিত্ব তারই।



0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন