১৫. "যতটুকু মনে পড়ে কলকাতার সাধারণ মুসলমানরা আমাদের ভালভাবে নেয়নি৷ তারা আমাদের থেকে নিজেদের একটু দূরে সরিয়ে রাখত। কথা বলতে চাইত না। কফি হাউজে মুসলমান লেখকদের দুএকজনের সাথে দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিত। আমার কাছে বিষয়টা অস্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু পরে যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখেছি তাদের কাছে পাকিস্তান ছিল আশা-ভরসা ও অহংকারের কেন্দ্রভূমি। আমরা সে পাকিস্তান ভেঙে ফেলার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছি এটা তাদের কাছে মনে হয়েছে দুঃস্বপ্ন। আমি আমার 'উপমহাদেশে' বইয়ে এর কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি। একজন সামান্য মুসলমান পানের দোকানদার আমাদের কাছে খুশি মনে এক খিলি পানও বিক্রি করতে চাইত না। যদি বুঝতে পারত আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছি। সোজা বলে দিত আগে যাইয়ে। আমাদের প্রতি এ অবজ্ঞার ভাব লক্ষ্য করে আমি সাধারণত কলকাতার কোন মুসলিম দোকানে কোনো কিছু কিনতে যেতাম না।" — আল মাহমুদ
একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ২
১৬। "পশ্চিম পাশে এসে আমি চমকে উঠলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল মসজিদ। এখন শূন্য। আমি মাঠ দৌড়িয়ে সেই মসজিদে পৌঁছলাম। দেখলাম কিছু লোক দীর্ঘক্ষণ সেজদায় পড়ে রয়েছে। কৌতূহলে এগিয়ে যেতেই জনৈক ব্যক্তি দৌঁড়ে এসে বললো, 'মসজিদ! ইয়ে মসজিদ হ্যায় ভাই রোখ যাও।'
আমি জবাব দিলাম, 'ম্যায় হু মুসলমান, ভাই সাব।'
সে চমকে দাঁড়ালো। তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, 'সাচ্চা মুসলিম হ্যায়? কোন মুলুক সে আয়া?'
আমি বললাম, 'বাংলাদেশ।'
সে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললো, 'ও, মাশরেকী পাকিস্তানী? মিল্লাত কি গাদ্দার! ভাগো ইহাসে। ভাগো।'
আমি অবাক হইনি। লক্ষ্ণৌ, বেনারস, দিল্লী, পাটনা, জম্মু, কাশ্মীর, ধানবাদ, আগ্রা, অমৃতসর- যেখানেই আমি মুসলমানদের সাথে আলাপ করেছি, তারা আমায়
গাদ্দার বলে ভর্ৎসনা করেছে। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিলো হাজার বছরের স্বপ্নের ইমারত; তাদের দিল ছিলো সেই ইমারতের কল্যাণ কামনায় পূর্ণ । বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তাই তারা মনে করে ফ্যান্টাসীর মৃত্যু অথবা আমাদের ঈমানী দুর্বলতা। আমি তাদের যতই বুঝাতে চেষ্টা করি, তারা ততই প্রতিবাদে টগবগ করে ওঠে। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের অপমানকে সহ্য করে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম।" — বুলবুল সরওয়ার, ঝিলাম নদীর দেশে।
১৭। মেহেরপুরের আমবাগান: মিথ থেকে বাস্তবে
মেহেরপুরে
আমবাগান ঘেরা একটা গ্রাম 'আমঝুপি'। অভিশপ্ত বৈদ্যনাথতলা থেকে প্রায় ১৮
কিলোমিটারের দূরত্বে। পলাশী থেকে সোজা দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। বলা হয়,
এই আমঝুপি গ্রাম মোঘল সেনাপতি মানসিংহ ও নবাব আলীবর্দী খানের স্মৃতি
বিজড়িত। তবে
এসবকে ছাপিয়ে একটি তথ্য প্রচলিত আছে যে, পলাশীর যুদ্ধের সর্বশেষ নীলনকশা
এই আমঝুপিতেই চূড়ান্ত হয়। জনশ্রুতি আছে, এখানে অনুষ্ঠিত হয় লর্ড ক্লাইভ এবং
বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও অন্যান্যের সর্বশেষ ষড়যন্ত্র সভা। যার পরিণতি
পলাশীর নাট্যমঞ্চে রূপায়িত হয়। যদিও এর সত্যতা ঐতিহাসিকরা জোরালোভাবে
স্বীকার করতে পারেন না। তাদের প্রবণতা এটিকে উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষেই।
কিন্তু
সেই পলাশী ষড়যন্ত্রের ২১৩ বছর পরে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে বৈদ্যনাথতলা
গ্রামে এই মিথ সত্যে উপনীত হয়। ১৯৬২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলা
গমনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়,
১৯৬৭ সালে বিদ্রোহের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং
একাত্তরের মার্চের শেষ সপ্তাহে পুনরায় বিদ্রোহের যে ষড়যন্ত্র রচিত হয়, তার
প্রত্যেকটিই নাকাম হয় সরকার ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে।
তবে
তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলে উঠে দেশের অভ্যন্তরে থেকেই বাঙালি রেজিমেন্টের
সৈন্যরা বিদ্রোহ করলেও তাদের সহযোগী ও যুদ্ধ পরিস্থিতির স্রষ্টা আওয়ামীলীগ
নেতারা শেখ মুজিবের নির্দেশে নিরাপদে কোলকাতায় আশ্রয় নেন। কোলকাতার
ভবানীপুরের রাজেন্দ্রপ্রসাদ রোডের ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর দপ্তর ও
লর্ড সিনহা রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে প্রবাসী বাংলাদেশী সরকারের দপ্তরে ৮
এপ্রিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পর্ব শেষ হয়। যা ঘোষিত হয়
১০ এপ্রিল। আর ১৭ এপ্রিল তারই প্রকাশ্য অনুষ্ঠান ছিল মেহেরপুরের
বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম বাগান।
ভারতবন্ধুরা
প্রথমে এই শপথ অনুষ্ঠান চুয়াডাঙ্গায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পাকিস্তান
আর্মির কারণে চুয়াডাঙ্গায় এই অনুষ্ঠান সফল হয়নি। হয়েছে আমঝুপির কাছে। ১৮০০—১৮১৫
সালের দিকে এই আমঝুপিতে একটি নীলকুঠি নির্মিত হয়। বাংলার কৃষকদের প্রতি
অত্যাচারের জন্য এই কুঠি কুখ্যাত হয়েছিল। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৭২
সালে অন্যতম ষড়যন্ত্রী তাজ উদ্দীন এই কুঠি পরিদর্শন করেন। 'আমঝুপি' নামের
স্বার্থকতা রক্ষায় কুঠির আশেপাশে রোপন করেন প্রচুর আম গাছ। আসলে ইতিহাসেরও
তো দায় আছে!
১৮। ৬৫’র সাফল্য একাত্তর ত্বরান্বিত করেছে
১৯৬৫
সালের ৫ আগস্ট থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় কাশ্মির যুদ্ধ। সম্ভবত পয়লা পদক্ষেপ
পাকিস্তানই নিছিল, যেমনটা বলা হয় সব মহলেই। আইয়ুব খান কাশ্মির ইস্যুর একটা
স্থায়ী সমাধান চাইছিলেন। হয়তো হঠকারিতাই ছিল সেটা। কিন্তু ভারত এই যুদ্ধটা
কাশ্মির ফ্রন্টে খেলতে রাজি ছিল না। এটারে টেনে নিয়ে আসছিল পাঞ্জাবে। ৬
সেপ্টেম্বর ভারত লাহোর আর শিয়ালকোট আক্রমণ করে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই
আক্রমণ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে। যার দরুণ বেশ কয়েকজন বাঙালি ফৌজি
সিতারায়ে জুররাত ও তমঘায়ে জুররাত হাসিল করে। ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত-পাকিস্তান
উভয়েই যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। পরে তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই
যুদ্ধে দৃশ্যমান কোন পক্ষেরই বিজয় হয়নি। উভয়েরই ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। তবে
সবার দৃষ্টি কাড়ে লাহোর প্রতিরক্ষা। এর আগ পর্যন্ত, ব্রিটিশ আমল থেকেই
বাঙালিরা 'নন মার্শাল রেস' (অযোদ্ধা জাতি) হিসাবে বিবেচিত হতো। কারণ
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না। এবার বাঙালি সিপাহিরাও দেখাতে পারল যে তারাও
যুদ্ধ জানে, এমনকি ভয়ঙ্কর শত্রুরেও ভালোমতোই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতেও পারে।
পরের বছর আবার সাইফুল আজম পাকিস্তানের হয়ে আরেক খেলা খেলছিলেন ইসরাইলে!
যুদ্ধে
ভারতের সাফল্য ছিল কাশ্মীর হাতছাড়া হয়নি, পাকিস্তানের সাফল্য লাহোর
হাতছাড়া হয়নি। পাকিস্তান এমনিতেই মাথা ব্যথা ছিলই, কিন্তু এই যুদ্ধ ভারতকে
ভাবিয়ে তোলে মুসলমান আর ইসলামী আদর্শের বাঙালি ফৌজ নিয়া যা তার শরীরের এক
কর্নারে বিষফোঁড়ার মতো। ভারত ইস্টার্ন ফ্রন্টে মনোযোগী হয়। এইটারে পশ্চিম
পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে গঠন করে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং - র,
১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। যা গঠনের মাত্র দুই বছরের মাথায় এনে দেয় চূড়ান্ত
সফলতা। ইন্দিরা গান্ধীর ভাষায় - “We have taken the revenge of a thousand
years.” অবশ্য র’ গঠনের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল চীন ও পাকিস্তানের উপর
গোয়েন্দাগিরি। ভারত হাজার বছরের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়।
গত
বছর ভারতের সাউদার্ন নেভাল কমান্ডের ফ্ল্যাগ অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ ভাইস
অ্যাডমিরাল অনিল কুমার চাওলা এই যুদ্ধরে স্মরণ করে বলছিলেন, "It was
mentioned that the war did not really start in December (1971).
Actually, if you really go back into the literature and read, the
thinking started actively after the 1965 war, on how to separate East
Pakistan from West Pakistan."
ছয়
দফা প্রস্তাব মানুষের সমর্থন আদায়ে এই যুদ্ধের একটা ভুল ভালো কাজে দিছিলো।
ছয় দফার প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত দফা (৬. পাকিস্তানের দুই অংশের নিজস্ব
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্ব স্ব আয়ত্বাধীন প্যারামিলিশিয়া বাহিনী
গঠনের অধিকার থাকতে হবে) এই যুদ্ধের হঠকারিতা ও ব্যর্থতার দিকে ইশারা করে।
দাবি করা হয় যে সে সময় ইস্টার্ন ফ্রন্টের নিরাপত্তায় তেমন একটা উদ্যোগ
নেওয়া হয় নাই। ভারত চাইলেই পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিতে পারতো ওই সময়ে। আরেকটা
বিষয় হচ্ছে, ৬৫’র যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাফল্য পাক ফৌজে থাকা
বেইমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়ে তুলছিল। যার কারণে ভারত পরিস্থিতি তৈরি করে
দিলে পিছন থেকে তারা ছুরি মারতে সক্ষম হয়।
পরিস্থিতি
তৈরি করে দেয়া এই কারণেই বলছি যে, একাত্তরের যুদ্ধ ভারত পরিকল্পিতভাবেই
বাঁধিয়েছে। যুদ্ধ মূলত শুরু হইছে ৩০ জানুয়ারি। যেদিন কথিত কাশ্মিরি মুজাহিদ
ভারতীয় বিমান হাইজ্যাক করে লাহোর নিয়ে যায়। আর এই বাহানায় ভারত তার আকাশে
পাকিস্তানি বিমান নিষিদ্ধ করে। যা পশ্চিম থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন
করে দেয়। সাবেক র’ কর্মকর্তা আর. কে. যাদব ২০১৫ সালে dailyo তে এই ঘটনার
বিবরণ দিয়া লিখছেন, "On January 30, 1971, an Indian Airlines plane Ganga
was hijacked from Srinagar though a RAW source and taken to Lahore
airport. All 26 passengers were released and the plane was set on fire.
This was an outdated plane which was due to be dumped soon. The Indian
government immediately banned over-flights going from West to East
Pakistan. This action of Kao (র’ প্রধান আর.এন. কাও) hampered the
transportation of men and material from air route although Pakistan
continued it via Colombo but slowed down this process in view of the
international outcry."
১৯। কেউ
কেউ শেখ মুজিবের বকওয়াস প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে মনে করেন 'পাকিস্তানিরা'
আমাদের 'পূর্ব বাংলা'র নাম বদলিয়ে 'পূর্ব পাকিস্তান' রেখেছিল। ১৯৫৭ সাল
থেকেই এ নিয়ে শেখ মুজিব গ্যাঞ্জাম বাঁধানোর কোশেশ করে যাচ্ছিলেন। ওই বছর
করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে এক বক্তৃতায় প্রথমবার এ নিয়ে কথার ফুলঝুরি
ছোটান তিনি। ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ নামটির প্রতিবাদ করে তিনি বলেন,
"পূর্ব-বাংলা নামের একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। আর যদি পূর্ব-পাকিস্তান নাম
রাখতেই হয়, তাহলে বাংলার মানুষের জনমত যাচাই করতে হবে। তারা নামের এই
পরিবর্তন মেনে নিবে কিনা- সেজন্য গণভোট করতে হবে।"
পরে
১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী
উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি ঘোষণা করেন, "আমাদের স্বাধীন দেশটির নাম
হবে বাংলাদেশ।" দিনটির স্মৃতিচারণ করে তিনি 'কারাগারের রোজনামচা'য়
লিখেছেন—
"এক
সময় এই দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ
চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।... একমাত্র বঙ্গোপসাগর
ছাড়া আর কোনও কিছুর নামের সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায়
নাই।... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের
পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব-পাকিস্তান এর পরিবর্তে হবে শুধুমাত্র
বাংলাদেশ।"
অথচ
'পূর্ব পাকিস্তান' নামটি (পশ্চিম) পাকিস্তানিদের আবিষ্কার নয়, বাঙালিরই
আবিষ্কার। এমনকি 'পূর্ব পাকিস্তান' নামটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নয়, আগে
থেকেই নির্ধারিত হয়ে গেছিল। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবে
প্রস্তাবিত দেশটির কোন নাম ছিল না। কিন্তু এর আগে ১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত
আলীর বুকলেটে 'পাক্সতান' নামটি প্রস্তাব করা হয়েছিল। একে আরেকটু পরিমার্জিত
করে 'পাকিস্তান' করা হয়। মূলত, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হলে এ নামটি
আলোচনায় আসে। বিশেষ করে হিন্দু পত্র-পত্রিকায় একে 'পাকিস্তান প্রস্তাব'
হিসাবে উল্লেখ করা হতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৪৩ সালের ২৪ এপ্রিল মুসলিম
লীগের বার্ষিক অধিবেশনে এই নামটি গ্রহণ করেন কায়েদে আযম। উল্লেখ্য,
'পাকিস্তান' দ্বারা পাঞ্জাব, আফগানিয়া, কাশ্মির, সিন্ধু এবং বালোচিস্তান
প্রদেশ প্রস্তাব করা হয়েছিল। চৌধুরী রহমত আলী বাংলার নাম দিয়েছিলেন
'বাঙ্গিস্তান'/'বঙ্গস্তান' অথবা 'বাংলাস্তান'।
কিন্তু
খোদ কায়েদে আযম 'পাকিস্তান' গ্রহণ করার আগে বাঙালিরা 'পাকিস্তান' গ্রহণ
করে বসেছিল। ১৯৪২ সাল থেকেই বাংলায় এ নামটি ব্যবহার হতে থাকে। সে বছর ঢাকায়
'পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ' যাত্রা শুরু করে। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
ছিলেন (পরবর্তীতে ঢাবি উপাচার্য) সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ
আলী আহসান। একই বছর কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ
সোসাইটি'। এর সভাপতি ছিলেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম
শামসুদ্দিন। ১৯৪৪ সালে এই সংগঠনটি প্রথম পরিষদ গঠন করে। এর উদ্বোধনী
অনুষ্ঠানে কে ছিলেন না? প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, শ্রমমন্ত্রী হোসেন
শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হাসান সোহরাওয়ার্দী, নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আকরাম খান,
একে ফজলুল হক, আবুল কাসেম, মৌলভি তমিজউদ্দিন খান, শাহাদাত হোসেন, গোলাম
মোস্তফা, এস ওয়াজিদ আলী, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আবুল হুসেন, গোলাম কুদ্দুস,
সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার। ছিলেন আরও অনেকেই। সৈয়দ সাজ্জাদ
হোসায়েন তখন এই সোসাইটির সাহিত্য শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।
এরপর
নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান কায়েম হয়। কিন্তু 'বঙ্গ'
প্রদেশের এই অর্ধেক অংশের নাম আর 'পূর্ব পাকিস্তান' রাখা হলো না। রাখা হলো
'পূর্ব বঙ্গ'। কারা রাখলেন? নাজিমুদ্দিন-নুরুল আমিনরা। তবে মুসলিম লীগের
নাম হলো 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ'। মুসলিম ছাত্রলীগের নাম হলো 'নিখিল
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত মুজিব
ছাত্রলীগেরও নাম রাখা হলো 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। ১৯৪৯ সালের
২৩ জুন (ঘষেটী-মীর জাফর দিবস) গঠিত হলো আওয়ামীলীগ। তার নামও রাখা হলো
'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'। পরবর্তীতে 'মুসলিম' বাদ দেওয়া হলেও
'পূর্ব পাকিস্তান' বাদ দেওয়া হয়নি কখনও।
মজার
বিষয় হচ্ছে, এই আওয়ামীলীগের নেতৃত্বেই 'পূর্ববঙ্গ' প্রদেশের নামকরণ হয়
'পূর্ব পাকিস্তান'। আর তা হয় ১৯৫৫ সালের ৭ জুলাই পাকিস্তানের পাহাড়ি শহর
মারীতে। সেদিন পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণ-পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। এ
অধিবেশনে পাকিস্তানের সকল প্রদেশের নেতারা সংবিধান সম্পর্কে একটি
সমঝোতা-চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই সমঝোতা চুক্তি মারী চুক্তি নামে পরিচিত।
এই চুক্তি স্বাক্ষরের পিছনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী এবং আওয়ামীলীগীয় গণতন্ত্রের
মানসপুত্র সোহরাওয়ার্দীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। সেদিন পাকিস্তানের দুই অংশকে
একটি ইউনিটে পরিণত করার চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী এক ইউনিটের অধীনে 'পূর্ব
পাকিস্তান' এবং 'পশ্চিম পাকিস্তান' নামে দুইটি প্রদেশ গঠন করা হবে। একইসাথে
সংখ্যাসাম্য নীতিও গ্রহণ করা হয়, যা প্যারিটি নীতি হিসাবে পরিচিত ছিলো।
এছাড়া সায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রভাষা নিয়েও এতে চুক্তি হয়। মারী চুক্তি অনুযায়ী
১৯৫৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের সকল প্রদেশকে এক ইউনিটে পরিণত
করে দ্বিতীয় গণপরিষদে একটি বিল পাশ হয়। আর এ চুক্তির মাধ্যমেই মূলত ‘পূর্ব
বাংলার’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়। ওপারের সকল প্রদেশ
বিলুপ্ত করে একটি মাত্র প্রদেশ গঠিত হয় 'পশ্চিম পাকিস্তান'। এই চুক্তির
আলোকেই পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। এই চুক্তিতে পূর্ব বাংলার
পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এবং
'বঙ্গবন্ধু' শেখ মুজিবুর রহমান।





0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন