দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

আব্দুল্লাহ আযযাম ও তাকফিরি মতবাদের সংঘাত

 

আফগানিস্তানে আব্দুল্লাহ আযযামের সংগঠন "মাকতাব আল খিদমাত" মূলত আরব যোদ্ধাদের হোস্টিং করতো। আরব থেকে যারা আফগানিস্তানে যেতো তারা সবাই এই সংগঠনের গেস্ট হাউজে থাকতো ও মিলিটারি প্রশিক্ষণ নিতো। কিন্তু ওবিএলের চিন্তা ছিলো আরব মুজাহিদিনদের আরো বেশি ফ্রন্টলাইনে ইনভলভড করা। তাই আরো সফিস্টিকেটেড মিলিটারি ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য তিনি জায়গা খোজতে থাকেন।

ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি তিনি ট্রেনিং ক্যাম্পের উপযুক্ত জায়গা পান "জাজি" এলাকায়। যে এলাকা সাইয়্যাফের প্রতি অনুগত আফগান মুজাহিদীনদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। সাইয়্যাফের প্রতি অনুগত মুজাহিদীনদের মধ্যে অনেকে ছিলেন শিয়া। ওবিএল ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য যে জায়গা পছন্দ করেন সেটা ছিলো আব্দুল সামি নামের এক শিয়া কমান্ডারের নিয়ন্ত্রণে। এই শিয়া কমান্ডার ও শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তায় ওবিএল আল কা(য়দার প্রথম মিলিটারি ক্যাম্প তৈরি করেন যা পরবর্তীতে মাসাদা ক্যাম্প হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

আল কা(য়দার প্রথম মিলিটারি ক্যাম্প শিয়া কমান্ডারের আওতাধীন এলাকায়, শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তায় তৈরি করা হয়। যাদের জন্মই হয়েছে শিয়াদের সাথে কলাবোরেশন করে তাদের অনেক সমর্থক ও ইডিওলগ আজকে আমাদেরকে শিয়াবিরোধীতা ও ইরানবিরোধীতা শিখায়।
 

 
হুযাইফা আযযাম আব্দুল্লাহ আযযামের ছেলে। ইউএস ইরাক আক্রমণের পরে তিনি সরাসরি সেখানে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই আল কা(য়দার ইরাকি শাখার প্রধান ও আইএসের গ্রান্ডফাদার আবু মুসআব আল জারকাওয়ী ইরাকে মাস বোম্বিং শুরু করলে তিনি তার প্রচন্ড সমালোচনা করেন। ফলে এর কিছুদিন পর জর্ডানে তার বাসার নিচে একটি সিডি পাওয়া যায়। সেই সিডির কন্ঠ ছিলো আবু মুসআব আল জারকাওয়ীর। তাকফিরবাদীতার সমালোচনা করায় তাকফিরী জারকাওয়ীর সহ্য হয়নি। তিনি হুযাইফা আযযামকে "কাফেরদের সহযোগী" আখ্যা দেন ও তাকে মৃত্যুর হুমকি দেন।
 
এই হচ্ছে আযযামের পরিবারের সাথে তাকফিরীদের আচরণ। অথচ আজকে অনেক তাকফিরী দেখি আযযামের নাম না নিলে একবেলা ভাত হজম হয় না। জাহান্নামের কুকুর ও আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের উত্তরসূরীদের জন্য লানত।
 

ওবিএল ও তাকফিরি জাওয়াহিরির অবস্থান নিয়ে আব্দুল্লাহ আনাসের বক্তব্য। এখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে জাওয়াহিরি আযযামের পিছনে নামায পরতেন না এবং আযযামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতেন। বর্তমা্নে অনেক তাকফিরী ও তাদের সমর্থকরা বলতে চান যে আব্দুল্লাহ আযযাম ও জাওয়াহিরির সংঘাত নাকি সিআইএর বানানো। আবার অনেকেই এখন আব্দুল্লাহ আনাসের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন
 
কথা হচ্ছে আপনি যদি আব্দুল্লাহ আযযামের ব্যক্তিগত সহকারী ও ফ্রন্টলাইনার মুজাহিদ আব্দুল্লাহ আনাসের একাউন্টকেই ধর্তব্য মনে না করেন তাহলে কোথাকার কোন মুনাফেক পেশোওয়ারের কোণায় বসে কি বললো বা কি লিখলো সে কিভাবে ধর্তব্য হতে পারে?
 
 
 
আল কা(য়দার আরেক ইডিওলগ নাসির আল ফাহাদ মনে করেন উসমানীয়রা কাফের। এই নজদি তাকফিরবাদীকে বিভিন্ন সময়ে তাকফিরীরা সাইট করে। এই তাকফিরী সাহওয়া আন্দোলন সম্পর্কেও জঘন্য ধারণা রাখে।
 

একটা আয়রনি হচ্ছে আল কায়েদার প্রথম মিলিটারি কমান্ডার আবু উবায়দা আল বানশিরি শহীদ আহমেদ শাহ মাসউদের আন্ডারে যুদ্ধ করেছিলেন। আবু উবায়দার নামের পরে "আল বানশিরি" মূলত পানশিরে যুদ্ধ করার জন্য বলা হয়। 
 
আবু উবায়দা আল বানশিরির মৃত্যুর পর আল কায়েদার দ্বিতীয় মিলিটারি কমান্ডার হন আবু হাফস আল মিশরি। এই আবু হাফস মিশরিকে নিয়ে মজার একটা ঘটনা আছে। মিশরিও আহমেদ শাহ মাসউদের কমান্ডে যুদ্ধ করার জন্য পেশওয়ার থেকে পানশিরে রওয়ানা দেন। কিন্তু পেশওয়ার থেকে পানশিরের যাওয়ার যে কঠিন ও কষ্টদায়ক পথ- সে পথ পাড়ি দিয়ে পানশির পৌছানোর আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও পুনরায় পেশওয়ারে ফিরে যান। এই হচ্ছে আরেকজন মহান "মুজাহিদ" এর আফগান জিহাদে অংশগ্রহণের ইতিহাস।
 

 
আফগান জিহাদের একবারে শুরুর দিকে আলজেরিয়া থেকে আফগানিস্তানে যান আব্দুল্লাহ আনাস। তিনি আব্দুল্লাহ আযযামের ব্যক্তিগত সহকারী ও মাক্তাব আল খিদমাতের পরিচালক ছিলেন। উনি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয় স্থানেই জিহাদের জন্য কাজ করেছেন। তার মতে, পেশোয়ারে জাওয়াহিরির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো আরব যোদ্ধাদেরকে আব্দুল্লাহ আযযাম থেকে বিরত রাখা। কেননা আব্দুল্লাহ আযযাম যেহেতু ইখওয়ানি ছিলেন তাই এইসব আরব যোদ্ধারাও আযযামের প্রভাবে ইখওয়ানি হয়ে যেতে পারে। 
 
পেশোয়ারে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর উত্তরসূরী মুনাফেক জাওয়াহিরির কর্মকান্ডের বিস্তারিত শুনুন আব্দুল্লাহ আনাসের বয়ানে-
 
আল কা(য়দা এফিলিয়েটেড ইডিওলগ আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসীর মতে, যেহেতু হামাস এবং ফাতাহ উভইয়ই গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাই এমন কোন দলের কোন নেতার পিছনে নামায আদায় করা যাবেনা। যেরকম নামায আদায় করা যেতো না শহীদ আব্দুল্লাহ আযযামের পিছনে। আপনারা আসলে সহজ জিনিস বুঝেন না। এতো করে বুঝানো লাগে কাদের পিছনে নামায আদায় বৈধ হবে আর কাদের পিছনে নামায আদায় করা যাবে না।

আয়মান আল জাওয়াহিরির সবচেয়ে বড় অপরাধ এইটা না যে তিনি আফগান জিহাদে অংশগ্রহণ করেন নাই। পেশোয়ারে বসে ফতোয়াবাজি করেছেন।
.
বরং জাওয়াহিরির সবচেয়ে বড় অপরাধ এইটা যে তিনি আফগান জিহাদ শেষ হওয়ার এক বছরের মাথায় মুসলিম ব্রাদারহুডের সমালোচনা করে "The Bitter Harvest: The Muslim Brothers in Sixty Years" বইটি লিখেন। যেই বইয়ে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে প্রকৃত জিহাদ থেকে দূরে সরে যাওয়ার অভিযোগ তুলেন।
.
আজকের অনেক তথাকথিত জিহাদী ইডিওলগ ইখওয়ান বাশিং করার জন্য এই বইয়ের রেফারেন্স টানেন। বাস্তবতা হলো জাওয়াহিরি নিজেই সোভিয়েত আফগান জিহাদ যার পুরোটাই ইখওয়ানি এন্ডেভার ছিলো সেই জিহাদ থেকে বিরত থাকেন। কোন জিহাদ না করেই জিহাদ নিয়ে বই লিখেন তিনি।
.
বিষয়টা অনেকটা এমন যে আপনি নিজে কোনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে পা রাখেননি। আপনার আশেপাশের অনেক বন্ধুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আপনি বিভিন্ন সময়ে তাদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোসিস্টেম সম্পর্কে জানলেন, কোন বিভাগের কোন শিক্ষক কিভাবে ক্লাস নেয়, কোন বিভাগের ইন্টারন্যাল পলিটিক্স কেমন এগুলো নিয়ে কিছু ধারণা অর্জন করলেন। এর কিছুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো ও প্রশাসনের সমালোচনা করে আপনি একটা বই লিখে ফেললেন। অথচ আপনি ভালো করে জানেনই না যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কিভাবে ফাংশন করে। ঠিক এই ধরণের একটা কাজই করেছেন জাওয়াহিরি। আফগান ময়দানের জিহাদ না করে যিনি ফেরকাবাজিতে লিপ্ত ছিলেন তার লিখিত বই যেকোন দৃষ্টিকোণ থেকেই বর্জনীয়।
.
আজকে আপনারা যে ন্যারোটিভ শুনেন যে ইখওয়ান প্রকৃত হক থেকে দূরে সরে গেছে, ইখওয়ান জিহাদ থেকে দূরে সরে গেছে এইগুলা মূলত জাওয়াহিরির ন্যারোটিভ। তিনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে এই ধরণের জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন ইখওয়ান সম্পর্কে। আমরা দোয়া করি জিহাদ না করেও জিহাদ নিয়ে বই লেখা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলের উত্তরসূরীদেরকে আল্লাহ যেন তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেন।
 
আজকে তথাকথিত গ্লোবাল জিহাদিস্ট নামে পরিচিত একদল "জিহাদিস্ট" যারা কখনোই সোভিয়েত- আফগান জিহাদে অংশগ্রহণ করে নাই। এদের মধ্যে আছেন আল কা(য়দার সাবেক প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরি, ইরাকী শাখার সাবেক প্রধান ও আইএসের আবু বকর আল বাগদাদীর গুরু আবু মুসআব আল জারকাওয়ী ও একিউ এফিলিয়েটেড ইডিওলগ আবু কাতাদা আল ফিলিস্তিনি ও আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী।
.
কোন জিহাদি লিটারেচারেই আফগান জিহাদে তাদের অংশগ্রহণের কোন ইতিহাস আপনি পাবেন না। তাহলে এই লোকগুলো আসলে ঐসময়ে কি করেছিলো?
.
সোভিয়েত আফগান জিহাদের সময়ে মুজাহিদীনদের মধ্যে অনেকগুলো ফ্যাকশন ছিলো। আফগান মুজাহিদরা একই সাথে সোভিয়েত ও নিজেদের অন্তর্কলহ চালিয়ে যাচ্ছিলো। আল কা(য়দার এই লোকগুলো পাকিস্তানের পেশোয়ারে বসে মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতো ও তাদেরকে উস্কানি দিতো। একবার আহমেদ শাহ মাসউদের সাথে হেকমতিয়ারের, আরেকবার আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে হেকমতিয়ারের দূরত্ব সৃষ্টি করতো।
.
আল কা(য়দার এই লোকগুলো যে আফগানিস্তান জিহাদে অংশগ্রহণ করে নাই সে কথা আমরা আব্দুল্লাহ আযযামের একান্ত সহযোগী ও আফগান জিহাদে একবারে প্রথমদিকে হিযরতকারীদের অন্যতম- আব্দুল্লাহ আনাসের বরাত দিয়ে আমরা জানতে পারি। আব্দুল্লাহ আনাস এমন ব্যক্তি যার কাছে পরবর্তীতে আব্দুল্লাহ আযযাম তার মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছিলেন। 
.
অথচ জিহাদ থেকে বিরত থাকা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলের উত্তরসূরী আল কা(য়দার এই মুনাফিকরা আজকে অনেক বড় "মুজাহিদ"। অনেকে তো "শায়খ" শব্দটা উচ্চারণ ব্যতীত এদের নামও মুখে নেন না। সেই আফগান জিহাদ থেকে শুরু করে আজকের ফিলিস্তিনের জিহাদ- প্রত্যেকটা জিহাদেই এই মুনাফেক গোষ্ঠী পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করেছে। অথচ অনেক জাহেল ব্যক্তি জিহাদের ইতিহাস না জেনেই, কোন কিছু না বুঝেই অবলীলায় এদেরকে "শায়েখ" "শায়েখ" ডাকতে থাকে। সেলুকাস।

আল কা(য়দা এফিলিয়েটেড ইডিওলগ আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী হামাসকে কাফের মনে করেন। তিনি হামাস থেকেও আইএসকে অধিকতর "ইসলামী" মনে করেন। কেননা আইএস অন্তত ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছে আর হামাস যুদ্ধ করছে গণতন্ত্রের জন্য।
.
 
হামাসের মিলিটারি কমান্ডার বাসসাম ঈসা ইসরাইলী হামলায় শহীদ হলে আল কা(য়দার কেউ কেউ তাকে "শহীদ" বললে আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী এর সমালোচনা করে বলেন- হামাস ইরানের প্রক্সি হিসেবে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছে ইসলামের জন্য লড়াই করছেনা। শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ যুদ্ধের রূপকার শহীস আহমেদ ইসমাইলকে তিনি "ইমামুদ দালাল" বা ভ্রষ্টদের ইমাম আখ্যা দেন। আহমেদ ইয়াসিনের কর্মকান্ড নাকি সুস্পষ্টভাবে তাওহীদের বিপরীত।
.
আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী আফগানিস্তানে আব্দুল্লাহ আযয়ামের সাথেও বেয়াদবী ও দ্বিমত করেন। আফগান জিহাদে সাহায্যের জন্য আব্দুল্লাহ আযযাম পাকিস্তানের জিয়াউল হকের প্রশংসা করতেন। তিনি যুবকদের তাকফিরবাদীতা থেকে বিরত থাকতে বলতেন। কিন্তু মাকদিসী সরাসরি জিয়াউল হককে তাকফির করতেন এবং আফগান মুজাহিদীনদের মধ্যে শিরকের বিস্তার রোধ করতে আব্দুল্লাহ আযযামের নীরবতার সমালোচনা করতেন।
.
বাংলাদেশের একটা সুনির্দিষ্ট গ্রুপ এই তাকফিরীর অনুসরণ করে হামাসের পলিটিক্যাল উইংকে তাকফির করে। এরা মূলত সেই ধারা যারা আইএসের মতো ক্যান্সারকে জন্ম দিয়েছে। নো ঔন্ডার বাংলাদেশেও এরা তাকফির ও খারেজী ধারার অনুসারী।

Share:

1 টি মন্তব্য:

  1. আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন,অনেক কিছু জানতে পারলাম, আগে সবসময় অন্যদের পোস্ট থেকে খুব বিভ্রান্ত লাগতো নিজেকে, ইসলামী আন্দোলনে আপনারা সফল হন, জামাত ইসলামী এর মত দলগুলোতে যোগ দিন, আপনাদের মত মানুষদের খুব দরকার তাইলে ইসলামী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে ইনশাআল্লাহ।

    উত্তরমুছুন

আর্কাইভ