দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

ইখওয়ান ও আব্দুল্লাহ আযযাম: জিহাদের দর্শন ও সমাজ গঠন

পশ্চিম তীরের জেনিনের এক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন আব্দুল হাদী। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন মুয়াল্লিম হিসেবেও কাজ করতেন। একদিন মসজিদে বারো বছরের বিনয়ী, ইবাদতের ক্ষেত্রে সচেতন ও নম্র এক ছেলে তার নজর কাড়ে। তার নাম ছিলো আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযযাম। তিনি আযযামকে মুসলিম ব্রাদারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আস্তে আস্তে ব্রাদারহুডের রেভ্যুলিউশনারি সাহিত্য আযযামকে পরিণত করে সত্যিকার রেভ্যুলিউশনারিতে। এর কিছুদিন পরেই মারা যান আব্দুল হাদী। স্মৃতিকাতর আযযাম আব্দুল হাদীর জানাযায় এক হৃদয় বিদারক বক্তব্য দেন। আব্দুল হাদী তার মনে এতোটাই জায়গা করে নিয়েছিলেন যে এর এগারো বছর পরে দামেস্ক ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সের থিসিস তিনি উৎসর্গ করেন আব্দুল হাদীর নামে।
.
আব্দুল্লাহ আযযাম আগাগোড়া ইখওয়ানি ছিলেন। সাইয়্যেদ কুতুব, ইমাম হাসান আল বান্না, উমর তিলমেসানীরা ছিলেন তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তার বইগুলোতে প্রায় সময়েই ইখওয়ানের লিটারেচারগুলো সাইট করেছেন।
.
আব্দুল্লাহ আযযামের আফগানিস্তানের কর্মকান্ড বুঝতে হলে ইখওয়ানের জিহাদের কন্সেপ্টটা বুঝা লাগবে। আমি যদি আপনাকে প্রশ্ন করি জিহাদ আসলে কি? জিহাদ কিসের জন্য? কারা জিহাদ করবে? কেন করবে?
এই প্রশ্নগুলোর হয়তো স্থান কাল পাত্রভেদে বিভিন্ন উত্তর আছে। আ'ম অথবা খাস। জিহাদ মূলত একটা "ইসলামি" সমাজ তৈরি করার প্রচেষ্টা। সেই সমাজকে রক্ষার প্রচেষ্টা। সাইয়্যেদ কুতুব আমাদেরকে বলতেসেন বর্তমান সমাজ জাহেলিয়্যাতে নিমজ্জিত। আমরা যদি এই জাহেলী সমাজ থেকে মুক্ত হতে চাই তাহলে আমাদের নিজেদেরকেও একটা সমাজ বানাতে হবে। এই সমাজটাই হবে "দ্যা সোসাইটি অব ব্রাদার্স"। জিহাদ মূলত হবে এই সমাজটাকে কেন্দ্র করেই।
.
এইজন্য ইখওয়ানি ডিসকোর্সে সমাজ বিনির্মাণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা এলিমেন্ট। ইখওয়ান কি এই ডিস্কোর্স নিজ থেকে তৈরি করেছে? না। বরং আল্লাহর রাসূল (সা) স্বয়ং জিহাদের আগে একটা সমাজ তৈরি করতে চেয়েছেন। মদিনায় হিজরত ছিলো সেই সমাজের গোড়াপত্তন। এরপরের জিহাদ, কিতাল, চুক্তি সবকিছুই হয়েছে সেই সমাজকে কেন্দ্র করে। যারা এই সোসাইটিতে বিলং করে, যারা এই সোসাইটিকে নিজেদের এবং নিজেদেরকে এই সোসাইটির একটা অংশ মনে করে তারাই জিহাদ করবে।
.
ফলে সোসাইটি তৈরির প্রক্রিয়া ইখওয়ানি ডিস্কোর্সের আরেকটা কন্টেস্টেড এবং গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট। কোন প্রক্রিয়ায় একটা সোসাইটি তৈরি হবে, সেই সোসাইটির ব্যক্তিকতা, জেন্ডার রুলস, শিক্ষাব্যবস্থা, বিভিন্ন এন্টিটির মিথস্ক্রিয়া কিভাবে হবে এইসব বুঝাপড়া নিয়ে ইখওয়ানের বিভিন্ন ফ্যাকশনের কনফ্লিক্টিং পজিশন নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। তবে যেকোন সোসাইটি বিনির্মাণের অংশ হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবা ইখওয়ানি এন্ডেভ্যর এর অংশ।
.
এখন জিহাদের জন্য একটা সোসাইটি দরকার- এতটুকু যদি আপনি পারসিভ করতে পারেন তাহলে আমি দুইটা উদাহরণ দিবো।
প্রথম উদাহরণটা হচ্ছে ফিলিস্তিনের হা ম। (স র। ১৯৬৭ এর যুদ্ধে পরাজয়ের পর আরব রাষ্ট্রগুলো মিলিটারিলি ইসরাইলকে পরাজিত করার আশা প্রায় ছেড়ে দেয়। ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আগ্রাসন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বামপন্থী পিএলওর অবস্থানও নড়বড়ে হতে থাকে। ১৯৭৯ এর ইরান বিপ্লব ইসলামী দুনিয়াকে নাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে ইখওয়ানিদের একটা গ্রুপ নতুন সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করতে চাইলে শায়খ আহমেদ ইসমাইল ইয়াসিন সহ ইখওয়ানের ওল্ডগার্ডরা তাতে সায় দেননি। এতে ওল্ডগার্ডদের প্রতি নাখোশ হয়ে তারা ইখওয়ান থেকে বের হয়ে ১৯৮১ সালে নতুন সশস্ত্র দল তৈরি করে। সেই সশস্ত্র দল হচ্ছে প্যালেস্টানিয়ান ইসলামিক জিহাদ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আহমেদ ইয়াসিনের মতো মানুষ কেন তখন সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করার জন্য সায় দেননি? তিনি কি তবে জিহাদের বিরোধী ছিলেন?
আহমেদ ইয়াসিন খুব ভালো করেই জানতেন যেদিন থেকে মিলিটারি ভ্যানগার্ডের কার্যক্রম শুরু হবে সেদিন থেকেই ইসরাইলের সাথে প্রকাশ্য সংঘাত তৈরি হবে। তিনি বরং মিলিটারি স্ট্রাগল শুরু করার আগে এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে সশস্ত্র লড়াই বহু বছর চালিয়ে যেতে হবে। তাই তিনি গাজার প্রত্যেকটা অঞ্চলেই মসজিদ বানিয়েছেন, হাসপাতাল তৈরি করেছেন, ইসলামী ইউনিভার্সিটি অফ গাযা বানিয়েছেন। আজকের যেসব হা ma স নেতার নামে গণজোয়ার উঠে তারা সবাই ইসলামিক ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট, এইসব ফেসিলিটির আউটপুট। ইসলামিক জিহাদ তৈরির প্রায় আটবছর পরে ১৯৮৮ সালে হাম।স প্রতিষ্ঠিত হয় যখন হ।ম।সের জিহাদ করার মতো সকল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হয়। আজকে "ইসলামিক জিহাদ" তো বটেই পুরো গাজার সাধারণ মানুষ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের ফুয়েল এই ইনফ্রাস্ট্রাকচারগুলোই। অথচ আহমেদ ইয়াসিন যদি ঐসময়ে ইখওয়ানের একটা গ্রুপের কথায় প্রভাবিত হয়ে জিহাদ শুরু করতেন তাহলে হয়তো ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন আজকের দিনে এসেও বামপন্থীদের হাতে থাকতো।
.
তো যা বলতেসিলাম, থিওলজিক্যাল, মেটাফিজিক্যাল ও স্ট্রাকচারাল লেভেলে সোসাইটি কন্সট্রাক্ট করা জিহাদের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শায়েখ আহমেদ ইসমাইল ইয়াসিন ফিলিস্তিনে যে কাজ করেছেন আব্দুল্লাহ আযযামও আফগানিস্তানে একই কাজ করেছেন। আযযামের স্ত্রী আরব মুজাহিদীনদের সন্তানদের জন্য স্কুল চালাতেন। আযযাম নিজেও হিউম্যানিটারিয়ান এইড পৌছানোর পাশাপাশি মুজাহিদীনদের শিক্ষার জন্য আলাদা ইনিসিয়েটিভ নিয়েছেন। আফগানে যুদ্ধ করাতে আসা আরবদের জন্য একটা সফিস্টিকেটেড সোসাইটি তৈরির চেষ্টা করেছেন। আফগানিস্তানে একটা সাস্টেইনেবল সোসাইটি তৈরির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আযযাম কোন চমক লাগানো উদ্দেশ্য হাসিল বা এটেনশন সিকিং এক্টিভিটিজে বিশ্বাস করতেন না এবং এগুলো এন্টারটেইন করতেন না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিশরে যখন আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের সদস্যরা তখন আযযাম এই ধরণের কোন কার্যক্রমকেই সমর্থন করেন নি। এমনকি আযযামের লেখালেখিতেও জুহাইমান আল ওতায়বীর সিজ অফ কাবা কিংবা খালিদ ইস্লাম্বুলীর সাদাত হত্যাকান্ড কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারেনি। বরং আযযামের লেখালেখির অন্যতম বিষয়বস্তু ছিলো ইখওয়ান।
.
কিন্তু ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ বা এইদলের যারা পরবর্তীতে আল কা(য়দায় যোগদান করে তাদের কাছে সাদাত হত্যার মতো এটেনশন সিকিং বা চমক সৃষ্টিকারী ইভেন্ট তৈরি করতে পারাটা ছিলো প্রশংসনীয়। সাদাত হত্যাকান্ডের মূল প্রোটাগনিস্ট খালেদ আল ইসলাম্বুলী তাদের কাছে সেই সম্মান পেতো যে সম্মান আজকের বিজেপির কাছে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে পায়। এইধরণের ঘটনাকে তারা সেলিব্রেট করতো। এন্টারটেইন করতো। খালেদ আল ইস্লাম্বুলীর নামে তাদের একটা ব্রিগেডও ছিলো। কন্সিকুয়েন্স বিবেচনা না করে হেডলাইনে আসতে পারাটাই ছিলো তাদের কাছে সফলতা। নো নিড টু সে যে এই গ্রুপটাই ৯/১১ ঘটিয়েছিলো।
.
ইখওয়ানের এই সোসাইটি সেন্ট্রিক জিহাদের জন্যই আফগান জিহাদ বা আজকের ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন সারা পৃথিবীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পেরেছিলো। আব্দুল্লাহ আযযাম কখনো তোরাবোরায় বসে ব্রিফিং করেন নাই। বরং তিনি মক্কা থেকে নিউইয়র্ক, লন্ডন থেকে কাসাব্লাংকা পর্যন্ত বক্তব্য দিয়ে বেড়াতেন, ভলেন্টিয়ার রিক্রুট করতেন। খোদ আমেরিকাতেই আযযামের মাকতাব আল খিদমাতের মোট ৫২টি শাখা ছিলো। আযযাম কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না, অথবা ছিলেন না কোন সো কল্ড গুরাবা। আযযাম মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ পরিহার করে আফগানিস্তানে একটা ইন্সক্লুসিভ সোসাইটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
.
আপনি সোসাইটি ছাড়া নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত কিছুই করতে পারবেন না। "উম্মাহ" ধারণা ইসলামের খুবই সিগনিফিক্যান্ট একটা আইডিয়া যা সমাজ তৈরি করে। মক্কার সমাজ আর মদিনার সমাজ যেমন একই রকম ছিলো না তেমনি আজকের মিশরের সমাজ আর ফ্রান্সের সমাজও সেইম না। আপনি কোন সমাজে বিলং করেন সেইটার উপর ভিত্তি করে আপনার একশন নির্ধারিত হবে। যেকোন এটেনশন সিকিং বা মনযোগকামী কর্মকান্ড করার আগে ভাবা উচিত এর কন্সিকুয়েন্স কি আপনার "সোসাইটি" তৈরি করতে বাধা দিবে নাকি ভূমিকা রাখবে।
.
এখন অনেক তাকফিরী গ্রুপ বিশ্বাস করে আমাদের সবাইকে গুরাবা হতে হবে। আমাদেরকে কেউ চিনবেনা। এই জাহেল সোসাইটিতে আমাদের কোন কিছু কন্ট্রিবিউট করার নাই। এই সোসাইটিতে আমরা তো বিলংই করি না। সিস্টেমের বাইরে থেকে আমরা সিস্টেমের উপর হামলা চালাবো। স্লিপার সেল তৈরি করবো। আর যারাই নতুন সোসাইটি তৈরি করতে চাইবে তারাই আমাদের শত্রু। কারণ নতুন আরেকটা সোসাইটি তো জাহেলি সোসাইটিই হবে। মুখে মুখে কুতুবিস্ট দাবী করা তাকফিরী ইডিওলগদের বেধে দেয়া এই হাইপার ইন্ডিভিজ্যুয়াল সোসাইটির বিরুদ্ধে যারাই একটা নতুন সমাজ তৈরি করতে চেষ্টা করবে তারাই হবে জিহাদের শত্রু, গণতন্ত্রকামী মডারেট।
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ