দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

সোভিয়েত আফগান জিহাদে পেশওয়ার: মুজাহিদীনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও তাকফিরী প্রভাব

সোভিয়েত আফগান জিহাদের শেষদিকে পেশওয়ারে কি হতো সেটা নিয়ে জিহাদী লিটারেচারগুলোতে অল্প বিস্তর আলোচনা আছে। ১৯৮৮, ১৯৮৯ সালের পেশওয়ার খুবই ঘটনা বহুল এবং ঐ সময়ের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা আরো স্পষ্টভাবে আযযাম ও তাকফিরি গ্রুপগুলোর পার্থক্য বুঝতে পারবো।

.
সোভিয়েত আফগান জিহাদে পেশোয়ার ছিলো মুজাহিদীনদের হাব। আফগান জিহাদে মুজাহিদীনদের অন্তত আটটি বড় গ্রুপ ছিলো। এই গ্রুপগুলোর প্রত্যেকটারই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে শক্ত উপস্থিতি ছিলো। এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক ওয়ারলর্ডরা ছিলো। আহমেদ শাহ মাসউদ ছাড়া বাকি সকল মুজাহিদীন গ্রুপগুলো পেশওয়ারে বসেই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো।
.
এই মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিলো প্রকট। জিহাদের জন্য আসা অর্থ কিভাবে বন্টন হবে, পেশওয়ারে কে কোথায় থাকবে, আফগানে কোথায় কোন গ্রুপ অপারেশন চালাবে এইগুলো নিয়ে মতপার্থক্য ছিলো নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। মুজাহিদীন গ্রুপগুলো শুধুমাত্র সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়াই করতোনা বরং আধিপত্য বিস্তারে তারা অন্য মুজাহিদীন গ্রুপের সাথেও লড়াই করতো।
.
মুজাহিদীনদের এই অন্তর্ঘাতী লড়াই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তো ছিলই, পাশাপাশি পেশওয়ারেও ছড়িয়ে পড়ে। ঐসময়ের সবচেয়ে ফরমিডেবল মুজাহিদীন কমান্ডার হেকমতিয়ারের বাহিনীর হাতে পেশওয়ারেই খুন হন প্রতিপক্ষ দলের কয়েকজন মুজাহিদীন। পেশওয়ারের মাটিতে এইসব খুনোখুনি কোনভাবেই পাকিস্তান পছন্দ করতোনা। আব্দুল্লাহ আযযাম নিজেও মুজাহিদীন ফ্যাকশনের নেগোসিয়েশনের জন্য বার বার চেষ্টা করতেন। যেহেতু আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে পাকিস্তান সরকার ও পেশওয়ারের মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর সম্পর্ক ছিলো তাই এইসব ঘটনার জন্য আব্দুল্লাহ আযযামের উপর চাপ বাড়াতে থাকে পাকিস্তান সরকার।
.
পেশওয়ারের মুজাহিদীনদের কালচার ছিলো খুবই অনৈসলামিক। কোন মুজাহিদীন গ্রুপ যদি অন্য কোন মুজাহিদীন গ্রুপের কাউকে হত্যা করতে চাইতো তাহলে প্রথমেই তাকে সুযোগ বুঝে সৌদি সরকারের এজেন্ট বা ইরানিয়ান এজেন্ট হিসেবে ট্যাগ দেয়া হতো। এরপর তার ডিফেইমেশন এমনভাবে করা হতো যাতে এই প্রপাগান্ডা পেশওয়ারে থাকা ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের (সংক্ষেপে ইআইজি) গেস্টহাউজে পৌছায়। যেহেতু ইআইজি সৌদি সরকারসহ সকল মুসলিম দেশের শাসকদের মুরতাদ মনে করে তাই কোন মুজাহিদ এইসব সরকারের হয়ে কাজ করে শুধুমাত্র এই তথ্যই ঐ মুজাহিদকে হত্যার জন্য যথেষ্ট ছিলো। ফলে পেশওয়ারে থাকা ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের অনেকেই আফগানিস্তানে লড়াই না করে পেশওয়ারে বিভিন্ন মুজাহিদীন গ্রুপের ক্রীড়নক হয়ে অপর পক্ষের মুজাহিদীনদের হত্যা করতো। আর এ কারণেই পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতি বিরক্ত হয়ে ওঠে।
.
পেশওয়ারে মুজাহিদীনদের এই লড়াইয়ের কারণে আযযাম নিজেও চাপে পড়তেন। জিহাদের শেষদিকে অবস্থা এমন হয় যে পাকিস্তানের আইএসআই আযযামকে হান্ট করা শুরু করে। এর কিছুদিন পরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিখ্যাত জয়নাব আল গাজালী পাকিস্তান সফরে গেলে সেখানে তিনি আযযামকে হেনস্থা না করতে জিয়াউল হককে অনুরোধ করেন। জিয়াউল হক জয়নাব আল গাজালীর প্রতি খুবই শ্রদ্ধা রাখতেন মিশরের জেলে তার লৌহদৃঢ় ভূমিকার কারণে। ফলে আযযামকে হেনস্থা বন্ধ করে পাকিস্থান প্রশাসন।
.
দেখুন, পেশওয়ারে থাকা তাকফিরী দলের সদস্যরা বার বার জিহাদকে বিপদে ফেলেছে। তারা আরব মুজাহিদীনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব উস্কে দিতো। যেহেতু আরবরা সালাফি ছিলো তারা পেশওয়ারে বসে ফতোয়াবাজি করতো- "আফগানিস্তানের জিহাদ সহীহ জিহাদ না। আফগানরা শিরকে লিপ্ত।" এমনকি আল কা(য়দার ইডিওলগ আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসি আব্দুল্লাহ আযযামকে ঘৃণা করতো কারণ আযযাম নাকি আফগানিস্তানে শিরকের বিস্তার রোধ করতে অনিচ্ছুক।
.
আব্দুল্লাহ আযযামের শাহাদাতের আগেও তার রক্ত হালাল করার জন্য একটা গ্রুপ পেশওয়ারে প্রচারণ চালায় আযযাম সৌদি আরবের দালাল। অথচ আযযাম জিহাদের শেষদিকে সৌদিতে গিয়ে বক্তব্য দিতে পারতেন না। পেশওয়ারের তাকফিরীরা অন্য মুজাহিদীনদের হত্যার আগে যেভাবে ট্যাগিং করতো আযযামের মৃত্যুর আগেও তারা আযযামকে ঐভাবে ট্যাগিং করেছে। এইজন্য অনেকেই সন্দেহ করে যে আযযামের শাহাদাতের পিছনে এই তাকফিরী গোষ্ঠীদের হাত ছিলো।
.
যদিও জিহাদী লিটারেচার এনালাইস করলে বুঝা যায় আযযামকে হত্যার ঘটনায় হয়তো তাকফিরীদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা কম তবে ১৯৮৯ সালে শাহাদাতের মাত্র একুশ দিন পূর্বেও আযযাম পেশওয়ারের যে মসজিদে খুতবা দিতেন সেই মসজিদের মিম্বারের নিচে বোমা পাওয়া গিয়েছিলো। ভাগ্যক্রমে মসজিদের এক খাদেম সেই বোমার সন্ধান পাওয়ায় সে যাত্রায় বেচে যান আযযাম। জিহাদী লিটারেচার মতে ঐ বোমা মসজিদের মিম্বারের নিচে পেশওয়ারের কোন তাকফিরী গ্রুপই রেখেছিলো সে সম্ভাবনা প্রবল।
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ