দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

দ্য ট্রায়াল অফ আব্দুল্লাহ আযযাম

 


আফগান জিহাদের ডাইভারসিটির কারণে মুজাহিদীনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে থাকলেও পেশওয়ারের আরব যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘাতের কারণ খুবই সিগনিফিক্যান্ট। আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে পেশওয়ারে থাকা কিছু আরবের দ্বন্দ্বের কারণ হিসেবে প্রধানত দুইটি ঘটনা দায়ী। এই সংঘাতের সুচনা হয় আহমেদ শাহ মাসউদকে কেন্দ্র করে। আর এই সংঘাত আরো প্রকট হয় তাহাদ্দি প্রজেক্ট কেলেংকারীতে।

.
আব্দুল্লাহ আযযাম মূলত আফগানিস্তানে আরব মুজাহিদীনদের জন্য ফান্ডরাইজ করতেন। এমনি একটা ফান্ডরাইজ প্রজেক্ট ছিলো তাহাদ্দি। এই প্রজেক্টে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন আব্দুল্লাহ আযযাম, তার একান্ত সহযোগী ওয়ায়েল জুলাইদান ও ইজিপশিয়ান কানাডিয়ান আহমেদ সাইদ খাদর। এই প্রজেক্টের মূল দায়িত্বে ছিলেন আহমেদ সাইদ খাদর। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য অফিস, টেলিফোন ও যাবতীয় খরচ বহন করেছিলেন আব্দুল্লাহ আযযাম। প্রজেক্টের ফান্ডরাইজিংয়ের জন্য খাদর আযযামের নিকট একটি এন্ডোর্সমেন্ট লেটার চাইলে আযযাম তার স্বাক্ষরিত একটি এন্ডোর্সমেন্ট লেটার দেন।
.
কিন্তু খাদরের ক্রমাগত মিস ম্যানেজমেন্টের জন্য বিদেশী দাতা সংস্থাগুলো এই প্রজেক্টে ফান্ডিং বন্ধ করে দেয়। প্রজেক্টের ব্যর্থতা ঠেকানোর জন্য আব্দুল্লাহ আযযাম ও জুলাইদান ম্যানেজেরিয়াল লেভেলে হস্তক্ষেপ শুরু করেন। এর মধ্যে জুলাইদান একটি প্রজেক্ট পেপার তৈরি করে খাদরকে দেন স্বাক্ষরের জন্য। পেপারে উল্লেখ ছিলো, স্টিয়ারিং কমিটি চাইলে এডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটিকে পরিবর্তন করতে পারবে। খাদর পুরো পেপার না পড়েই স্বাক্ষর করেন।
.
এর কিছুদিন পর স্টিয়ারিং কমিটির আব্দুল্লাহ আযযাম নিজেই তাহাদ্দি প্রজেক্টের পুরো দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন এবং খাদরের পদত্যাগ দাবি করেন। খাদর দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং কানাডায় চলে যান।
.
আব্দুল্লাহ আযযাম ও জুলাইদান নিশ্চিত হন খাদর কানাডায় গিয়ে প্রজেক্টের রিসোর্সের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছেন। আব্দুল্লাহ আযযামের অনুগত কয়েকজন পেশওয়ারে খাদরের অফিস তল্লাসি করে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট জব্দ করে ও প্রজেক্টের সকল সম্পদ সৌদি রেড ক্রিসেন্টের ওয়্যারহাউজে জমা দেয়। আযযামের অনুগতরা দাবি করে তারা খাদরের অফিস থেকে এমন নথি উদ্ধার করেছে যা থেকে স্পষ্টত বুঝা যায় খাদর এই প্রজেক্ট দখলের চেষ্টা করেছেন। তারা খাদরকে বহিষ্কারের একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করে তাহাদ্দি প্রজেক্টের সকল দাতাকে ফ্যাক্স করে।
.
এই ঘটনার কয়েকমাস পরেই খাদর পুনরায় পেশওয়ারে ফিরে আসেন। তাহাদ্দি প্রজেক্টের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রভাবশালী আব্দুল্লাহ আযযামের মোকাবেলায় তিনি পেশওয়ারের আরব- যারা আযযামকে অপছন্দ করতো তাদেরকে মোবিলাইজ করেন। তিনি সকল আফগান মুজাহিদীন নেতাদেরকে এপ্রোচ করেন এবং আযযামের সাথে সংঘাতের ব্যাপারে বিচারের আয়োজন করার অনুরোধ করেন।
.
১৯৮৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই বিচার অনুষ্ঠিত হয় যদিও আযযাম সেদিন সশরীরে হাজির ছিলেন না। জিহাদি লিটারেচারে এই বিচার "ট্রায়াল অফ আযযাম" নামে পরিচিত।
.
বিচারের ফলাফল কি হয়েছিলো সেটা নিয়ে যথেষ্ট ধোয়াশা আছে। বিভিন্ন জিহাদী লিটারেচারের বিবরণ অনুযারী বিচারকরা আব্দুল্লাহ আযযামের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন এবং খাদরের সকল সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আযযাম ও জুলাইদানকে আহবান জানিয়েছিলেন। একই সাথে খাদরকে তাহাদ্দি প্রজেক্টে পুনর্বহাল ও এর প্রজ্ঞাপন সকল ডোনারকে ফ্যাক্স করার জন্য বলা হয়।
.
বিচারের পর আযযাম ও জুলাইদান খাদরের সম্পদ ফিরিয়ে দিলেও তার মানহানি বা অফিস ভাঙ্গার জন্য কোন ক্ষতিপূরণ দেননি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আফগান জিহাদ থেকে বিরত থাকা পেশওয়ারের কিছু আরব আযযামের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুরু করে। এই প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের মূল নেতা ছিলেন ফাদল ও আয়মান আল জাওয়াহিরি।
.
ফাদল তার বইতে পরবর্তীতে এই ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে লিখেন- "আল্লাহর ইচ্ছায় আমি বিখ্যাত দায়ীদের মধ্যস্থতাকারী হয়েছিলাম। অতপর যখন সত্য উদ্ভাসিত হলো তখন তারা [আব্দুল্লাহ আযযাম ও ওয়ায়েল জুলাইদান] সত্য থেকে পালালো।"
.
২০০৮ সালে প্রকাশিত আয়মান আল জাওয়াহিরির বইয়েও এই ঘটনা উল্লেখ আছে। তবে জাওয়াহিরি ফাদলের সাথে আযযামের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন চালালেও তার বইয়ে তিনি ফাদলের সাথে দ্বিমত করেন এবং আযযামকে বেনিফিট অফ ডাউট দেন।
.
তাহাদ্দি প্রজেক্ট কেলেংকারির বহুবছর পরে প্রকাশিত জাওয়াহিরির বইয়ে তিনি ফাদলের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন আযযামের বিরুদ্ধে ফাদলের সহযোগি। এই ঘটনায় জাওয়াহিরির অবস্থান পরবর্তীতে আরো স্পষ্ট হয় জাওয়াহিরির প্রতি লেখা বিন লাদেনের এক চিঠিতে যেখান লাদেন জাওয়াহিরিকে আযযামের নিন্দাবাদ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। ফলে এটা প্রমাণিত হয় যে, জাওয়াহিরি বাস্তবে ফাদলের সাথে মিলে আযযামের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ছড়ালেও তার বইয়ে তিনি পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকতে চেয়েছেন।
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ