২৪।
১৯৪০
সালের ২৩ মার্চ উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাব নিয়া মাঝে-মধ্যেই কথা উঠতে
দেখতেছি। বাংলাদেশে এইটা মশহুর হইয়া আছে যে এই প্রস্তাব শেরে বাঙাল এ.কে.
ফজলুল হকের। কিন্তু এইটা তারা ভুইলা যান যে এই কারারদাদ (ঘোষণা) শেরে
বাঙালের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়।
খেয়াল
রাখতে হবে যে, এই প্রস্তাব পাশ হইতেছে মুসলিম লীগের অনুষ্ঠানে। হক সাহেব
১৯১০ এর দশকে যুগপৎভাবে লীগ আর কংগ্রেসের নেতা হইলেও ১৯৩৭ —এ প্রধানমন্ত্রী
হইছেন কৃষক-প্রজা পার্টির হয়ে। তার পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম
লীগের খাজা নাজিমুদ্দিন। এর আগে ১৯২৪ সালে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতি বাদ
দিয়া কৃষক দলের দোকান খোলেন, আর ১৯৪৬ সালে তা বন্ধ কইরা পুনরায় মুসলিম লীগে
যোগ দেন। অর্থাৎ কারারদাদ-এ পাকিস্তানের সময় তিনি মুসলিম লীগে ছিলেনই না।
তাইলে
কী হইছিল? পাকিস্তানের প্রস্তাবের উপস্থাপক শেরে বাঙাল এ কে ফজলুল হক এবং
খোদ খসড়া প্রস্তুতকারী পাঞ্জবের প্রধানমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান দুইজনই
নন-লীগার। মূলত নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত এই প্রস্তাব জনপ্রিয় করতে দুই মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সর্বোচ্চ নেতাদের ব্যবহার করছিলেন কায়েদে আযম। একজনরে
দিয়া খসড়া লেখাইছেন, আরেকজনরে উপস্থাপন করতে দিছেন।
এই
প্রস্তাবটি ১৯৪০ সালের ২২-২৪ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ২৭ তম
অধিবেশনে পাশ করা হয়। এই অধিবেশনের সভাপতিত্ব করতেছিলেন কায়েদে আযম। এর আগে
জিন্নাহ সাহেব একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। স্যার সিকান্দার হায়াত খান, মালিক
বরকত আলী এবং নবাব ইসমাইল খানকে নিয়ে এই কমিটি। এই কমিটির সিদ্ধান্তের
আলোকে সিকান্দার হায়াত খান ইংরেজিতে একটি খসড়া তৈরি করেন। ২২ মার্চ এই খসড়া
মুসলিম লীগের সাবজেক্ট কমিটিতে পেশ করেন কায়েদে মিল্লাত শহীদ লিয়াকত আলী
খান। সম্মেলনে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হলে নতুন সংকট দেখা দেয়। নেতৃবৃন্দের
অনেকেই ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। এই সময় এই খসড়াটি উর্দুতে লেখার
দায়িত্ব দেওয়া হয় মাওলানা জাফর আলী খানকে। তিনি যখন এটি উর্দুতে তরজমা
করছিলেন, সিকান্দার সাহেব পাশে বসেই নিরীক্ষণ করছিলেন।
সিকান্দার
হায়াত খানের এই প্রস্তাবের উপর বহু কাটাকাটি হয়। উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে
খোদ কায়েদে আযম এবং মালিক বরকত আলীসহ আরও অনেকেই সংশোধনী ও সংযোজনী দেন।
প্রাথমিক খসড়া মাত্র দুই পাতায় লেখা হয়েছিল। কিন্তু এত বেশি সংশোধনী আর
সংযোজনী এসেছিল যে কাটাকাটি ও পুনর্লিখন করতে করতে মোট পৃষ্ঠা দাঁড়িয়েছিল
১৩তে। এভাবেই প্রস্তুত ও গৃহীত হয় লাহোর প্রস্তাব। পরদিন শেরে বাঙাল এ কে ফজলুল হককে দিয়ে এই প্রস্তাব ঘোষণা আকারে পাঠ করান কায়েদে আযম। ২৫
মার্চ উর্দু দৈনিক ইনকিলাবে উর্দু প্রস্তাবটি হুবহু ছাপা হয়। সেখানে 'আজাদ
ইসলামী হুকুমাতেঁ' শিরোনামে একটি অনুচ্ছেদ ছিলো। অর্থাৎ বহুবচন, একাধিক
রাষ্ট্রের প্রস্তাব।
২৫। শেরে বাঙাল খেতাব কি গান্ধী দিছিলেন?
কোন
কোন বাঙাল মনে করেন যে হক সাহেবকে শেরে বাঙাল খেতাব দিছিলেন গান্ধী। আসলে
১৯৩৭ সালে লখনৌ অধিবেশনে উপস্থিত হলে জনগণের মধ্যে চঞ্চলতা সৃষ্টি হয়।
হিন্দু বিরোধী বক্তব্য দিয়ে তিনি তখন ভারতীয় মুসলমানের কাছে জনপ্রিয়। এই
সময়েই অনুষ্ঠান সভাপতি কায়েদে আযম তাকে 'শেরে বাঙাল' বলে অভিহিত করেন। তখন
থেকেই তিনি শেরে বাঙাল।
-কারারদাদ সংক্রান্ত বক্তব্যটি উর্দু দৈনিক দুনিয়া অবলম্বনে লিখিত।
২৬।
রোহিঙ্গা
বিদ্বেষ ছড়ানোর মূলে হলো বাঙালি জাতিবাদ।আজকের জাতিবাদীদের পূর্বপুরুষরাই
বিহারী মুহাজিরদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন ও গণহত্যা পরিচালনা করেছিল। এদের
একটা অংশ অবাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষবশত পাকিস্তান ভাঙতে গিয়ে সাময়িক সময়ের
জন্য নিজেরাও রিফিউজিতে পরিণত হইছিল। সাথে নিজেদের গুণ্ডাগিরির মধ্য দিয়া
আরও বিশাল একটা অংশকেও পরিণত করছিল রিফিউজিতে।
কিন্তু
রিফিউজি অবস্থায় তাদের পরিণতি কী ছিল? নেতারা কে কোথায় ছিলেন, সেগুলো
মোটামুটি সবাই জানে। কিন্তু নিম্নস্তরের জাতিবাদী, আর বৃহৎ পরিসরে সাধারণ
বাঙালির অবস্থা কেমন ছিল? একাত্তরের
৬ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমসের বিশাল খবর। শিরোনাম— 'Bengali Refugees
Stirring Strife in India', মানে ‘বাঙালি উদ্বাস্তুরা ভারতে কলহ ছড়াচ্ছে’।
চতুর্থ প্যারায় লেখা হয়েছে— ‘There have been clashes and brief riots in
which several refugees have been killed by the police or by local
people.’
এই
পরিস্থিতিতে বিশাল অংকের উদ্বাস্তুর ভার যখন সইতে পারছিল না পশ্চিম বাংলা,
তখন কেন্দ্রীয় ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল বাঙালদের অন্যান্য প্রদেশে
স্থানান্তরের। কিন্তু বাঙালরা রাজি হয়নি। যেমনটা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে
পাঠাতে গিয়ে ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু কেন? কারণ ‘the refugees, virtually all
Bengalis, do not want to leave an area where they are culturally and
linguistically at home.’
আর
কী কী সমস্যা? পড়েন— ‘Refugees complain that camp officials are not
giving them their full rations. In some camps, refugees charge that
officials are illegally selling relief supplies on the black market.
Local
Indians, meanwhile, are complaining that they cannot afford to buy the
amount of food the refugees are getting free. Refugees and local people
clash over the scarce firewood for cooking: fights have also occurred
when refugees strip food from orchards.
Refugee
pressures have driven some food prices up, while wage rates have
dropped, particularly for unskilled field hands, as the refugees have
entered the labor market—despite a Government prohibition—and have
offered to work for extremely low pay.’
প্রগতিমারানি
বাম ভাদাদের ভূমিকা কী ছিল জানেন? খবর বলছে তারা উস্কানি দিয়ে যাচ্ছিল
স্থানীয় আর রিফিউজিদের মধ্যকার বিবাদে। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে— ‘Leftist
political parties have begun exploiting the discontent of both the
refugees and the local people. Some of the clashes have reportedly been
fomented by extremists.’ পরিস্থিতি
কি মুহাজির রোহিঙ্গা কওমের চেয়ে উন্নত কিছু ছিল? হ্যাঁ, এই খবরে বাঙালদের
ইয়োবা বিক্রির কথা বলা হয়নি। কিন্তু এমন ভান ধরছে এই বাঙালরা যেন মনে হচ্ছে
তারা ইয়োবা কী জিনিস, কখনো চেখে দেখে নাই।
মোদ্দাকথা,
একাত্তরে বাঙাল রিফিউজি আর এখনকার রোহিঙ্গা কিংবা সাতচল্লিশের বিহারী
মুহাজিরদের মধ্যকার ক্ষোভ, অসন্তোষ যা; তা উদ্বাস্তু জীবনের স্বাভাবিক
বিষয়। এর সমাধান খুঁজতে হবে; বিদ্বেষ, ঘৃণা নয়।
২৭।
'স্বৈরশাসক'
আইয়ুব খান তখন ক্ষমতায়। ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখলের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি
শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেন। গঠন করেন এসএম
শরীফ শিক্ষা কমিশন। ১০ সদস্যের ওই কমিশনে চারজন বাঙালি ছিলেন। তাদের মধ্যে
তিনজন খুবই পরিচিত। একজন অধ্যাপক মোমতাজউদ্দিন আহমেদ, রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য; আরেকজন অধ্যাপক এ এফ আতোয়ার রহমান, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক ও ১৯৮৭ সালে জাতীয় অধ্যাপক এবং অন্যজন
বুয়েটের প্রথম উপাচার্য এম এ রশীদ, যিনি ৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হন।
বাকি একজন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা ছিলেন, আব্দুল হক।
এই
কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে কিছু সমস্যা ছিল। শিক্ষার ব্যয়-বৃদ্ধি এবং
শিক্ষা সংকোচনের মতো ব্যাপার ছিল। ১৯৬২ সালে এই কমিশনের নীতি বাস্তবায়ন
শুরু হয়। এতে কথিত কিছু 'মৌলবাদী' ও 'সাম্প্রদায়িক' নীতিও ছিল। এসব সামনে
আনার সুযোগ তখন ছিল না। নিষিদ্ধ হয়েও ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন গোপনে
ছাত্রদের সংগঠিত করে এই শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন দাঁড় করিয়ে দেয়। ওই
বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর লাশ পড়লে এর চুড়ান্ত পরিণতি ঘটে। ৬৪ সালে হামুদুর
রহমান কমিশন গঠন করে এর থেকে মুক্তি পায় আইয়ুব।
১৯৬৯
সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামের আলোকে ঢেলে
সাজানোর নিয়ত করে। গঠন করে নূর খান শিক্ষা কমিশন। মাদরাসাকে স্কুলের সাথে
একীভূত করে সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষা চালুর প্রস্তাব দেয় এই কমিশন। পাশাপাশি
বয়স্ক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা ও উর্দুর
প্রস্তাব দেয়।
কিন্তু
দেশের হিন্দু লবি, প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতান্ত্রিক শক্তি ও কথিত
'ধর্মনিরপেক্ষতা'র ধ্বজাধারীরা এর বিরুদ্ধে হৈচৈ শুরু করে। এর প্রেক্ষিতে
জনমত জরিপের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয় সরকার। জরিপের অংশ হিসাবে ২ আগস্ট ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নিপা ভবনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুত্ববাদী ও সমাজতান্ত্রিকদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে
ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা সভাপতি আব্দুল মালেক বক্তব্য রাখেন সে সভায়। সেদিন
ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে সেই আলোচনা কক্ষে তুমুল ঝড় ওঠে। পরে
প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ১২ আগস্ট ছাত্রদের নিয়ে সভা ডাকে। সেখানে আব্দুল
মালেকসহ ইসলামপন্থীদের উপস্থিতি ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবুও ইসলামী
শিক্ষা ব্যবস্থার 'ব্রান্ডিং' এর জন্য আব্দুল মালেক ছাত্র সংঘের নেতাদের
নিয়ে উপস্থিত হন সেখানে।
এই
অপরাধে ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় লাল সন্ত্রাসীরা।
রেসকোর্স ময়দানে নির্মমভাবে আব্দুল মালেককে শহীদ করা হয়। কথিত 'ঐতিহাসিক
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান' এর এই তো ঐতিহাসিক উদ্বোধন। সম্ভবত এই কমিশন আর
বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে
পরের বছর 'পাকিস্তান: দেশ ও কৃষ্টি' নামে একটি বই মাধ্যমিক স্তরে চালু করে
সরকার। বইটির লেখক মুহম্মদ সিরাজুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের
ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইসলামী
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ পান।
বইটিতে
উপমহাদেশে ইসলামের তথা মুসলমানদের ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে আবারও
ক্ষিপ্ত হয় রাম-বামরা। ওই বছর এই বইটি বাতিলের দাবিতে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের
সূত্রপাত করে তারা। এতে স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাদেরও শামিল করতে সমর্থ হয়
আধিপত্যবাদের এই দোসররা। আরেক 'স্বৈরশাসক' ইয়াহিয়াও ভারতের দালালদের চাপে
এই বইটি তুলে নিতে বাধ্য হন।
এরপর?
বাকিটা ইতিহাস। চলতি সময়ে কথা হচ্ছে 'ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান' বইটি
নিয়ে। ৬২, ৬৯ আর ৭০’র সেই গেরুয়া আর লাল সন্ত্রাসীরা নিশ্চিন্তমনে সব আদায়
করে নিয়েছে। কিন্তু আজকে শহীদ আব্দুল মালেকের উত্তরসুরীরা কি কোন আন্দোলন
গড়তে পেরেছে? সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলতি শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতিকর
দিক সম্পর্কে সচেতনা সৃষ্টি দূরে থাক, নিজেদের মধ্যেই কি কোন কর্মসূচি
নিয়েছে? মালেকের উত্তরসুরীরা কোন 'ঝটিকা' মিছিলও করেছে কি না আমার জানা
নেই। আফসোস! তৌহিদবাদী জনপদে হিন্দু লবি কাজ করে, লাল সন্ত্রাসীরা বিষ ছড়ায়; কিন্তু খোদ তৌহিদবাদীরা কিছু করতে পারে না।
২৮। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য শেষে কায়েদে আযমের সঙ্গে দেখা করতে চায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি দল। তারা
প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে করা চুক্তি উপস্থাপন করে
বাংলার পক্ষে কথা বলেন। কায়েদ বলেন সেই চুক্তি তিনি মানেন না। কারণ খাজা
সাহেবকে বাধ্য করা হয়েছিল এ চুক্তি স্বাক্ষরে। আট দফা চুক্তির আটটি দফাই
ছিল সরকারের করণীয়। আন্দোলনকারীদের করণীয় কিছু ছিল না। এটা কোন চুক্তির
সংজ্ঞায় পড়ে না।
প্রতিনিধি
দল কায়েদে আযমের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিল। তারা বলল কানাডা, সুইজারল্যান্ড
প্রভৃতি দেশে একাধিক রাষ্ট্রভাষা আছে। জিন্নাহ তা অস্বীকার করলেন। তখন অলি
আহাদ কায়েদে আযমকে অপসারণের হুমকি দেয়।
অলি
আহাদ রাষ্ট্রের গভর্নরকে বলছে- "I also know that you are the Governor
General of Pakistan. But we also know that we can appeal to #Queen for your removal."
এ
কথা শুনে সম্ভবত কায়েদে আযম ধমক দিছিলেন। তাঁর সেক্রেটারি রিভলবার উঁচিয়ে
কামরায় প্রবেশ করেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আবার ফিরে যান।
কিন্তু
এরপরও জিন্নাহ ছাত্রদের সাথে নমনীয় আচরণ করেন। এত বড় একটা হুমকি পাওয়ার পর
তিনি যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তা ঠিক হুঁশিয়ারি মনে হয় না। তিনি 'My Boys'
সম্বোধন করে বলেন, "Two men may differ on one point. let us differ
respectfully. You can go with point with constitutional way. Any
unconstitutional movement will be crushed ruthlessly."
ঢাকার নেতা খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
২৯।
"সামনে
ঈদ-উল-আজহা। মানুষের মুখে মুখে চাপা সুরে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে—এ বছর গরু
কোরবানী দেওয়া হবে। অন্যদিকে হিন্দু উকিল—মোক্তারদের একটু চিন্তাগ্রস্তই
মনে হচ্ছিল। জটাধারী এক সাংবাদিক যিনি ঢাকার ইত্তেফাক ও কলকাতার
আনন্দবাজারের রিপোর্টার, ঘনঘন কোর্ট বিল্ডিং এর আশে-পাশে ঘুর ঘুর করছেন।
সম্ভবত আন্দাজ করতে চেষ্টা করছেন কোরবানীর বিষয়টি। হঠাৎ জেলা
ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের কাছ থেকে একটা গোপনীয় চিঠি পেলাম। এতে বলা হয়েছে
যে, ঈদের নামাজের সময় যাতে শান্তি-শৃংখলা বজায় থাকে এবং বিশেষ করে
কোরবানীর ব্যাপারে যাতে শান্তি-শৃংখলা ভঙ্গ না হয় সে দিকে নজর রাখতে হবে।
ভাবলাম এখানে এর আগে কোরবানী নিয়ে কোন বিবাদ-বিসংবাদ হয়েছে বলে তো
শুনিনি।
তাহলে এই অগ্রিম দুঃশ্চিন্তা কেন? যাহোক, আমার নিজের অফিসারদের
নিয়ে একটা মিটিং করলাম। নানাভাবে জানবার চেষ্টা করলাম যে, শান্তি ভঙ্গের
কোন আশংকা আছে কিনা? কিন্তু কেউই সে রকম কোন কথা বললেন না। ব্যাপারটা নিজের
মাথায় রেখে দিয়ে চুপচাপ থাকলাম। মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সাহেবকে
জিজ্ঞেস করলাম, ‘শহরে গরু কোরবানী হয় কিনা এবং হলে কি রকম হয়, খুব ধুমধাম
করে হয় নাকি?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘এটাতো রাণী ভবানীর শহর, এখানে গরু
কোরবানী হয় না। যারা পারে ছাগল, ভেড়া কোরবানী করে। গ্রামের দিকেও তেমন
একটা শোনা যায় না কোরবানীর কথা।’ সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার কি মতলব?’
তিনি একটু বেকায়দায় পড়ে গেলেন সত্য, কিন্তু তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে
বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমি কোরবানী দেব। ঈদের দিন সন্ধ্যায় আমার বাড়ী
আপনাকে আসতে হবে।’ ধন্যবাদ জানালাম তাঁকে দাওয়াতের জন্য।
ঈদের
আর মাত্র তিন দিন বাকী। মিউনিসিপ্যাল চেয়ারম্যান, উকিল, মোক্তার, একজন
ডাক্তার এবং সেই জটাধারী সাংবাদিক (চেয়ারম্যান ছাড়া সকলেই হিন্দু) আমার
সঙ্গে দেখা করতে এলেন। জিজ্ঞেস করলাম-‘কি ব্যাপার?’ তাঁরা বললেন- ‘স্যার,
আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আপনার কাছে এসেছি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ
করার জন্য।’ ‘বলুন।’ ‘স্যার শহরের দক্ষিণ দিকে নোয়াখালী থেকে আসা কতগুলো
মানুষ বসতি স্থাপন করেছে। এরা চাষ করে খায়। প্রকাশ্যে এরা গরু জবাই করে
কোরবানী দেবে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা ভয় করছি তারা রায়ট বাধাবার
ষড়যন্ত্র করছে। স্যার, আমরা যুগ যুগ ধরে এখানে বাস করে আসছি— এরকম
অনাসৃষ্টি কোনদিন হয়নি। তাছাড়া এটা রাজা-মহারাজাদের শহর, মিউনিসিপ্যাল
এলাকার মধ্যে এই জাতীয় কাজ হলে আমরা সংখ্যালঘুরা বাস করব কিভাবে? আপনি
মহকুমার অধিকর্তা, আপনার কাছে আমরা আকুল আবেদন করছি যাতে গরু কোরবানী বন্ধ
করা হয়।’ একটা পিটিশনও তাঁরা এনেছিলেন।
সেটি আমার হাতে তুলে দিলেন। পড়ে
দেখলাম মুখে যা যা বলেছেন মোটামুটি তাই লেখা আছে। আর্জির কপি জেলা
ম্যাজিষ্ট্রেট, বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের
বরাবরে পাঠান হয়েছে। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কয়েকদিন আগে আপনারা ডিএম এবং
কমিশনার সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন নাকি?’ সকলেই চুপ। একটু পর উকিল বাবু
বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার, আমরা গত সপ্তাহে রাজশাহী গিয়েছিলাম। তাঁরা পরামর্শ
দিয়েছেন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য।’ এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে
গেল। চেয়ারম্যান সাহেব একেবারে চুপ। আস্তে-ধীরে বললাম যে, ‘কোরবানী করা
মুসলমান বিত্তবানদের ধর্মীয় অবশ্য কর্তব্য। ছাগল-ভেড়া মাত্র একজন লোক
কোরবানী করতে পারে। গরু-মহিষ হলে অন্তত সাত জন ভাগাভাগি করে তাদের এই অবশ্য
করণীয় কাজটি সমাধা করতে পারে। তাদের এই ধর্মীয় অবশ্য করণীয় কাজ করতে
সরকার বাধা দেবে কেমন করে? তাছাড়া, তারাতো যে যার বাড়ীর সামনে বা কোন
খোলা জায়গায় কোরবানী দেবে। আপনাদের তাতে আতঙ্কিত হবার তো কিছু দেখি না।’
হঠাৎ জটাধারী সাংবাদিক বলে উঠলেন, ‘স্যার, গরু হিন্দুদের পূজণীয়, তাদের
দেবতাস্বরূপ। সুতরাং গরু হত্যা করলে আমাদের মনে প্রচন্ড আঘাত লাগবে। সেজন্য
এটাকে এড়িয়ে গেলে তো সব ঝামেলা চুকে যায়।’ বললাম, ‘দেখুন হিন্দুরা
তাদের আদিযুগে অর্থাৎ আর্যদের যুগে মুণি-ঋষিদের যুগে ‘গোমেধ যজ্ঞ’ করতেন,
সোমরস আর গো- শাবকদের মাংস ভক্ষণ করতেন। আমি প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের
ছাত্র হিসেবে সে কথাইতো বইপত্রে পড়ে এসেছি। আর নিকট অতীতের কথা ধরতে গেলে
বলতে হয় গত সাত শত বছর ধরে মুসলমানরা গরু জবাই করে তার গোস্ত খেয়ে এসেছে
আর হিন্দুরা সেই গোমাতার পূজা করে এসেছে। এই দ্বন্দ্ব বেচারা নাটোরের এসডিও
কিভাবে সমাধান করবে? একদিকে সংযম অন্যদিকে সহনশীলতা সমস্যাটির একমাত্র
সমাধান। আমার তো আর কিছু জানা নেই সমস্যাটির সমাধান সম্বন্ধে।’ তাঁরা
বললেন, ‘স্যার, এতদিন মুসলিমরা গরু কোরবানী না দিয়ে পারল আর আজ গরু
কোরবানীর জন্য জিদ করছে কেন!’
—‘দেখুন
জিদের ব্যাপর নয়। আপনারা আপনাদের ধর্মীয় অনুশাসন বাদ দেবেন কিনা চিন্তা
করে দেখুন। এতদিন তারা ছিল মৃত্যুদন্ডের ভয়ে ভীত। তারপর গরু খেলে রোগ হয়-
ভীতিও ছিল। এক কথায় তারা একটা অন্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এখন তারা বুঝতে
পারছে যে, ধর্মীয় বিধান পালন করার জন্য সৃষ্টিকর্তা সহজ পন্থা বাতলিয়ে
দিয়েছে। সুতরাং সে কাজে বাধাদান কিভাবে সম্ভব? অনেকক্ষণ কথাবার্তা হবার পর
তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, রায়ট তারা করবে কেন? তারা তো গরু কোরবানী
করে নিয়ম মত অন্যদের দেবে আর নিজেরা খাবে। কেউ যদি সে কাজে বাধা দেয় তখনই
রায়টের প্রশ্ন আসে। সুতরাং রায়ট হলে মনে করব তাদের কাজে বাধা দেওয়া
হয়েছে। এবং সে বাধা নিশ্চয় কোন মুসলমান দেয়নি। তবে আপনাদের বাড়ীর
সংলগ্ন জায়গায় বা সাধারণ মানুষ চলাচলের রাস্তার উপর যাতে কোরবানী না
দেওয়া হয় সেটা আমরা নিশ্চিত করব।’ যহোক, তাঁরা চলে গেলেন। সিআই পুলিশ ও
আনসার এ্যাডজুটেন্টকে ডাকলাম। খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম শহরে এই প্রথমবারের মত
গরু কোরবানী হবে।
ঈদের
দিনের আগের সন্ধ্যায় মুন্সেফ সাহেব ও আমার সেকেন্ড অফিসারকে বলে দিলাম,
‘শহরের প্রধান জামাতে আমি উপস্থিত থাকবো না। সাত-আট মাইল দূরে এক গ্রামের
ঈদগাহে নামাজ আদায় করব।’ পরদিন ভোরে চলে গেলাম একটা পিয়নকে সঙ্গে করে ওই
গ্রামের ঈদগাহে। এই ঈদগাহটি হল একটা খালের ওপাড়ে। যখন আমি খালের এপাড়ে
হাজির হলাম। ওপাড়ের জামাত থেকে মানুষগুলো চিৎকার করছে, ‘এসডিও সাহেব কি
জয়।’ খাল পেরিয়ে বকাবকি করলাম এদেরকে। ইমাম সাহেবকে বললাম, তিনি তো
এদেরকে একটু নসিহত করলে পারতেন। ঈদের জামাতে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন ছাড়া
কারো কোন প্রশংসা একজন মুসলমান কিভাবে করে? তাছাড়া বিগত চল্লিশের দশকের
সেই ‘জিন্দাবাদ’ আর ‘জয়’—এর দ্বন্দ্বের পর শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান
প্রতিষ্ঠার ন’বছর পরেও ঈদের জামাতে ‘জয়’ শোনার জন্য মনটা সত্যিই তৈরী ছিল
না। ঈদের জামাত, তাই নিজেকে সংযত করতেই হল। সবাইকে নিয়ে সরবে আউড়াতে
লাগলাম ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহ আকবার,
আল্লাহ আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ’— মুহূর্তে পরিবেশটি আবেগময় হয়ে উঠল।
যথারীতি
ঈদের নামাজ পর্ব শেষে শহরে ফিরলাম। সব ঠিকঠাকই আছে। শহরে হ্যাঁ, রাণী
ভবানীর শহরে সম্ভবত প্রথমবারের মত তিনটি গরু কোরবানী হল মৃত্যুদন্ডের ভয়
ছাড়াই। একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার কাছে হিন্দু প্রতিনিধিরা
একথাও বলেছিলেন যে, গরুর মাংস খেয়ে হাড়গুলি যেখানে-সেখানে ফেলে দিলে
কাকরা মুখে করে হিন্দুদের বাড়ীতে ফেলতে পারে। এতে হিন্দুদের ধর্ম নষ্ট
হয়ে যেতে পারে—তারা মনে আঘাত পেতে পারে। তখন তাদের বলেছিলাম যে, ‘বেচারা
এসডিও’র কোন ক্ষমতা কাক-চিলের ওপর নেই— তারা ১৪৪ ধারার তোয়াক্কা করে না।’ এ
কথাও অবশ্য বলে দিলাম যে, ‘এত বছর তো মুসলমানরা গরু জবাই করেনি—কিন্তু
ভাগাড় থেকে মরা গরুর হাড্ডি কুকুররা হিন্দু—মুসলমান নির্বিচারে সবার
বাড়ীর আনাচে-কানাচে এনে খায় এবং ফেলে যায়— এতে তো কারো মনে আঘাত পাবার
কথা এ পর্যন্ত শুনিনি।’
সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় দাওয়াত খেতে
গেলাম। চেয়ারম্যান সাহেব বিজয়ের সুরে বললেন তেবাড়িয়ার হাট থেকে নিজে
গিয়ে গরু কিনে এনেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘জবাই দিলেন কোথায়?’ বেচারা একটু
সুর নিচু করে জবাব দিলেন, ‘কি করবো স্যার বাড়ীর উঠানে জবাই দিয়েছি।’
বললাম, ‘সর্বনাশ, এখানে আপনার একটা গরু শোয়ানর মত জায়গা কোথায়?’ বললেন,
‘কি করবো স্যার? সবদিক দেখেই তো চলতে হয়।’ বললাম, ‘আপনি, খুব ভাল কাজ
করেছেন। অন্যান্যের জন্য দৃষ্টান্ত হবে এটা। নিজের বাড়ীর লোকদের কষ্ট হলেও
অন্যের মনে যাতে আঘাত না লাগে সে কাজই আপনি করেছেন।’ নানা আলাপ-আলোচনার
মধ্যে হঠাৎ চেয়ারম্যান সাহেব আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘আমার স্ত্রী
বলেছেন বাড়ীর ভেতর গরু জবাই দেয়া হল কোন অমঙ্গল হবে না তো?’ কিছুক্ষণ
চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘প্রশ্নটা আপনার স্ত্রীর না আপনার?’ ‘না স্যার,
আমি তো এসব পাত্তাই দেই না।’ বললাম, ‘আপনার স্ত্রীকে বলবেন, এসডিও সাহেব
বলেছেন এ বাড়ীতে যে সব ভূত-প্রেত এতদিন ছিল, আজকের এই গরু কোরবানীর পর সব
এই মহকুমা ছেড়ে পালিয়ে গেছে, আর কোন দিন তারা আসবে না।’
গরু কোরবানীর কারণে কোথাও আইন-শৃংখলার কোন রকম ব্যাঘাত ঘটেনি। আর একটি থানায়ও একটি গরু কোরবানী হয়েছিল বলে খবর পেয়েছিলাম।"
_______স্মৃতির পাতা থেকে, পি এ নাজির, পৃ. ৩৬—৩৯





0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন