দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

'আলেমে দ্বীন' অর্থ কি? যেকোনো আলেমই কি 'আলেমে দ্বীন'?

 'আলেমে দ্বীন' অর্থ কি? যেকোনো আলেমই কি 'আলেমে দ্বীন'?

ওয়াজের মৌসুম চলছে। ঢালাওভাবে শুনা যাচ্ছে, 'বক্তব্য রাখবেন আলেমে দ্বীন অমুক', কাল আসবেন আলেমে দ্বীন অমুক, এইমাত্র এসেছেন আলেমে দ্বীন তমুক। আসুন বাস্তবিক অর্থে আমরা দেখি আমাদের দেশের এই আলেমে দ্বীন আসলেই কি আলেম?
পবিত্র কুরআনে বেশ কয়েক জায়গায় (الْعِلْمِ ) ইলম ,(الْعُلَمَاءُ) উলামা শব্দটি এসেছে। আলিম আরবী শব্দ যার অর্থ জ্ঞানী বা পণ্ডিত । এর বহুবচন হলো- আল উলামা । উলামা শব্দটি এসেছে সূরা ফাতির এর ২৮ নং আয়াতে (ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা)- ''আসল ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাঁকে ভয় করে।''
আর ইলম শব্দটি এসেছে 'ওয়ার রাসিখুনা ফিল ইল্ম' শব্দটি যার অর্থ- পরিপক্ষ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর মানে দাঁড়ালো- যারা পরিপক্ষ জ্ঞানের অধিকারী তারা এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তারা আলেম। তাফসীরকারকগণ বলেছেন, আল্লাহর গুন, আল্লাহর ক্ষমতা, আল্লাহর মালিকানা ও আল্লাহ প্রতাপ সম্পর্কে যিনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল তিনি আলেম।
যিনি ইলম রাখেন তিনিই আলেম। হাদীসে ইলমের আরেকটি বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাঁকে তিনি দ্বীনের বুঝ বা ‘তাফাক্কুহ ফি-দ্বীন’ দান করেন।
তাফাক্কুহ ফি-দ্বীন অর্থ হলো দ্বীনের বুঝ। কেউ দ্বীন বুঝলো, দ্বীন মানলো, দ্বীন অনুযায়ী চললো এবং সেই দ্বীন প্রচারের জন্য লোক গঠন করলো।
যেমন উমর রা কাব রহ. কে জিজ্ঞেস করলেন, প্রকৃত আলেম কে? কাব বললেন, ‘যিনি ইলম অনুযায়ী আমল করেন।‘
অর্থাৎ একজন জ্ঞানী যখনই জানবেন ‘’ন্যায়পরায়ন শাসকের একদিনের শাসন ৬০ বছরের ইবাদাতের সমান’’ তখনি তিনি ন্যায়পরায়ন শাসক নিয়োগের চেষ্টা শুরু করবেন। যখন তিনি জানবেন, ‘’অত্যাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলাও জিহাদ তখন তাঁকে সেই অনুযায়ি কাজ করতে হবে।‘’ তাওবার একটি আয়াতে এসেছে, তারা অভিযানে বের হবে, দ্বীনের জ্ঞান লাভ করবে এবং স্বজাতিকে সতর্ক করবে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, যে আল্লাহকে ভয় করেনা সে জ্ঞানী বা আলেম নয়। আরেকটি হাদীস রয়েছে, রাসূল সা. বলেন, লোকজন যদি তোমাদের মধ্যে দূর দূরান্ত থেকে আসে তাহলে তাদেরকে তাই জানিয়ে দাও যা তমরা জানো। সাবধান! জ্ঞান গোপন করবেনা।
কুরআনের এসব আয়াত-হাদীস থেকে তাই বুঝা যায়, যিনি প্রকৃত জ্ঞানী, তিনি সেই অনুযায়ী কাজ করবেন, তিনি ন্যায়পরায়ন শাসক নিয়োগের জন্য কাজ করবেন, লোক গঠন করবেন, প্রশিক্ষণ দিবেন, এই লক্ষ্যে অভিযানে বের হবেন, সেদিকেই মানুষকে সতর্ক করবেন এবং কেউ তাঁর কাছে আসলে তাঁকে তিনি দ্বীনের ইলম দন করবেন। -তাহলেই তিলি আলেম।
মিশকাতুল মাসাবিহতে এসেছে,জালেম শাসকের দরবারে যাওয়া আলেম ও গোমরাহি নেতাদের শাসনই মূলত ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য সহায়ক শক্তি ।
সুতরাং আমাদের দেখার বিষয় হলো- আমাদের সমাজের মধ্যে এরকম আলেম আছেন কিনা? আমরা যাদেরকে আলেম বলি তারা কি আসলেই আলেম? তারা বিনামূল্যে কাউকে দ্বীন শিক্ষা দেন কিনা। আল্লাহ রাসূলকে এই শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, আপনি বলুন এ সত্য প্রচারে আমি কোনো বিনিময় চাইনা।
আর আমাদের কথিত আলেম সমাজ 'বিনিময়' নেন, জালেম শাসকের কাছে যান, না গেলেও তার আচার ব্যবহার সম্মন্ধে আলহামদুলিল্লাহ ধারণ পোষণ করেন,তারা ইসলামী শাসকের জন্যও কাজ করেন না ।
আমাদের জেনে রাখা উচিত , দ্বীনের শুধু জ্ঞান-ই মূল জ্ঞান নয়। দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞানই মূল জ্ঞান। আর প্রকৃত জ্ঞান হলো, জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করা। আর যিনি জ্ঞানী তিনিই আলেম। আর তিনিই আলেম যিনি ইলমের দাবি অনুযায়ী মাঠে ময়দানে ইলম প্রতিষ্টার জন্য কাজ করেন।
সুতরাং মাদ্রাসায় পড়লেই, ওয়াজ করলেই, আলেম সমাজ কাউকে আলেম বললেই আপনারা তাঁকে আলেম বলবেন না। আলেম হতে হলে কমপক্ষে উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো মানতে হবে। এটা হলো সর্বনিম্ন।
আর ‘দ্বীন’ এর আলেম—এটা তো আরো ব্যাপক। শুধু এটুকু বলা যায় দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞান (তাফাক্কুহ ফি দ্বীন) অর্জন করলেও 'দ্বীন' এর আলেম হওয়া যায়না। যিনি কুরআনের সার্বিক বা সামগ্রিক বিষয় প্রতিষ্টার জন্য আন্দোলন করেন তিনিই দ্বীনের আলেম।
রাসূল সা. এর বহুল প্রচলিত হাদীস, আলেমরা নবীর উত্তরাধিকার। তো আপনাদের কি মনে হয় নবী কাদেরকে এই কথা বলেছেন? কে নবীর প্রকৃত উত্তরাধিকার -যিনি অধিক জেনে গুম হয়ে বসে থাকেন অথবা কোনো কিছুর বিনিময়ে জ্ঞান দান করেন তাকে নাকি যিনি অধিক জেনে সেই অনুযায়ী কাজ করে, সেই কাজ প্রতিষ্টার জন্য লোক নিয়োগ করেন এবং জালেমদের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন শুরু করেন তাকে?
আমাদের নবী ছিলেন সর্বশেষ বার্তাবাহক। আর তিনি পরিপূর্ণভাবে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কখনোও আংশিক কাজ সম্পন্নকারীদেরকে নিজের উত্তরাধিকার হিসেবে বলে যাবেন না। তাদেরকেই বলবেন, যারা এই অনুযায়ী কাজ করে এবং প্রতিষ্টার জন্য জান-মাল সপে দেয়।
Share:

ইসলামপন্থী ও অনুগত নাগরিক : আমার দৃষ্টিভঙ্গি

পন্থা মানে কি? সহজ ভাষায় Way- পথ-পদ্ধতি, রীতিনীতি। কোনো কাজ সমাধানের জন্য যে পথ অনুসরণ করা হয় তাকেই পন্থা বলে।

পন্থী মানে কি? পন্থার অনুসারীকেই পন্থী বলে।
পন্থা অর্থ যদি পথ বা পদ্ধতি হয় তাহলে এই পথ এর অর্থ কি?
পথ বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন নদী পাড়ি দেয়ার জন্য কেউ 'নৌকা' ব্যবহার করবেন অথবা কেউ পাড়ি দেয়ার জন্য সাতার'রের পথ বেছে নিবেন। That is up to him.
মূলত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই পন্থার ব্যবহার করতে হয়। এখন মূল বিবেচ্য হলো, কার কি উদ্দেশ্য। যেমন, বামপন্থীদের উদ্দেশ্যে তাদের নির্ধারিত এজেন্ডা বাস্তবায়ন, নাস্তিকদের উদ্দেশ্য তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন। ফরাসি বিপ্লবের উদ্দেশ্যে ছিল বিপ্লবের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন।
ঠিক তেমনিভাবে ইসলামের কিছু উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য প্রতিষ্টা করার জন্যও আমাদের কিছু 'পথ' বেছে নিতে হয়। সুন্নাত শব্দের অর্থ হলো- চলার পথ, কর্মের নীতি ও পদ্ধতি। কুরআনে বলা হয়েছে, তুমি আমাদের সোজা পথ দেখাও। সুতরাং ইসলামের কাজ করার জন্য যে পথ ও পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় তাকে বলে ইসলামেরপন্থা বা ইসলামপন্থা। আর যিনি এই পন্থার অনুসরণ করেন তাকেই বলে এই পথের পথিক বা ইসলামপন্থী।
তাহলে সোজাসাপটা বললে দাঁড়ায় ইসলামপন্থী মানে হলো নবীর সুন্নাত, কর্মনীতি অনুসরণ করার মধ্যে দিয়ে, আল্লাহর দেখানো পথে পরিচালিত করার যে বাস্তব কর্মসূচি তাকে।এখন দেখার বিষয় ইসলাম আমাদের জন্য কেমন পথ? এটাকি সার্বিক পথ নাকি আংশিক পথ? কেউ ইসলাম পুরোপুরি মানলে তাকে ইসলামপন্থী বলবো নাকি আংশিক মানলে ইসলামপন্থী বলবো? খন্ড খন্ড ইসলাম মানার মধ্যে দিয়ে কি তিনি ইসলামপন্থী হতে পারবেন? বনী ঈসরাইলের ৮০ নং আয়াত দেখলে আমরা কয়েকটা তামাদ্দুনিক বিষয় দেখতে পাই। এক. আল্লাহ সত্যের সাথে আমাকে বের করুন। দুই. সত্যের সাথে আমাকে নিয়ে যাও। তিন. শক্তিশালী রাষ্ট্র দান করো।
সহজ ভাষায় এই হলো, ইসলামের পথ। সত্যের সহিত একটি ইসলামী তামাদ্দুনিক রাষ্ট্র দান করুন যেখানে আমি আমার উম্মতদের তোমার বিধান অনুযায়ী হেদায়েতের পথে পরিচালিত করবো। তার মানে দাওয়াত তাবলীগ, হাদীস দারস, মাসয়ালা মাসায়েল ও তাফসীর, ফিকহ সহ রাষ্ট্রীয় তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা।রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি, সভ্যতা ও তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা মূলত নবীদের মৌলিক উদ্দেশ্যে। কেননা উক্ত আয়াতে মূল কথা বলা হয়েছে, আমাকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রদান করুন।
মোটাদাগে এই হলো কোনো পন্থার বা পন্থী'র মূল কাজ। তাহলে ইসলামের মৌলিক এই কাজ বাদ দিয়ে কোনো আলেম, শায়খ কিংবা ফেইসবুক সেলিব্রিটি, বই লেখক কিভাবে 'ইসলামপন্থী' হয়ে যান?তিনি বড়জোর হতে পারেন যেকোনো রাষ্ট্রের অনুগত একজন নাগরিক। যে রাষ্ট্র ফাসেক হলেও তাকে গ্রহণ করে নেবে, দূর্নীতিবাজরাও গ্রহণ করে নিবে। তিনি অত্যাচারীদের জন্য হুমকী হবেন না, অত্যাচারী শাসকরাও তার জন্য হুমকী হবেনা।
নাগরিক বলা হয় তাকেই যিনি ইসলামের মিশন ও পন্থা নিয়ে কাজ করা ছাড়া, নিজে সেই দেশের সব বৈধ অবৈধ আইন মেনে নিয়া বাস করেন। একইসাথে যারা সেই রাষ্ট্রের অবৈধ ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে সৎ লোকের শাসন ও আল্লাহর আইন জারি করতে চায়না, এবং এই অনুযায়ীই কাজও করেনা তাকেও সাধারণ নাগরিক বলা হয়।
Share:

বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা-পীর-মাশায়েখ - জুলফিকার আহমদ কিসমতি

বইটি একটি জীবনীগ্রন্থ বলতে পারেন গত শতাব্দীর বাংলার বিখ্যাত আলেমদের জীবনী এখানে সংকলন করা হয়েছে। মাওলানা মহিউদ্দিন খান (রহঃ) সম্পাদিত এ বইটি থেকে আপনারা অনেক অজানা তথ্য জানতে পারবেন বলে আশা করছি ।


এই বইটিতে যাদের জীবনে আছে তারা হলেন, হাজী শরীয়ত উল্লাহ, পীর মইনুদ্দীন আহমদ দুদু মিয়া, পীর বাদশা মিয়া, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর,  মুন্সী মেহেরুল্লাহ,  ফুরফুরার পীর আবু বকর সিদ্দিকী, মাওলানা রুহুল আমিন,  মাওলানা নেছার উদ্দিন আহমেদ ( শর্ষিনার পীর সাহেব) ,  মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ,  মাওলানা আব্দুল্লাহ আল কাফী, শহীদ মাহমুদ মোস্তফা আল মাদানী, জ্ঞানতাপস মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, সুফি রাজনীতিক মাওলানা আতহার আলী, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মুফতি দীন মোহাম্মদ খাঁ, মুফতী সাইয়েদ মুহাম্মদ আমি আমিমুল এহসান, মাওলানা আলাউদ্দিন আল আজহারী, মাওলানা ওবায়দুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা আব্দুল মজিদ খাঁ,  মাওলানা আব্দুল আলী ফরিদপুরী,  মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, খতিবে আজম মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ,  মাওলানা শৈখ মোখলেছুর রহমান, পীর মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর, মাওলানা তাজুল ইসলাম ও মাওলানা ফয়জুল্লাহ।

ডাউনলোড করুন Direct link (Compressed size-53 MB)
ডাউনলোড করুন direct link (Original Size - 140 MB)

ডাউনলোড করুন Drive Link (Compressed size-53 MB)
ডাউনলোড করুন Drive Link (Original Size - 140 MB)





Share:

দ্বীনের (دين) কাজ কাকে বলে? কোন কাজ الدِّیْنَ 'আদ-দ্বীন' এর কাজ?

দ্বীনের (دين) কাজ কাকে বলে? কোন কাজ الدِّیْنَ 'আদ-দ্বীন' এর কাজ?

আকিদার আলাপ উঠেছে। এগুলো আজীবন ই চলবে। এই আলোচনা গুলো এক সময় সীমাবদ্ধ ছিল মুসলমান দার্শনিকদের মধ্যে দর্শনগত আলাপে। যেমন আশয়ারী, মাতুরিদি ও আছারী এই তিনটা শাখাই মূলত তাদের ব্যক্তিগত দর্শন, চিন্তা ও গ্রীকদের পালটা ন্যারেটিভ ডিবেট ছিল।
কিন্তু এখন নৈরাশ্যবাদী, বৈরাগ্যবাদী ও মিশ্র জাহালিয়াত লালনকারী আলেম ওলামা একে করে ফেলেছেন আকিদার অংশ। তাও 'আকিদা' বললে সমস্যা ছিলনা কিন্তু তারা 'আকিদা' নামক এই নবশব্দকে বানিয়ে নিয়েছেন 'দ্বীনের মৌলিক' শব্দ। সমস্যা এখানেই। সবক্ষেত্রেই 'দ্বীন' শব্দ ব্যবহারেই আমার নোকতা।
যেকেউ ধুম করে যেকোনো ব্যক্তি, বা কাজকে দ্বীনি ব্যক্তি, দ্বীনি ভাই,দ্বীনের দায়ী কিংবা দ্বীনের কাজ বলতে পারেননা। ওয়াজ করলেই, ইসলামী বই করলেই, লিখলেই কেউ দ্বীনি ভাই বা দ্বীনের দায়ী হয়ে যেতে পারেন না। কারণ দ্বীন শব্দটা আসলে ব্যপক।
আপনারা যেকোনো জ্ঞানী আলেম, তাহকীক জানেন, উসুল জানেন, মুফাসসির, মাদ্রাসার মুহতামিম কিংবা কোনো ইসলামী চিন্তাবিদকেও 'দ্বীনের দায়ী' বলতে পারেননা। এর কারণ সুক্ষ্মভাবে চিন্তা করা লাগবে।
আরো স্পষ্ট করে যদি বলি যেমন, মাদ্রাসা পাশ কোনো এক হুজুর যখন কোনো এক শায়খকে 'দ্বীনের দায়ী' বলেন। অথবা সালাফী আলেম যখন এ দেশীয় কওমী আলেম কাউকে 'দ্বীনের দায়ী' বলেন। তখনই আমার সমস্যা হয়। কারণ এরা উভয়ই 'দ্বীন' শব্দের ভূল অর্থ ব্যাখ্যা করছেন।
কেন এদেশের অনেক আলেম 'দ্বীনের দায়ী' নয় তা কুরআন দিয়ে বিচার করা লাগবে।
আরবীতে دين শব্দটির কয়েকটি অর্থ আছে। যার এক অর্থ হলো-প্রভূত্ব ও প্রাধান্য, শক্তি ও আধিপত্য। দুই. আনুগত্য ও দাসত্ব। তিন. প্রতিফল ও কর্মফল এবং চার. পথ পন্থা ব্যবস্থা ও আইন।
সূরা আলে ইমরানে যেভাবে এসেছে- ইন্নাদ্দিনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম। অর্থ-ইসলাম আল্লাহ‌র নিকট একমাত্র দ্বীন বা জীবন বিধান।
এখানে যদি আমরা ভালোভাবে খেয়াল করি তাহলে দেখবো যে, আল্লাহ বলেছেন الدِّیْنَ অর্থাৎ একমাত্র দ্বীন। শুধু দ্বীন বলেননি। যদিও শুধু দ্বীন বললেও হয় তবুও আল্লাহ আদ-দ্বীন বলেছেন। আমি যদি আরোও সহজ করে বুঝাই তাহলে ব্যাপারটি দ্বারায় এভাবে।
আরবীতে যখন আমরা বলি, 'বাইতুন' (بيت) তখন এর অর্থ দ্বারায় 'একটি ঘর'। কিন্তু সেই 'বাইতুন' (بيت) কে যদি আমরা 'আল বাইত' (البيت) বলি তাহলে অর্থ দ্বারায় 'ঘরটি'। অর্থাৎ প্রথমটির অর্থ- একটি ঘর আর দ্বিতীয়টির অর্থ- ঘরটি মানে এটিই একমাত্র ঘর।
ঠিক তেমনি আল্লাহ বলেছেন, আদ-দ্বীন(الدِّیْنَ) মানে হলো- একমাত্র পথ। দ্বীন (دين) অর্থ পথ। যেকোনো পথ হতে পারে। আর আদ-দ্বীন অর্থ একমাত্র পথ। এখন কথা হলো ইসলাম আমাদের জন্য 'একমাত্র পথ' কি- না। জ্বী,একমাত্র পথ। আল্লাহ আদ-দ্বীন বলে আর কোনো সুযোগ রাখেননি।
প্রশ্ন হলো, যদি ইসলাম একমাত্র পথ হয়ে থাকে তাহলে তো সেইপথে সবকিছুই বিদ্যমান থাকবে। ইসলামে কি আসলেই সব কিছুর সমাধান আছে? হ্যা, ইসলামে সব কিছুই বিদ্যমান আছে।
যেমন, ইসলামে আনুষ্ঠানিক ইবাদাত ছাড়াও আছে রাজনীতি, আইন, বিচারনীতি, অর্থনীতি,সমাজনীতি,রাষ্ট্রনীতি, জীবনব্যবস্থা, দর্শন-ধ্যাণ,সাহিত্য, সংস্কৃতি, যুদ্ধ ও সন্ধি,আন্তর্জাতিক নীতি সহ সবকিছুই ইসলামে আছে।
সুতরাং 'দ্বীন' শব্দের মধ্যে সবই আছে। কেউ দ্বীনের দায়ী হতে হলে তাকে প্যাকেজ হওয়া লাগবে। তাকে রাজনীতি করতে হবে। তাকে করতে হবে রাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতির রাজনীতি। তাকে একটা রাষ্ট্র ও সমাজে যা যা ফাংশন করা লাগেব সেই সবকিছুতেই ইনভলভ হওয়া লাগবেই। অন্তত তাকে উক্ত প্যাকেজগুলো ফাংশন করতেই হবে।
আর আমরা জানি একটা রাষ্ট্রের মধ্যে মানুষের যা যা প্রয়োজন সবই বিদ্যমান আছে। সুতরাং আধুনিক সময়ের এই রাষ্ট্রের সব উপাদান ই কুরআনে বর্ণিত 'দ্বীন' শব্দের মোটামুটি কাছাকাছি উপাদান। এর বাহিরে রাষ্ট্র ও পৃথিবী যত বড়ই হবে 'দ্বীন' শব্দটি সেই সব শক্তিকেই কাভার করবে।
এবং যিনিই এই প্যাকেজ কাজ গুলো কায়েম করতে চান, যিনি এইসব কাজকে আল্লাহর রেযামন্দীতে নিয়ে আসতে চান। মানবজীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগকে যিনি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের অনুগত করতে চান, রাসূলের সা. এর নবুয়্যতের হেদায়েত দিয়ে সাজাতে চান তিনিই কেবল 'দ্বীনের দায়ী' হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
এছাড়া ওয়াজ করলে,মাদ্রাসায় পড়ালে, শায়খ লকব ধারণ করলে, মাসয়ালা জানলে, তাহকীক জানলে, হাদীস লিখলে, কুরআন অনুবাদ করলেই তাকে দ্বীনের দায়ী বলা যাবেনা। দ্বীনের দায়ী একমাত্র তিনিই যিনি রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে আবাদ করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেন ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতি করেন এবং পৃথিবীতে ইসলামকে একটি ডমিন্যান্ট পবিত্রতাবাদী শক্তি হিসেবে আবিষ্কার করতে চান।
Share:

যে কাউকে ইসলামপন্থী বলা যাবে কি?

ইদানীং 'ইসলামপন্থী' শব্দটাকে এতবেশি পঁচানো হয়েছে যে, একে প্রজেক্ট, মানবসেবা, জীব সেবা ইত্যাদিতে পরিণত করা হয়েছে। যেন ইসলামপন্থী মানে 'জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ইশ্বর।'

ইসলামপন্থী কি? কাকে ইসলামপন্থী বলে? আমরা কি যে কাউকেই ইসলামপন্থী বলতে পারি? যিনি মাজারে গিয়ে ৫ টাকা দান করেন তিনিও বলেন যে, আমি ইসলামের জন্য দিয়েছি। তাহলে তাকে কি ইসলামপন্থী বলা যাবে? প্রকৃত ইসলামপন্থী কে আসলে? কিইবা প্রকৃত ইসলামপন্থা?

যে ব্যবস্থা মুসলমানদের, আইন-আদালত, দর্শন-ধ্যান ধারণা, ধর্ম ও নৈতিকতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, সভ্যতা ও সমাজব্যবস্থা, যুদ্ধ ও সন্ধি, চরিত্র ও আচরণ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক নীতি সহ মানবজীবনের গোটা ব্যবস্থাকে আল্লাহর দাসত্ব ও নবীর হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সেই ব্যবস্থাকেই বলে ইসলামপন্থা।

আর যিনি এই ব্যবস্থাকে মনে প্রাণে ধারণ করেন তিনিই একমাত্র ইসলামপন্থী। সুতরাং বুঝা গেল, ইসলামপন্থা একটা বড় জায়গা ও ইসলামপন্থী একজন মহৎ মানুষ।

সুতরাং যে কাউকে ইসলামপন্থী বলা থেকে দূরে থাকুন।

Share:

মরুসিংহ উপন্যাস পিডিএফ

 

১৬ সেপ্টেম্বর সকাল নয়টা। পূর্ব থেকেই খােলা ময়দানে ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। সকাল হতেই গোল করে হাজার হাজার লিবীয় ফাঁসির মঞ্চের চতুর্দিকে জড় করা হলো। পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম হাজার হাজার। মানুষের সম্মুখে কোন জননন্দিত নেতাকে ফাসিকাষ্ঠে ঝুলানো হল । এই ফাঁসি অবলোকন করানোর জন্য সেদিন ইতালী সরকার প্রায় বিশ হাজার মানুষকে সমবেত করেছিল। দুধের শিশুসহ আশীতপরায়ণ বৃদ্ধাও ছিল ওই বিশ হাজার মানুষের মনে। কড়া পাহারা চতুর্দিকে। অসংখ্য সৈন্য অস্ত্র হাতে বিশ হাজার মানুষকে নিশ্চুপ রেখেছে। পিনপতন নিস্তব্ধতা। প্রাণপ্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য সকলে উদগ্রীব। তাদের অন্তরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটি নাম "ওমর মুখতার, ওমর মুখতার!! কিন্তু মুখফুটে উচ্চারণ করতে পারছে না | কড়া প্রহরায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অসাংবাদিত নেতা ওমর মুখতাবকে ফাঁসির মঞ্চে আনা হল । তিনি সমবেত জনতার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন । ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে অনেকে। অনেকে চোখ মুছছে আস্তিন দিয়ে। অনেকে ঠোট কামড়ে কান্না রোধ করার চেষ্টা করছে। অথচ তারা শব্দ করতে পারছে না । ওমর মুখতারের হাত পায়ে বাধন খুলে দেয়া হল। ধীরে ধীরে তাকে ফাসির দড়ির নিকট আনা হলাে।
 
ওমন মুখতার জাল্লাবিয়ার পকেট হতে ছােট মু্সহাফটি বের করলেন। ক’মিনিট স্থির ভাবে তিনি পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করলেন করলেন। তাকে এবার ফাঁস লাগানাে সিড়ির উপর উঠান হল। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে কটি কথা বললেন, যা জনতার সম্মখে বসে থাকা ব্যক্তিরা দ্বাড়া কেউ শুনতে পেল না । তিনি বললেন- “আমরা কখনাে আত্মসমর্পণ করবো না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ও কখনাে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। বীরের নেয় মৃত্যুবরণ করা অনেক উত্তম পরাধীনতার জীবন থেকে । এরপর ফাঁসির মঞ্চে তার গলা পরিয়ে দেয়া হল। তিনি উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করলেন “আশহাদু আল্লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহ লাশারিকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসূল।" | সমবেত জনতার অনেকে দৃষ্টি অবনত করলো । এ দৃশ্য দেখা যায় না। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। কষ্টে তাদের বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু তব্যক্ত করতে পারছে না। তারাও মৃদু স্বরে কালিমা শাহাদাৎ পাঠ করছে। সামরিক অফিসার জাল্লাদকে নির্দেশ দিলেন ফাসি কার্যকর করতে ।  অভিনব কায়দায় তৈরি ফাঁসির মঞ্চে একটি চাকা ঘুরাল জ্ল্লাদ । হঠাৎ পায়ের নিচের থেকে সরে গেল কাঠ । শূন্যের উপর ফাসিতে ঝুলে রইলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুজাহিদ ওমর মুখতার। | বিশ হাজার মানুষ আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে বিশাল ময়দান কেঁপে উঠলো । ইতালী সৈন্যদের অন্তরে ভয়ের সঞ্চার ঘটলো। তাদের আচরণে সেই ভয়ের স্পষ্ট ফুটে উঠলে! । ডাক্তার পরীক্ষা করে রিপাের্ট দিলেন ওমর মুখতার এখনো মরেনি পুনরায় তাকে ফাঁসি দেয়া হলো । জনতার মধ্যে ততক্ষনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
 
আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠছে। তাদের সামাল দিতে কয়েক হাজার ইতালী সৈন্যের বেগ পেতে হচ্ছে। সেই সাথে তাদের চেহারায় ও ফুটে উঠেছে ভয়ের ছাপ । সবকিছু দ্রুত করার চেষ্টা করছে তারা।ডাক্তার পরীক্ষা করে এবার তাঁকে মৃত ঘোষণ করলেন। সাথে সাথে ফাসিকাষ্ঠে হতে ওমর, মুখতাবের পবিত্র দেহ নামিয়ে নেয়া হলো । ঝটপট পাশে রাখা একটি খালি ট্রাকে উঠানো হলো । স্রোতের ন্যায় জনতা চারদিক থেকে এগিয়ে আসছে। সামরিক অফিসারাও ঝটপট গাড়িতে উঠে বসলাে । গাড়ি ছেড়ে দিল । জনতাকে সামাল দিতে দিতে সৈন্যরাও এক এক করে গাড়িতে উঠে বসলাে।
 
খালি ফাঁসির মঞ্চে পড়ে রইল । আর নিথর দাড়িয়ে রইল বিশ হাজার বেদনা বিধুর নিরীহ মানুষ। তাদের মুখে ভষা নেই । চোখের অশ্র শুকিয়ে গেছে। তারা স্বচক্ষে দেখলেও বিশ্বাস করতে পারছে যে, তাদের প্রাণাধিক প্রিয় নেতা ওমর মুখতার আর নেই। তাদের বিশ্বাস ওমল মুখতাব মতে পারে না। ওমর মুখতার প্রতিটি লিবিয়ার জনগণের অন্তরে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম জীবিত। মাঠ তখন অনেক খালি হয়ে এসেছে । শাতিলার কোল থেকে আব্দুল্লাহ জোর করে নেমে পড়লো, তারপর এক ফাঁকে ফাঁসির মঞ্চে উঠে পড়ল। ফাসিকাষ্ঠে দোল খাওয়া অবস্থায় আস্তিন হতে তাঁর প্রিয় চশমাটি পড়ে গিয়েছিল । আব্দুল্লাহ সেই চশমা উঠিয়ে নিল । শাতিলা দৌড়ে এসে আদুল্লাহকে বুকে জড়িয়ে ধরলাে। আব্দুল্লাহ চশমাটি চোখে পরলো ।
 
:দেখতো মাম্মা! আমাকে ওমর মুখতারের মত লাগছে না?
:হা বাবা তোকে ওমর মুখতারের মত দেখাচ্ছে।  তুই এ যুগের ওমর মুখতার….

এই উপন্যাসটি আমার জীবনের প্রথম পড়া উপন্যাস।  ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় উপন্যাসটি পড়েছিলাম। “মরুসিংহ” উপন্যাসটি শেষ অংশটুকু পড়ার সময় অনেক কেঁদেছিলাম । উপন্যাসটি মূল থিমটি ভুলে লাগিয়েছিলাম কিন্তু শেষ অংশটুকু আমি কখনো ভুলতেপারিনি। অনেকদিন পর উপন্যাসটি খুঁজে পেয়েছি এবং পিডিএফ করেছি। আপনারা চাইলে পড়তে পারেন।

ডাউনলোড লিংক


উপন্যাসের নামঃ মরুসিংহ

লেখকঃ মাসুউদ

প্রকাশনাঃ সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান পত্রিকা

Share:

মহান সেনুসি আন্দোলন

পবিত্র নগরীর উত্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আবু কুবাইস পাহাড়-বহু প্রাচীন উপকথাও ইতিকথার কেন্দ্র। এছাড়া , যেখানে  ছিল মুকুটের মত  দুটি নিচু মীনার সম্বলিত একটি ছোট্ট চুনকাম করা মসজিদ, সেখান থেকি নীচের দিকে তাকালে একটি চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে মক্কা উপত্যকার, যার ঠিক তলদেশেই রয়েছে বর্গাকার কা’বার মসজিদ এবং বার্ণাঢ্য, ইতস্তত ছড়ানো রংগশালার মতো ঘরবাড়ি, যা সকল দিকে পাহাড়ের নগন্ন শিলাময় ঢালু বেয়ে যেনো উঠে আসছে উপরের দিকে। আবু কুরাইস পাহাড়ের চূড়ার নীচেই রয়েছে এক সারি পাতুরে দালান, যা সংকীর্ণ সমতল খাঁজ থেকে ঝুলছে এক গুচ্ছ ঈগলে নীড়ের মতোঃ সেনুসি ভ্রাতৃ-সংঘের মক্কী কেন্দ্র । 

এখানে যে বৃদ্ধ লোকটি রয়েছে তাঁর নাম সারা মুসলিম জগতে মহশুর মহান সেনুসি সৈয়দ আহমদ । এখানে তিনি একজন নির্বাসিত ব্যক্তি । দীর্ঘ ৩০ বছরের সংগ্রাম এবং কৃষ্ণসাগর ও ইয়েমেনের পর্বতগুলির মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর সাত বছর ছুটাছুটির পর সাইরেনিকায় তাঁর নিজের ফিরে আসার সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । যার নামে আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শাসকদের বিনিদ্র রজনীর কারণ ছিলো । ধর্ম এবং আযাদীর জন্য আপোসহীন যোদ্ধা, যিনি আগিয়ে চলেছেন বার্ধক্যের দিকে, তাঁর সুন্দর ভ্রূ-জোড়ার উপর খোদিত দেখতে পেরাম দুঃখ –যন্ত্রণার ছাপ। সামান্য সাদা দাড়ি এবং যন্ত্র্যণা-চিহ্ণিত গভীর রেখার মধ্যে ইন্দ্রিয়গতভাবে সুচতুর মুখের অধিকারী আহমদের মুখমণ্ডল ছিলো ক্লান্ত। চোখের পাতা একান্তভাবেই ঝুলে আছে চোখের উপর, যার জন্য মনে হয় চোখ দুটি যেনো ঘুমে ঢুলছে। তাঁর কণ্ঠস্বরের ধ্বনিও দুঃখ- বেদনায় একই রমক মোলায়েম ও ভারাক্রান্ত। কিন্তু কখনো কখনো তার মধ্যে হঠাৎ উদ্দীপনা জেগে ওঠে; তখন চোখ দুটি তাঁর হয়ে ওঠে জ্বলজ্বললে, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয় প্রসাদগুণ, সংগীতের কম্পন এবং তাঁর সাদা চৌগার ভাঁজের ভেতর থেকে উর্ধ্বে উত্থিত হয় একটি বাহু, ঈগলের ডানার মতো!

তিনি এমন একটি ভাবাদর্শ , এমন একটি মিশনের উত্তরধিকারী যা কার্যে পরিণত হলে হয়তো বা আধুনিক ইসলামে একটি পুনরুজ্জীবন ঘটতো ।  বয়সের এবং অসুস্থতা সত্ত্বেও এবং তাঁর জীবননের উদ্দেশ্য বানচাল হলেও উত্তর আফ্রিকার এই মহান বীর তাঁর উজ্বল দীপ্তি হারান নি। তিনি জানতেন, ইসলামের সত্যিকার মর্মানুযায়ী ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের আকাংখা-যা সেনুসি আন্দোলনের লক্ষ্য মুসলিম জাতিগুলির হৃদয় থেকে কখনো তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

সৈয়দ আহমদের দাদা ছিলেন মাহন আলজিরীয় পণ্ডিত মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সেনুসি,(উপনামটি বানু সেনুস গোত্র থেকে গৃহীত, যে গোত্রে জন্ম হয়েছিলো তাঁর) যিনি এই শতকের প্রথমার্ধে স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি ইসলামী ভ্রাতৃসমাজের যা একদিন সত্যিকার এক ইসলামী কমনওয়েলথ(স্বাধীন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী আন্তর্জাতিক সংগঠন) প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দেবে। বহু বছর বহু আরব দেশে ঘুরে বেড়ানো ও পড়াশোনার পর মুহাম্মদ ইবনে আলী সেনুসি তরীকার প্রথম ‘জাভিয়া’ বা মোকাম স্থাপন করেন মক্কায় আবু কুবাইস পাহাড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হেজাজের বেদুঈনদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক অনুসারী পেয়ে যান । অবশ্য তিনি মক্কায় বসে থাকলেন না, তিনি ফিরে গেলেন উত্তর আফ্রিকায়, শেষ পর্যন্ত সাইরেনিকা ও মিসরের মধ্যবর্তী মরুভূমিতে অবস্থিত যাগবু নামক এক মরূদ্যানে, স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। ওখান থেকেই তাঁর বাণী বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো সারা লিবিয়াতে এবং লিবিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে । তিনি যখন ১৮৫৯ সালে ইন্তেকাল করেন, তখন সেনুসিদের (এই তরীকার সকল লোকই এই নামে পরিচিতি হয়ে ওঠে) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এক বিশাল রাষ্ট্র-ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে শুরু করে বিষুব অঞ্চলের আফ্রিকার গভীরে এবং আলজিরীয় সাহারার তুয়ারেগ নামক অঞ্চল অবধি।

অবশ্য রাষ্ট শব্দটি দ্বারা এই অনুপম সৃষ্টির নিখুঁত বর্ণনা হয় না, কারণ মহান সেনুসি কখনো তাঁর নিজের জন্য কিংবা তাঁর বংশধরদের জন্য একটি ব্যক্তিগত শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাননি; তাঁর লক্ষ্য ছিলো ইসলামের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি সাংগঠনিক বুনিয়াদ তৈরি করা। তুর্কীর সুলতানকেই তিনি ইসলামের খলীফা বলে মেনে নিতে থাকেন। তিনি তাঁর সমস্ত প্রয়াস নিয়োজিত করলেন বেদুঈনদের ইসলামের মূল শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে, যা থেকে ওরা দূরে সরে গিয়েছিলো অতীতে, এবং তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সেই উপলব্ধি আনতে যা ছিলো কুরআনের লক্ষ্য, কিন্তু বহু তকের গোত্রীয় দ্বন্ধ সংঘর্ষের ফলে লোপ পেয়েছিলো বহুলাংশে। 

উত্তর আফ্রিকার সর্বত্র যে বিপুল সংখ্য জাভিয়া গড়ে উঠলো সেনুসিরা সেগুলি থেকে তাদের বাণী বহন করে নিয়ে গেলো বৃহত্তম অঞ্চলের গোত্রগুলির কাছে এবং কয়েক যুগের মধ্যেই প্রায় এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনে দিলো আরব ও বারবার, উভয়ের মধ্যে।  ধীরে ধীরে অতীতের আন্তগোত্রীয় অরাজকতার অবসান ঘটলো এবং মরুভূমির এককালের উচ্ছৃংখল যোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়ে উঠলো পারস্পরিক সহায্যের আন্তরিকতায়, এতোকাল তাদের নিকট যা অপরিচিত। জাভিয়াগুলিতে তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা পেলো-কেবল ইসলামী শিক্ষা নয়, বহু ব্যবহারিক শিল্প এবং হাতের কাজেও , যা আগে নিন্দার চোখে দেখতো যুদ্ধবাজ যাযাবরেরা। শত শত বছর ধরে যেসব এলাকা ছিলো বন্ধ্যা সেসব অঞ্চলে আরো বেশি এবং আরো উন্নত ধরনের কুয়া খনন করতে ওদের উৎসাহিত করা হলো, আর সেনুসি পরিচালনায় ধূসর মরুভূমির বুকে সমৃদ্ধশালী বসতি গড়ে উঠতে লাগলো, দূরে দূরে, একেকটি বিন্দুর মতো। তেজারতিকে উৎসাহ দেওয়া হলো এবং সেনুসি ব্যবস্থার ফলে যে শান্তি-শৃংখলা এলো তার ফলে সে-সব অঞ্চলেও সফর সম্ভব হলো যেখানে অতীতে কোনো কাফেলার পক্ষেই আগানো ছিলো অসম্ভব লুণ্ঠিত না হয়ে। 

সংক্ষেপে, এই তরীকার প্রভাব সভ্যতা এবং প্রগতির জন্য এক প্রচণ্ড প্রেরণা হয়ে দাঁড়ালো; অন্যদিকে, ওদের অনঢ় ধর্মনিষ্ঠা, পৃথিবীর এ অংশের লোকদের অতীতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে এই নতুন সমাজের নৈতিক মানকে তা থেকে উন্নীত করলো অনেক উপরে। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ, গোত্র এবং গোত্রের সর্দারেরা স্বেচ্ছায় মেনে নিলো মহান সেনুসির রূহানী নেতৃত্ব; এমনকি, লিবিয়ার উপকূলভাগের শহরগুলির তুর্কী কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত দেখতে পেলো, এ তরীকার নৈতিক নেতৃত্বের ফলে তাদের পক্ষে এককালের ‘দুর্ধর্ষ ’বেদুঈন গোত্রগুলির সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অনেক বেশি সহজ হয়েছে। আল্লামা আবুল আসাদের মতে "রাসূলের সময় থেকে মুসলিম বিশ্বের কোথাও এমন ব্যাপক আকারের কোনো আন্দোলন আর দেখা যায়নি, যা এই সেনুসি আন্দোলনের মতো ইসলামী জীবন পদ্ধতির এতোটা নিকট, এতোটা কাছাকাছি পৌছেছিলো!"

এই শান্তিপূর্ণ যুগ উনিশ শতকের শেষ কোয়ার্টারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো যখন ফ্রান্স দক্ষিণদিকে আগাতে শুরু করলো আলজিরিয়া থেকে বিষুব আফ্রিকার দিকে, আর ধাপে ধাপে দখল করতে লাগলো সেসব অঞ্চল , যা আগে স্বাধীন ছিলো এ তরীকার নেতৃত্বে। ওদের এই আযাদী রক্ষা করতে গিয়ে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার পুত্র এবং উত্তরাধিকারী মুহাম্মদ আল মাহাদী তরবারী ধারণ করতে বাধ্য হন- তাঁর পক্ষে সে তরবারী আর কখনো সংবরণ করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ সংগ্রাম ছিলো সত্যিকার ইসলামী ‘জিহাদ’, আত্মরক্ষার জন্য এক যুদ্ধ । রঞ্জিত ঝাণ্ডা বহন করে নিয়ে গেছে গভীর হতে আরো গভীরে-মুসলিম দেশগুলির ভেতরে।

মুহাম্মদ আল মাহদী যখন ইন্তেকাল করলেন ১৯০২ সালে, তখন তাঁর ভাতিজা সৈয়দ আহমদ তাঁর স্থলে এই তরীকার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। উনিশ বছর বয়স থেকে , তাঁর চাচার জীবৎকালে এবং পরে যখন তিনি নিজেই হলেন মহান সেনুসি, একটানা যুদ্ধ করে চললেন, ফরাসী অনুপ্রবেশে বিরুদ্ধে। ইতালীয়ানরা যখন ১৯১১ সানে ত্রিপলীতানিয়া এবং সাইরেনিকা অবরোধ করে তখন তাঁকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয় দুই ফ্রন্টে। এই নতুন এবং অধিকতরো চাপ তাঁকে তাঁর প্রধান মনোযোগ উত্তর দিকে ফেরাতে বাধ্য করলো। তুর্কীদের সংগে পাশাপাশি এবং পরে তুর্কী কর্তৃক লিবিয়া পরিত্যক্ত হলে একাই সৈয়দ আহমদ এবং তাঁর সেনুসি মুজাহিদীন –এই নামেই এই যোদ্ধরা অভিহিত কতো নিজেদেরকে-সাফল্যের সংগে যুদ্ধ পরিচালনা করেন হানাদারদের বিরুদ্ধে-ইতালীয়রা, তাদের উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র আর বিপুলতরো সংখ্যা সত্ত্বেও মাত্র উপকূলের কয়েকটি শহরেই কোনো রকমে তাদের পা রাখতে সক্ষম হলো!

ব্রিটিশ শক্তি তখন মজবু হয়ে আসন গেড়েছে মিসরে! উত্তর আফ্রিকার অভ্যন্তরভাগে ইতালীয়দের ক্ষমতা বিস্তার করতে দেখে ওরা পষ্টতই তেমনটি উদ্বিগ্ন ছিলো না। এ সব কারনে, সে সময় ব্রিটিশ শক্তি সেনুসিদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিলো না। এই নিরপেক্ষ মনোভাব সেনুসি তরীকার জন্য ছিলো পরম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘মুজাহিদীনে’র সমস্ত রসদ আসতো মিসর থেকে, যেখানে প্রায় গোটা জনগোষ্ঠীয় ছিলো তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এটা খুবই সম্ভাব্য মনে হয় যে, ব্রিটেনের এই নিরপেক্ষতার ফলে শেষ পর্যন্ত সেনুসিরা সাইরেনিকা থেকে ইতালীয়দের সম্পূর্ণভাবে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হতো। কিন্তু ১৯১৫ সনে তুরস্ক মহাযুদ্ধে জার্মানীর পক্ষে অংশ গ্রহণ করে এবং ইসলামের খলীফা হিসাবে উসমানী সুলতান মহান সেনুসিকে আহবান জানালেন মিসরের ব্রিটিশ শক্তির উপর আক্রমণ চালিয়ে তুর্কীদের সাহয্যে করতে। 

যেহেতু ব্রিটশ সরকার মিসরে তাদের অধিকারে পশ্চাৎভাগের নিরাপত্তার জন্য অন্য সকল সময়ের চাইতে স্বভাবতই অধিকতর ব্যগ্র ছিলো সে কারণে তারা সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার জন্য অনুরোধ করে। এই নিরপেক্ষতার বিনিময়ে ওরা প্রস্তুত ছিলো লিবিয়ার সেনুসি তরীকাকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে- এমনকি, পশ্চিমাঞ্চলে মরুভূমির কিছু সংখ্যক মিসরীয় ওযেসিসও সেনুসিদের হাতে ছেড়ে দিতে ওরা তৈরি ছিলো।

সৈয়দ আহমদ যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, তাহলে কাণ্ডজ্ঞান যার নির্দেশ দেয় দ্ব্যর্থহীনভাবে, তিনি কেবল তারই অনুসরণ করতেন। তুরস্কের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো আনুগত্য ছিলো না; কারণ এই তুরস্কই কয়েক বছর আগে লিবিয়াকে লিখে দিয়ে দিয়েছিলো ইতালীর হাতে, যার জন্য একা সানুসিকেই দাঁড়াতে হলো ইতালীর বিরুদ্ধে লড়বার জন্য। ব্রিটিশ শক্তি সানুসির বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কোনো কাজই করেনি, বরং তাদের সুযোগ দিয়েছিলো মিসর থেকে রসদ পাবার, আর মিসরই ছিলো তাদের রসদ পাওয়অর একমাত্র উপায়। প্রভাবশালী সেনুসিরা সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের দুর্বল খলীফাকে রক্ষা করার অত্যুচ্চ অথচ অবাস্তব আকাংখাই প্রবল হয়ে দাঁড়ালো যুক্তির নির্দেশের উপর এবং তাঁকে একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে করলো প্ররোচিত। তিনি নিজেকে তুর্কীর পক্ষে বলে ঘোষণা করেন এবং পশ্চিমের মরুভূমিতে ব্রিটিশ শক্তিকে আক্রমণ করে বসেন।


বিবেকের এই দ্বন্দ এবং ঘটনাক্রমে তার পরিণতি সৈয়দ আহমদের বেলায় অধিকতরো করুণ হয়ে উঠলো-কারণ তাঁর ক্ষেত্রে, এ কেবল ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের প্রশ্ন ছিলো না, বরং এতে করে সম্ভবত অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হলো তাঁর সমগ্র জীবনের এবং তাঁর আগের দুই পুরুষের, সকল সেনুসির জীবনের মহৎ লক্ষ্যটিরই। এ কাজের পেছনে যে উদ্দেশ্য ছিলো, তা ছিলো চূড়ান্তভাবেই স্বার্থলেশশূন্য-মুসলিম জাহানের সংহতি রক্ষাকরার বাসনাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে তিনি কুরবানী দিয়েছিলেন সেনুসি তরীকার গোটা ভবিষ্যৎকেই-সে সময়ে তা পুরাপুরি উপলব্ধি না করে।

তিনি বাধ্য হলেন তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধে চালিয়ে যেতে। উত্তরে ইতালয়দের বিরুদ্ধে, দক্ষিণ-পশ্চিমে ফরসীদরে বিরুদ্ধে এবং পূর্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। শুরুর দিকে তিনি কিছু কিছু সাফল্য অর্জন করেন। সুয়েজ খাল অভিমুখে জার্মান-তুর্কীর অগ্রাভিযানে কোণঠাসা হয়ে ব্রিটিশ শক্তি পশ্চিমের মরুভূমির ওয়েসিসগুলি থেকে সরে পড়লে সৈয়দ আহমদ সংগে সংগেই সেগুলি দখল করে নেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই যুদ্ধের গতি বদলে গেলো আকস্মিকভাবেঃ জার্মান-তুর্কী বাহিনীর ক্ষিপ্র অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান রূপ নিলো পশ্চাদ-অপসরণে। কিছু পরেই পশ্চিমের মরুভুমিতে ব্রিটিশ পাল্টা আক্রমণ করে সেনুসি ফৌজকে, সীমান্ত অঞ্চলের মরূদ্যান এবং কূপগুলি দখল করে নেই, আর এমনিভাবে মুজাহিদীনে’র রসদ পবার একমাত্র পথটিকে দেয় কেটে। সাইারেনিকার অভ্যন্তরভাগ একা সক্ষম ছিলো না জীবন-মরণ যুদ্ধে লিপ্ত জনগোষ্ঠীকে রসদ যুগিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে, আর যে স্বল্প কটি জার্মান ও অস্ট্রীয় সাবমেরিন অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ এনে পৌছালো, তারাও নামমাত্র সাহায্যের বেশি কিছু নিয়ে এলো না।

১৯১৭ সনে সৈয়দ আহমদ তাঁর তুর্কী উপদেষ্টাদের পরামর্শে সাবমেরিন করে ইস্তাম্বুল যান অধিকতরো কার্যকরী সাহায্য-সমর্থনের ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু রওনা করার আগেই সইরেনিকায় তিনি তরীকার নেতৃত্ব দিয়ে যান তাঁর চাচাতো ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ আল ইদরিসকে। [১৯৫২ সাল থেকে লিবিয়ার বাদশাহ] প্রকৃতির দিক দিয়ে সৈয়দ আহমদের চেয়ে অধিকতরো আপোসকামী ইদরিস কাল বিলম্ব না করেই ব্রিটিশ এবং ইতালীয়দের সাথে সন্ধি করার প্রয়াস পান। ব্রিটিশেরা তো শুরু থেকেই সেনুসিদের সংগে এই সংঘর্ষ না-পছন্দ করেছে। কাজেই ওরা দ্বিধা না করে সন্ধি করতে ইতালী সরকার সৈয়দ ইদরিসকে ‘সেনুসিদের আমীর’ বলে সরকারীভাবে স্বীকৃতি দান করে। ইদরিস ১৯২২ সন পর্যন্ত সাইরেনিকার অভ্যন্তরভাগে এক টলটলায়মান আধা-স্বাধীনতা বজায় রাকতে সক্ষম হন। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো, ইতালীয়রা আসলে তাদের চুক্তি মেনে চলতে চায়নি, বরং গোটা দেশটিকেই ওদের শাসনের আওতায় আনার জন্য বদ্ধপরিকর, তখন সৈয়দ ইদরিস তার প্রতিবাদে ১৯২৩ ইংরেজির শুরুর দিকে মিসর ত্যাগ করেন এবং উমর আল মুখতার (রহ) হাতে সেনুসিদের নেতৃত্ব তুলে দেন। সাইরেনিকায় যুদ্ধ আবার শুরু হয়ে যায়।

এদিকে তুরস্কে সৈয়দ আহমদ হতাশার পর হতাশার সম্মুখীন হতে লাগলেন । তাঁর ইচ্ছা ছিলো, তাঁর উদ্দেশ্য হাসিলের সাথে সাথে তিনি সাইরেনিকায় ফিরে আসবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য কখনো হাসিল হলো না, কারণ তিনি যেই ইস্তাম্বুল ঢুকলেন, অমনি বিচিত্র-সব ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেলো, যার ফলে তিনি তাঁর প্রত্যাবর্তন স্থগিত রাখতে বাধ্য হলেন হপ্তার পর হপ্তা, মাসের পর মাস । তাঁর কাছে এ প্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠলোঃ সুলতানকে যারা ঘিরে আছে তারা সত্যি চায় না যে, সেনুসিরা সফল হোক, বিজয়ী হোক ।  তুর্কীদের এ আশংকা বরাবরকার-পাছে নবজাগ্রত আরবেরা মুসলিম জাহানে আবার তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে! সেনুসিদের বিজয়ে অনিবার্যভাবেই ঘোষিত হবে এ জাতীয় আর পুনর্জাগরণের কথা এবং মহান সেনুসিকে-তুরস্কেও যাঁর খ্যাতি অনেকটা রূপকথার মতোই-করে তুলবে খিলাফতের সন্দেহাতীত উত্তরাধিকারী । তাঁর নিজের যে এ ধরনের কেনো উচ্চাকংখাই নেই তাতেও তুরস্কের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারীদের-সন্দেহ দূর হলো না- এবং যদিও তাঁর মর্যাদার উপযোগী পরম সম্মান এবং সকল সম্মানই তাঁকে দেওয়া হলো তবু বিনয়ের সংগে অথচ কার্যকরীভাবেই তুরস্কে আটক করা হরো সৈয়দ আহমদকে।  ১৯১৮ সনে উসমানী খিলাফত ভেঙে পড়লে এবং তারপর মিত্র শক্তি ইস্তাম্বুল দখল করে নিলে তাঁর অলীক আসার মৃত্যু –ঘন্টা বেজে উঠলো এবং যুগপৎ তাঁর জন্য সাইরেনিকার সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেলো।

কিন্তু মুসলিম সংহতির জন্য উদ্দাম প্রেরণা সৈয়দ আহমদকে নিস্ক্রিয় থাকতে দিলো না। মিত্র শক্তি যখন ইস্তাম্বুল অবতরণ করছে তখন তিনি সীমান্ত পার হয়ে গিয়ে পৌছুলেন এশিয়া মাইনরে কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য । সেনুসি ভুল করলেন, তুর্কী জনগোষ্ঠীর নেতার মতলব সম্পর্কে। কারণ তাঁর আসল মতলব এবং তাঁর জাতির মধ্যে যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দুয়ের মধ্যে তফাত বিপুল। 

আতাতুর্কের ইসলাম-বিরোধী বিভিন্ন সংস্কারে চরম হতাশ হয়ে সৈয়দ আহমদ তুরস্কে সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা থেকে সরে দাঁড়ালেন এবং অবশেষে ১৯২৩ সনে চলে গেলেন দামেশকে-সেখানে আতাতুর্কের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ পলিসির বিরোধী হলেও –তিনি আবার মুসলিম সংহতির লক্ষ্যে তুরস্কের সংগে মিলিত হবার জন্য সিরীয়দের বোঝাবার চেষ্টা করেন। স্বভাবতই ফরাসী ম্যান্ডেটরী সরকার তাঁকে চরম অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করেন। ১৯২৪ সনের দিকে তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা যখন জানতে পারলেন তাঁর গ্রেফতারী আসন্ন, তখন তিনি একটি মোটর গাড়িতে করে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে পৌছুলেন গিয়ে নযদ সীমান্তে আর সেখান থেকে রওয়ানা হলেন মক্কা, যেখানে আন্তরিকতার সংগে তাঁকে গ্রহণ করলেন বাদশা ইবনে সউদ।

আর এদিকে সাইরেনিকার সেই সিংহপুরুষ যাঁর সত্তর বছরে অধিক বয়স শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর দেশের আযাদীর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সুদীর্ঘ দশটি বছর তিনি ছিলেন তাঁর জাতির প্রতিরোধ শক্তির প্রাণ, তার রূহ যে-সব বাধা-বিঘ্ন জয়ের আশা নেই সে-সবের বিরুদ্ধে, তাঁর ফৌজের চাইতে দশ গুণ বেশি ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে .. . যে ইতালীয় ফৌজ আধুনিকতম অস্ত্রশস্ত্রে সাঁজোয়া গাড়ি, উড়োজাহাজ এবং কামানে সজ্জিত-যখন উমর এবং তাঁর অর্ধ-উপবাসী মুজাহিদীনে’র কিছুই ছিলো না রাইফেল এবং কয়েকটি ঘোড়া ছাড়া, যা নিয়ে তাঁকে এমন এক দেশে লড়তে হয়েছে একটি বেপরোয়া গেরিলা যুদ্ধ যে দেশ পরিণত হয়েছিলো একটি বিশাল বন্দী শিবিরে.. .।

সিদি উমর এবং তাঁর বিশ পঁশিচ জন সংগী ছিলেন ইতালী অধিকৃত এলাকার অনেক ভেতরে, যখন তাঁরা স্থির করেন তাঁরা রসূলের সহাবা সিদি রফির মাযারে গিয়ে য়িয়ারত করবেন। মাযারটি ছিলো কাছেই। কোনো না কোনোভঅবে ইতালীয়রা তাঁর উপস্থিতির কথা জানতে পায় এবং বহু লোক দিয়ে উপত্যকার দু’দিকই বন্ধ করে দেয়। পালিয়ে বাঁচার আর কোনো পথ ছিলো না । তিনি যখন হন এবং জীবিত অবস্থায় বন্দী হন । জেনারেল গ্রাৎসিয়ানির সম্মুখে। সে তাঁকে জিজ্ঞাস করেঃ তুমি কী বলবে যদি ইতালী সরকার তার মহৎ করুণ বশে তোমাকে বেঁচে থাকবার অনুমতি দেয়? ‘তুমি কি ওয়াদা করতে রাজী আছো তুমি তোমার জীবনের বাকি বছরগুলো শান্তিপূর্ণভাবে কাটাবে?’ কিন্তু সিদি উমর জবাব দিলেনঃ ‘তোমার লোকসকল আর তোমার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে ক্ষান্ত দেবো না যতক্ষণ না তোমরা দেশ ত্যাগ করছো অথবা আমি আমি আমার জীবন থেকে বিদায় নিয়েছি। মানুষের অন্তরে যা আছে, যিনি তা জানেন, তাঁর নামে কসম করে আমি তোমাকে বলছি, যদি এই মুহূর্তে আমার হাত দুটি বাঁধা না থাকতো, আমি আমার খালি হাত নিয়ে তোমার সংগে লড়তাম যদিও আমি বৃদ্ধ এবং বিধ্বস্ত । তারপরই তাঁকে ইতালীয়রা ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে. . 

মক্কার পথ বইয়ের লেখক আবুল আসাদের সঙ্গে সাইয়িদ আহমদ কথোপকথনে ,সাইয়িদ আহমদ বলেন,-হ্যাঁ, আমিও তা জানতাম,.. . আমিও তা বুঝতে পেরেছিলাম খুব দেরীতে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, সতেরো বছর আগে ইস্তাম্বুল থেকে যে আহবান এসেছিলো, তাতে সাড়া দেয়া আমার ভুল হয়েছে.. .‘কিন্তু’, সাইয়িদ আহমদ আবার বলেন, ইসলামের খলীফা যখন আমার কাছে মদদ চাইলেন, তখন অন্য সিদ্ধান্তই আমার পক্ষে কি ক’রে সম্ভব ছিলো? আমি কি ঠিক করেছিলাম, না নির্বোধের মত কাজ করেছি? আল্লাহ ছাড়া আর কে-ই বা বলতে পারে ।

[মক্কার পথ বই থেকে...]

Share:

বিষাদ সিন্ধু ,কারবালা ও তাত্বিক পর্যালোচনা-আব্দুল ওয়াহাব


আব্বা প্রায় গল্পটি বলতেন, আজ থেকে প্রায় ৪০-৫০ বছর আগের কথা, ছোটবেলায় আমার আব্বা তার দূর সম্পর্কের এক দাদার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন৷ সময়টা ছিল দশই মহররম৷ সেই বুড়ো ছিলেন গ্রামের মাদবার ৷ বাবা গিয়ে দেখেন যে বাড়িতে মহররমের মিলাদ এর জন্য বিশাল আয়োজন চলছে ৷ সে সময় গ্রামের দুই তিন বাড়িতে গ্রামের বেশ কিছু লোক সারারাত ভর বিষাদ সিন্ধু পাঠ করত ৷

.
এই বুড়ো(মাদবার) মহররমের রাতে বিষাদ সিন্ধু পাঠ করতেন আর হু হু করে কঁদতেন৷ তিনি বিষাদ সিন্ধু কে সেভাবে সম্মান করতেন যেভাবে কোরআনকে সম্মান করা হয়৷ বিষাদ সিন্ধু বুকে ঠেকাতেন, চুমু খেতেন ৷ যা হোক,তার সঙ্গে গ্রামের যেসব লোক এই মিলাদে শরিক হতেন তাদের মাঝেও কান্নার রোল পড়ে যেত ৷ এভাবে চলত সারা রাত ৷ ঠিক ফজরের আগ দিয়ে মিলাদ শেষ হত এবং সবায় তাবারক নিয়ে বাড়ি ফিরতো ৷ এই হলো গ্রাম বাংলার মানুষের ইসলাম ৷
.
ইংরেজরা এদেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর হিন্দুরা তাদের মেনে নিলেও মুসলিমরা তাদের মেনে নেয়নি ৷ ক্রমাগত তারা বিদ্রোহ করতে থাকে তিতুমীর,সাইয়েদ আহমদ শহীদ, সেপাহী বিদ্রোহ আরও অনেক বিপ্লব সংগঠিত হয় যাতে মুসলমান দের অবদানই বেশি৷ পরাজিত জাতি হিসাবে এরা শাসক গোষ্ঠি থেকে দূরে সরতে থাকে ৷ কারণ মুসলমানদের কাছে যে শিক্ষা ছিল তার দ্বারা কখনই সাম্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠিকে মনে নেয়া সম্ভব ছিলনা ৷
.
এদিকে জীবিত নেতারা কেউ পালাতক বা নির্বাসিত৷ নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ইংরেজদের দয়ায় কোন মতে টিকে আছে৷ এসময় এমনিতেই মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক৷ তার উপর শিক্ষা না পেয়ে একটি মুর্খ প্রজন্ম তৈরী হয়৷ যারা পরিণত হয় উদ্দেশ্যহীন ও কুসংস্কারচ্ছন্ন এক জাতিতে৷ তারপরও এ মুসলিম সমাজ ছিল
এমন এক পোড়া খড়ের গাদা, যেখানে ক্রোমাগত ধোঁয়া উড়তে থাকে৷ কোরআন, হাদিস ও ইতিহাসের সামান্য একটু বাতাস দিলেই ধোঁয়া উড়তে খড়ের গাদা থেকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠে৷
.
আমরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গোল্ডস্টোন এর বক্তব্য সম্পর্কে জানি ৷ মুসলমানদেরকে কোরআন থেকে দূরে সরে দেয়ার জন্য যতরকম চেষ্টা করা করা দরকার তারা করেছে৷ বাদ রাখেনি ইতিহাস কে বিকৃতি করতেও ৷
.
কারবালার ইতিহাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়কে মসলিম মন থেকে মুছে দেয়া তাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট ৷ অসত্যের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এই যুদ্ধের ইতিহাস তাদের জন্য ছিল হুমকিস্বরূপ ৷ আর মীর মোশারফ হোসেনের "বিষাদ সিন্ধু" তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে ৷
.
সহায়ক বললে ভুল হবে এটা ব্রিটিশদেরই একটা এজেন্ডা ছিল ৷ ইংরেজ ভৃত্য মীর মোশাররফ হোসেন খুব সুচারু রূপে তা পালন করেছিলেন ৷ আপনাদের একটা পরিসংখ্যান দেই ৷ পরিসংখ্যানটা খন্দকার আবুল খায়ের (রহ) এর "শহীদে কারবালা" বই থেকে নেয়া ৷
.
তৎকালীন বৃটিশ বাংলায় প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার গ্রাম ছিল ৷ প্রায় প্রতিটি গ্রামে ৩/৪ টি করে বিষাদ সিন্ধু পৌঁছে গিয়েছিল/পৌঁছিয়ে দেয়া হয়েছিল৷ আপনি হয়তো বলতে পারেন যে, বিষাদ সিন্ধু সেই সময়ে জনপ্রিয়তার কারণে ছড়িয়ে পড়েছিল ৷ কিন্তুু কথা হচ্ছে যে, ৫৮০ পৃষ্ঠার [প্রথম সংস্করণে] একটি বই সেই সময়ে ৩/৪ লাখ হার্ডকপি বই [গ্রামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী] ১৮৯০ সালের দিকে কোন প্রকাশকানীর সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল৷ এত খরচই বা কোথা থেকে এসেছিল!!
.
খন্দকার আবুল খায়ের রহমাতুল্লাহ তার বইয়ে ১৮ পৃষ্ঠায় লেখেন যে “কলকাতা মাদ্রাসার প্রবীণ হিন্দুস্থানী হুজুরদের নিকট থেকে এর যতটুকু তথ্য পেয়েছি তা হচ্ছে এই যে, ব্রিটিশ সরকার মীর মোশাররফ হোসেনকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন এবং পরিকল্পিত ভাবেই কারবালার মূল ঘটনাকে কালো পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই বইটি লেখা হয়েছিল এবং মোটা অংকের টাকা দিয়ে বই ছাপানোর এবং তা বাংলার মুসলমানদের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল"৷
.
আর এই বইটি যে একটি উপন্যাসের বই ৷ বইটি যেভাবে সাজানো হয়েছে তা দেখে বুঝার উপায় নাই যে, এটা একটি উপন্যাসের বই বা ইতিহাসের বই ৷ বিশ্বাস না হলে লিংক কমেন্টে দেয়া আছে দেখে নিতে পারেন৷ আর সে সময় বর্তমান সময়ে বাংলায় যেরকম বই আছে, তেমন বই কোন বইও ছিলনা যার মাধ্যমে সত্য ইতিহাস জানতে পারতো ৷ তাই স্বল্প শিক্ষিত ধর্ম প্রাণ মুসলমানরা ধর্মীয় বই পেয়ে লুফে নিয়ে ছিল৷ দেয়াও হয়েছিল সল্প মূল্যে বা বিনা মূল্যে৷
.
খন্দকার আবুল খায়ের (রহ) তার বইতে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন ৷ ঘটনা টি হচ্ছে " আমি ঝিকরগাছার পাশের গ্রাম পুরন্দরপুরে মুহাররমের আলোচনা করতে গিয়ে বললাম, বিষাদ সিন্ধু কোন ইতিহাস নয়, এটা একটা উপন্যাস মাত্র, এরমধ্যে সত্য-মিথ্যা সংমিশ্রণ রয়েছে, বললাম অনেক কথাই মিথ্যা এবং কাল্পনিক ৷ তখন ওই মাহফিলের একজন প্রবীণ মাদবার যিনি গ্রামের মাদবারী করেন এবং ভালো বৈষয়িক জ্ঞান রাখেন, গ্রামের লোক যার কথার উপরে কেউ কথা বলতে সাহস করে না, এমন এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে আমার কথার প্রতিবাদ করে বললেন," যা বইতে লেখা আছে তা কি মিথ্যা হতে পারে, আর যা মিথ্যা তা কি কেউ লিখতে পারে ......!!!
.
বিষাদ সিন্ধুর এই বিষাদ থেকে, এখনও আমরা মুক্ত হতে পারিনি৷ ১৩৬ বছর প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাঁদতে কাঁদতেই পার হয়ে গেল৷ মূর্খরা বা স্বল্প শিক্ষিতরা এটাকে ইতিহাস ভাবলেও আমরা শিক্ষিতরা জেনে উপন্যাস হিসেবে পড়লেও আমরা কখনো খুঁজে দেখার চেষ্টা করিনি যে, কারবালার আসল ইতিহাস কি ছিল৷
.
ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে ইংরেজদের মাথা ব্যথার করণই বা কি? কেনইবা ইতিহাস বিকৃতি করা হলো ৷ আমরা কি সেটা কি কখনো খোঁজার চেষ্টা করেছি ?
.
বিষাদ সিন্ধুর পুরো ঘটনা সাজানো হয় একজন মেয়েকে কেন্দ্র করে ৷ ইয়াজিদ ও ইমাম হুসাইনের সংঘর্ষের মূল কারণ কথিত জয়নাব নামের মেয়েটি ৷ আর কারবালার আসল ইতিহাস হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই ৷ খেলাফত কুক্ষিগত কারীর বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই৷ জালিমের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিরোধ৷ কিন্তু ভাবতেও লজ্জা লাগে যে, মীর মোশারফ হোসেন ইতিহাসের সঙ্গে কি ঘৃণ্য খেলাটাই না খেললেন৷
.
ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু চাননি যে, ইসলামী খিলাফাত রাজতন্ত্রের মুখে হারিয়ে যাক ৷ আর এর জন্য তিনি জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করেছেন৷ আর তার এই লড়াই মুসলিমদের জন্য একটা উসুল ৷ মুসলমানদের রাজনীতিতে একটি মূলনীতি। পরাজয় জেনেশুনেও বাতিলের বিরোধিতা করতে হয়।
ইসলামী খেলাফত ছাড়া অন্য কোন ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা মুসলিমরা মেনে নিতে পারে না, তা রাজতন্ত্রই হোক আর মানব রচিত যে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থায় হোক ৷
.
খেয়াল করেলে দেখবেন যে, সিপাহী বিদ্রোহের পর পরই বিষাদ সিন্ধুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়৷ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কারবালার আসল শিক্ষা কে দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় ৷ আর এর ঠিক পরপরই রেশমী রুমাল আন্দোলন ব্যর্থ হয় ৷
.
কারবালার ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের জীবনে প্রভাব রেখে আসছে৷ আমাদের জীবনে বিষাদসিন্ধুর প্রভাব আছে কিন্তু কারবালার প্রভাব নেই ৷ ইমাম হুসাইন (রা) এর রক্তে লেখা এই ফাতওয়া যদি আমাদের জীবনে প্রভাব রাখতো তাহলে আমাদের অবস্থাও সেই কারবালার ইমাম হোসাইন আবস্থানে থাকতাম৷ ইসলামের এই অবস্থা হতো না ৷ আল্লাহ আমাদেরকে কারবালার ইতিহাস থেকে সঠিক শিক্ষা নিয়ে জীবন চলার তৌফিক দান করুন ৷

Share:

ইমাম হোসাইন (রা.) ও কারবালা- মিয়া গোলাম পরওয়ার

 ইমাম হোসাইন রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু সম্মন্ধে পয়লা কথা হলো যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুই নাতিকে অত্যধিক ভালোবাসতেন। আপনারা জানেন যে, তাঁরা তাঁকে ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চড়ে বসতো, তিনি তাদেরকে ঘাড়ে-গলায় চুমু দিতেন, তর্ক ও করেছেন দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটির মাধ্যমে। এই যে এতো ভালোবাসার সম্পর্ক। এতোটাই তীব্র যে আল্লাহর রাসূল(সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হাসান-হোসাইনকে ভালোবাসলো, সে আমাকে ভালোবাসলো।’ আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বি'আল্লাহু আনহু বলেছেন, “তারা হচ্ছে জান্নাতে বেহেশতী যুবকদের নেতা।”

আল্লাহর প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৌহিত্র, আলী (রাঃ) এবং মা ফাতেমা(রাঃ) এর আদরের পুত্রসন্তান ইমাম হোসাইন (রাঃ)। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রাসূল (সাঃ) যেসব ইংগিত দিয়েছেন, তিনি যেভাবে জীবন দিলেন, এর মাঝে আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ রয়েছে। যদিও এর প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে, তবুও এ ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ।
একটি সমাজ, রাষ্ট্রের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের(সাঃ) যে দিগদর্শন, কোরআন মাজীদে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'য়ালা একটি ইসলামী সমাজ এবং রাষ্ট্রের যে দর্শন উল্লেখ করেছেন, রাসূল(সাঃ) এবং খোলাফায়ে রাশেদীন খেলাফতের যে সিস্টেম চালু করে করেছেন- ইয়াজীদের শাসনক্ষমতা গ্রহণ এবং বাইয়াত নিতে বাধ্য করবার নীতির মাধ্যমে, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত ধারণা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিকৃত চিন্তাধারার জন্ম দেয়া হচ্ছিলো । এই বিকৃত ধ্যান ধারণা প্রতিরোধ করাটাকে ইমাম হোসাইন (রাঃ) নিজস্ব দায়িত্ব মনে করেছিলেন । কেননা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্রের খিলাফত নির্বাচিত হবে।
খোলাফায়ে রাশেদীনের জীবনী পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, তাদের কেউ নিজেকে নিজে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি । কখনো কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির কথায় খলীফা মনোনীত করা হয়নি । কোন খলীফা তার সন্তানকে পরবর্তী খলীফা নিযুক্ত করেননি । এমনকি রাসূল(সাঃ) স্বয়ং আবু বকর (রাঃ) কে খলীফা হিসেবে নির্বাচিত করে যাননি । একটি পরামর্শ সভা হলো, শূরা গঠন করা হলো এবং তারা আবু বকর রাদ্বি'আল্লাহু আনহুকে খলীফা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নবীজি (সাঃ) এর দাফন পর্যন্ত বিলম্বিত করা হয় । অর্থাৎ নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে অথবা স্বীয় বংশের কাউকে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত করার কোন বিধান ইসলামী ইতিহাস সমর্থন করে না । এটা রাসূল(সাঃ) এর আদর্শের অনুসৃত পথ নয়। ইমাম হোসাইন (রাঃ) বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইয়াজিদ যেভাবে নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলো তা কোনোভাবেই রাসূল(সাঃ) এর দেখানো পন্থা নয় ।
রাষ্ট্র এবং সমাজ গঠনে ইসলামের যে কর্মপন্থা, সেই মূল চিন্তা থেকে বিকৃত পন্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, যদি তার প্রতিরোধ না করা হয় । তাই তিনি জোর তাগিদ অনুভব করেছিলেন যে, এই ব্যাপারটি স্পষ্ট না করা হলে, এই বিকৃত পন্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে ইসলামী খিলাফতের নিয়ম হিসেবে। কেননা এটি যদি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ইমাম হোসাইন রাঃ জীবিত থাকাকালীন এবং তিনি এর প্রতিবাদস্বরূপ কিছু না করেন, তাহলে পরবর্তীতে যুগ যুগ ধরে গোটা উম্মাহ এ ভুল ম্যাসেজ পেয়ে যাবে যে, ইমাম হোসাইন বেঁচে থাকতে ই তো এটি স্ট্যাবলিশ হয়ে গিয়েছিলো, ফলে হয়তো এটি জায়েজ ।
মুলুকিয়াত বা রাজতন্ত্র যে গ্রহণযোগ্য নয়, রাজার ছেলে রাজা হবে, পরামর্শ ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া হবে(যাকে ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারী বলে), অত্যাচারী শাসকের ক্ষমতায় যাবার এই প্রক্রিয়া রুদ্ধ করা কে নিজের দায়িত্ব মনে করে ইমাম হোসাইন(রাঃ) জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রওয়ানা হয়েছিলেন ।
আমি অবাক হই! অনেক স্কলারেরা বলে থাকেন, তিনি মদীনা থেকে গভীর রাত্রে কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে চলে গিয়েছিলেন! কিন্তু এটি বিন্দুমাত্র ও সত্য নয়। অনেক আলোচনার পর তিনি মদীনায় থেকে বাইয়াত নিতে চান নি, পরবর্তীতে মক্কায় উমরাহ করেন এবং তারপর তিনি কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
প্রথম শিক্ষা হচ্ছে,
তিনি নিজে নেতা হওয়ার জন্য এই শাহাদাতের মুখোমুখি হননি। তিনি ইসলামী সমাজ, সভ্যতা, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসৃত পন্থাকে বিকৃত হতে দিতে চাননি। ইতিহাসের কাছে যেন তিনি দায়ী না হয়ে যান, সেই দায় থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই তিনি নিজে অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে শক্ত হয়ে দাঁড়াবার জন্যই তিনি রওনা হয়েছিলেন.
দ্বিতীয় শিক্ষা হচ্ছে যে. তিনি যখন গেলেন পথিমধ্যে তাকে আটকে দেওয়া হলো. ইমাম হোসাইন (রাঃ) ক্ষমতার জন্য কুফায় রওয়ানা হয়েছিলেন.। ইয়াজিদ খবর পেল এবং আব্দুল্লাহ বিন যিয়াদ কে পাঠালো তার কাছে বলা হলো একদিন সময় দেয়া হলো আপনি বাইয়াত গ্রহণ করবেন, না মৃত্যুর জন্য ফায়সালা গ্রহণ করবেন. তিনি তাঁর পরিবার-পরিজন কে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। উনি তার পরিবারকে এই মেসেজগুলো দিলেন।
এটা বলতে গেলে আমাদের শহীদ নেতৃবৃন্দের কথা মনে আসে। যারা আমাদের নেতৃবৃন্দ শহীদ হয়েছেন তারা ফাঁসির রাতে পরিবারের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করে তারা যে সব কথা বলে গেছেন একদম চেতনার সঙ্গে যেন একই মিল। তাঁর স্ত্রী পরিবার-পরিজনকে হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলছেন যে, আমার প্রতি মেসেজ এসেছে, তোমাদের সকলের মতামত কি? ওই ছোট্ট শিশু, মহিলা সকলে মিলে কেউ দ্বিমত করেননি সবাই হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর সেই কনসেপশন কে মেনে নিয়ে বলেছেন। আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শের বাহিরে কোন কিছু মেনে নিতে পারিনা। আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি।
খালিদ, নিজামী ভাইয়ের ছেলে; তার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসে লেখার মাধ্যমে যে বর্ণনাটি প্রকাশ করেছেন সেটি ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।
“আমি ডাক্তার হিসেবে অনেক বড় মানুষের মৃত্যুর সময় কাছে থেকেছি। কাছে থেকেও মৃত্যুর দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছে। মৃত্যুর মুহূর্তে এসে কত অস্থির হয়ে যায় বাঁচার জন্য কত আকুতি মিনতি করে বাঁচার চেষ্টা সেটা আমি আমার পিতার মধ্যে কখনো দেখি নাই। আমার পিতা ফাঁসির মঞ্চে যাবেন তার চেহারার মধ্যে এই ধরনের কোন আলামত লক্ষ্য করি নাই। তিনি বলছেন যে আমি কোন লেবাস পড়ে ফাঁসির মঞ্চে যাব তোমরা বলে দাও। প্রশান্ত হৃদয়ে তিনি আমাদেরকে বলতে বলছেন যে ‘কোন লেবাস পড়ে আমি ফাঁসির মঞ্চে যাব। লুঙ্গি পরা থাকবে না পায়জামা পরা থাকবে। জানাজা কে যাবে তোমার মা যেন না যায় আমার কথাই আমার কবর কোথায় হবে।
মনে হচ্ছে বিষয়টা ব্যাপার না; একটি নরমাল জিনিস । নরমাল জীবনে যেমন মানুষ সাধারণত কনভারসেশন করে সেভাবেই যেন তিনি কনভারসেশন করছেন। মুজাহিদ ভাই কথা বলেছেন তাঁর পরিবারের সাথে, কামরুজ্জামান ভাই বলেছেন। আমাদের নেতৃবৃন্দ এভাবে কথা বলেছেন তার পরিবারের সঙ্গে, বিদায়ী সাক্ষাৎকারে।
ফাঁসির মঞ্চে মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু আমাদের শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ভাই ছুটছেন ফাঁসির মঞ্চের দিকে। কারারক্ষীরা বলছেন যে, কাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা, ধরে নিয়ে যাওয়া লাগে ফাঁসির মঞ্চে। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লা ভাই ছুটছেন সবার আগে, উনাকে কারারক্ষীরা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না। যেন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করার তর সইছে না…
ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এবং তার গোটা পরিবার ঐক্যমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন সিদ্ধান্ত নিলেন যে আমরা ইসলামের মৌলিক নীতিমালা থেকে বিচ্যুত হতে পারি না। উম্মত চিরজীবনের জন্য বিভ্রান্ত হবে। তাই আমরা মাথা নত করব না। হয় আমাদের কথা মানতে হবে না হয় আমরা শাহাদতের ফয়সালা করলাম। আলহামদুলিল্লাহ! এটি হচ্ছে দ্বিতীয় ম্যাসেজ। ইসলামের মৌলিক নীতিমালা একটি আদর্শিক বিষয় সেটার রক্ষা করা জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান; ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কারবালার প্রান্তরে জীবন দিয়ে সেটি প্রমাণ করে গেছেন।
আমরাও ফ্যাসিবাদী শাসকের অধীনে আজ অত্যাচারিত মজলুম , জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে যারা ক্ষমতায় আসে তারাও তো সেই ইয়াজিদের আদর্শের অনুসারী। যারা জনগণের কথার তোয়াক্কা না করে ভোটাধিকারের তোয়াক্কা না করে আমার ছেলের উপরেই খেলাফত হবে। এটার নামই হচ্ছে কিন্তু মুলুকিয়াত ফ্যাসিবাদ জবরদস্তি করে ক্ষমতায় যাওয়া।
রাসূল ইমাম হাসান হোসাইনকে ভালোবেসেছেন, তাদেরকে জান্নাতী বলেছেন। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূলের বর্ণনা থেকে রেওয়ায়েত করেছেন, সাইয়্যিদুস শাবাব ইয়া আহলিল জান্নাহ। জান্নাতে যুবকদের সর্দার হবেন। ফলে আল্লাহর নবীর এই সাহাবী ও দৌহিত্র যে জান্নাতী তা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। ফলে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন সেটি অবশ্যই সঠিক।
যেটা মানুষের মধ্যে ধারণা বা আজকে আমাদের মধ্যে যে ধারণা একটা স্যেকুলার ধারণা, নামাজ রোজা হজ জাকাত করো, সদক্বা, ফিতরা দাও, ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম পালন করো- এটা ইসলাম। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন সেটাও রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, না ওটা ইসলাম নয়। তাহলে আল্লাহর নবীর এই প্রিয় সাহাবী দৌহিত্র মদিনায় পৌঁছে তসবি তাহলীল করে আদর্শ এবং উন্নত মানের জীবন যাপন করতে পারতেন। দুনিয়ার এত আরামের জায়গা ছেড়ে দিয়ে তিনি কেন শাহাদাতের পথ বেছে নিলেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন এটি ই শুধু ইসলাম নয়, রাষ্ট্রে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করতে হবে। রাষ্ট্রের মাঝে কোরআনের বিধান, খেলাফতে রাশেদার বিধান এবং খেলাফতের সর্বোচ্চ অর্জনকে তুলে ধরে জাতির নিরাপত্তা এবং মুক্তির জন্য আদর্শ সমাজ গড়তে হবে। এটাও ইসলাম, এটাই হচ্ছে আসল ইসলাম।
যে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-আকিমুদ্দিন ওয়ালা তাফাররাকু “দ্বীন কায়েম করো এবং তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
দ্বীন কায়েমের যে ফরজিয়াত, ইকামতে দ্বীন এর যে গুরুত্ব তা ইমাম হোসাইন উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি কিন্তু এই পথকে বেছে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপালন যদি ইসলাম হত তাহলে ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এই ঝুঁকি নিতে যেতেন না। উনার কথা না হয় বাদই দিলাম। আল্লাহর প্রিয় নবী ই তো এ পথে যেতে না। এবং মসজিদে হারামে আল্লাহ- জিকির -আজকার -তাহাজ্জুদে রত থাকলে কেউ বাধা দিতো না। কাফেররা তো বলেই ছিলো যে তোমরা এসব করো। রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে তুমি এসো না । কিন্তু তাতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শের সঙ্গে কন্ট্রাডিকশন করেছিল।
এটার মাঝে তৃতীয় শিক্ষা আছে যে, যারা মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করেন রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই আশুরা আমাদেরকে এই শিক্ষা দিচ্ছে। কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছে যে, ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপালন-ই ইসলাম নয়। ইসলাম হচ্ছে পরিপূর্ণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ একটি জীবন ব্যবস্থা।
আল কোরআনে বলেছেন, আকমালতু লাকুম দিনুকুম এটা একটা পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। 'নেজামে মোকাম্মেলে হায়াত'। এটা পরিপূর্ণ সমাজ রাষ্ট্র অর্থনীতি-ব্যবসা, বিচার, শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক ব্যাবস্থা সব বিষয়ে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে। সকল বিষয়ে হচ্ছে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা করে আল্লাহতা'লা দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালন করেই যদি মনে করেন যে, জান্নাতে চলে যাবেন এর থেকে বড় বিভ্রান্ত আর কিছু হতে পারে না, এটি ভাবারও কোনো সুযোগ নেই।আল্লাহ তাআলা তো কুরআনে বলেছেন,
اَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتٰبِ وَ تَكْفُرُوْنَ بِبَعْضٍۚ
“তোমরা কি আমার কিতাবের কিছু অংশ পড়বে আর কিছু অংশ ছেড়ে দিবে। তোমরা কি কিছু অংশ কে অস্বীকার করবে।” (২ঃ৮৫)
পক্ষান্তরে কোরআনকে না মানার-ই নামান্তর ঘরের মধ্যে ইসলাম থাকবে, আর রাষ্ট্রব্যবস্থায় শয়তান দুষ্কৃতী বাতিল শক্তি আধিপত্য করবে, রব বানিয়ে আমরা আনুগত্য করব। ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর শাহাদাত আমাদের কি শিক্ষা দিচ্ছে? তিনি এটা মোটেও বরদাস্ত করেন নি, তা তাঁর জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন। ইসলাম ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিতে হবে, এটা ইসলাম নয়। ইসলাম সমাজজীবন এবং ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যই এসেছে।
لِیُظْهِرَهٗعَلَى الدِّیْنِ كُلِّهٖ
কথার মানে কি? আর যত দ্বীন, আর যত মতবাদ, আর যত আইডোলজি আছে তার উপরই এই দ্বীনকে প্রচার করো, জাহির করো। ইমাম সেটা প্রচার প্রচার করার জন্যই জীবন দিয়েছিলেন।
আরেকটা কথা বলি। সেটা হচ্ছে শাহাদাতের তামান্না। এটা সবথেকে বড় শিক্ষা যে জীবনের মায়া তিনি করেননি। পরিবার, সন্তান দিয়ে কি হবে আমার বেঁচে থাকলে এই দুনিয়ার লোভ-লালসা, মায়া-মমতা স্ত্রী-সন্তান, পিতা-মাতা, ভাই-বোন নিয়ে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনের জীবন কার না ভালো লাগে। কিন্তু সবকিছু তাঁর কাছে তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। ইসলামী আন্দোলন: জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে শাহাদাতের তামান্না, শাহাদাতের তামান্না এবং থেকে শিক্ষা পাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ইমাম হোসাইন কারবালার ময়দানে রক্ত দিয়ে শাহাদতের যে আকাঙ্ক্ষা উম্মতের জন্য হাদিয়া করে গেছেন। আমরা তাঁরই সার্থক,তাঁরই উত্তরসূরী।
আমি বিশ্বাস করি আমরা যে জমিনে জন্মগ্রহণ করেছি আমার বিশ্বাস হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বাংলাদেশ আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হোক এটাই আমরা কামনা করি । ফ্যাসিবাদী অত্যাচারী শাসক, রাষ্ট্রক্ষমতা, পুলিশ, রাজনীতি, মিডিয়া প্রশাসনকে ব্যবহার করে মুসলমানদের এই চিন্তা চেতনা এবং ইনসাফ ভিত্তিক দেশ প্রতিষ্ঠায় বাধা দিতে চায় তারা। আমাদের জয় হবেই। তাদের শাস্তি দুনিয়াতেও হবে এবং আখেরাতেও হবে।
ইয়াজিদ নাম কেউ রাখেনা মীরজাফর নামও কেউ রাখেনা, শাস্তি দুনিয়াতে হয়ে গেছে। যে গালে যে ঠোঁটে, যে গলায় আল্লাহর প্রিয় নবি চুমু খেয়েছেন; ইবন যিয়াদ সেই মস্তিষ্ক খন্ডিত করে ইয়াযীদের সামনে রাখলো আর লাঠি দিয়ে সেই খন্ডিত মস্তিষ্কে আঘাত করে যে নিষ্ঠুরতার ইতিহাস তৈরি করা হয়েছে। আমি মনে করি যারা আল্লাহর দ্বীনের পথে কাজ করা মানুষদেরকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করে, শহীদ করে, হাত খন্ড করে দ্বীন কায়েমের পথে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে, তাদের এই অত্যাচারের হাত বন্ধ না হলে তাদের এই করুণ পরিণতি অপমান লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে আখেরাতেও তারা ভোগ করবে।
ফলে আমরা মনে করি আমাদের এই স্বপ্ন, আমাদের এই মিশন, আমাদের কাফেলা, আমাদের এই অভিযাত্রা কেউ রুখতে পারবে না। এটা একটা অপ্রতিরোধ্য কাফেলা। আমাদের এই চেতনাকে কখনো রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের এই চেতনার মতে মৃত্যুর কোন ভয় নাই। কারণ যারা পূর্বসূরী আমাদের, তারা মৃত্যুকে ভয় পায় নি। তাদের উত্তরসূরী হিসেবে আমরা কখনো মৃত্যুকে ভয় পাবো না। তারা আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে আমরাও আমাদের আদর্শের জন্য জীবন দেব। এই আশুরার শিক্ষা, মহররমের শিক্ষার অর্থই হলো অত্যাচারী ফ্যাসিবাদী জালিম এর সামনে মাথা নত না করা এবং খেলাফতে রাশেদার জন্য যে শাসন সেটার ভিত্তিতে সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জীবন দেওয়া, ইসলামকে ব্যক্তিগত জীবনে চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্যেকুলার বা অন্য কোনো ধারণা কে প্রতিষ্ঠা করে ডেমোক্রেসি সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদীর দিকে ঝুঁকে যাবে তারাও যে তাদের উত্তরসূরি এটাও মহরমের একটি শিক্ষা।
আজকে জামায়াতে ইসলামী আলহামদুলিল্লাহ শাহাদাতের সিঁড়ি বেয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।আমাদেরকে রক্ত আরো দিতে হবে আল্লামা ইকবাল তো এটাই বলেছেন,“ইসলাম জিন্দা হোতা হে হার কারবালা কি বাদ” ‘ প্রতিটি কারবালার পরেই ইসলাম আবার জিন্দা হয় । ’
আমরা সেই কারণের জন্যই কারবালার হোসাইন হতে রাজি আছি। রক্তাক্ত একটি জমিনের মধ্য দিয়ে যদি ইসলাম জিন্দা হয় তাহলে আমরা সেই রক্ত দিতে রাজি আছি। আমরা সেই দিনের জন্য প্রস্তুত আছি। ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী'র এই অন্ধকার দূরীভূত হবে। আমাদের সফলতা এবং সম্ভাবনার সেই সকাল আমাদের সামনে আবার উদিত হবে। কারবালার এই শিক্ষা থেকে আমাদের সুসংগঠিত হয়ে আদর্শের সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বাতিলের সাথে আপোষ করা কখনো কারবালার শিক্ষা নয়। আদর্শের জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
আমার জীবনকে তুচ্ছ মনে করে ঈমানকে বড় মনে করা- এটাই আমাদের শিক্ষা। আমাদের কদম যেন দূর্বল না হয়ে যায়। আমরা যেন বিচলিত না হই। আমাদের ঈমান, সবর এবং তাওয়াককুল এর উপর থেকে, আল্লাহ তা'আলার দ্বীনের উপর থেকে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার তাওফিক এবং নসীব যেনো দান করেন। আমীন।
Share: