দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

হারিয়ে যাওয়া হায়দ্রাবাদ


হায়দ্রাবাদের আয়তন ছিল 82 হাজার 698 বর্গমাইল । হায়দ্রাবাদ এর উত্তরে ছিল ভারতের মধ্য প্রদেশ ,উত্তর-পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্র ,দক্ষিণের কৃষ্ণা ,তুঙ্গভদ্রা নদী, পশ্চিমে আহমদনগর, বিজাপুর পূর্বে ছিল তামিলনাড়ু । 1947 সালের 28 সেপ্টম্বর অপারেশন  পলো নামের পুলিশ অ্যাকশন এর আড়ালে ভারতীয় বাহিনী  দখল করে নেয় হায়দ্রাবাদ।1947 সালের 14 ই আগস্ট হায়দ্রাবাদ যখন স্বাধীন হয় তার বহু আগে থেকে শুরু হয-নেহেরু -প্যাটেলদের ষড়যন্ত্র। 1948 জুলাই মাসে নেহেরু স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীবলেন, "যখন প্রয়োজন মনে করব হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করব"৷রাজনীতিবিদ বুদ্ধিবৃত্তিক, সংস্কৃতিক অঙ্গন ,ব্যবসায়ী মহল ও সেনাবাহিনীর মধ্যে অর্থবিত্ত পদক স্কলারশিপ পুরস্কার এর ব্যবস্থা ও পদোন্নয়ন এর মাধ্যমে তারা তৈরি করতে থাকে নিজেদের লোক।এই লোকেরাই দেশপ্রেমের ভান ধরে গণমাধ্যম এর বদৌলতে রাতারাতি এক একজন  স্টারে পরিনত হয়৷ আর যারা সত্যিকারের দেশ প্রেমিক ছিল তাদের বাজে লোক বানিয়ে না-নান কেচ্ছা কাহিনী ছড়িয়ে দেওয়া হয়-আর পেছন দিকে তৈরি হতে থাকে ভারতীয় সামরিক আগ্রাসনের ক্ষেত্র।হায়দ্রাবাদের আত্মপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য হাজার হাজার সংস্কৃতিক সংগঠনের জন্ম দেয় ভারত।এভাবেই এখন বাংলাদেশের ভেতর গজিয়ে উঠেছে নানা ধরনের  বর্ণাঢ্য সংগঠন,  নারী ফাউন্ডেশন।

হায়দ্রাবাদের দুর্ভাগ্য তার জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই ছিল হিন্দু৷ সাধারন হিন্দু জনতা হয়তো হায়দ্রাবাদের স্বাধীন সার্বভৌম এর প্রতি শ্রোদ্ধাশীল ছিল৷ কিন্তু তাদের যেসব সংগঠন ছিল তার পুরো নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ছিল ভারতের বিশুদ্ধ দালাল ।এই দালালদের বিষয়ে হায়দ্রাবাদ সরকারের কাছে বিস্তর অভিযোগ ছিল৷ দেশের অভ্যন্তরে নাশকতামূলক কাজ চালানো কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে ,গণমাধ্যম এর পূর্ণ সমর্থন ও ভারতীয় চাপের কারণে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় ভাড়া হায়দ্রাবাদের সরকার।

হায়দ্রাবাদের প্রতিটি হিন্দু সংগঠনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তারা সবাই ছিল আসলে ভারতের কোন না কোন সংগঠনের শাখা৷ তাদের কাজকর্ম  ছিল ভারতে অবস্থিত মূল সংগঠনের আদেশ-নির্দেশ প্রণীত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা৷ তাদের জন্য সীমান্তের ওপার থেকে আসতো বস্তা বস্তা টাকা।

হায়দ্রাবাদ ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হায়দ্রাবাদের হিন্দু-মুসলিম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বন্ধুর মতো বসবাস করে আসছিল ৷কখনোই তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি বরং ঈদ মহররম ,রামলীলা গণেশ উৎসব ইত্যাদি সর্বজনীনতার সঙ্গে পালন করা হতো।আর ভারত সর্বপ্রথম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের দিকে হাত বাড়ায়।

হায়দ্রাবাদের ম্যাপ

হায়দ্রাবাদকে ঘিরে  থাকা তিনটি রাজ্যে 1947 সালের নির্বাচনে সরকার গঠন করে কংগ্রেস।আর এই দিনটি সরকারি হায়দ্রাবাদের অভ্যন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টির কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। প্রথমেই তারা প্রয়োগ করলো “সত্যাগ্রহ“ নামক গান্ধীবাদী অস্ত্র৷  হায়দ্রাবাদের কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, আরএসএস  অস্থিরতা সৃষ্টির করার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ে কিন্তু সাধারণ হিন্দুদের এই কাজে অনীহা থাকায় তারা ব্যবহার করে সংগঠনগুলোকে।

সম্মিলিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবক সন্ত্রাসীদল  হায়দ্রাবাদে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় ৷এই স্বেচ্ছাসেবকদেরয দায়িত্ব দেওয়া হয় দেওয়া হয় আইন অমান্য করার। তাদেরকে বলা হয় যেন হায়দ্রাবাদের বিভিন্ন শহরে আইন অমান্য করে গ্রেফতার বরণ করবে ৷এই স্বেচ্ছাসেবক কে বুঝানো হয় তারা যেন গ্রেফতার হয় কিন্তুু নিজাম সরকারের কারাগারে তাদের কোন ভয় নেই কারন সেখানে ভারতের অনুগত কর্মকর্তারা আছে।

মুসলিম নেতাদের মধ্যে যারা এই চক্রান্তের মূল উদ্দেশ্য জানতেন তারা সত্য আসন্য বিপদ সম্পর্কে জনসাধারণকে  সাবধান করেন৷ ইতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন  রাজনীতিবিদ বাহাদুর ইয়ার জং তিনি  বলেন, "হায়দ্রাবাদ বাঁচাও ভারত রোখ"।এই আহবান এর বিরুদ্ধে ভারতীয় হায়দ্রাবাদের দুই দেশেরই চক্রান্তকারীরা বিক্ষোভ দেখাতে লাগল৷ তারা মুসলিম রাজনৈতিক নেতাদের চৌদ্দগুষ্টি তুলে গালাগাল করে হইচই বাধিয়ে ফেলল।তারা বলল হিন্দুদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে সীমাহীন অত্যাচার নির্যাতন ইত্যাদি নানা সাম্প্রদায়িক কল্পকাহিনী রচনা করতে লাগলো।আর হায়দ্রাবাদের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সেটাই বড় হয়ে দেখা দিল ।এই সাম্প্রদায়িক বানানোর প্রক্রিয়া কি আরো তীব্র বেগবান করার জন্য এগিয়ে এলেন হায়দ্রাবাদের কংগ্রেস নেতা স্বামী রামানন্দ তীর্থ তিনি প্রচার শুরু করলেন হায়দ্রাবাদের সরকার ও মুসলিম জনগোষ্ঠী পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে এই অবস্থায় হায়দ্রাবাদের হিন্দু জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে৷ মুসলমানরা হিন্দুদের বাড়িঘর জমি জমা সহায়-সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে তাদের মা বোনের ইজ্জত কেড়ে নিচ্ছে ৷প্রতিনিয়ত দাঙ্গার শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে হিন্দুরা অথচ তারাই হায়দ্রাবাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। তাই যেকোন মূল্যেই হোক হায়দ্রাবাদ কে ভারতভুক্ত করতেই হবে।

রামানন্দ হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তি দাবিতে শুরু করলেন আইন অমান্য আন্দোলন।  ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হল সারা হায়দ্রাবাদ জুড়ে৷ এ পরিস্থিতিতে হিন্দুবাদী নেতারা  অনেকে হায়দ্রাবাদ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়ে গঠন করলেন অ্যাকশন কমিটি৷ এই অ্যাকশন কমিটির নেতৃত্বে ভারতের হাজার হাজার উগ্রবাদী সন্ত্রাসী সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকতে শুরু করল হায়দ্রাবাদে তারা শুরু করল ব্যাপক অরাজকতা, ধ্বংসযজ্ঞ ৷মুসলমানদের উপর চালানো ভয়ংকর নিষ্পেষণ শত শত মুসলমান নিহত হলো এদের হাতে লুটপাট অগ্নিসংযোগ এর মাধ্যমে শুরু হয়।

দেশ ও জাতির এই চরম সংকট কালে হায়দ্রাবাদের মুসলিমরা চিন্তিত হয়ে পড়েন।হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এর কার্যক্রম এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে তারা সংগঠিত না হয়ে কোন উপায় দেখলেন না ৷তার  তিনটি বিষয়কে সামনে আনলেন।

এক.  স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জাতীয় ঐক্য সংহতি গড়ে তোলা৷

দুই. মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ভীতি ছড়িয়ে আছে তা দূর করা ৷

তিন. হিন্দু সম্প্রদায়ের যেভাবে ভারতীয় হিন্দু মানসিকতা এখনও রত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন তা থেকে বের করে তিনি রাষ্ট্রীয় মূল চেতনার সঙ্গে সম্মিলিত করা।

আর এই লক্ষ্যে বাহাদুর ইয়ার জং এর নেতৃত্বে ইত্তেহাদুল মুসলিমিন নামক একটি সংগঠন তৈরি করা হয়।আর তিনি সারা হায়দ্রাবাদে ব্যাপক সফর করতে শুরু করলেন ৷এবং ঘোষণা করলেন "হায়দ্রাবাদ শুধু মুসলমানদের মাতৃভূমি নয়, হায়দ্রাবাদ শুধু হিন্দুদের মাতৃভূমি নয়, হায়দ্রাবাদ হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকলের, হায়দ্রাবাদ মুসলমানদের নয় ,হিন্দুদের নয় বরং তারা সবাই হায়দ্রাবাদি৷  হায়দ্রাবাদ আক্রান্ত তার স্বাধীন অস্তিত্ব বিপন্ন আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে৷

বাহাদর ইয়ার জং  এর এ বক্তব্য স্ফুলঙ্গের  মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশেরএক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত৷ দেশজুড়ে দেখা দিল অভূতপূর্ব গণজাগরণ ৷ যেখানেই বাহাদুর গিয়ার চঙ্গের সভা-সমাবেশ সেখানে হল নামতে থাকলো মানুষের ৷মানুষ যোগ্য একজন নেতা কে পেয়ে  আশ্বস্ত হলো৷ হায়দ্রাবাদ কে রক্ষার শপথ নিয়ে নেমে এলো রাজপথে ।ঠিক এ সময় বজ্রপাতের মত আরেকটি সংবাদ এলো হায়দ্রাবাদের এক বন্ধুর বাসায় নৈশভোজে অংশ গ্রহন করতে গিয়ে ইন্তেকাল করেন জননেতা বাহাদুর ইয়ার জং।

বাহাদুর ইয়ার জং

বাহাদুর ইয়ার জং এর  মৃত্যুতে হায়দ্রাবাদ পরিণত হয় শোকের  পাথরে। স্তম্বিত হয়ে পড়ে জনগণ ৷ইত্তেহাদ এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। সেই সংকট কালে এই হায়দ্রাবাদের মানুষের সামনে আলো মতো উদ্ভাসিত হন  অপেক্ষাকৃত তরুণ জননেতা, দৃঢ় মনোবল ,সাহসী মানুষ হিসেবে পরিচিত কাশেম রিজভী।বাহাদুর ইয়ার জঙ্গের মৃত্যুর সুযোগে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে হায়দ্রাবাদের পরিস্থিতির আরও অস্থির আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।হায়দ্রাবাদের মানুষের সামনে ভারত দাঁড় করিয়েছে দুটি পথ :-

এক. হয় স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে৷

দুই. না হয় স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা।

ভারত তাদের সামনে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরী করলো যে দিক থেকেই তোমরা যাও, যে দিক থেকেই তোমরা চেষ্টা করতে থাকো ভারতভুক্ত তোমাদেরকে হতেই হবে ৷এছাড়া তোমাদের নিস্তার নেই। হায়দ্রাবাদের  মানুষ বিশেষ করে মুসলিম জনতা তখন টগবগ করে ফুটছে৷ভারতকে ঠেকানোর জন্য সাধারণ মানুষ ত্যাগ স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল ৷কংগ্রেসের ইন্ধনে  ভারতীয় সন্ত্রাসীরা হায়দ্রাবাদ এর ভেতর ঢুকে নারকীয় তান্ডব, বিশৃংখলা লুট অগ্নিসংযোগ ,হত্যাযোগ্য শুরু করে৷ অনুপ্রবেশকারীদের কে  ভেতর থেকে কিছু মানুষ সহোযোগীতা করতে থাকে ৷এ ধরনের আত্মঘাত মূলক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর ক্ষেত্রে সহায়ক রামানন্দ।

কট্টর হিন্দু সংগঠন গুলোর পাশাপাশি কংগ্রেস আরও একটি অস্ত্র প্রয়োগ করলো হায়দ্রাবাদে ৷এই অস্ত্রের নাম হচ্ছে "কমিউনিষ্ট"৷ তেলেঙ্গা অঞ্চলে কংগ্রেসের উসকানিতে কমিউনিস্টরা রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নেয়৷ কমিউনিস্টদের অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকে ভারত সরকার৷কংগ্রেসের উৎসাহ  ও  সাহায্য নিয়ে চলে কমিউনিস্টরা শুরু করে সশস্ত্র বিদ্রোহ। হায়দ্রাবাদ পুলিশ এই বিদ্রোহ দমন করতে পারে না শেষ পর্যন্ত হায়দ্রাবাদ সরকার সেনাবাহিনী তলব করল৷ সেনাবাহিনী বিদ্রোহ দমনে হিমশিম খেতে লাগলো কারণ:-

এক .সম্মুখ সমরে বিদ্রোহীদের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র

দুই .ভারতীয় মিডিয়ার নামে বিরোধী প্রচারণায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করল, যেন বিশ্ববাসী সবাই বোঝে যে হায়দ্রাবাদ  সেনাবাহিনী রক্তপিপাসু ৷তারা হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করছে ৷তারা করছে হিন্দু নারীদের ইজ্জত লুট করছে৷

আর এই দিকে কাশেম রিজভী হায়দ্রাবাদের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ করে দেখেন, হায়দ্রাবাদ কে বাঁচাতে হলে তাদেরকে অবশ্যই সশস্ত্র হতে হবে ৷আর এই লক্ষ্যে তিনি কাজ শুরু করেন। তিনি মনে করেন যে হায়দ্রাবাদকে রক্ষা দায়িত্ব শুধু সরকারের না হায়দ্রাবাদ রক্ষার দায়িত্ব দেশের প্রতিটি মানুষের। কাশেম রেজভীর সুযোগ্য নেতৃত্বে একটি রেজাকার বাহিনী গঠন করেন ৷শারীরিক সামর্থ্য শিক্ষা অনুযায়ী কাশেম রেজভী রাজাকার বাহিনীর বিভিন্ন ডিভিশন গড়ে তোলেন ৷দেখতে দেখতে দেশের মানুষ উৎসাহের সঙ্গে রাজাকার বাহীনিতে যোগদান করতে থাকলো ৷প্রথমেই অভিযান চালালেন সীমান্তে৷ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী অত্যাচার বন্ধ হলো ৷সন্ত্রাসীদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করল এ অভিযান।

(From left to right): Prime Minister Jawaharlal Nehru, Nizam VII and army chief Jayanto Nath Chaudhuri after Hyderabad's accession to India
(From left to right): Prime Minister Jawaharlal NehruNizam VII and army chief Jayanto Nath Chaudhuri after Hyderabad's accession to India

এখানে আরও একটি কথা বহির্বিশ্বে তখন রাজাকার বাহিনীর গুণগান চলছিল ৷তাদের  ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য ইন্ডিয়ান সংবাদপত্র গুলো তাদের ভাবমূর্তি খুন্য করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। এবার কাশেম রেজভীর চোখ পড়ল তেলেঙ্গার  বিদ্রোহের দিকে।জননেতা কাশেম রিজভীর নেতৃত্বে 2 লাখ রেজাকার এবং 9 লাখ ইত্তিহাদ কর্মী প্রাণপণ প্রচেষ্টার ফলে তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে৷ বন্ধ হয়ে গেল সীমান্ত সব ভারতীয় সৈন্য ও সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ দেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় মদদে গোলযোগ সৃষ্টির সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিল এই সম্মিলিত বাহিনী।

একই সঙ্গে হায়দ্রাবাদের সেকেন্দ্রাবাদে  যে ভারতীয় সৈন্য ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে শত শত  বছর ধরে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে ইত্তেহাদ দাবি করল।ভারত একটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায় এবং বহির্বিশ্বের তাদের ভাবমূর্তি খুন্ন রাখার জন্য তারা একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত করে।চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দুই দেশের পরিস্থিতি ওপর নজর  রাখার জন্য হায়দ্রাবাদের সাবেক মন্ত্রী নবাব ইয়ার জঙ্গের দিল্লিতে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করেন নিজাম সরকার আর  গুজরাটের ঝানু রাজনীতিবিদ বোম্বের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে এম মুন্সীকে  হায়দ্রাবাদে ভারতীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করে ভারত ।

এই কে এম মুন্সি হায়দ্রাবাদ নানা অপপ্রচার ও অপকর্ম চালানোর জন্য দায়ী।চুক্তি স্বাক্ষর স্বাক্ষর এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী ছত্রী হায়দ্রাবাদ ছেড়ে চলে গেলেন তার স্থলে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলেন রাজনীতিবিদ প্রকৌশলী মীর লায়েক আলী। চুক্তি যে তারা মেনে নেয়নি তার প্রমাণ কিছুদিন পরেই পাকিস্তানের দুর্দিনে সাহায্য করার জন্য 20 কোটি টাকা পাকিস্তানকে সাহায্য ঋণ দিয়েছিল হায়দ্রাবাদ৷তা  ভালোভাবে নেয়নি ভারত।

এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সর্বপ্রথম জারি হলো বিমান অবরোধ৷বোম্বাই ব্যাঙ্গালোর মাদ্রাজ দিল্লী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হল ৷তারপস ভারতের সঙ্গে হায়দ্রাবাদের টেলি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো।ভারত অবরোধে হায়দ্রাবাদের  তখন প্রায় নাভিশ্বাস উঠার মত অবস্থা।

আর এদিকে হায়দ্রাবাদের ভারতের প্রতিনিধি এটিএম মুন্সি কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও রীতিনীতি ভঙ্গকরে হায়দ্রাবাদের সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত সফর শুরু করলো ৷তিনি তার সফরের প্রতিটি পর্যায়ে সমাবেশ করতে লাগলেন এবং ভারতের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তিনি ঘোষণা করলেন হায়দ্রাবাদের রক্তে-মাংসে ভারতের সঙ্গে মিশে আছে দুই দেশের জনগণ ও অভিন্ন তাদের সংস্কৃতি অভিন্ন৷

অবরোধের কারণে হায়দ্রাবাদের প্রধানমন্ত্রী দাঁড়  কাকের মতো ছোটাছুটি করতে থাকলেন হায়দ্রাবাদ থেকে দিল্লি দিল্লি থেকে হায়দরাবাদ এবং তিনি লর্ড মাউন্টব্যাটেন এর সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা বৈঠক করেন কিন্তু কোন লাভ হলো না ।উল্টো তিনি ভয় দেখায় বললেন যে ,"আমি কয়েকদিন পরে ভারত ত্যাগ করে চলে যাব সুতরাং ভারত যদি হায়দ্রাবাদে সেনা অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় সে ক্ষেত্রে হায়দ্রাবাদের সেনাবাহিনী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবেন"।মীর লায়েক সেদিন বলেছিলেন ,"একথা ঠিক যে হায়দ্রাবাদ সেনাবাহিনীর অবস্থান আমাদের বিজয় অনুকূল নয় তথাপি আমি বলব হায়দ্রাবাদের রাষ্ট্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব বিসর্জন দিয়ে ভারতের সঙ্গে মিশে যাওয়া আমাদের  জন্য দশ গুণ  নিচুতার কাজ হবে।

1948 সালের ফেব্রুয়ারিতে হায়দ্রাবাদের চারদিক বিপুল সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু কংগ্রেসের অধিবেশনে ঘোষণা করলেন ,“হায়দ্রাবাদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে হয় ফিরে আসো না হয় যুদ্ধ করো"। হায়দ্রাবাদ  সরকার এর কাছে হায়দ্রাবাদ রক্ষার জন্য ভারত সেনাবাহিনীকে মোকাবেলার পথই বেছে নেওয়া শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয় ৷1948 সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে  সালের রাতের আধারে ওঁত পেতে থাকা ভারতীয় রাডার ফাঁকি দিয়ে পাকিস্তানের করাচিতে পৌঁছলেন প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলী ৷প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক তড়িঘড়ি করে জীবনের ঝঁকিনিয়ে  করাচিতে গেলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর শয্যাপাশে।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু শয্যায় সারা পাকিস্তানের তখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কিন্তু হায়দ্রাবাদ তখন তার চেয়েও বেশি অস্থিরতায় ৷তাই  কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন , "যদি ভারত হায়দ্রাবাদ আক্রমণ চালায় তাহলে সে পরিস্থিতি পাকিস্তান বসে থাকবে না"৷তারা সেখানে পাকিস্তান আসন্ন যুদ্ধের পাকিস্তান কতটা সাহায্য করতে পারবে এই বিষয়ে কথা বলেন।কিন্তু তারা উত্তর দেন  পাকিস্তান কি করবে তা কায়েদে আজম জিন্নাহ  ছাড়া আর কারো এ ব্যাপারে কথা বলার কোন সুযোগ নেই৷  জিন্নাহর কথার উপর দারুন নির্ভরশীল ছিলেন নিজাম ওসমান আলী খান এবং প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলী।

হায়দ্রাবাদের দুর্ভাগ্য যে 11 সেপ্টেম্বর কায়েদে আজম জিন্নাহ মারা যাম এবং তাদের সবচেয়ে নির্ভরশীলতা জায়গাটি হারিয়ে যায় ৷ তারা জাতিসংঘের থেকে বেশ নির্ভরশীল ছিলেন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ  উপর৷ গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের উপর ভিত্তি করে তারা হামলার সময় নির্ধারণ করেন  20 থেকে 23 এ সেপ্টেম্বর৷তারা  একটি ক্যালকুলেশন করলেন  যে  রাজধানী পর্যন্ত আসতে প্রায় ৮ সপ্তাহের মত সময় লাগবে  ভারতীয় সেনাবাহিনীর এবং তারা ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে বলে আশা করছে এবং তারা একটি টিমকে জাতিসংঘে পাঠায় সাহায্যের জন্য৷

কায়েদে আজম মোহাম্মদ জিন্নাহর  মৃত্যুর পর হায়দ্রাবাদ মন্ত্রিসভা পরিষ্কার বুঝে গেল  20 তারিখ নয় হয়তো আগামীকালই  ভোরে হয়ত ভারত আক্রমণ করতে পারে কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইদরুস কে বোঝানো গেল না৷ তার  ধারণা 20 সেপ্টেম্বর এর আগে ভারত আক্রমণ করবে না৷ তাছাড়া তার অতিরিক্ত উৎফুল্ল ভাব, সেনা সন্নিবেশন নানান ত্রুটিতে উদ্বিগ্ন মন্ত্রী সভার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী লায়েক আলী বিষয়টি নিজামের করে আনলেন ৷ সেনাপ্রধানের রহস্যময় আচরণ নিয়ে  প্রধানমন্ত্রীর সাথে একমত হলেন নিজাম ৷ কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

এদিকে জাতিসংঘের যাওয়ার জন্য প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের পৌঁছে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলী কিছুটা হাসিখুশি ছিলেন কারণ প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে এবং জাতিসংঘ যেতে পারবে। এদিকে ভারতের গভর্নর জেনারেল রাজগোপাল এর কাছে নিজাম অনুরোধ করেছিলেন যাতে তিনি চেষ্টা করে দেখেন ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় আসা যায় কিনা। তবে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে নিজাম আমন্ত্রণ জানাবে ভারত কে যেন রাজধানীতে তাদের সেনাবহরে স্থাপন করে এবং ভারত সরকারের সব প্রস্তাব মেনে নেয়।

এমনি এমনি সময়ে পূর্ব সীমান্তে একটি ঘটনা ঘটেছিল । পশ্চিম সীমান্তে ভারতের কিছু সিট মহল ছিল ঠিক তেমনি হায়দ্রাবাদের ও কিছু সিটমহল ছিল কিন্তু মূলত শুধু নামেই ছিল। হায়দ্রাবাদের কর্মকর্তাদেরকে ভারত সেখানে ঢুকতে দিত না ।কোদাদ নামক একটি গ্রামে ডাকাতদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য হায়দ্রাবাদ কিছু সংখ্যক সেনা পাঠায় কিন্তু সকালে হঠাৎ করে ট্যাংক বহর নিয়ে ভারত সেখানে হামলা চালায় এবং পুরো গ্রাম কে  জ্বালিয়ে দেয় তারা হায়‌দ্রাবাদের সেনাবাহিনীর  উপর ভারতীয়রা গুলি চালায় এবং অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। যে জায়গায় এই ঘটনাটি ঘটেছিল তা হায়দ্রাবাদ সীমানা থেকে 50 মাইল এর মধ্যে যদিও হায়দ্রাবাদের সীমানার ভেতরে ভারতীয় বাহিনী ঢুকে পড়েছিল তবু হায়দ্রাবাদের কিছুই করার ছিল না।যদিও হায়দ্রাবাদের ছোট দলটি তেমন সুসজ্জিত ছিল না তবুও তাদের অপ্রস্তুত থাকাটা আশ্চর্যের বিষয় ছিল তাছাড়া আরও বড় বিষয় হলো যে ভারতীয় ট্যাংক বহর তখন রাজধানী 50 মাইল এর মধ্যে অবস্থান করছিল। অথচ সেনাপ্রধানের মধ্যে কোন উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেলনা ৷নেজাম মিটিংয়ের আয়োজন করলেন মিটিংয়ে সবাই সেনাবাহিনীর অপরিপক্বতা নিয়ে হতাশ ব্যক্ত করলেন যদিও তারা হাত ছিলেন যে আমলা 20 তারিখেই হবে৷

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু একদিন পর  13 সেপ্টেম্বর 1948 সালের ভোরবেলা ভারত গোটা পৃথিবীতে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়দ্রাবাদের উপরে । তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল 11 সেপ্টেম্বর জিন্নাহর মৃত্যু তাদের কাছে সেই সুযোগটি এনে দেয়। ভারতের অনুমান ঠিক ছিল তা আক্রমণের পরে বুঝা গেল পাকিস্তান সেদিন হায়দ্রাবাদের পাশে দাঁড়ানো তো দূরের কথা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। আক্রমণ শুরু করার আগেই ভারত হায়দ্রাবাদের কিছু রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীসহ সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আল ইদরুস  কে  কিনে ফেলেছিলো। বাংলার বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের মতই এই আল ইদরুস নিজাম ও প্রধানমন্ত্রী কে ধোকা দিয়ে সেনাবাহিনীর উন্নয়নের গতি রুদ্ধ করে রেখেছিল। সেনাবাহিনী কে রেখেছিল অপ্রস্তুত অবস্থায় ।ভারত এর মাধ্যমে হায়দরাবাদকে ভেতর থেকে দুর্বল করে তারপর আক্রমণ করল।

ভারত সারা পৃথিবী কে এটা বোঝানোর চেষ্টা করে যে তারা সেখানে জনগণকে রক্ষা করার জন্য, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য নিতান্ত বাধ্য হয়েই পুলিশ অ্যাকশনে গিয়েছিল। আর সেই অপারেশন টিম নাম দিয়েছিল অপারেশন পলো। এই অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল কে এম চৌধুরী (জয়ন্ত নাথ চৌধুরী )। তার নেতৃত্বেই দেওয়া হয় একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ,তিনজন মেজর জেনারেলসহ সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীকে।হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে ভারত ব্যবহার করেছে:-

১) একটি আর্মড ব্রিগেড

২) ১৭ ডোগরা রেজিমেন্ট থার্ড ক্যাভালরি

৩ )নবম ব্যাটেলিয়ন

৪) ৬ টি ইনফ্যানটি ব্যাটেলিয়ন

৫) একটি আন্টি ট্যাংক রেজিমেন্ট

৬) 18 ক্যাভালরি

৭) সার্ভিস মেইনটেন্স ট্রুপস

৮) বিপুল সংখ্যক ফোরম্যান ও স্টুয়ার্ট ট্রুপস

৯) রয়েল ইন্ডিয়ান বিমান বাহিনী।

সত্য স্বাধীন হায়দরাবাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল:-

১) 22 হাজার সেনাসদস্য

২ ) 8 টি 25 পাউন্ডের ঊ

৩) তিন রেজিমেন্ট সেনা যানবাহন

৪ )দশ হাজার পুলিশ ও কাস্টমস বাহিনী

৫) কাশেম রেজভীর বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক রাজাকার যাদের অস্ত্র বলতেছিল লাঠি আর কিছু বর্শা ।

ভারত তার বিপুল পরিমাণ সেনা শক্তি পদাতিক বাহিনীর ট্রেন ও বিমান বাহিনীর সহায়তায় পরিচালনা করে ভয়াবহ সাঁড়াশি অভিযান।যাতে তারা পুরোপুরি দেশটাকে দখল করতে পারে। চুক্তি -ফুক্তি  পায়ের তলায় মারিয়ে ভারত জারি করে সেনাশাসন আর জাতিসংঘ ভারতকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল।

Indian Army movements during the Operation Polo


ট্যাঙ্ক বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। প্রথম দিনেই ভারতীয় বিমান বাহিনী হায়দ্রাবাদের শহর ওসমানাবাদ ,ইয়েলদিমির কোন বাধা ছাড়াই অধিকার করে নেয়। শহর দখল করার পর সাধারণ জনগণের মধ্যে তারা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বিশেষ করে তারা মুসলমানদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তারা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। সেখানে সামান্য কিছু সেনাবাহিনী রেখে অপকর্ম সম্পন্ন করার জন্য ভারতীয় বিমান বাহিনী ও রাঙ্গা আদিলাবাদ আওরঙ্গবাদ বিমান বন্দরে ব্যাপক গোলা বর্ষণ করে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে দেয়। হাকিমপেত বিমানবন্দরে হায়দ্রাবাদের কিছু বিমান বিধ্বংসী সরঞ্জাম ছিল কিন্তু কোন এক গাদ্দার তাদেরকে সেটি জানিয়ে দেয় এবং তারা সেই এলাকাতে প্রবেশ করে নাই।

হায়দ্রাবাদ সেনাবাহিনী তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বেতারের যে গোপন কোড ব্যবহার করছিল তা  ভারত জেনে যায় বা তাদেরকে এই তথ্য দেওয়া হয়। ওয়ারদা  ও নলদ্রাগা রেলপথ সেতু ধ্বংসের জন্য হায়দ্রাবাদ তাদের ইঞ্জিনিয়ার ও সেনাবাহিনী পাঠায় কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের আগেই সেই ব্রিজটি  দখল করে নেয় ।গাদ্দার এরা তাদের খেলা শুরু করে। এই দিনে নলদ্রাগা এলাকার প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়।ভারতীয় সেনাবাহিনীর কিছুটা আধার সম্মুখীন হলেও তারা সেগুলো অতিক্রম করে সামনের রাজধানীর দিকে  আসছিল।

আর এইদিকে কাশেম রেজভী দেশকে বাঁচানোর জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করে যাচ্ছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।তারা জলনা নামক একটি অঞ্চল ভারতীয়দের কাছ থেকে পুনর্দখল। একথা বলতেই হয় যে কাশেম রিজভীর লোকদেরকে যদি ঠিকমতো অস্ত্র দেওয়া যেত তাহলে যুদ্ধের পরিস্থিতি আরো অন্যরকম হতো।

সেনাবাহিনী প্রধান মীরজাফরের মত তাদের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। মীরজাফরের পলাশীর ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকার মত সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাবাহিনীকে উল্টাপাল্টা পরিচালনা করছিলেন এবং নিজাম এবং প্রধানমন্ত্রী কে উল্টা পাল্টা তথ্য দিয়েছিলেন।

আর এদিকে 16 সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে একটি সাধারণ সভা ডাকা হয়েছিল হায়দ্রাবাদ বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য। চীন ছাড়া প্রায় সকল দেশে হায়দ্রাবাদের পক্ষেই রায় দিয়েছিল। সেখানে বিদেশ প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক হয় বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয় কিন্তু চীনের প্রতিনিধি যিনি কিনা পরিষদের স্থায়ী সদস্য তিনি প্রস্তাব রাখেন সময় পিছিয়ে 20 তারিখে বিষয়টি আলোচনা করার জন্য। তারপরও তারপরও উভয় পক্ষের শুনানি হয় এবং ভারতীয জোরালোভাবেই বিষয়টি উপস্থাপন করে যে হায়দ্রাবাদ কখনো আসলেই স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না দুই পক্ষের শুনানির পর রায়ের জন্য 20 সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়। আর এই একটি  সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্তই হায়দ্রাবাদকে শেষ করে  দেয়।

আসলেই সময় হায়দ্রাবাদের কিছুই করার ছিল না তাদের সেনাবাহিনী ও কি ভাবে প্রতিরোধ করতে পারছিল না তারা বাহির থেকে কোন ধরনের সাহায্য পারছিল না তো এই পরিস্থিতিতে তারা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। 17 সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে নিজাম বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

পরাজয় এবং আত্মসমর্পণ ভারত কর্তৃক হায়দ্রাবাদ দখলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাক্ষীদের একজন স্যার মীর লায়েক আলী। যিনি ছিলেন নিজামের পরেই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্ত। দেশের প্রধানমন্ত্রী হায়দ্রাবাদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সবচেয়ে বিখ্যাত অসহায় সাক্ষী ।কাশেম রিজভী সাক্ষী হিসেবে ছিলেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ একজন কারণ তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই হায়দ্রাবাদের জনগণের নেতা ছিলেন । ভারত কর্তৃক হায়দ্রাবাদ দখলের পর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন কাশেম রেজভী কাসেম। দেশদ্রোহীতার অপরাধে জীবনের দীর্ঘ সময় তাকে কাটাতে হয় ভারতীয়দের প্রকোষ্ঠে এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ভেতর দিয়েই চিরতরে নিভে যায় হায়দ্রাবাদের প্রাণের প্রদীপ।

গণহত্যা হায়দ্রাবাদ দখলের পরপরই গণহত্যার খবর আসতে থাকে। আবার ভারতজুড়ে মুসলিমদের গণঅসন্তোষের ভয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু কংগ্রেসের সংসদ সদস্য পন্ডিত সুন্দরলালের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন যাতে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মেরই সদস্য ছিল। এ কমিটি হায়দ্রাবাদ ঘুরে এসে তাদের রিপোর্ট জমা দেয় যা সুন্দরলাল রিপোর্ট নামে পরিচিত। নেহেরু থেকে শুরু করে মনমোহন পর্যন্ত, ভারত সরকার এ রিপোর্ট সম্পর্কে গোপনীয়তা বজায় রেখেছে। গণহত্যার বিষয়ে বহির্বিশ্ব ও ভারতের জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়। সর্বশেষে ২০১৩ সালে দিল্লীর নেহেরু স্মৃতি জাদুঘরে এ রিপোর্ট জনসম্মুখে আসে। কমিটির মতে, খুব কম করে ধরলেও ২৭০০০ থেকে ৪০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। যদিও এ জি নুরানি ও অন্যান্য গবেষকদের মতে এ সংখ্যা দুই লাখ বা তার থেকেও বেশী। কমিটির রিপোর্টে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনী এ সকল গণহত্যায় সরাসরি জড়িত ছিল।

“বেশ কয়েক জায়গায়, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা শহর ও গ্রাম থেকে মুসলিম পুরুষদের ধরে নিয়ে এনে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছে।”

সেনাবাহিনী মুসলিম পুরোপুরি নিরস্ত্র করলেও হিন্দুদের তো নিরস্ত্র করা হয়ইনি বরং সেনাবাহিনী উৎসাহিত করেছে আর কিছু ক্ষেত্রে বাধ্য করেছে স্থানীয় হিন্দুদের, মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকানপাট লুটপাট করার জন্য। সুন্দরলাল রিপোর্টের সাথে পেশ করা একটা গোপনীয় নোটে হিন্দুদের রক্তলোলুপ এই চরিত্রের এক জঘন্য নমুনা দেখা যায়।

Flag
হায়দ্রাবাদের পতাকা

“অনেক জায়গায় আমাদের দেখানো হয় কুয়া যেগুলো ছিল পচা লাশে ভরা। এ রকম এক ক্ষেত্রে আমরা ১১ টি লাশ দেখেছি যার মধ্যে ছিল একজন মহিলা যার ছোট শিশুটি তার স্তনের সাথে লেগেছিল।”

“দেখেছি ডোবা-নালার মধ্যে লাশ ছড়িয়ে আছে। বেশ কয়েক জায়গায় দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল ; আমরা গিয়ে দেখেছি পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া হাড় আর খুলি এখনও সেখানে পড়ে আছে।”

শুধু হত্যা আর লুটই নয়, অসংখ্য মুসলিম মহিলা সশস্ত্র হিন্দু মিলিশিয়াদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। মুহাম্মাদ হায়দারের ভাষায়, “ হাজার হাজার পরিবার ভেঙ্গে গিয়েছিল, শিশুরা তাদের পিতামাতার কাছ থেকে আর স্ত্রীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। মহিলা ও তরুণীদের ধাওয়া করা হত আর ধর্ষণ করা হত”।

যাদের সামর্থ্য ছিল তারা পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন। জাতিসঙ্ঘ ও মানবাধিকার তখন অন্ধ ছিল। বিশ্বের “সর্ববৃহৎ গনতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে” এ অপরাধের জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি, কারো বিচার হয়নি বরং এর দৃশ্যায়ন আবার ঘটেছিল গুজরাটে।

তথ্যসূত্রঃ

1-হারিয়ে যাওয়া হায়দ্রাবাদ -আব্দুল হাই শিকদার

2-http://www.hinduonnet.com/thehindu/...

3- http://www.bbc.com/news/magazine-24...

Thomson, Mike (24 September 2013). “Hyderabad 1948:

India’s hidden massacre”. BBC

4- Indian integration of Hyderabad, Wikipedia

5-https://www.facebook.com/islameritihash/posts/1675869645959983/

@Abdul Wahab


Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন