দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

ইখওয়ানুল মুসলিমীন সিরিয়া, একটি ব্যর্থ বিদ্রোহ অতঃপর.

 ইখওয়ানুল মুসলিমীন সিরিয়া, একটি ব্যর্থ বিদ্রোহ অতঃপর.

সময়টা ১৯৬৩ সাল ,বাথ পার্টি সামরিক অভ্যুত্থান এর মাধ্যমে সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করে এবং জরুরি অবস্থা জারি করে । ১৯৪৫ সালে জন্মের পর সিরিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুড তখন প্রধান রাজনৈতিক দল হয়ে উঠেছে । ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলি এবং মার্ক্সবাদীদের সরকার তীব্র বিরোধিতা করে । শুরু হয় ধর্মঘট ও গণ- বিক্ষোভ, ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে । আস্তে আস্তে আন্দোলন আরও জোরালো হতে থাকে । প্রধান শহরগুলি, বিশেষত হামায় সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রচুর ধ্বংসযজ্ঞ চালায় । ১৯৬৪ সালের মাঝামঝিতে রাস্তাঘাট অবরোধ,ধর্মঘট ও গণ- বিক্ষোভ আরো তীব্র হয় । বিদ্রোহীরা বাথ পার্টির সদশ্যদের উপর আক্রমণ করেতে থাকে । একজন ইসমাইলি বাথী সৈন্য নিহত হওয়ার পরে দাঙ্গা তীব্র হয় । বিদ্রোহ দমন করতে সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক পর্যন্ত ব্যবহার করে। মুসলিম ব্রাদারহুডের 70-100 জন সদস্য মারা যায় আরও অনেককে আহত বা বন্দী করা হয় আনেকে আন্ডারগ্রাউ আবস্ত নিখোঁজ হয়ে যায় । এ আন্দোলন কিছু টা স্তমিত হলেও থেমে যায়নি ,এ আন্দোলন ধীরে ধীরে সশস্ত্র রুপ নিতে থাকে । ১৯৭০ এর শেষের দিকে হাফিজ আল আসাদ ক্ষমতা দখল করে । সুন্নি ইসলামপন্থীরা সিরিয়ায় বাথ সরকারের বিরুদ্ধে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত যে আন্দোলন করে ছিল তাকে "লং ক্যাম্পেইন অফ টেরর' হিসাবে আবহিত করা হয় ।


1979 সালে ব্রাদারহুড সরকারী কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে দেশের একাধিক শহরে গেরিলা আক্রমণ করে । ফলস্বরূপ সরকারের দমন- নির্যাতন , গণ-গ্রেপ্তার ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দেয়। ১৯৮০ সালের শুরুতে সিরিয়ার প্রায় সব শহরই ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে , শহর রক্ষা বাহিনীর সাথে রিতিমত লড়াই শুরু হয়ে যায় । মুসলিম ব্রাদারহুড এবং অন্যান্য বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলগুলো সরকারী কর্মকর্তাদের উপর হামলা,সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় । ২৬ শে জুন, ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি হাফেজ আল-আসাদকে হত্যার প্রচেষ্টা । মালি রাষ্ট্রপতির জন্য সরকারী সংবর্ধনায় তার উপর আক্রমণ করা হয় । কেবলমাত্র হালকা আঘাত প্রাপ্ত হন কিন্তু বেঁচে যান । হাফিজ আল-আসাদের প্রতিশোধ ছিল দ্রুত এবং নির্দয়: মাত্র কয়েক ঘন্টা পরে তাদমোর কারাগারে বহু সংখ্যক ইসলামপন্থী বন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ।

১৯৮০ সালের জুলাইয়ে, ইমার্জেন্সি ল 49-এর অনুমোদনের ফলে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যপদকে মৃত্যদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসাবে আইন পাস করা হয় । আগস্টে ইসলামপন্থীদের আলেপ্পোতে অবস্থানরত সেনাদের উপর হামলার জবাবে ৮০ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। 1981 সালের এপ্রিলে সেনাবাহিনী হামার প্রায় 400 জন বাসিন্দার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

সিরিয়ার হামা শহরটি ইখয়ানীদের শক্তিশলী একটি ঘাটি । ১৯৮২ সালে বেশ কয়েকটি জায়গায় সরকারী বাহিনী এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের ইসলামপন্থীরাদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে । যার প্রেক্ষিতে হাফিজ আল-আসাদ হামায় ১২০০০ সৈন্য প্রেরণ করে । সাথে রিফাত আল-আসাদের বিশেষ বাহিনী, অভিজাত সেনা ইউনিট এবং মুখভারত এজেন্টরা শহরে আসে । হামলার আগে সামরিক বাহিনীক শহরবাসীকে আত্মসমর্পণের আহবান জানায় এবং সতর্ক করে যে এই শহরে কেউ রয়ে গেলে তাকে বিদ্রোহী বলে বিবেচনা করা হবে। ৯৮২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাত দুটো থেকে শুরু হয় আপারেশন ।

আর এদিকে ইখওয়ানীরা সরকারী কর্মকর্তা এবং বাথ পার্টির নেতাদের বাড়িতে আক্রমণ করে , পুলিশ চৌকিতে আক্রমণ করে এবং অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় । 3 ফেব্রুয়ারির সকালে মধ্যে প্রায় 70 জন শীর্ষ বাথীকে ঝুলিয়ে দেয় ইখওয়ানীরা এবং হামাকে একটি "মুক্ত শহর" হিসাবে ঘোষণা করে।

হামার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সেনাবাহিনীর প্রায় ৩ সপ্তাহ লেগেছিল । অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, সিরিয়ার সেনাবাহিনী সরু রাস্তাগুলি দিয়ে পদাতিক , আর্টিলারি ও ট্যাঙ্ক নিয়ে যাওয়ার জন্য এয়ার ্ট্রাইক করে । লড়াইয়ের প্রথম চার দিনের মধ্যে ভবনগুলি ধংস হয়ে যায়। পুরানো শহরের বড় অংশ ধ্বংস করা হয়ে যায় । সরকারী বাহিনীর উপর হাইড্রোজেন সায়ানাইড ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে । শহরের ভেতর লুকিয়ে থাকা ইখওয়ানীদের প্রত্যেককে খুজে খুজে হত্যা করে ।

হামা শহর শহরতলীতে সৈন্যরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল ঘোষণা করেছিল,আপনারা সবাই রাস্তায় নেমে আসুন । কিছু লোক বেরিয়ে আসে । অফিসার তাদের বলে , আমাদের উপর ভরসা করুন , আপনারা
নিরাপদ বাড়ীর সবায়কে নিয়ে আসুন। সৈন্যরা বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালায় এবং সেখানে অবস্থানকৃত সবায়কে বাইরে নিয়ে আসে । তদের দ্বারাই বড় একটি খাদ খনন করানো হয় । এরপর শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ প্রায় ১৫০০ লোককে গুলি করে হত্যা করে খাদে ফেলে দেয় ।

এ আসম যুদ্ধে ১০০০ জন সৈন্য নিহত হয় ৩৮,০০০ মানুষ মানুষ মারা যায় । রাষ্ট্রপতির ভাই রিফাত আল-আসাদ ৩৮,০০০ মানুষকে হত্যা করার বিষয়ে গর্ব করতেন। সাংবাদিক সুবহি হাদিদি লিখেছিলেন যে , জেনারেল আলী হায়দারের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী 27 দিনের অবরোধে ভারী কামান এবং ট্যাঙ্ক দিয়ে আক্রমণ করে প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয় । 15,000 জনের আজ অবধি খোজ পাওয়া যায় নি এবং 100,000 জনকে বহিষ্কার করা হয় ।

হামার পরাজয় ইখওয়ানুল মুসলিমীনকে সিরিয়ার রাজনীতি থেকে কার্যত অদৃশ্য করে দেয় ৷ কেউ কেউ আত্মসমর্পণ করে অথবা আত্মগোপনে চলে যায় ৷ দলের বেশিরভাগ সদস্যই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় জর্ডান এবং ইরাকে, তুরস্ক, সিরিয়া, আরব রাষ্ট্র সমূহে । তারপরেও নুসায়েরীরা কি ইসলামী আন্দোলনকে ঠেকাতে পারেছিল ৷ না তারা তা পারেনি! ইখওয়ানুল মুসলিমীন হয়তো প্রকাশ্যে আসতে পারেনি ঠিকই কিন্তুু অপ্রকাশ্য ভাবে তারা তাদের কাজ ঠিকই চালিয়ে গেছে ৷ বলা হয়ে থাকে যে ২০১১ সালের সিরিয়ায় আরব বসন্তের মূল কারিগর ছিল ইখওয়ানুল মুসলিমীন ৷ 
@Abdul Wahab
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন