দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

শায়খ আহমাদ ইয়াসিন রহ:

ইসলামি রেনেসাঁর অগ্রপথিকগণঃ



১৯৩৬ সালের জানুয়ারি মাসে আসকালান শহর থেকে ২০ কি. মি দূরে জুরাহ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল আব্দুল্লাহ ইয়াসিন এবং মাতার নাম সা'দা আল হাবেল। তিন বছর বয়সে তার পিতা মৃত্যু বরণ করেন। তারা চার ভাই এবং দুই বোন্। ১৯৪৮ সালে তাদের গ্রাম ইসরায়েলের দখলে চলে গেলে দশ বছরের বালক আহমেদের জায়গা হয় গাজার আল শাতিঈ শরণার্থী শিবিরে। শরণার্থী জীবনের দু’বছরের মাথায় যখন তার বয়স মাত্র বারো, বন্ধু আব্দুল্লাহর সঙ্গে কুস্তি খেলতে গিয়ে মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড আঘাত পান। টানা পঁয়তাল্লিশ দিন প্ল্যাস্টার করে রেখেও শেষ রক্ষা হলো না। আহমেদ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। পঙ্গু হয়ে যাবার পরেও তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি নিয়ে তৎকালীন ইসলামী জ্ঞানের তীর্থস্থান কায়রোর আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আর্থিক সংকটের কারণে তিনি গাজায় ফিরে আসেতে বাধ্য হন । শরীরের অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেলে গাজায় ফেরত আসেন। ঘরে বসেই তিনি তার শিক্ষা চালিয়ে যান। এসময় তিনি এলাকার মসজিদে জুমার নামাজ পড়ানো শুরু করেন। প্রখর যুক্তি এবং মানুষকে আকৃষ্ট করার যোগ্যতার কারণে তার খুৎবা এলাকাবাসীর কাছে অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। বিশেষ করে তরুণরা তার কথা বার্তায় খুজে পায় ফিলিস্তিনী জাতির মুক্তির মন্ত্র। এভাবে নানা এলাকার মসজিদে মসজিদে লোকে তাকে ডাকতে থাকে। এর পাশাপাশি রোজগারের জন্য একটি স্কুলে আরবী ভাষা বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবেও ছাত্রদের মধ্যে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তার ছাত্রদের মনেও তিনি বপন করে দেন ইসরাইল বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ। স্ট্রিপের অন্যতম সম্মানিত দায়ী ও খতিব হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন । ১৯৬৫ সালে তিনি ইখওয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে আটক করে। এর আগে তার বিরুদ্ধে জামাল আবদেল নাসেরের প্রশাসনের নানা ধরনের বাজে প্রচারণা ও প্রপাগান্ডা চালাই। একমাস গাজায় কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকার পর তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও । তার কায়রো ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় । এটা তাকে প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত করে । তিনি এর আগে কখনোই মিশরের ইখওয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না । তবে এই ঘটনার পরে তিনি ইখওয়ানের অনেক কাছাকাছি চলে আসেন। সম্ভবত 1967 সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইখওয়ানের যোগদান করেন এবং দলের প্রয়োজনে নিবেদিত ব্যক্তি হিসেবে সর্বোচ্চ পরিমাণ আত্মনিয়োগ করেন । ১৯৬৭ তে আরব-ইজরাইল যুদ্ধের সময় গাজাসহ পুরো ফিলিস্তীন দখল করে ফেলে ইজরাইল। জনগণ দুর্বিষহ অবস্থার দিকে চলে যায়৷ আহমদ ইয়াসিন নিজে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজতে শুরু করলেন ৷ গাজা ও পশ্চিম তীরের ইসরাইলি দখলদারিত্ব ইখওয়ানের জন্য অনেকগুলো সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়৷ এই সময় মানুষের কাছে ইখওয়ানের অবস্থান একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে চলে যায়৷ এই সময়ে তারা ব্যাপক ধরনের সামাজিক কাজ করতে থাকে ৷ শেখ আহমেদ ইয়াসিন ও ইখওয়ানের ফিলিস্তিনিদের সাহায্যের জন্য আল মুজাম্মা আল ইসলামি নামে একটি ইসলামি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠন ব্যাপকভাবে জনসেবা এবং সামাজিক কাজ করতে লাগল যেমন ফ্রি ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা, ফ্রি স্কুলিং, মসজিদ এবং লাইব্রেরী নির্মাণ। এই সামাজিক কাজ গুলো ব্যাপকভাবে সমাজে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়৷ ইসলামিক সোসাইটি ইসলামিক সেন্টারের উপর ভর করেই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে ইখওয়ান । অল্প সময়ের মধ্যেই মোট মসজিদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় । প্রায় প্রতিটি মসজিদেই কিন্ডার গার্ডেন স্কুল চালু হয় আবারও কিছু মসজিদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ক্লিনিকের ব্যবস্থাও চালু করে তারা ৷ তারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে যুবকদের মগজে ইসলামী নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিষয়গুলোকে ঢোকার চেষ্টা করে৷ এমনকি এই সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে ইখওয়ান গাজায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করে যার -নাম "ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়" ৷ কারণ শায়খ আহমাদ ইয়াসিন মনে করতেন প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করার আগে আরো অনেক কাজ করতে হবে। এই সামাজিক কার্যক্রম চলতে থাকে ১৯৬৭ থেকে প্রথম ইন্তেফাদা পর্যন্ত। আশির দশকের শুরুতে ফাতিহ শিকাকি ইসলামিক "জিহাদ মুভমেন্ট ইন ফিলিস্তিন" নামে একটি সংগঠন তৈরি করে ৷ তাতে ইখওয়ান ও ইখওয়ানের বাইরেও অনেকেই শামিল হয় ৷ 1969 সাল থেকে 1981 সাল পর্যন্ত এই এই সংগঠনটির ইজরাইলিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম তরুণ সমাজকে ভীষণভাবে আন্দোলিত করে ৷ ঠিক তখনই ইখওয়ানের মধ্যে বড় ধরনের এক সংকট দেখা দিতে থাকে৷ ইখওয়ানের কর্মীরা অভিযোগ করতে থাকে কেন(?) আমরা অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলছি না ? ভেতর থেকে এবং বাহির থেকে আহমদ ইয়াসিনের উপরে ক্রমাগত চাপ বাড়ছিল ৷ কারণ তিনি ফিলিস্তিনে ইখওয়ানের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিদের মধ্যে একজন ৷


দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কিছু করতে না পারার ব্যর্থতা ও মনস্তাপ ইখওয়ানের কর্মিদের ক্রমশ দুর্বল ও বিভেদ মুখর করে দিচ্ছিলো ৷ 1983 সালে কিছুটা বাধ্য হয়েই শেখ আহমাদ ইয়াসিন ও তার কিছু ঘনিষ্ঠজন গোপনে কিছু কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আম্মানে পাঠান এবং অস্ত্র ক্রয় করার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন ৷ অস্ত্র কেনার পরিকল্পনাটি ফাঁস হয়ে যায় ৷ যে দুইজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন ইজরাইলিদের হাতে গ্রেফতার হয় ৷ অত্যাচারের মুখে এক পর্যায়ে তারা শেখ আহমাদ ইয়াসিন এর নাম বলে দেন ৷ শেখ আহমাদ ইয়াসিন গ্রেফতার করা হয় ৷ 1984 সালের 15 এপ্রিল ইসরাইলের সামরিক আদালতে ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে শেখ ইয়াসিনকে 13 বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয় ৷ 1985 চুক্তির বিনিময়ে ইয়াসিন মুক্তি লাভ করেন ৷ 

তার মুক্তির পরে শেখ আহমদ ইয়াসিন ১৯৮৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে গাজা উপত্যকায় একদল ইসলামী নেতাদের (ডাঃ আবদ আল আজিজ আল রনতিসি সহ) ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন (হামাস) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুলত এটা ইখওয়ান এর আপডেট ভার্সন । হামাসের লক্ষ্য প্যালেসটাইনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জায়নিবাদী দখলকে প্রতিহত করা। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরই গাজা উপত্যকায় জায়নবাদী দখলদার সৈন্যদের উপর বেশ কয়েকটি আক্রমণ চালআয় এবং বেশ কয়েকজন জায়নিবাদী দখলদার সৈন্য ও অফিসারকে হত্যা করে। হামাস যখন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বাড়াচ্ছিল , তখন জায়নিবাদীরা ইয়াসিনের তৎপরতা বন্ধ করার উপায়ের কথা ভাবতে শুরু করে। 

1989 সালে, প্রথম ইন্তিফাদের দুই বছর পরে, ইয়াসিনকে আবারও জায়ো*নিস্ট সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। এবার তাকে 40 বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয় ৷ সশস্ত্র প্রতিরোধের আহ্বান জানানো এবং দখলদার সৈন্যদের হত্যা ও অপহরণ করার পাশাপাশি হামাস প্রতিষ্ঠা এবং এর সামরিক শাখা প্রতিষ্ঠার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় ৷ ১৯৯১ এর ১৬ সেপ্টেম্বর ইসরাঈলী আদালত তাকে যাবজ্জীবন এবং অতিরিক্ত আরো ১৫ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত করে। রিমান্ডে নিয়ে আঘাত করার ফলে তার ডান চক্ষু সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায় এবং বাম চোখের দৃষ্টি শক্তি দুর্বল হয়ে যায় । তাকে যেদিন বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তার সঙ্গে তার ছেলে আব্দুল হামিদকেও নিয়ে যাওয়া হয়, তার দেখাশোনা করার জন্য ৷ 

সে সময়ের শেখ আহমাদ ইয়াসিন এর জবানবন্দি: "তারা আমাকে নিয়ে একটি রুমে বসালো আর সেই সঙ্গেই চিৎকার করে গালি দেয়া শুরু করল । শুরু হলো নির্যাতন, তারা আমার মুখে থুতু ফেললো এবং একই সঙ্গে চড় থাপ্পড় মারা শুরু করল , একটা ট্রেতে আমার মাথাটি উপুড় করে রাখল । এরপর পিছন থেকে আমার ঘাড়ের রগ গুলো উপর থেকে নিচে আবার নিচ থেকে উপর কিভাবে যেন চাপ দিলো । মনে হচ্ছিল রোগগুলো যেন ভর্তা হয়ে যাচ্ছে আমি প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম ,এবার তারা আমার বুকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত শুরু করল যতক্ষণ না বুকটা ব্যথায় নীল হয়ে যায় । তারপর তারা আমার ছেলেকে নিয়ে এলো , তারা আমার সামনেই তাকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে চারজন মিলে পাগলা কুকুরের মত তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো ৷ একজন তার গলা চিপে ধরল একজন তাকে মারতে শুরু করল , আরেকজন শারীরিকভাবে অপদস্ত করা শুরু করল , সে পাগলের মত চিৎকার করছিল । আমাকে বলল, "যদি তোর ছেলের প্রতি মায়া থাকে তাহলে স্বীকার করে নে তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে(!) হামাস তো এর মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে । তাই এখন আর নিজের দায় অস্বীকার করে তুই কি তোর দলকে বাঁচাতে পারবি "। 

আমি তাদের জানিয়ে দিলাম আমার বলার কিছুই নেই ৷ তারা চলে গেল কয়েক ঘন্টা পর আবারও এসে আমার ছেলের উপর বেদম প্রহার শুরু করল ৷ তাদের অত্যাচার এতটাই ভয়ানক ছিল যে প্রায় মরেই গিয়েছিল ৷ তারপর ওরা তাকে নিয়ে যায় । পরবর্তী চারটে দিন আমি এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারিনি ৷ এই চারটি দিন আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও হুইলচেয়ার থেকে নামতে দেয়া হয়নি । ঘন্টার পর ঘন্টা এসে জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমার উপর অত্যাচার করত ৷ আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতাম ৷ আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ ইয়াসিন এসব তথ্য জানান । 

 তবে তার উপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল পরবর্তী সময়ে এই কথাগুলো তারই ঘনিষ্ঠ সহচর ও বর্তমান রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া নিশ্চিত করেছেন ৷ সে সময় তিনি কারাগারে ছিলেন এবং তিনি ছিলেন সেই গুটিকয়েক নেতাদের মধ্যে একজন যাদেরকে ডেকে এনে দূর থেকে আহমদ ইয়াসিনের উপর চালানো নির্যাতন দেখানো হতো ৷ যাতে তারা ভয় পায় এবং তাদের মনোবল ভেঙ্গে যায় । শেখ ইয়াসিন প্রতিবন্ধী ও হুইল চেয়ারে বসা থাকলেও তাকে ইসরাইলি সেনারা সেনা ও কারা কর্মকর্তা প্রায় কয়েক তলা সিঁড়ির উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত এবং তিনি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে যেতেন আবারো তাকে উপরে নিয়ে এসে ফেলে দেওয়া হতো ৷ তার দাড়ি চেয়ারের সাথে বেঁধে দেয়া হতো তিনি অত্যাচার সইতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যেতেন।
হুইলচেয়ারে শায়েখ
১৯৯২ এর ১৩ ডিসেম্বর হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জুদ্দীন আলকাসসাম ব্রিগেডস এক ইসরাঈলী সৈন্যকে অপহরণ করে , তার মুক্তির বিনিময়ে শেখ আহমাদ ইয়াসীনের মুক্তি দাবী করে। ইসরাঈল এ দাবী প্রত্যাখ্যান করে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালালে মুজাহিদরা শাহাদত বরণ করেন এবং ঐ সৈন্যও নিহত হয় । জর্দানে খালিদ মেশালকে গুপ্ত হত্যার প্রস্তুতির সময় ধৃত ২ ইসরাঈলী গুপ্তচরকে মুক্তিদানের বিনিময় ১৯৯৭ এর ১ সেপ্টেম্বর বুধবার ইসরাঈল সরকার শেখ আহমদ ইয়াসীনকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। 

২০০৩ সালের শেষের দিকে ই*সরাঈল শেখ আহমদ ইয়াসীনকে হত্যা করার জন্য হামলা চালায় কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান । একই বছরের জানুয়ারীতে ই*সরাঈল শেখ আহমদ ইয়াসীনকে যত দ্রুত সম্ভব হত্যা করার হুমকি দেয় । এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, " শাহাদতই আমাদের কাম্য। হত্যা করে এই আন্দোলন দমানো যাবেনা"। ইহুদীরা যতদিন ফিলিস্তিনে থাকবে, ততদিন তাদের নিধন করা অথ্যাহত থাকবে "। 

২০০৪ সালের ২২ মার্চ সোমবার ফজর নামায শেষে বাসভবনে যাওয়ার সময় শেখ আহমদ ইয়াসীনকে লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে ক্ষেপনাস্ত্র ছুড়ে তারা তাদের দীর্ঘদিনের অভিলাষ পূর্ন করে। পরপর ৩টি ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে শেখ ইয়াসীনের দেহ ঝাঝরা হয়ে যায়। তার হুইল চেয়ারটি টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এ সময় হামামের নেতা খুমাইস মুশতাহী সহ হামাসের আরো ছয় জন কর্মী শাহাদত বরণ করেনা। আহত হন দু’ছেলে আবদুল হামিদ ও আবদুল গনী। 

শেখ ইয়াসীনের স্ত্রী উম্মে মুহাম্মদকে বলেন, "শেখ ইয়াসীন শহীদ হওয়ার আগের দিন তার সন্তানদের হঠাৎ ডেকে বললেন, মনে হচ্ছে খুব শিঘ্রই আমি শহীদ হবো এবং শাহাদাতই হচ্ছে আমার কাম্য। আমি আখেরাতই কামনা করি। আমি দুনিয়া চাইনা "। উম্মে মুহাম্মদ আরো বলেন, " শেখ আহমদ ইয়াসীন ই*সরাঈলের হত্যার হুমকির কারণে দু’বছর থেকে ঘরে রাত যাপন ছেড়ে দিয়েছিলেন । তিনি অজ্ঞাত স্থানে রাত যাপন করতেন । কিন্তু শহীদ হওয়ার রাত্রে তিনি মসজিদেই রাত যাপন করেন এবং রোজা রাখেন। হাদীসের আমল অনুযায়ী তিনি প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার নিয়মিত রোজা রাখতেন।" শাহাদতের তিন ঘন্টা পূর্বে শহীদ আহমদ ইয়াসীন ছেলে মোহাম্মদ তাকে বললেন যে, "তিনি ইসরাঈলী বিমান হামলার তিন ঘন্টা পূর্বে গোয়েন্দা বিমান আকাশে পর্যবেক্ষণ করতে এসেছে " । উত্তরে শায়খ বললেন, "আমরা শাহাদাত লাভের চেষ্টা করছি। আমরা সবাই আল্লাহর এবং সবাই আমরা তার দিকে প্রত্যাবর্তন করব।" 

গুপ্তহত্যা ই*সরাঈলের কাপুরুষতার প্রমান জীবনের সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ আহমাদ ইয়াসীন, জর্দানের সাপ্তাহিক ‘আসসাবীল’ কে দেওয়া তার সর্বশেষ সাক্ষাতকারে বলেছেন, " ই*সরাঈল হামাসের নেতাদের হত্যা করার যে হুমকি প্রতিনিয়ত দিয়ে যাচ্ছে, তা তাদের অক্ষমতা ও কাপুরুষতার প্রমাণ ।" শেখ আহমাদ ইয়াসীনকে প্রশ্ন করা হয় "গাজা থেকে ইসরাঈলী সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সত্ত্বেও কেন হামাস তার সামরিক অপারেশন বন্ধ করছেনা" । উত্তরে তিনি বলেন, "সামরিক অপারেশনের ফলেই ই*সরাঈল ফিলিস্তিনের অন্যান্য এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে"। শেখ ইয়াসীন আরো বলেন, "ইসরাঈল ফিলিস্তিনীদের হত্যার জন্য কোন ধরণের কারণ বা অজুহাত দর্শানোর প্রয়োজন অনুভব করেনা । কারণ, তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র পথ হচ্ছে, হত্যা ও লুণ্ঠন । শত্র আমাদেরকে প্রতিরোধ যুদ্ধ স্থগিত করতে বলে । কিন্তু আমাদের প্রশ্ন পৃথিবী কেন ই*সরাঈলকে আমাদের ভূমি জবরদখল থেকে বিরত থাকতে বলে না । বিরত কার থাকতে হবে? কে আত্মরক্ষাকারী ও কে জবরদখলকারী ? " হামাস ও ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের মাঝে চলে আসা সাম্প্রতিক বিরোধের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে শেখ আহমদ ইয়াসীন বললেন, "আমরা আগেও বলেছি এবং এখনো বলছি যে, আমরা সর্বপ্রকার গৃহদ্বন্দ্বের বিরোধী । যা ঘটেছে তা ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের দোষেই ঘটছে । আমি একজন যোদ্ধা এবং শত্রুর টার্গেট ও লক্ষ্যবস্তু । তাই ইসরাঈলী বিমান ও গুপ্তচরদের থেকে লুকিয়ে নিরাপদ থাকারই চেষ্ট করি। কিন্তু অনেকেই আমাদের নিরাপদ থাকা পছন্দ করেনা । 

" শহীদ ইয়াসীনের ঘর দুনিয়াবিমুখ ও শাহাদাত পিয়াসী আপোষহীন মুজাহিদ শহীদ ইয়াসীনের ঘরে আল জাজিরা টিভি প্রতিনিধি গিয়ে দেখতে পান, তার ঘরে মাত্র দু’টি কক্ষ, একটি মেহমান খানা ও একটি পাকাঘর। খুবই সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন দুনিয়া কাঁপানো এ মুজাহিদ নেতা। শহীদ ইয়াসীনের সাথে শাহাদত বরণকারী অন্যান্যরা শহীদ আহমাদ ইয়াসীনের সাথে শাহাদাত বরণকারী অন্যান্যরা হলেন, 
 (১) খুমাইস সামী মুশতাহী (শহীদ ইয়াসীনের মেয়ে খাদিজার স্বামী) 
 (২) আয়ুব আতাল্লাহ (শহীদ ইয়াসীনের খাদেম) 
 (৩) খলীল আবু জিয়াব (শহীদ ইয়াসীনের খাদেম) 
 (৪) মুমিন ইয়াযুরী 
 (৫) আমীর আবদুল আল 
 (৬) রবী আবদুল আল 
 (৭) রাতেব আলূল (শেষের চারজন স্থানীয় হামাস কর্মী)। 

দুনিয়া কাঁপানো এ অসীম সাহসী মুজাহিদ নেতাকে আল্লাহ দান করুক জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা এবং তার প্রতি ফোটা রক্ত বিন্দু থেকে সৃষ্টি করুক অজস্র আহমদ ইয়াসিন । হামাস এর প্রতিষ্ঠাতা হুইল চেয়ারে চলাফেরা মানুষটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের সাথে লড়াই করে গিয়েছেন, এখনো কাঁপুনি দিচ্ছে বিশ্ব পরাশক্তিদের। তিনি এতোটাই অচল ছিলেন যে তার হাত পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারতেন না। চোখেও দেখতেন খুবই কম। কিন্তু তিনি আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে সংগ্রাম করে যেতে হয় জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ।

@Abdul Wahab

Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন