দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ৩

২০। আইয়ুব খানের নগ্ন ছবি খুররম মুরাদের হাত


খুররম মুরাদের হাতে আইয়ুব খানের নগ্ন ছবি তুলে দিয়ে জোটসঙ্গীরা বললেন, এটি ছাপিয়ে ছড়িয়ে দিন সবখানে!
"১৯৬৪ সালের নির্বাচনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত সম্মিলিত বিরোধী জোট (কপ) —এর নেতৃত্ব প্রতি মাসে ভিন্ন ভিন্ন দলের কাছে সোপর্দ করা হতো। নির্বাচন যে মাসে ছিলো, সে মাসে জোটের নেতৃত্বদানের গুরুদায়িত্ব পড়ে নেযামে ইসলাম পার্টির নেতা মৌলভি ফরিদ আহমদের (পরবর্তীতে শহীদ) ওপর। কিন্তু প্রচারণার জন্য তিনি নিজ নির্বাচনি এলাকা কক্সবাজার চলে যান। যাওয়ার সময় আমাকে কপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ঘোষণা করে গেলেন। যদিও ওই সময় পর্যন্ত আমার কোন রাজনৈতিক অবস্থানই ছিলো না। আমি সংকোচ বোধ করছিলাম, পূর্ব পাকিস্তানের বড় বড় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আমার পিছনে দাঁড়াবেন কিভাবে? কিন্তু তারা খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাকে সহযোগিতা করেন। আমিও নিজ দক্ষতা অনুযায়ী ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করি।
ওই সময়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আমার মনে আছে। আমি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আর প্রচারণার শেষ দিন। নির্বাচন যেন একেবারে মাথার ওপরে। কোথা থেকে আমাদের জোটের বন্ধুরা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের একটি নগ্ন ছবি জোগাড় করেন। ছবিটি ব্রিটেনে তোলা হয়েছিল। দেখা গেল, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান একটি সুইমিং পুলের পাশে অতি অল্প পোশাকে (সুইমিং কস্টিউম) ক্রিস্টিনা কেলার নাম্নী এক মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ওই সময়ে ব্রিটেনে ক্রিস্টিনা কেলার খুব বড় স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যাতে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জন ডেনিস প্রোফুমোকে পদত্যাগও করতে হয়েছিল।
 
তারা ছবিটি নিয়ে এসে হাতে তুলে দিলেন। বললেন, ‘এটি ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিন। এতে ভোটে প্রভাব পড়বে। রায় আইয়ুব খানের বিপক্ষেই আসবে।’যদিও পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়েছে যে, এসব কর্মকাণ্ড তেমন একটা প্রভাব রাখতে পারে না। বরং তা বেকার প্রচেষ্টা মাত্র। তবে ওই সময় নৈতিক দিক বিবেচনায় রেখে আমি খুব আপত্তি তুলেছিলাম। এটি প্রকাশ করলে আমরা নগ্ন ছবি প্রচারের কারণ হব, যা কুরআন মাজিদ মোতাবেক অশ্লীলতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যক্তির মোকাবেলা করতে হবে রাজনৈতিকভাবে। একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তার রাজনৈতিক চরিত্রের মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য দলিল তথা তথ্য-প্রমাণেরও প্রয়োজন রয়েছে। ঠিক যেভাবে করেছিলেন মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)। তিনি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় তা পেশ করতেন। নির্বাচনি জমায়েতে বক্তৃতাকালেও তিনি সুন্দর, মিষ্টভাষী এবং দলিল নির্ভর ছিলেন। ঢাকার পল্টন ময়দানেও তিনি একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত চরিত্র, তার লুটপাট এবং তার ছেলেমেয়েদের কীর্তিকলাপ নিয়ে কথা বলব না। বরং তার প্রথম অপরাধ হচ্ছে, তিনি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে দেশটা কব্জা করে রেখেছেন।’ এরপর তিনি প্রতিবেদনটি জনগণের সামনে পেশ করেন।
 
ছবি সংগ্রাহকদের সাথে বাতচিত করে তা ছাপানোর শক্ত বিরোধিতা করলাম। বললাম, ‘নির্বাচনি প্রচারণার জন্য আমাদের এত নিচে নামা ঠিক না। এতে আমাদের নৈতিক স্খলন ঘটবে। আর আমরা যে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রচার করি তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ আল্লাহকে ধন্যবাদ, তারা আমার কথা মেনে নিয়েছিলেন। পরে শুনেছি পশ্চিম পাকিস্তানের কোন কোন শহরে ছবিটি ছাপানো হয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও এটি বিতরণ করা হয়নি। আমি এখনও রাজনৈতিক মোকাবেলার ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার পক্ষে।
 
কয়েক বছর আগে, ১৯৮৮ সালেও এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বেনজির ভুট্টোর পশ্চিমা পোশাক পরিহিত একটি ছবি ছিলো। সেটি অক্সফোর্ড বিশ্বব্যিালয়ে তার পড়াশোনাকালে। ছবিটি করাচির সাপ্তাহিক তাকবির প্রকাশ করে পোস্টার আকারেও বের করে। এই কাণ্ড যেন উল্টো প্রভাব ফেলে। সে বছর সংসদে পিপলস পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আমাদের জোটের কয়েকজন পোস্টারগুলো প্রচারের পক্ষে ছিলো। কিন্তু আমি শক্তভাবে এর বিরোধিতা করে বলি, জামায়াতের কর্মীরা এমন পোস্টার বিতরণ করতে পারবে না। যদিও ইসলামী গণতান্ত্রিক জোটেরই কিছু লোক এমনটা করছিলেন। কথা হচ্ছে, এমন প্রোপাগান্ডা প্রচারকারীরা এর দ্বারা প্রভাবিত হয় বলে ভাবেন যে সবাই প্রভাবিত হচ্ছে। কিন্তু এটি একটি বোঝার ভুল মাত্র। মানুষ অন্যান্য বুনিয়াদের ওপর নিজের ভোট দিয়ে থাকেন।"
 
[ঘটনাটি খুররম জাহ মুরাদের (রহ.) ‘লামহাত’ নামক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ থেকে অনূদিত। খুররম জাহ মুরাদ উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। জামায়াতে ইসলামীর প্রাথমিক যুগের রাহনুমাদের একজন তিনি। ইসলামী ছাত্রসংঘের (জমিয়ত) কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন একেবারে শুরুর দিকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনের সবচেয়ে সংকটকাল কিংবা সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়ে তিনি ছিলেন ঢাকা শহর জামায়াতের আমির। পরে পাকিস্তানে থিতু হন এবং পাক জামায়াতের নায়েবে আমির থাকাকালে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
 
ইসলামী আন্দোলনের অনেকেই প্রতিপক্ষ দল-মতের নানান অশ্লীল-অপকর্ম প্রচার করে থাকেন। তারা হয়তো এটি করেন নেক নিয়তে। ভাবেন- প্রতিপক্ষের অপকর্ম সম্পর্কে জনগণকে জানানো গেল। কিন্তু তা অশ্লীলতার প্রচার ও প্রসার ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিপক্ষের বিরোধিতা করতে হলেও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।]
 
 ২১।  এই লাল রঙ আসলে কিসের প্রতীক?
বাংলাদেশের নাম, পতাকা সবটাই ঠিক করেছে সিরাজুল আলম খানের নিউক্লিয়াস। লাল সবুজের এই পতাকার রহস্য খুব কঠিন হয়ে আসছে আমার কাছে। মিলাতে পারছি না। তবে একটা সূত্র পেয়েছি। যদিও এখনো ধোয়াশা থেকে গেছে। বাংলাদেশের পতাকা অঙ্কিত হয় ১৯৭০ সালের ৬ জুন। কাজেই এর লাল রঙের সাথে পরবর্তী বছরের কথিত তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের মাধ্যমে অর্জিত সূর্যের সম্পর্ক অবাস্তব, অলীক। ফলেই মূলত সৃষ্টি হয়েছে পতাকার এই রহস্যটা। তাহলে এই লাল রঙ আসলে কী? যুদ্ধের এক বছর আগে বানানো পতাকার ব্যাখ্যায় যুদ্ধের কথা বলা হয় কেন? যদিও আরেকটি প্রশ্ন আমার মধ্যে ছিল। মুসলিম বিশ্বে পতাকায় সবুজ রঙ এস্তেমাল হয়েছে ইসলামের নিশান হিসাবে। সোলায়মানের আ. মোহর (যেটা ইসরায়েলের পতাকায় রয়েছে) সেটিকে সবুজ রঙ পরিয়ে ইসলাম হিসাবে উপস্থাপন করেছে মরক্কো, তার পতাকায়। এমনকি বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের পতাকাতেও সবুজের ব্যবহার ইসলাম বুঝাতে; গেরুয়া-হিন্দু, সাদা-শান্তি, সবুজ-ইসলাম। কিন্তু বাংলাদেশের পতাকায় সবুজ কিভাবে জমিন হয়ে গেল তার উৎস খুঁজতেছিলাম।

এই পতাকা রচিত হয়েছে সত্তরের ৬ জুন। এর বর্ণনা দিয়েছেন পতাকা অঙ্কনের সাথে জড়িতদের একজন কাজী আরেফ আহমেদ। তার বক্তব্য—
“৬ জুন ’৭০ সালে ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর রুমে মনিরুল ইসলাম, শাহজাহান সিরাজ ও আ স ম আবদুর রবকে ডেকে আমি ‘নিউক্লিয়াস’-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফ্ল্যাগ তৈরির কথা জানাই।
এ ফ্ল্যাগ পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসাবে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানাই। তখন মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মনি) ও আ স ম আবদুর রব বলেন, এ পতাকার জমিন অবশ্যই বটলগ্রিন হতে হবে। শাহজাহান সিরাজ বলেন, লাল রঙের একটা কিছু পতাকায় থাকতে হবে। এরপর আমি পতাকার নকশা তৈরি করি-বটলগ্রিন জমিনের ওপর প্রভাতের লাল সূর্যের অবস্থান। সবাই একমত হন। তারপর পতাকার এ নকশা ‘নিউক্লিয়াস’ হাইকমান্ডের অনুমোদন নেওয়া হয়।

তখন আমি প্রস্তাব করি, এ পতাকাকে পাকিস্তানি প্রতারণা থেকে বাঁচাতে লাল সূর্যের মাঝে সোনালি রঙের মানচিত্র দেওয়া উচিত।” (বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র, কাজী আরেফ আহমেদ, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ৭৭)

জাসদের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন শাহজাহান সিরাজ। তার প্রস্তাবেই এই পতাকায় লাল রঙ দেওয়া হলো। তবে এই লাল একটি আপত্তিকর রঙ। সারাবিশ্বে লাল রঙ সমাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আমরা রাও ফরমান আলীর একটা বক্তব্য জানি, “পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটি রক্তে লাল করে দেব”; কিন্তু এই বক্তব্যের ব্যাপারে রাও ফরমান বেশ ইন্টারেস্টিং একটা তথ্য দিয়েছিলেন। সৈয়দ মবনু তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে রাও ফরমান আলী তাকে বলেন—
“ঢাকাতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মিটিং ছিলো আনুমানিক নির্বাচনের এক বছর পূর্বে। এটা ভাসানীর দল। বাংলাদেশে দু’জন তোয়াহা ছিলো। একজন ইসলামিক এবং অন্যজন সেকুলার (নোয়াখালীর)। সেকুলার তোয়াহা সেই মিটিং-এ বলেছিলো, “আমি পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটি রক্তে লাল করে দেব।” আমাকে কোর হেড কোয়ার্টার থেকে জেনারেল ইয়াকুব তা জানালো। আমি এই কথাটি স্মরণ রাখার জন্য ডাইরীতে লিখে রাখি এবং তোয়াহা-কে খবর দেই। তাদের সাথে আমার এতটুকু বন্ধুত্ব ছিলো যে, আমি যখন বলেছি তোমাকে গ্রেফতার করা হবে না, তখন সে বিশ্বাস করেছে তাই হবে। সে আসে। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এসব কি বলেছো? সে বললো এটা আমার নয়। কাজী জাফরের বক্তব্য। আমি বললাম, এর অর্থ কি? সে বললো, এর অর্থ এদেশে কম্যুনিস্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করা, লাল হচ্ছে কমুউনিস্টের প্রতীক। সে চলে গেলো। আমার ডাইরীতে কথাগুলো রয়ে গেলো। গুরুত্ব দেইনি। আমাকে গ্রেফতার করার পর তারা আমার ডাইরী নিয়ে গেলো। প্রচার করলো, জেনারেল ফরমান গোটা বাংলার মানুষকে হত্যা করার প্লান করেছিলো। এ কথা শেখ মুজিবও ভুট্টোকে বলেছিলো। তার দাবী ছিলো, সবাইকে ছেড়ে দিলেও ফরমান আলীকে ছাড়া যাবে না। আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটি আমার কাছে এসেছিলো। আমি বিস্তারিত তাদেরকে বললাম। এরপর তা নিয়ে তদন্ত হয়েছে। এমনকি হামিদুর রহমান কমিশনও আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে। আমি বললাম, দেখুন এটা আমার হাতের লেখা সত্য, কিন্তু কথা আমার নয়। একথা ১৯৬৯ ইংরেজীর ১৬ই জুন কাজী জাফর পল্টন ময়দানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মিটিং-এ বলেছিলেন। এরপর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আজো আমি বলছি, ওকথা আমার নয়। কাজী জাফরের কথা।”— (লাহোর থেকে কান্দাহার, সৈয়দ মবনু, আবাবীল পাবলিকেশন্স, আগস্ট ২০০০, পৃ. ১৫৬-১৫৭)

এই কাজী জাফর আহমেদ ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। ষাটের দশকে প্রথমে মার্ক্স আর পরে মাওবাদী ন্যাপে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে জাতীয় পার্টি থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। নিউক্লিয়াসের সাথেও তার সম্পর্ক ছিল।

সার্বিকভাবেই বাম ধারার বিচ্ছিন্নতাবাদী চক্রটি পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে কাজ করছিল, আর তাদের সঙ্গমস্থল নিউক্লিয়াস। বাংলাদেশের নাম, পতাকা, যুদ্ধ পরিস্থিতি সবটা তাদেরই তৈরি। কাজেই বাংলাদেশের পতাকার লাল রঙ কি আসলেই কোন স্বাধীনতার প্রতীক? নাকি কমিউনিজমের লাল সন্ত্রাসের প্রতীক? কাজী জাফরের সবুজ জমিনকে লাল করে দেওয়ার ধারণা নিউক্লিয়াস আর শাহজাহান সিরাজের কাছে পৌঁছানো অস্বাভাবিক না।

তবুও এই প্রশ্নের কোন নিশ্চিত উত্তর কি মিলবে?

২২। 
 
এখনও যারা মনে করেন একাত্তরের যুদ্ধ একটা 'মুক্তিযুদ্ধ' কিংবা এই যুদ্ধ 'বাঙালির যুদ্ধ' তাদেরকে আর কী বলার থাকতে পারে!
 
দেখেন, প্রচলিত বয়ানে বলা হইছে যে ২৫শে মার্চ সেনাবাহিনী অতর্কিত হামলা চালাইছে আর এর ফলে যুদ্ধ শুরু হইছে। অথচ এই যুদ্ধ আসলে শুরু হইছে ৩০ জানুয়ারি, জাস্ট ডিক্লারেশনটা হয় নাই। ৩০ জানুয়ারি ভারতের পরিত্যক্ত একটা বিমান 'গঙ্গা'য় ২৬ গিনিপিগ বসায়া হাইজ্যাক নাটক সাজাইছিল র’। যে বাহিনীটা গঠনই হইছিল পাকিস্তান ভাঙার উদ্দেশে। ওই দিনের পর ভারতের সীমানায় পাক বিমান নিষিদ্ধ হয়। ফলে বিচ্ছিন্ন হয় পাকিস্তান। এরপর-পরই উন্মাতাল হইয়া যায় নিউক্লিয়াস। মুজিবও তাদের সামাল দিতে পারতেছিলেন না। যার ধারাবাহিকতায় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশ্য সশস্ত্র মহড়া, সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, রাষ্ট্রীয় পতাকা অবমাননা, পোড়ানো, বিহারী নিপীড়ন শুরু করে তারা।
 
আর ফেব্রুয়ারিতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম দিয়ে দেশে প্রবেশ করে একটা সিক্রেট অপারেশনাল ফোর্স। নাম 'স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স'। এই ফোর্সের একজন সদস্য 'Dapon Jampa Kalden' এর ভাষায়, "the operation was decided in March (1971) but we were already in Bangladesh in February. I was there two months before the operations were decided."
তার ভাষায়, "The real battle started in March."
 
যুদ্ধাবস্থা তৈরিতে র আর এস‌এফ‌এফের কর্মকাণ্ড খুব সংক্ষেপে পড়তে পারেন সাবেক র অফিশিয়াল আর.কে. যাদবের '1971 Bangladesh war: RAW heroes India forgot to honour' শিরোনামের গর্বিত স্বীকারোক্তিমূলক লেখায়। আর 'Phantoms of Chittagong' তথা এসেফ‌এফের ব্যাপারে জানতে পারবেন 'The Phantoms of Chittagong: The unsung Tibetan heroes of the 1971 Bangladesh liberation war' শিরোনামের এই লেখাটিতে।
 
 
২৩।  ভাষা আন্দোলন: বাঙালি মুসলমানের আদিপাপ
 
আঠারো শতকে ভারতে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগে এদেশের দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফারসি। ধর্মীয় ভাষা আরবি। সাহিত্য ও জনগণের প্রধান ভাষা হিসাবে এখানে বিকাশ লাভ করেছিল উর্দু ও বাংলা। এর মধ্যে উর্দুর বিস্তার ছিল সমগ্র উপমহাদেশে। এ ভাষা দু’টোকে পণ্ডিতরা ‘মুসলমানি ভাষা’ হিসাবে চিহ্নিত করেন। উপনিবেশিক শক্তির সহায়তায় এসব ভাষাকে পরিশুদ্ধতার মিশন নিয়ে তারা কাজে নেমে পড়েন। এমনকি এক পর্যায়ে উর্দু থেকে হিন্দি আলাদাও হয়ে যায়। তাদের প্রবল ভাষিক আগ্রাসনের মুখে উর্দু টিকে যায় মূলত শিক্ষাক্ষেত্রে উর্দুভাষী মুসলমানের সিলসিলা তথা উত্তরাধিকার বহাল থাকার ফলে। কিন্তু বাংলা ভাষা রক্ষা পায়নি। এ ভাষাকে তারা ‘সাধু’ বানায়ে ফেলে। এর পিছনে উপনিবেশিক প্রচেষ্টা ছিল। ১৮৩০ এর দশকে শিক্ষা ও দাপ্তরিক ভাষা থেকে ফারসি কাটা পড়ে, প্রবর্তিত হয় ইংরেজি। কিন্তু শুরুতে এ ভাষা বাংলা করার পরিকল্পনা ছিল কোম্পানির বেনিয়াদের। এ কাজে সহায়তা করেন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের একদল কর্মচারী। যারা পরবর্তীতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ পান। তাদের মানস গঠন ছিল সংস্কৃত অনুগামী।
 
সে সময় বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে পারেনি। কিন্তু ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সময় খোদ বাঙালিদের মধ্য থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে। তা শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্য থেকেই। যারা কেবল বাংলাকে ভালোবেসেছিলেন; বাংলাকে ঘিরে তাদের পিঠেই যে ছুরিকাঘাত করা হবে তা তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
 
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে ১৯১০ এর দশকে। রাষ্ট্রভাষা ঠিক নয়, ‘সাধারণ ভাষা’ (Lingua Franca)। সে সময় পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বারবার বাংলার পক্ষে ওকালতি করেছেন। এর আগে অবশ্য ১৯১১ সালে রংপুরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবি জানিয়েছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী।
 
সে সময় শহীদুল্লাহই একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন যিনি চেয়েছিলেন বাংলা হবে রাষ্ট্রের ভাষা। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতির পিতা গান্ধীকে চিঠি লিখেছিলেন, “The only possible national language for inter-provincial intercourse is Hindi in India.” ১৯১৮ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে সর্বভারতীয় সম্মেলনে ১৯ জন বক্তার মধ্যে একমাত্র শহীদুল্লাহ বাংলার কথা বলেন। তার বক্তব্যকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আবেগবহুল’, ‘এর মধ্যে যুক্তি নেই’। ওই সভায় সুনীতিও ছিলেন। ১৯২০ সালে আবারও সভা হয়। এই সভায়ও হিন্দু পণ্ডিতরা সবাই হিন্দির পক্ষে ছিলেন। তাদের প্রস্তাবিত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ‘হিন্দি’। কারণ তারা জানতেন হিন্দি বা উর্দু উপমহাদেশের সকল অঞ্চলের মানুষ বোঝে। কিন্তু পাঞ্জাবের মানুষের কাছে বাংলা, কিংবা বাংলার মানুষের কাছে পাঞ্জাবীর প্রচলন সম্ভব নয়। সুনীতিকুমার হিন্দির পক্ষে ওকালতি করে তার ‘ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা’ বইতে লিখেছেন, “ভারতের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত হিন্দি।”
অবশ্য এবার ড. শহীদুল্লাহর বোধোদয় হয়। তিনি প্রথমে রাখেন উর্দুকে। তিনি বলেন, “সাধারণ ভাষা হইবার পক্ষে দোষ-ত্রুটি সংশোধনের পরে উর্দুর দাবি অগ্রগণ্য, তারপর বাঙালা, তারপর হিন্দি, তারপর আর কোনো ভাষার দাবি আসতে পারে না।”
 
এরপরেও ১৯২১ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছে বাংলাকে প্রদেশের রাষ্ট্রভাষা করার লিখিত প্রস্তাব দেন। ১৯২৭ সালে আসাম প্রদেশের আইন পরিষদে বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি চান আব্দুল হামিদ চৌধুরী ওরফে সোনা মিয়া। বহু তর্কাতর্কির পরে অবশেষে তিনি সে সুযোগ পান। কিন্তু বাংলা অঞ্চলের মুসলমানের এসব উন্মাদনার বাইরে সমগ্র ভারতে তখন দ্বন্দ্ব হিন্দি আর উর্দুর। হিন্দুরা চাচ্ছে হিন্দি হবে রাষ্ট্রভাষা, মুসলমানরা চাচ্ছে উর্দু। আর এটাই স্বাভাবিক ও সহজাত দাবি। মুসলমান আমল থেকেই উর্দু চলে আসছে ভারতের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসাবে।
 
কিন্তু ১৯৩৭ সালে দাক্ষিণাত্যে প্রাদেশিক সরকার হিন্দি চাপিয়ে দিলে ছাত্র বিক্ষোভ হয়। সেখানে পুলিশি নির্যাতনে ২ জন ছাত্র মারা যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে রচিত ভারতের সংবিধানেও ১৯৬৫ সালের মধ্যে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার বিধান রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে এসে মাদ্রাজে আবার বিক্ষোভ হয়। এ সময় দুই পুলিশসহ সরকারি হিসাবে মারা যায় ৬০ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে মারা যায় ৫০০ ব্যক্তি।
কিন্তু সে সময়েও বাঙালি মুসলমান বাংলার পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েই যাচ্ছিলেন। তবুও এ.কে. ফজলুল হক সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। ১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর নিখিল ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন— উর্দুকেই ভারতের সাধারণ ভাষা (Lingua Franca) করতে হবে। ড. এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন, “ব্রিটিশ ভারতে ভাষা সমস্যার ক্ষেত্রে হিন্দি-উর্দু বিরোধ প্রবল হয়ে উঠেছিল। মুসলমানেরা সর্বত্রই ছিলেন উর্দুর পক্ষে। ব্রিটিশ বাংলার বাংলাভাষী মুসলমানেরাও এর বিরোধী ছিলেন না।”
এর প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। ঢাকার আদি ভাষা ছিল উর্দু। যা ১৯৫২ সালের পরে সৃষ্ট বিকট উগ্র জাতীয়তাবাদের উৎকট আলখাল্লার নিচে বগলদাবা হয়ে যায়। পুরান ঢাকার অলিগলিতে এখনও তার নজির মেলে। এবনে গোলাম সামাদ তার ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভূমি পরিচয়’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “ঢাকার মুসলমানেরা ১৯৪৮ সালে প্রায় সবাই ছিলেন একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। ঢাকার আদি মুসলিম অধিবাসীদের ভাষা ছিল এক ধরণের উর্দু। তাই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাদের মোটেও সমর্থন ছিল না।”
২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার পরে আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মায়ের ভাষার দাবির জন্য ছাত্রদের এভাবে গুলি করে হত্যা করার সংবাদে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভের আগুন দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে উঠে। যে ঢাকার জনসাধারণ ১৯৪৮ সনে উর্দুর পক্ষে থেকে সরকারকে সব রকমের সাহায্য করেছে— তারাও সরকারের উপর ক্ষেপে যায়।”
 
উপরোক্ত উদ্ধৃতাংশ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়ার পক্ষে এক ধরণের জনমত তৈরি ছিল। কিন্তু তা আর থাকেনি। এক পর্যায়ে এমনকি উৎকট বাঙালিয়ানা গিলে ফেলে ঢাকার আদি উর্দুকে। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে বাংলায় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম সম্বলিত একাধিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। এসবের কোন কোনটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির বুক পকেটে। এসব সংগঠনের আড়ালে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। সর্বশেষে শবে কদরের রাতে প্রাপ্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ১ সেপ্টেম্বর ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম। এর দুটি শব্দই আরবি উৎস হতে আগত। কারণটাও এই যে এ সংগঠন ছিল ইসলামপন্থীদের সংগঠন। এটি ছিল খেলাফতে রব্বানি পার্টির টিকি। ১৫ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা বের করে এই সংগঠন। পুস্তিকায় আবুল মনসুর আহমদ, কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল কাসেমের তিনটি প্রবন্ধ স্থান পায়। এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয় উর্দু ও বাংলাকে। আর পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ভাষা বাংলা, দ্বিতীয় উর্দু।
 
এসবে প্রভাবিত হয়ে ওই সময়ের ইসলামপন্থীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন। কবি ফররুখ আহমদ, অধ্যাপক গোলাম আযম, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, শাহেদ আলী, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্নভাবে।
 
অধ্যাপক আবুল কাসেম পরে এসব ইন্টেলেকচুয়াল আলাপকে আন্দোলনে রূপ দিতে চাইলেন। অক্টোবরে গোপনে গড়ে তুললেন ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদের সভাগুলো খুব গোপনে হতো। কারণটা ইন্টারেস্টিং। পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক নূরুল হক ভূঁইয়া বলছেন, “বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষক এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে এগিয়ে আসেননি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমাদেরকে রীতিমত নাজেহাল হতে হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক বাংলার সপক্ষে সাড়া দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট ডক্টর মাহমুদ হোসেন, রে‌আয়ৎ খাঁ, সরদার ফজলুল করিম, আজিজ আহমদ প্রমুখের নাম উল্লেখ করার মত। প্রথম দু’জন ছিলেন অবাঙালি। অথচ উভয়েই ছিলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সরব সমর্থক। এমনকি রে‌আয়ৎ খাঁঁ প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে উর্দুভাষীদের মধ্যে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মনে করতেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করাই ন্যায়সঙ্গত। তাঁরা দেখেছিলেন, পূর্ববঙ্গবাসীরা উর্দু-বিদ্বেষী নয়।”
 
অবশ্য তারা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন না বলেই এমনটা ভেবেছিলেন। অধ্যাপক গোলাম আযম একবার ঢাকাবাসীকে বাংলার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলেন। ড. এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন, “এসময় গোলাম আযম পড়েন ঢাকার একদল মানুষের হাতে; যারা প্রহার করতে চায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি করেছেন বলে। গোলাম আযম তাদের উদ্দেশ্যে বলেন— ভাই, আমাকে মারতে হলে, আমাকে তার আগে কিছু বলতে দিন। তিনি জনতাকে লক্ষ্য করে বলেন, কেন তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে? জনতা তার বক্তৃতা শুনে শান্ত হয়। গোলাম আযম ও তার সাথে আরো যে ক’জন ছাত্র ছিলেন, তারাও সম্ভাব্য প্রহারের হাত থেকে পেতে পারেন রক্ষা।”
 
এক পর্যায়ে ঢাকার জনগণ তমদ্দুন মজলিশের অফিসে হামলাও করে। এরকম পরিস্থিতিতে খুব গোপনে ছড়িয়ে পড়তে লাগল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার অযৌক্তিক দাবি। মুসলিম লীগের মন্ত্রীরাও তাদের পক্ষে আসতে লাগলেন। ১৬ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে যে ১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি স্মারকলিপি পেশ করেন তারা প্রায় সবাই ছিলেন ইসলামমনা। এরা ছিলেন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, জসীমউদ্দিন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, শাহ আজিজুর রহমান, মওলানা মুস্তাফিজুর রহমান, হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, সৈয়দ মুহম্মদ আফজাল, নইমুদ্দীন, সাহিত্যিক আবুল হাসনাত।
 
ইসলামপন্থীদের এসব কর্মকাণ্ডে মুসলিম লীগ বিব্রত। কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট পার্টি সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে দেখে মজলিশকে। তবে এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে রাম আর বামরা। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের করাচিতে গণ-পরিষদের প্রথম অধিবেশনেই উর্দু আর ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণ-পরিষদের ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানিয়ে কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বনে যান হিরো। সে সময় পূর্ব পাক প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নেতা নাজিমুদ্দিন সাহসের সাথে সত্য তুলে ধরে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশই চায় যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।”
 
কিন্তু খাজা সাহেবের এই বক্তব্যে চটে যায় এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা। ১১ মার্চ হরতাল আহ্বান করা হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। যে দেশের মাঁজা তখনও সোজা হয়ে দাঁড়ায়নি, তার জন্য এ শুভ সূচনাই বটে। ততদিনে শেখ মুজিবের সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের জন্ম হয়েছে। ২ মার্চ শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল, মোস্তাক, মানিক মিয়া আর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সার, রণেশ দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরী, কমরেড তোয়াহাসহ আরও কয়েকজন বামপন্থীদের নিয়ে ফজলুল হক হলে গোপন সভা ডাকেন কাসেম সাহেব। নিজ হাতে গড়া রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে তুলে দেন তাদের হাতে। নাম হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। নিজেদেরকে সদ্যপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের সার চেতনার বিরোধী হিসাবে প্রমাণ না রাখার স্বার্থে হিন্দুদের এই কমিটিতে রাখা হয়নি। এদের নেতৃত্বে ৭ মার্চ ঢাকায় আর ১১ মার্চ তামাম প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। ১০ মার্চের সিদ্ধান্ত ছিল অফিস- আদালতেও পিকেটিং চালাতে হবে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে। ১১ তারিখ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সেক্রেটারিয়েটের সামনে পিকেটিং করে এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা। এদিনের পিকেটিংয়ের কারণে ১৪ তারিখ অধ্যাপক গোলাম আযম গ্রেফতার হন।
 
ওইদিন পিকেটিংকারীরা প্রাদেশিক পরিষদের দিকে অগ্রসর হলে এ কে ফজলুল হকসহ বেশ কয়েকজন বেরিয়ে আসেন। তিনি আগেই পঁচে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এবার মিছিলে এসে একাত্মতা ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। অনেককে গ্রেফতার করলেও ৬৯ জন ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেয়। ১৫ মার্চ সৈয়দ নজরুল, কামরুদ্দিন আহমদ আর তোয়াহাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন আবুল কাসেম। তার বেশ কয়েকটা দাবির মধ্যে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও ছিল। আন্দোলনকারীদের মধ্যে কমিউনিস্ট থাকলেও তাদের যেন কমিউনিস্ট বলা না হয় তার আবদারও জানান তিনি। সেদিন নাজিমুদ্দিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বেশ কিছু চুক্তি করতে বাধ্য করা হয়।
 
১৯ মার্চ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রায় তিন লক্ষ জনতার সামনে তিনি ভাষণ দেন। ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনেও একই ঘোষণা দেন তিনি। তাঁর যুক্তি ছিলো উর্দু ভাষা ভারতীয় উপমহাদেশের সকল অঞ্চলের মুসলমানই বোঝে। এজন্য সকলের ঐক্যের স্বার্থে এই ভাষাটিকেই আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা তথা রাষ্ট্রের ভাষা করতে হবে। তাঁর এ বক্তব্যকে সকলেই করতালির মধ্য দিয়ে স্বাগত জানায়। তবে তিনি বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের ভাষা হিসাবে বাংলার কথাও বলেন। তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব এখানকার সরকারের হাতে ছেড়ে দেন। কিন্তু এরপরও এই ভাষিক সন্ত্রাসীরা কায়েদে আযমের সাথে বৈঠক করে তাঁর সম্মানে বেয়াদবি করেন। অলি আহাদ তাঁকে এই বলে হুমকি দেন যে— "We also know that we can appeal to the Queen for your removal."
 
কিন্তু জিন্নাহ শান্ত ভঙ্গিতে তাদের 'My boys' সম্বোধন করে বলেন, "Two men may differ on one point, let us differ respectfully. You can go with point with constitutional way. Any unconstitutional movement will be crushed ruthlessly." এপ্রিলে পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৯ এপ্রিল তা সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। এরপর আবুল কাসেমের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের সরকারি ভাষা করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আবুল সাহেবের দোকান ততদিনে জনগণ বয়কট করেছেন। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে এই দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও কেন্দ্রে কিংবা আন্তঃপ্রাদেশিক ক্ষেত্রে এর কোনই যৌক্তিকতা নেই।
 
ওই বছরের ২৭ নভেম্বর দেশের প্রধানমন্ত্রী কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। জিমনেসিয়াম হলে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয় তাঁর সম্মানে। ওইদিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পুনরায় স্মারকলিপি দেওয়া হয়। যা তৎকালীন ডাকসু জিএস অধ্যাপক গোলাম আযম পাঠ করেছিলেন। এই স্মারকলিপিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসপ্রকৃতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। লিয়াকত আলী খান আশ্চর্য হয়ে গেছিলেন তা শুনে। তিনি বলেছিলেন— এসব দাবি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়া আর কী?
কিছু সংখ্যক বাঙালির এমন গোঁড়ামি আর মরিয়া আচরণের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারও তখন উদ্ভট আচরণ শুরু করে। বাংলাকে যখন সারা দেশের ভাষা হিসাবে নিতে হবে, তখন তাকে সহজ করেই নেওয়া যাক! তাঁরা বললেন— তাহলে বাংলা লিখতে হবে আরবি হরফে। অবশ্য এ দাবি কথিত পশ্চিম পাকিস্তানিদের না, এ প্রস্তাব করেছিলেন একজন বাঙালিই। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমান। এ দাবি পরে বাস্তবায়িত হয়নি।
লিয়াকত আলীর ঢাকা আগমনের পর স্মারকলিপি প্রদান ছাড়া ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ অব্দি তেমন কিছু ঘটেনি। আবুল কাসেমরা দোকান মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছেন। তারা যে ভুল করেছেন তার খেসারত এবার দেওয়ার পালা। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হাইজ্যাক করা হয়। এর নেতৃত্ব চলে যায় পুরোপুরি বামদের হাতে। নতুন আহ্বায়ক হলেন ভাষা মতিন। তবুও আবুল কাসেম তাদেরকে সহযোগিতা করেন।
 
ওই বছরের ১৬ অক্টোবর কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দিন। পরের বছর ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে তিনি রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে পুনরায় উর্দুর কথা ঘোষণা করেন। তাঁর এই ঘোষণার পর ৩০ জানুয়ারি হরতাল ডাকে নতুন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ৩১ জানুয়ারি আরেক বৈঠকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে আরেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। নতুন কমিটিতে ভাসানীসহ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পাশাপাশি খেলাফতে রব্বানি পার্টির লোকেরা দায়িত্বে আসেন। তারা ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেন। ওইদিনই সিদ্ধান্ত হয় ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে হরতাল পালন হবে।
 
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নুরুল আমিন সরকার পরিস্থিতিকে গুরুতর মনে করে। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে একমাস ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ২০ তারিখ রাতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। কিন্তু ফজলুল হক হলে আলাদা দুইটি সভায় বাম নেতৃত্বাধীন ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন। এতে সমর্থন দিয়েছিলেন মুসলিম লীগের এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তিনি তখন খেলাফতে রব্বানির নেতা।
 
পরদিন দফায় দফায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। দীর্ঘ সময় টানা ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি হয় পুলিশ আর ছাত্রদের। অভিযোগ, বিকাল তিনটার দিকে পুলিষ গুলিবর্ষণ করে। ছাত্রদের টার্গেট ছিল প্রাদেশিক পরিষদ দখল করা। তখন প্রাদেশিক পরিষদের সভা চলছিল। ধীরেন বাবু কী নায়কোচিত বক্তব্য দিচ্ছেন তখন (!) — "I have personal Knowledge that the students obeyed that order and they did not hold any public meetings nor had they taken out any procession in public places. What they did was that they collected in the Medical College compound and shouted the slogan 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' without breaking the orders under section 144."
 
ওইদিন আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেব পদত্যাগ করেন আইন পরিষদ থেকে। বলা হয়, পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। যদিও তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। কিন্তু ওই সময়ে গুজব ছড়ানো হয় পুলিশের গুলিতে দেড়শোর বেশি মানুষ মারা গেছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢামেকের ভবন নির্মাণের জন্য আনা ইট-সিমেন্ট দিয়ে কথিত শহিদ মিনার বানানো হয়। যা উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদের সম্পাদক ও পদত্যাগী সাংসদ আবুল কালাম শামসুদ্দিন। 
 
ভাষা নিয়া এই তুলকালাম ঘটে যাওয়ার পরও ইসলামপন্থী-ইসলামমনারা এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের সমর্থন দেন। তমদ্দুন মজলিশের সৈনিক, আবুল মনসুর আহমদের ইত্তেহাদ, ইনসান, সিলেটের নওবেলাল, মিল্লাত, আমার দেশ, বেগম, দৈনিক আজাদ, মোহাম্মদী, পাকিস্তান অবজারভার —এসব পত্রিকা সমর্থন অব্যাহত রাখে। আন্দোলন সমর্থন না করায় উগ্র জাতিবাদীরা মর্নিং নিউজের অফিস জ্বালিয়ে দেয়। সেই ছাইভস্মে দাঁড়িয়ে মর্নিং নিউজ ব্যানার হেড লাইন করে— Morning News can not die. ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে কবিতা-গল্প প্রভৃতি লিখে এদের আরও উস্কানি দিতে থাকেন ইসলামপন্থী অনেকেই।
 
২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর পাকিস্তানকে অকার্যকর একটা রাষ্ট্রে পরিণত করার আরেক ধাপ পরিকল্পনা নেয় রাম-বামরা। ১৯৫৩ সালের ১২ মার্চ ঢাকা জেলা বার কাউন্সিলে এক সেমিনারে বামপন্থী সংগঠন যুবলীগের আব্দুস সামাদ আজাদ ও সাংবাদিক কে জি মোস্তফা মোট সাতটি ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তবে এ দাবি হালে পানি পায়নি।
 
ভাষা আন্দোলনে রাম-বামদের কূটকৌশলের কাছে হেরে যান পূর্ব বাংলার নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন। নুরুল আমিন তো একেবারে ভিলেন বনে গেলেন। এর ফল হলো ৫৪'র নির্বাচনে। এসবের প্রেক্ষিতে ১৯৫৬ সালে প্রণীত শাসনতন্ত্রে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু খোদ আওয়ামীলীগের গুরু সোহরাওয়ার্দীও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করেননি। তার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ শহরে জিন্নাহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার দিনে তিনি উর্দুকেই দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যোগ্য হিসাবে ঘোষণা করেন।
 
২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি তাজা প্রাণের বিনিময়ে ভাষিক জাতিবাদী সন্ত্রাসীরা বিজয়ী হয়। যে সন্ত্রাস ইসলামপন্থী অথবা মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা শুরু করেছিলেন তা অনেক আগেই হাইজ্যাক করে ফেলেছিল রাম আর বামরা। আর ২১ তারিখের ঘটনার পর পূর্ব পাকিস্তানে অতি দ্রুত পট পরিবর্তন হতে শুরু করে। ঢাকার আদি উর্দুভাষীরা উর্দু বলতে ভয় পান। কেউ বাংলায় বলেন, কেউ বিক্ষিপ্ত হয়ে যান। কিন্তু এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের কাছে উর্দু শত্রু হওয়ায় নতুন করে ব্ল্যাক লিস্টেড হন উর্দুভাষী মুহাজির বিহারীরা। তাদেরও কেউ কেউ ভাষা আন্দোলনে ইন্ধন যুগিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি ধরে বাংলায় জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধের কবর রচিত হয়। জাতীয়তাবাদের আড়ালে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে। হিন্দুত্ববাদী শক্তি আর সমাজতন্ত্রী সন্ত্রাসীদের হাতে লাখো ইসলামপন্থী আর সাধারণ মুসলমানের রক্তে ভেসে চলে ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের এই জমিন। তার সিলসিলা এখনও চলমান। আমরা সাক্ষী।
 
ভাষা আন্দোলনের সূচনাকারীরা অনেকেই ইসলামপন্থী, অন্তত মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী। কিন্তু তাদের হাতেই বীজ রোপিত হয়েছে এ জমিনের রক্তাক্ত ইতিহাসের। যার খঞ্জর ঠিক তাদের বিরুদ্ধ শক্তির হাতে। ইতিহাসের এ এক আশ্চর্য এপিটাফ।
Share:

আব্দুল্লাহ আযযাম ও তাকফিরি মতবাদের সংঘাত

 

আফগানিস্তানে আব্দুল্লাহ আযযামের সংগঠন "মাকতাব আল খিদমাত" মূলত আরব যোদ্ধাদের হোস্টিং করতো। আরব থেকে যারা আফগানিস্তানে যেতো তারা সবাই এই সংগঠনের গেস্ট হাউজে থাকতো ও মিলিটারি প্রশিক্ষণ নিতো। কিন্তু ওবিএলের চিন্তা ছিলো আরব মুজাহিদিনদের আরো বেশি ফ্রন্টলাইনে ইনভলভড করা। তাই আরো সফিস্টিকেটেড মিলিটারি ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য তিনি জায়গা খোজতে থাকেন।

ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি তিনি ট্রেনিং ক্যাম্পের উপযুক্ত জায়গা পান "জাজি" এলাকায়। যে এলাকা সাইয়্যাফের প্রতি অনুগত আফগান মুজাহিদীনদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। সাইয়্যাফের প্রতি অনুগত মুজাহিদীনদের মধ্যে অনেকে ছিলেন শিয়া। ওবিএল ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য যে জায়গা পছন্দ করেন সেটা ছিলো আব্দুল সামি নামের এক শিয়া কমান্ডারের নিয়ন্ত্রণে। এই শিয়া কমান্ডার ও শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তায় ওবিএল আল কা(য়দার প্রথম মিলিটারি ক্যাম্প তৈরি করেন যা পরবর্তীতে মাসাদা ক্যাম্প হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

আল কা(য়দার প্রথম মিলিটারি ক্যাম্প শিয়া কমান্ডারের আওতাধীন এলাকায়, শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তায় তৈরি করা হয়। যাদের জন্মই হয়েছে শিয়াদের সাথে কলাবোরেশন করে তাদের অনেক সমর্থক ও ইডিওলগ আজকে আমাদেরকে শিয়াবিরোধীতা ও ইরানবিরোধীতা শিখায়।
 

 
হুযাইফা আযযাম আব্দুল্লাহ আযযামের ছেলে। ইউএস ইরাক আক্রমণের পরে তিনি সরাসরি সেখানে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই আল কা(য়দার ইরাকি শাখার প্রধান ও আইএসের গ্রান্ডফাদার আবু মুসআব আল জারকাওয়ী ইরাকে মাস বোম্বিং শুরু করলে তিনি তার প্রচন্ড সমালোচনা করেন। ফলে এর কিছুদিন পর জর্ডানে তার বাসার নিচে একটি সিডি পাওয়া যায়। সেই সিডির কন্ঠ ছিলো আবু মুসআব আল জারকাওয়ীর। তাকফিরবাদীতার সমালোচনা করায় তাকফিরী জারকাওয়ীর সহ্য হয়নি। তিনি হুযাইফা আযযামকে "কাফেরদের সহযোগী" আখ্যা দেন ও তাকে মৃত্যুর হুমকি দেন।
 
এই হচ্ছে আযযামের পরিবারের সাথে তাকফিরীদের আচরণ। অথচ আজকে অনেক তাকফিরী দেখি আযযামের নাম না নিলে একবেলা ভাত হজম হয় না। জাহান্নামের কুকুর ও আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের উত্তরসূরীদের জন্য লানত।
 

ওবিএল ও তাকফিরি জাওয়াহিরির অবস্থান নিয়ে আব্দুল্লাহ আনাসের বক্তব্য। এখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে জাওয়াহিরি আযযামের পিছনে নামায পরতেন না এবং আযযামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতেন। বর্তমা্নে অনেক তাকফিরী ও তাদের সমর্থকরা বলতে চান যে আব্দুল্লাহ আযযাম ও জাওয়াহিরির সংঘাত নাকি সিআইএর বানানো। আবার অনেকেই এখন আব্দুল্লাহ আনাসের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন
 
কথা হচ্ছে আপনি যদি আব্দুল্লাহ আযযামের ব্যক্তিগত সহকারী ও ফ্রন্টলাইনার মুজাহিদ আব্দুল্লাহ আনাসের একাউন্টকেই ধর্তব্য মনে না করেন তাহলে কোথাকার কোন মুনাফেক পেশোওয়ারের কোণায় বসে কি বললো বা কি লিখলো সে কিভাবে ধর্তব্য হতে পারে?
 
 
 
আল কা(য়দার আরেক ইডিওলগ নাসির আল ফাহাদ মনে করেন উসমানীয়রা কাফের। এই নজদি তাকফিরবাদীকে বিভিন্ন সময়ে তাকফিরীরা সাইট করে। এই তাকফিরী সাহওয়া আন্দোলন সম্পর্কেও জঘন্য ধারণা রাখে।
 

একটা আয়রনি হচ্ছে আল কায়েদার প্রথম মিলিটারি কমান্ডার আবু উবায়দা আল বানশিরি শহীদ আহমেদ শাহ মাসউদের আন্ডারে যুদ্ধ করেছিলেন। আবু উবায়দার নামের পরে "আল বানশিরি" মূলত পানশিরে যুদ্ধ করার জন্য বলা হয়। 
 
আবু উবায়দা আল বানশিরির মৃত্যুর পর আল কায়েদার দ্বিতীয় মিলিটারি কমান্ডার হন আবু হাফস আল মিশরি। এই আবু হাফস মিশরিকে নিয়ে মজার একটা ঘটনা আছে। মিশরিও আহমেদ শাহ মাসউদের কমান্ডে যুদ্ধ করার জন্য পেশওয়ার থেকে পানশিরে রওয়ানা দেন। কিন্তু পেশওয়ার থেকে পানশিরের যাওয়ার যে কঠিন ও কষ্টদায়ক পথ- সে পথ পাড়ি দিয়ে পানশির পৌছানোর আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও পুনরায় পেশওয়ারে ফিরে যান। এই হচ্ছে আরেকজন মহান "মুজাহিদ" এর আফগান জিহাদে অংশগ্রহণের ইতিহাস।
 

 
আফগান জিহাদের একবারে শুরুর দিকে আলজেরিয়া থেকে আফগানিস্তানে যান আব্দুল্লাহ আনাস। তিনি আব্দুল্লাহ আযযামের ব্যক্তিগত সহকারী ও মাক্তাব আল খিদমাতের পরিচালক ছিলেন। উনি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয় স্থানেই জিহাদের জন্য কাজ করেছেন। তার মতে, পেশোয়ারে জাওয়াহিরির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো আরব যোদ্ধাদেরকে আব্দুল্লাহ আযযাম থেকে বিরত রাখা। কেননা আব্দুল্লাহ আযযাম যেহেতু ইখওয়ানি ছিলেন তাই এইসব আরব যোদ্ধারাও আযযামের প্রভাবে ইখওয়ানি হয়ে যেতে পারে। 
 
পেশোয়ারে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর উত্তরসূরী মুনাফেক জাওয়াহিরির কর্মকান্ডের বিস্তারিত শুনুন আব্দুল্লাহ আনাসের বয়ানে-
 
আল কা(য়দা এফিলিয়েটেড ইডিওলগ আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসীর মতে, যেহেতু হামাস এবং ফাতাহ উভইয়ই গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাই এমন কোন দলের কোন নেতার পিছনে নামায আদায় করা যাবেনা। যেরকম নামায আদায় করা যেতো না শহীদ আব্দুল্লাহ আযযামের পিছনে। আপনারা আসলে সহজ জিনিস বুঝেন না। এতো করে বুঝানো লাগে কাদের পিছনে নামায আদায় বৈধ হবে আর কাদের পিছনে নামায আদায় করা যাবে না।

আয়মান আল জাওয়াহিরির সবচেয়ে বড় অপরাধ এইটা না যে তিনি আফগান জিহাদে অংশগ্রহণ করেন নাই। পেশোয়ারে বসে ফতোয়াবাজি করেছেন।
.
বরং জাওয়াহিরির সবচেয়ে বড় অপরাধ এইটা যে তিনি আফগান জিহাদ শেষ হওয়ার এক বছরের মাথায় মুসলিম ব্রাদারহুডের সমালোচনা করে "The Bitter Harvest: The Muslim Brothers in Sixty Years" বইটি লিখেন। যেই বইয়ে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে প্রকৃত জিহাদ থেকে দূরে সরে যাওয়ার অভিযোগ তুলেন।
.
আজকের অনেক তথাকথিত জিহাদী ইডিওলগ ইখওয়ান বাশিং করার জন্য এই বইয়ের রেফারেন্স টানেন। বাস্তবতা হলো জাওয়াহিরি নিজেই সোভিয়েত আফগান জিহাদ যার পুরোটাই ইখওয়ানি এন্ডেভার ছিলো সেই জিহাদ থেকে বিরত থাকেন। কোন জিহাদ না করেই জিহাদ নিয়ে বই লিখেন তিনি।
.
বিষয়টা অনেকটা এমন যে আপনি নিজে কোনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে পা রাখেননি। আপনার আশেপাশের অনেক বন্ধুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আপনি বিভিন্ন সময়ে তাদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোসিস্টেম সম্পর্কে জানলেন, কোন বিভাগের কোন শিক্ষক কিভাবে ক্লাস নেয়, কোন বিভাগের ইন্টারন্যাল পলিটিক্স কেমন এগুলো নিয়ে কিছু ধারণা অর্জন করলেন। এর কিছুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো ও প্রশাসনের সমালোচনা করে আপনি একটা বই লিখে ফেললেন। অথচ আপনি ভালো করে জানেনই না যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কিভাবে ফাংশন করে। ঠিক এই ধরণের একটা কাজই করেছেন জাওয়াহিরি। আফগান ময়দানের জিহাদ না করে যিনি ফেরকাবাজিতে লিপ্ত ছিলেন তার লিখিত বই যেকোন দৃষ্টিকোণ থেকেই বর্জনীয়।
.
আজকে আপনারা যে ন্যারোটিভ শুনেন যে ইখওয়ান প্রকৃত হক থেকে দূরে সরে গেছে, ইখওয়ান জিহাদ থেকে দূরে সরে গেছে এইগুলা মূলত জাওয়াহিরির ন্যারোটিভ। তিনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে এই ধরণের জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন ইখওয়ান সম্পর্কে। আমরা দোয়া করি জিহাদ না করেও জিহাদ নিয়ে বই লেখা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলের উত্তরসূরীদেরকে আল্লাহ যেন তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেন।
 
আজকে তথাকথিত গ্লোবাল জিহাদিস্ট নামে পরিচিত একদল "জিহাদিস্ট" যারা কখনোই সোভিয়েত- আফগান জিহাদে অংশগ্রহণ করে নাই। এদের মধ্যে আছেন আল কা(য়দার সাবেক প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরি, ইরাকী শাখার সাবেক প্রধান ও আইএসের আবু বকর আল বাগদাদীর গুরু আবু মুসআব আল জারকাওয়ী ও একিউ এফিলিয়েটেড ইডিওলগ আবু কাতাদা আল ফিলিস্তিনি ও আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী।
.
কোন জিহাদি লিটারেচারেই আফগান জিহাদে তাদের অংশগ্রহণের কোন ইতিহাস আপনি পাবেন না। তাহলে এই লোকগুলো আসলে ঐসময়ে কি করেছিলো?
.
সোভিয়েত আফগান জিহাদের সময়ে মুজাহিদীনদের মধ্যে অনেকগুলো ফ্যাকশন ছিলো। আফগান মুজাহিদরা একই সাথে সোভিয়েত ও নিজেদের অন্তর্কলহ চালিয়ে যাচ্ছিলো। আল কা(য়দার এই লোকগুলো পাকিস্তানের পেশোয়ারে বসে মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতো ও তাদেরকে উস্কানি দিতো। একবার আহমেদ শাহ মাসউদের সাথে হেকমতিয়ারের, আরেকবার আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে হেকমতিয়ারের দূরত্ব সৃষ্টি করতো।
.
আল কা(য়দার এই লোকগুলো যে আফগানিস্তান জিহাদে অংশগ্রহণ করে নাই সে কথা আমরা আব্দুল্লাহ আযযামের একান্ত সহযোগী ও আফগান জিহাদে একবারে প্রথমদিকে হিযরতকারীদের অন্যতম- আব্দুল্লাহ আনাসের বরাত দিয়ে আমরা জানতে পারি। আব্দুল্লাহ আনাস এমন ব্যক্তি যার কাছে পরবর্তীতে আব্দুল্লাহ আযযাম তার মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছিলেন। 
.
অথচ জিহাদ থেকে বিরত থাকা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলের উত্তরসূরী আল কা(য়দার এই মুনাফিকরা আজকে অনেক বড় "মুজাহিদ"। অনেকে তো "শায়খ" শব্দটা উচ্চারণ ব্যতীত এদের নামও মুখে নেন না। সেই আফগান জিহাদ থেকে শুরু করে আজকের ফিলিস্তিনের জিহাদ- প্রত্যেকটা জিহাদেই এই মুনাফেক গোষ্ঠী পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করেছে। অথচ অনেক জাহেল ব্যক্তি জিহাদের ইতিহাস না জেনেই, কোন কিছু না বুঝেই অবলীলায় এদেরকে "শায়েখ" "শায়েখ" ডাকতে থাকে। সেলুকাস।

আল কা(য়দা এফিলিয়েটেড ইডিওলগ আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী হামাসকে কাফের মনে করেন। তিনি হামাস থেকেও আইএসকে অধিকতর "ইসলামী" মনে করেন। কেননা আইএস অন্তত ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছে আর হামাস যুদ্ধ করছে গণতন্ত্রের জন্য।
.
 
হামাসের মিলিটারি কমান্ডার বাসসাম ঈসা ইসরাইলী হামলায় শহীদ হলে আল কা(য়দার কেউ কেউ তাকে "শহীদ" বললে আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী এর সমালোচনা করে বলেন- হামাস ইরানের প্রক্সি হিসেবে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছে ইসলামের জন্য লড়াই করছেনা। শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ যুদ্ধের রূপকার শহীস আহমেদ ইসমাইলকে তিনি "ইমামুদ দালাল" বা ভ্রষ্টদের ইমাম আখ্যা দেন। আহমেদ ইয়াসিনের কর্মকান্ড নাকি সুস্পষ্টভাবে তাওহীদের বিপরীত।
.
আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসী আফগানিস্তানে আব্দুল্লাহ আযয়ামের সাথেও বেয়াদবী ও দ্বিমত করেন। আফগান জিহাদে সাহায্যের জন্য আব্দুল্লাহ আযযাম পাকিস্তানের জিয়াউল হকের প্রশংসা করতেন। তিনি যুবকদের তাকফিরবাদীতা থেকে বিরত থাকতে বলতেন। কিন্তু মাকদিসী সরাসরি জিয়াউল হককে তাকফির করতেন এবং আফগান মুজাহিদীনদের মধ্যে শিরকের বিস্তার রোধ করতে আব্দুল্লাহ আযযামের নীরবতার সমালোচনা করতেন।
.
বাংলাদেশের একটা সুনির্দিষ্ট গ্রুপ এই তাকফিরীর অনুসরণ করে হামাসের পলিটিক্যাল উইংকে তাকফির করে। এরা মূলত সেই ধারা যারা আইএসের মতো ক্যান্সারকে জন্ম দিয়েছে। নো ঔন্ডার বাংলাদেশেও এরা তাকফির ও খারেজী ধারার অনুসারী।

Share:

ইখওয়ান ও আব্দুল্লাহ আযযাম: জিহাদের দর্শন ও সমাজ গঠন

পশ্চিম তীরের জেনিনের এক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন আব্দুল হাদী। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন মুয়াল্লিম হিসেবেও কাজ করতেন। একদিন মসজিদে বারো বছরের বিনয়ী, ইবাদতের ক্ষেত্রে সচেতন ও নম্র এক ছেলে তার নজর কাড়ে। তার নাম ছিলো আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযযাম। তিনি আযযামকে মুসলিম ব্রাদারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আস্তে আস্তে ব্রাদারহুডের রেভ্যুলিউশনারি সাহিত্য আযযামকে পরিণত করে সত্যিকার রেভ্যুলিউশনারিতে। এর কিছুদিন পরেই মারা যান আব্দুল হাদী। স্মৃতিকাতর আযযাম আব্দুল হাদীর জানাযায় এক হৃদয় বিদারক বক্তব্য দেন। আব্দুল হাদী তার মনে এতোটাই জায়গা করে নিয়েছিলেন যে এর এগারো বছর পরে দামেস্ক ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সের থিসিস তিনি উৎসর্গ করেন আব্দুল হাদীর নামে।
.
আব্দুল্লাহ আযযাম আগাগোড়া ইখওয়ানি ছিলেন। সাইয়্যেদ কুতুব, ইমাম হাসান আল বান্না, উমর তিলমেসানীরা ছিলেন তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তার বইগুলোতে প্রায় সময়েই ইখওয়ানের লিটারেচারগুলো সাইট করেছেন।
.
আব্দুল্লাহ আযযামের আফগানিস্তানের কর্মকান্ড বুঝতে হলে ইখওয়ানের জিহাদের কন্সেপ্টটা বুঝা লাগবে। আমি যদি আপনাকে প্রশ্ন করি জিহাদ আসলে কি? জিহাদ কিসের জন্য? কারা জিহাদ করবে? কেন করবে?
এই প্রশ্নগুলোর হয়তো স্থান কাল পাত্রভেদে বিভিন্ন উত্তর আছে। আ'ম অথবা খাস। জিহাদ মূলত একটা "ইসলামি" সমাজ তৈরি করার প্রচেষ্টা। সেই সমাজকে রক্ষার প্রচেষ্টা। সাইয়্যেদ কুতুব আমাদেরকে বলতেসেন বর্তমান সমাজ জাহেলিয়্যাতে নিমজ্জিত। আমরা যদি এই জাহেলী সমাজ থেকে মুক্ত হতে চাই তাহলে আমাদের নিজেদেরকেও একটা সমাজ বানাতে হবে। এই সমাজটাই হবে "দ্যা সোসাইটি অব ব্রাদার্স"। জিহাদ মূলত হবে এই সমাজটাকে কেন্দ্র করেই।
.
এইজন্য ইখওয়ানি ডিসকোর্সে সমাজ বিনির্মাণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা এলিমেন্ট। ইখওয়ান কি এই ডিস্কোর্স নিজ থেকে তৈরি করেছে? না। বরং আল্লাহর রাসূল (সা) স্বয়ং জিহাদের আগে একটা সমাজ তৈরি করতে চেয়েছেন। মদিনায় হিজরত ছিলো সেই সমাজের গোড়াপত্তন। এরপরের জিহাদ, কিতাল, চুক্তি সবকিছুই হয়েছে সেই সমাজকে কেন্দ্র করে। যারা এই সোসাইটিতে বিলং করে, যারা এই সোসাইটিকে নিজেদের এবং নিজেদেরকে এই সোসাইটির একটা অংশ মনে করে তারাই জিহাদ করবে।
.
ফলে সোসাইটি তৈরির প্রক্রিয়া ইখওয়ানি ডিস্কোর্সের আরেকটা কন্টেস্টেড এবং গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট। কোন প্রক্রিয়ায় একটা সোসাইটি তৈরি হবে, সেই সোসাইটির ব্যক্তিকতা, জেন্ডার রুলস, শিক্ষাব্যবস্থা, বিভিন্ন এন্টিটির মিথস্ক্রিয়া কিভাবে হবে এইসব বুঝাপড়া নিয়ে ইখওয়ানের বিভিন্ন ফ্যাকশনের কনফ্লিক্টিং পজিশন নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। তবে যেকোন সোসাইটি বিনির্মাণের অংশ হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবা ইখওয়ানি এন্ডেভ্যর এর অংশ।
.
এখন জিহাদের জন্য একটা সোসাইটি দরকার- এতটুকু যদি আপনি পারসিভ করতে পারেন তাহলে আমি দুইটা উদাহরণ দিবো।
প্রথম উদাহরণটা হচ্ছে ফিলিস্তিনের হা ম। (স র। ১৯৬৭ এর যুদ্ধে পরাজয়ের পর আরব রাষ্ট্রগুলো মিলিটারিলি ইসরাইলকে পরাজিত করার আশা প্রায় ছেড়ে দেয়। ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আগ্রাসন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বামপন্থী পিএলওর অবস্থানও নড়বড়ে হতে থাকে। ১৯৭৯ এর ইরান বিপ্লব ইসলামী দুনিয়াকে নাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে ইখওয়ানিদের একটা গ্রুপ নতুন সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করতে চাইলে শায়খ আহমেদ ইসমাইল ইয়াসিন সহ ইখওয়ানের ওল্ডগার্ডরা তাতে সায় দেননি। এতে ওল্ডগার্ডদের প্রতি নাখোশ হয়ে তারা ইখওয়ান থেকে বের হয়ে ১৯৮১ সালে নতুন সশস্ত্র দল তৈরি করে। সেই সশস্ত্র দল হচ্ছে প্যালেস্টানিয়ান ইসলামিক জিহাদ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আহমেদ ইয়াসিনের মতো মানুষ কেন তখন সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করার জন্য সায় দেননি? তিনি কি তবে জিহাদের বিরোধী ছিলেন?
আহমেদ ইয়াসিন খুব ভালো করেই জানতেন যেদিন থেকে মিলিটারি ভ্যানগার্ডের কার্যক্রম শুরু হবে সেদিন থেকেই ইসরাইলের সাথে প্রকাশ্য সংঘাত তৈরি হবে। তিনি বরং মিলিটারি স্ট্রাগল শুরু করার আগে এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে সশস্ত্র লড়াই বহু বছর চালিয়ে যেতে হবে। তাই তিনি গাজার প্রত্যেকটা অঞ্চলেই মসজিদ বানিয়েছেন, হাসপাতাল তৈরি করেছেন, ইসলামী ইউনিভার্সিটি অফ গাযা বানিয়েছেন। আজকের যেসব হা ma স নেতার নামে গণজোয়ার উঠে তারা সবাই ইসলামিক ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট, এইসব ফেসিলিটির আউটপুট। ইসলামিক জিহাদ তৈরির প্রায় আটবছর পরে ১৯৮৮ সালে হাম।স প্রতিষ্ঠিত হয় যখন হ।ম।সের জিহাদ করার মতো সকল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হয়। আজকে "ইসলামিক জিহাদ" তো বটেই পুরো গাজার সাধারণ মানুষ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের ফুয়েল এই ইনফ্রাস্ট্রাকচারগুলোই। অথচ আহমেদ ইয়াসিন যদি ঐসময়ে ইখওয়ানের একটা গ্রুপের কথায় প্রভাবিত হয়ে জিহাদ শুরু করতেন তাহলে হয়তো ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন আজকের দিনে এসেও বামপন্থীদের হাতে থাকতো।
.
তো যা বলতেসিলাম, থিওলজিক্যাল, মেটাফিজিক্যাল ও স্ট্রাকচারাল লেভেলে সোসাইটি কন্সট্রাক্ট করা জিহাদের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শায়েখ আহমেদ ইসমাইল ইয়াসিন ফিলিস্তিনে যে কাজ করেছেন আব্দুল্লাহ আযযামও আফগানিস্তানে একই কাজ করেছেন। আযযামের স্ত্রী আরব মুজাহিদীনদের সন্তানদের জন্য স্কুল চালাতেন। আযযাম নিজেও হিউম্যানিটারিয়ান এইড পৌছানোর পাশাপাশি মুজাহিদীনদের শিক্ষার জন্য আলাদা ইনিসিয়েটিভ নিয়েছেন। আফগানে যুদ্ধ করাতে আসা আরবদের জন্য একটা সফিস্টিকেটেড সোসাইটি তৈরির চেষ্টা করেছেন। আফগানিস্তানে একটা সাস্টেইনেবল সোসাইটি তৈরির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আযযাম কোন চমক লাগানো উদ্দেশ্য হাসিল বা এটেনশন সিকিং এক্টিভিটিজে বিশ্বাস করতেন না এবং এগুলো এন্টারটেইন করতেন না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিশরে যখন আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের সদস্যরা তখন আযযাম এই ধরণের কোন কার্যক্রমকেই সমর্থন করেন নি। এমনকি আযযামের লেখালেখিতেও জুহাইমান আল ওতায়বীর সিজ অফ কাবা কিংবা খালিদ ইস্লাম্বুলীর সাদাত হত্যাকান্ড কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারেনি। বরং আযযামের লেখালেখির অন্যতম বিষয়বস্তু ছিলো ইখওয়ান।
.
কিন্তু ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ বা এইদলের যারা পরবর্তীতে আল কা(য়দায় যোগদান করে তাদের কাছে সাদাত হত্যার মতো এটেনশন সিকিং বা চমক সৃষ্টিকারী ইভেন্ট তৈরি করতে পারাটা ছিলো প্রশংসনীয়। সাদাত হত্যাকান্ডের মূল প্রোটাগনিস্ট খালেদ আল ইসলাম্বুলী তাদের কাছে সেই সম্মান পেতো যে সম্মান আজকের বিজেপির কাছে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে পায়। এইধরণের ঘটনাকে তারা সেলিব্রেট করতো। এন্টারটেইন করতো। খালেদ আল ইস্লাম্বুলীর নামে তাদের একটা ব্রিগেডও ছিলো। কন্সিকুয়েন্স বিবেচনা না করে হেডলাইনে আসতে পারাটাই ছিলো তাদের কাছে সফলতা। নো নিড টু সে যে এই গ্রুপটাই ৯/১১ ঘটিয়েছিলো।
.
ইখওয়ানের এই সোসাইটি সেন্ট্রিক জিহাদের জন্যই আফগান জিহাদ বা আজকের ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন সারা পৃথিবীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পেরেছিলো। আব্দুল্লাহ আযযাম কখনো তোরাবোরায় বসে ব্রিফিং করেন নাই। বরং তিনি মক্কা থেকে নিউইয়র্ক, লন্ডন থেকে কাসাব্লাংকা পর্যন্ত বক্তব্য দিয়ে বেড়াতেন, ভলেন্টিয়ার রিক্রুট করতেন। খোদ আমেরিকাতেই আযযামের মাকতাব আল খিদমাতের মোট ৫২টি শাখা ছিলো। আযযাম কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না, অথবা ছিলেন না কোন সো কল্ড গুরাবা। আযযাম মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ পরিহার করে আফগানিস্তানে একটা ইন্সক্লুসিভ সোসাইটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
.
আপনি সোসাইটি ছাড়া নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত কিছুই করতে পারবেন না। "উম্মাহ" ধারণা ইসলামের খুবই সিগনিফিক্যান্ট একটা আইডিয়া যা সমাজ তৈরি করে। মক্কার সমাজ আর মদিনার সমাজ যেমন একই রকম ছিলো না তেমনি আজকের মিশরের সমাজ আর ফ্রান্সের সমাজও সেইম না। আপনি কোন সমাজে বিলং করেন সেইটার উপর ভিত্তি করে আপনার একশন নির্ধারিত হবে। যেকোন এটেনশন সিকিং বা মনযোগকামী কর্মকান্ড করার আগে ভাবা উচিত এর কন্সিকুয়েন্স কি আপনার "সোসাইটি" তৈরি করতে বাধা দিবে নাকি ভূমিকা রাখবে।
.
এখন অনেক তাকফিরী গ্রুপ বিশ্বাস করে আমাদের সবাইকে গুরাবা হতে হবে। আমাদেরকে কেউ চিনবেনা। এই জাহেল সোসাইটিতে আমাদের কোন কিছু কন্ট্রিবিউট করার নাই। এই সোসাইটিতে আমরা তো বিলংই করি না। সিস্টেমের বাইরে থেকে আমরা সিস্টেমের উপর হামলা চালাবো। স্লিপার সেল তৈরি করবো। আর যারাই নতুন সোসাইটি তৈরি করতে চাইবে তারাই আমাদের শত্রু। কারণ নতুন আরেকটা সোসাইটি তো জাহেলি সোসাইটিই হবে। মুখে মুখে কুতুবিস্ট দাবী করা তাকফিরী ইডিওলগদের বেধে দেয়া এই হাইপার ইন্ডিভিজ্যুয়াল সোসাইটির বিরুদ্ধে যারাই একটা নতুন সমাজ তৈরি করতে চেষ্টা করবে তারাই হবে জিহাদের শত্রু, গণতন্ত্রকামী মডারেট।
Share:

মুস্তাফা সালাবি: আযযামের লেগ্যাসি ধ্বংসের পথে আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায়

আব্দুল্লাহ আয যামের শাহাদাতের পর জিহাদী হিস্ট্রির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্র্যাজেডি হচ্ছে মুস্তাফা সালাবির শাহাদাত।

.
আব্দুল্লাহ আযযামের শাহাদাতের পরেও মাকতাব আল খেদমাত কয়েকটা মহাদেশে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ফলে আযযামের শাহাদাতের পরে একটা গোষ্ঠী জিহাদের অথরিটি নিজেদের হাতে নিতে চাইলে এপথে একমাত্র শত্রু হয়ে দাঁড়ায় আযযামের প্রতিষ্ঠা করা আফগান জিহাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মাকতাব আল খেদমাত। মাকতাব আল খিদমাতের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
.
মাকতাব আল খেদমাতের কর্মকান্ডের অন্যতন প্রধান কেন্দ্র ছিলো ইউএসএ। আযযাম প্রতি বছরেই ইউএস যেতেন আফগান জিহাদের বার্তা পৃথিবীর কাছে পৌছানোর জন্য। কোন সফরে আযযাম নিজে যেতে না পারলে তামীম আল আদনানীকে পাঠাতেন। আযযামের শাহাদাতের পর ইউএসএতে এই প্রতিষ্ঠানের দেখাশোনার দায়িত্বভার পরে মুস্তাফা সালাবির উপর।
.
১৯৯০ সালে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের সাথে এফিলিয়েটেড শায়েখ ওমর আব্দুর রহমান (চোখ অন্ধ থাকায় তিনি পরবর্তীতে ব্লাইন্ড শায়েখ নামে খ্যাতি লাভ করেন) নিউইয়র্কে বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন আযহারাইট। যদিও তিনি আব্দুল্লাহ আযযামের বিরোধীতা করতেন তবে একজন আযহারাইট মানবেতর জীবন যাপন করবেন সেটা আযযাম মেনে নিতে পারেন নি। আযযামের জীবদ্দশাতেই মাকতাব আল খেদমাত থেকে তার জন্য এলাওয়েন্স বরাদ্দ ছিলো।
.
যখন তিনি নিউইয়র্কে মুভ করেন তখনো তার এপার্টমেন্ট, টেলিফোন, কার ও ড্রাইভারের সকল ব্যয় বহন করে মাকতাব আল খিদমাত। কিন্তু ব্লাইন্ড শায়েখ চেয়েছিলেন আব্দুল্লাহ আযযামের এই সংগঠনকে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের জন্য উন্মুক্ত করে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে। কিন্তু মুস্তাফা সালাবী এতে রাজি হননি। এর কিছুদিন পরেই ব্লাইন্ড শায়েখ মুসতাফা সালাবীকে "অসৎ" আখ্যা দেন এবং মুস্তাফা সালাবীকে সমাজচ্যুত করার আহবান জানান।
.
মুস্তাফা সালাবী আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে তার স্ত্রীকে মিশর পাঠিয়ে দেন এবং তিনি নিজেও আফগানিস্তানে চলে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। কিন্তু নিউইয়র্কের এয়ারপোর্টে ব্লাইন্ড শায়েখের প্রতি অনুগতরা তাকে হত্যা করে। বলাই বাহুল্য, মুস্তাফা সালাবির মৃত্যুর পর ইউএসএতে মাকতাব আল খেদমাতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়।
.
মুস্তাফা সালাবির মৃত্যু একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিলো না, ছিলো শত শত মুজাহিদীনদের রক্ত দিয়ে তৈরি করা এক সংগঠনের মৃত্যু। যারা আযযামের জীবদ্দশায় পেশওয়ারে বসে কুৎসা রটাতো তারাই আযযামের মৃত্যুর পর তার সংগঠনকে ধ্বংসের জন্য একে একে জিহাদের মাস্টারমাইন্ডদেরকে খুজে খুজে হত্যা করেছে। আজকে এরা নিজেদের লেজিটিমেসির জন্য আযযামকে পূজা করে। আযযামের প্রিয়জনদের হত্যা করা তারাই নাকি আযযামের লেগ্যাসির ধারক ও বাহক।

Share:

সোভিয়েত আফগান জিহাদে পেশওয়ার: মুজাহিদীনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও তাকফিরী প্রভাব

সোভিয়েত আফগান জিহাদের শেষদিকে পেশওয়ারে কি হতো সেটা নিয়ে জিহাদী লিটারেচারগুলোতে অল্প বিস্তর আলোচনা আছে। ১৯৮৮, ১৯৮৯ সালের পেশওয়ার খুবই ঘটনা বহুল এবং ঐ সময়ের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা আরো স্পষ্টভাবে আযযাম ও তাকফিরি গ্রুপগুলোর পার্থক্য বুঝতে পারবো।

.
সোভিয়েত আফগান জিহাদে পেশোয়ার ছিলো মুজাহিদীনদের হাব। আফগান জিহাদে মুজাহিদীনদের অন্তত আটটি বড় গ্রুপ ছিলো। এই গ্রুপগুলোর প্রত্যেকটারই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে শক্ত উপস্থিতি ছিলো। এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক ওয়ারলর্ডরা ছিলো। আহমেদ শাহ মাসউদ ছাড়া বাকি সকল মুজাহিদীন গ্রুপগুলো পেশওয়ারে বসেই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো।
.
এই মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিলো প্রকট। জিহাদের জন্য আসা অর্থ কিভাবে বন্টন হবে, পেশওয়ারে কে কোথায় থাকবে, আফগানে কোথায় কোন গ্রুপ অপারেশন চালাবে এইগুলো নিয়ে মতপার্থক্য ছিলো নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। মুজাহিদীন গ্রুপগুলো শুধুমাত্র সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়াই করতোনা বরং আধিপত্য বিস্তারে তারা অন্য মুজাহিদীন গ্রুপের সাথেও লড়াই করতো।
.
মুজাহিদীনদের এই অন্তর্ঘাতী লড়াই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তো ছিলই, পাশাপাশি পেশওয়ারেও ছড়িয়ে পড়ে। ঐসময়ের সবচেয়ে ফরমিডেবল মুজাহিদীন কমান্ডার হেকমতিয়ারের বাহিনীর হাতে পেশওয়ারেই খুন হন প্রতিপক্ষ দলের কয়েকজন মুজাহিদীন। পেশওয়ারের মাটিতে এইসব খুনোখুনি কোনভাবেই পাকিস্তান পছন্দ করতোনা। আব্দুল্লাহ আযযাম নিজেও মুজাহিদীন ফ্যাকশনের নেগোসিয়েশনের জন্য বার বার চেষ্টা করতেন। যেহেতু আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে পাকিস্তান সরকার ও পেশওয়ারের মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর সম্পর্ক ছিলো তাই এইসব ঘটনার জন্য আব্দুল্লাহ আযযামের উপর চাপ বাড়াতে থাকে পাকিস্তান সরকার।
.
পেশওয়ারের মুজাহিদীনদের কালচার ছিলো খুবই অনৈসলামিক। কোন মুজাহিদীন গ্রুপ যদি অন্য কোন মুজাহিদীন গ্রুপের কাউকে হত্যা করতে চাইতো তাহলে প্রথমেই তাকে সুযোগ বুঝে সৌদি সরকারের এজেন্ট বা ইরানিয়ান এজেন্ট হিসেবে ট্যাগ দেয়া হতো। এরপর তার ডিফেইমেশন এমনভাবে করা হতো যাতে এই প্রপাগান্ডা পেশওয়ারে থাকা ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের (সংক্ষেপে ইআইজি) গেস্টহাউজে পৌছায়। যেহেতু ইআইজি সৌদি সরকারসহ সকল মুসলিম দেশের শাসকদের মুরতাদ মনে করে তাই কোন মুজাহিদ এইসব সরকারের হয়ে কাজ করে শুধুমাত্র এই তথ্যই ঐ মুজাহিদকে হত্যার জন্য যথেষ্ট ছিলো। ফলে পেশওয়ারে থাকা ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের অনেকেই আফগানিস্তানে লড়াই না করে পেশওয়ারে বিভিন্ন মুজাহিদীন গ্রুপের ক্রীড়নক হয়ে অপর পক্ষের মুজাহিদীনদের হত্যা করতো। আর এ কারণেই পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতি বিরক্ত হয়ে ওঠে।
.
পেশওয়ারে মুজাহিদীনদের এই লড়াইয়ের কারণে আযযাম নিজেও চাপে পড়তেন। জিহাদের শেষদিকে অবস্থা এমন হয় যে পাকিস্তানের আইএসআই আযযামকে হান্ট করা শুরু করে। এর কিছুদিন পরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিখ্যাত জয়নাব আল গাজালী পাকিস্তান সফরে গেলে সেখানে তিনি আযযামকে হেনস্থা না করতে জিয়াউল হককে অনুরোধ করেন। জিয়াউল হক জয়নাব আল গাজালীর প্রতি খুবই শ্রদ্ধা রাখতেন মিশরের জেলে তার লৌহদৃঢ় ভূমিকার কারণে। ফলে আযযামকে হেনস্থা বন্ধ করে পাকিস্থান প্রশাসন।
.
দেখুন, পেশওয়ারে থাকা তাকফিরী দলের সদস্যরা বার বার জিহাদকে বিপদে ফেলেছে। তারা আরব মুজাহিদীনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব উস্কে দিতো। যেহেতু আরবরা সালাফি ছিলো তারা পেশওয়ারে বসে ফতোয়াবাজি করতো- "আফগানিস্তানের জিহাদ সহীহ জিহাদ না। আফগানরা শিরকে লিপ্ত।" এমনকি আল কা(য়দার ইডিওলগ আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসি আব্দুল্লাহ আযযামকে ঘৃণা করতো কারণ আযযাম নাকি আফগানিস্তানে শিরকের বিস্তার রোধ করতে অনিচ্ছুক।
.
আব্দুল্লাহ আযযামের শাহাদাতের আগেও তার রক্ত হালাল করার জন্য একটা গ্রুপ পেশওয়ারে প্রচারণ চালায় আযযাম সৌদি আরবের দালাল। অথচ আযযাম জিহাদের শেষদিকে সৌদিতে গিয়ে বক্তব্য দিতে পারতেন না। পেশওয়ারের তাকফিরীরা অন্য মুজাহিদীনদের হত্যার আগে যেভাবে ট্যাগিং করতো আযযামের মৃত্যুর আগেও তারা আযযামকে ঐভাবে ট্যাগিং করেছে। এইজন্য অনেকেই সন্দেহ করে যে আযযামের শাহাদাতের পিছনে এই তাকফিরী গোষ্ঠীদের হাত ছিলো।
.
যদিও জিহাদী লিটারেচার এনালাইস করলে বুঝা যায় আযযামকে হত্যার ঘটনায় হয়তো তাকফিরীদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা কম তবে ১৯৮৯ সালে শাহাদাতের মাত্র একুশ দিন পূর্বেও আযযাম পেশওয়ারের যে মসজিদে খুতবা দিতেন সেই মসজিদের মিম্বারের নিচে বোমা পাওয়া গিয়েছিলো। ভাগ্যক্রমে মসজিদের এক খাদেম সেই বোমার সন্ধান পাওয়ায় সে যাত্রায় বেচে যান আযযাম। জিহাদী লিটারেচার মতে ঐ বোমা মসজিদের মিম্বারের নিচে পেশওয়ারের কোন তাকফিরী গ্রুপই রেখেছিলো সে সম্ভাবনা প্রবল।
Share:

দ্য ট্রায়াল অফ আব্দুল্লাহ আযযাম

 


আফগান জিহাদের ডাইভারসিটির কারণে মুজাহিদীনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে থাকলেও পেশওয়ারের আরব যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘাতের কারণ খুবই সিগনিফিক্যান্ট। আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে পেশওয়ারে থাকা কিছু আরবের দ্বন্দ্বের কারণ হিসেবে প্রধানত দুইটি ঘটনা দায়ী। এই সংঘাতের সুচনা হয় আহমেদ শাহ মাসউদকে কেন্দ্র করে। আর এই সংঘাত আরো প্রকট হয় তাহাদ্দি প্রজেক্ট কেলেংকারীতে।

.
আব্দুল্লাহ আযযাম মূলত আফগানিস্তানে আরব মুজাহিদীনদের জন্য ফান্ডরাইজ করতেন। এমনি একটা ফান্ডরাইজ প্রজেক্ট ছিলো তাহাদ্দি। এই প্রজেক্টে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন আব্দুল্লাহ আযযাম, তার একান্ত সহযোগী ওয়ায়েল জুলাইদান ও ইজিপশিয়ান কানাডিয়ান আহমেদ সাইদ খাদর। এই প্রজেক্টের মূল দায়িত্বে ছিলেন আহমেদ সাইদ খাদর। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য অফিস, টেলিফোন ও যাবতীয় খরচ বহন করেছিলেন আব্দুল্লাহ আযযাম। প্রজেক্টের ফান্ডরাইজিংয়ের জন্য খাদর আযযামের নিকট একটি এন্ডোর্সমেন্ট লেটার চাইলে আযযাম তার স্বাক্ষরিত একটি এন্ডোর্সমেন্ট লেটার দেন।
.
কিন্তু খাদরের ক্রমাগত মিস ম্যানেজমেন্টের জন্য বিদেশী দাতা সংস্থাগুলো এই প্রজেক্টে ফান্ডিং বন্ধ করে দেয়। প্রজেক্টের ব্যর্থতা ঠেকানোর জন্য আব্দুল্লাহ আযযাম ও জুলাইদান ম্যানেজেরিয়াল লেভেলে হস্তক্ষেপ শুরু করেন। এর মধ্যে জুলাইদান একটি প্রজেক্ট পেপার তৈরি করে খাদরকে দেন স্বাক্ষরের জন্য। পেপারে উল্লেখ ছিলো, স্টিয়ারিং কমিটি চাইলে এডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটিকে পরিবর্তন করতে পারবে। খাদর পুরো পেপার না পড়েই স্বাক্ষর করেন।
.
এর কিছুদিন পর স্টিয়ারিং কমিটির আব্দুল্লাহ আযযাম নিজেই তাহাদ্দি প্রজেক্টের পুরো দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন এবং খাদরের পদত্যাগ দাবি করেন। খাদর দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং কানাডায় চলে যান।
.
আব্দুল্লাহ আযযাম ও জুলাইদান নিশ্চিত হন খাদর কানাডায় গিয়ে প্রজেক্টের রিসোর্সের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছেন। আব্দুল্লাহ আযযামের অনুগত কয়েকজন পেশওয়ারে খাদরের অফিস তল্লাসি করে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট জব্দ করে ও প্রজেক্টের সকল সম্পদ সৌদি রেড ক্রিসেন্টের ওয়্যারহাউজে জমা দেয়। আযযামের অনুগতরা দাবি করে তারা খাদরের অফিস থেকে এমন নথি উদ্ধার করেছে যা থেকে স্পষ্টত বুঝা যায় খাদর এই প্রজেক্ট দখলের চেষ্টা করেছেন। তারা খাদরকে বহিষ্কারের একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করে তাহাদ্দি প্রজেক্টের সকল দাতাকে ফ্যাক্স করে।
.
এই ঘটনার কয়েকমাস পরেই খাদর পুনরায় পেশওয়ারে ফিরে আসেন। তাহাদ্দি প্রজেক্টের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রভাবশালী আব্দুল্লাহ আযযামের মোকাবেলায় তিনি পেশওয়ারের আরব- যারা আযযামকে অপছন্দ করতো তাদেরকে মোবিলাইজ করেন। তিনি সকল আফগান মুজাহিদীন নেতাদেরকে এপ্রোচ করেন এবং আযযামের সাথে সংঘাতের ব্যাপারে বিচারের আয়োজন করার অনুরোধ করেন।
.
১৯৮৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই বিচার অনুষ্ঠিত হয় যদিও আযযাম সেদিন সশরীরে হাজির ছিলেন না। জিহাদি লিটারেচারে এই বিচার "ট্রায়াল অফ আযযাম" নামে পরিচিত।
.
বিচারের ফলাফল কি হয়েছিলো সেটা নিয়ে যথেষ্ট ধোয়াশা আছে। বিভিন্ন জিহাদী লিটারেচারের বিবরণ অনুযারী বিচারকরা আব্দুল্লাহ আযযামের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন এবং খাদরের সকল সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আযযাম ও জুলাইদানকে আহবান জানিয়েছিলেন। একই সাথে খাদরকে তাহাদ্দি প্রজেক্টে পুনর্বহাল ও এর প্রজ্ঞাপন সকল ডোনারকে ফ্যাক্স করার জন্য বলা হয়।
.
বিচারের পর আযযাম ও জুলাইদান খাদরের সম্পদ ফিরিয়ে দিলেও তার মানহানি বা অফিস ভাঙ্গার জন্য কোন ক্ষতিপূরণ দেননি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আফগান জিহাদ থেকে বিরত থাকা পেশওয়ারের কিছু আরব আযযামের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুরু করে। এই প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের মূল নেতা ছিলেন ফাদল ও আয়মান আল জাওয়াহিরি।
.
ফাদল তার বইতে পরবর্তীতে এই ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে লিখেন- "আল্লাহর ইচ্ছায় আমি বিখ্যাত দায়ীদের মধ্যস্থতাকারী হয়েছিলাম। অতপর যখন সত্য উদ্ভাসিত হলো তখন তারা [আব্দুল্লাহ আযযাম ও ওয়ায়েল জুলাইদান] সত্য থেকে পালালো।"
.
২০০৮ সালে প্রকাশিত আয়মান আল জাওয়াহিরির বইয়েও এই ঘটনা উল্লেখ আছে। তবে জাওয়াহিরি ফাদলের সাথে আযযামের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন চালালেও তার বইয়ে তিনি ফাদলের সাথে দ্বিমত করেন এবং আযযামকে বেনিফিট অফ ডাউট দেন।
.
তাহাদ্দি প্রজেক্ট কেলেংকারির বহুবছর পরে প্রকাশিত জাওয়াহিরির বইয়ে তিনি ফাদলের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন আযযামের বিরুদ্ধে ফাদলের সহযোগি। এই ঘটনায় জাওয়াহিরির অবস্থান পরবর্তীতে আরো স্পষ্ট হয় জাওয়াহিরির প্রতি লেখা বিন লাদেনের এক চিঠিতে যেখান লাদেন জাওয়াহিরিকে আযযামের নিন্দাবাদ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। ফলে এটা প্রমাণিত হয় যে, জাওয়াহিরি বাস্তবে ফাদলের সাথে মিলে আযযামের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ছড়ালেও তার বইয়ে তিনি পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকতে চেয়েছেন।
Share:

একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ২

১৫. "যতটুকু মনে পড়ে কলকাতার সাধারণ মুসলমানরা আমাদের ভালভাবে নেয়নি৷ তারা আমাদের থেকে নিজেদের একটু দূরে সরিয়ে রাখত। কথা বলতে চাইত না। কফি হাউজে মুসলমান লেখকদের দুএকজনের সাথে দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিত। আমার কাছে বিষয়টা অস্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু পরে যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখেছি তাদের কাছে পাকিস্তান ছিল আশা-ভরসা ও অহংকারের কেন্দ্রভূমি। আমরা সে পাকিস্তান ভেঙে ফেলার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছি এটা তাদের কাছে মনে হয়েছে দুঃস্বপ্ন। আমি আমার 'উপমহাদেশে' বইয়ে এর কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি। একজন সামান্য মুসলমান পানের দোকানদার আমাদের কাছে খুশি মনে এক খিলি পানও বিক্রি করতে চাইত না। যদি বুঝতে পারত আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছি। সোজা বলে দিত আগে যাইয়ে। আমাদের প্রতি এ অবজ্ঞার ভাব লক্ষ্য করে আমি সাধারণত কলকাতার কোন মুসলিম দোকানে কোনো কিছু কিনতে যেতাম না।" — আল মাহমুদ


১৬। "পশ্চিম পাশে এসে আমি চমকে উঠলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল মসজিদ। এখন শূন্য। আমি মাঠ দৌড়িয়ে সেই মসজিদে পৌঁছলাম। দেখলাম কিছু লোক দীর্ঘক্ষণ সেজদায় পড়ে রয়েছে। কৌতূহলে এগিয়ে যেতেই জনৈক ব্যক্তি দৌঁড়ে এসে বললো, 'মসজিদ! ইয়ে মসজিদ হ্যায় ভাই রোখ যাও।'
আমি জবাব দিলাম, 'ম্যায় হু মুসলমান, ভাই সাব।'
সে চমকে দাঁড়ালো। তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, 'সাচ্চা মুসলিম হ্যায়? কোন মুলুক সে আয়া?'
আমি বললাম, 'বাংলাদেশ।'
সে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললো, 'ও, মাশরেকী পাকিস্তানী? মিল্লাত কি গাদ্দার! ভাগো ইহাসে। ভাগো।'
আমি অবাক হইনি। লক্ষ্ণৌ, বেনারস, দিল্লী, পাটনা, জম্মু, কাশ্মীর, ধানবাদ, আগ্রা, অমৃতসর- যেখানেই আমি মুসলমানদের সাথে আলাপ করেছি, তারা আমায়
গাদ্দার বলে ভর্ৎসনা করেছে। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিলো হাজার বছরের স্বপ্নের ইমারত; তাদের দিল ছিলো সেই ইমারতের কল্যাণ কামনায় পূর্ণ । বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তাই তারা মনে করে ফ্যান্টাসীর মৃত্যু অথবা আমাদের ঈমানী দুর্বলতা। আমি তাদের যতই বুঝাতে চেষ্টা করি, তারা ততই প্রতিবাদে টগবগ করে ওঠে। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের অপমানকে সহ্য করে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম।" — বুলবুল সরওয়ার, ঝিলাম নদীর দেশে।
 
১৭। মেহেরপুরের আমবাগান: মিথ থেকে বাস্তবে
মেহেরপুরে আমবাগান ঘেরা একটা গ্রাম 'আমঝুপি'। অভিশপ্ত বৈদ্যনাথতলা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটারের দূরত্বে। পলাশী থেকে সোজা দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। বলা হয়, এই আমঝুপি গ্রাম মোঘল সেনাপতি মানসিংহ ও নবাব আলীবর্দী খানের স্মৃতি বিজড়িত। তবে এসবকে ছাপিয়ে একটি তথ্য প্রচলিত আছে যে, পলাশীর যুদ্ধের সর্বশেষ নীলনকশা এই আমঝুপিতেই চূড়ান্ত হয়। জনশ্রুতি আছে, এখানে অনুষ্ঠিত হয় লর্ড ক্লাইভ এবং বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও অন্যান্যের সর্বশেষ ষড়যন্ত্র সভা। যার পরিণতি পলাশীর নাট্যমঞ্চে রূপায়িত হয়। যদিও এর সত্যতা ঐতিহাসিকরা জোরালোভাবে স্বীকার করতে পারেন না। তাদের প্রবণতা এটিকে উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষেই।
 
কিন্তু সেই পলাশী ষড়যন্ত্রের ২১৩ বছর পরে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে বৈদ্যনাথতলা গ্রামে এই মিথ সত্যে উপনীত হয়। ১৯৬২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলা গমনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়, ১৯৬৭ সালে বিদ্রোহের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং একাত্তরের মার্চের শেষ সপ্তাহে পুনরায় বিদ্রোহের যে ষড়যন্ত্র রচিত হয়, তার প্রত্যেকটিই নাকাম হয় সরকার ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে।
 
তবে তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলে উঠে দেশের অভ্যন্তরে থেকেই বাঙালি রেজিমেন্টের সৈন্যরা বিদ্রোহ করলেও তাদের সহযোগী ও যুদ্ধ পরিস্থিতির স্রষ্টা আওয়ামীলীগ নেতারা শেখ মুজিবের নির্দেশে নিরাপদে কোলকাতায় আশ্রয় নেন। কোলকাতার ভবানীপুরের রাজেন্দ্রপ্রসাদ রোডের ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর দপ্তর ও লর্ড সিনহা রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে প্রবাসী বাংলাদেশী সরকারের দপ্তরে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পর্ব শেষ হয়। যা ঘোষিত হয় ১০ এপ্রিল। আর ১৭ এপ্রিল তারই প্রকাশ্য অনুষ্ঠান ছিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম বাগান।
 
ভারতবন্ধুরা প্রথমে এই শপথ অনুষ্ঠান চুয়াডাঙ্গায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পাকিস্তান আর্মির কারণে চুয়াডাঙ্গায় এই অনুষ্ঠান সফল হয়নি। হয়েছে আমঝুপির কাছে। ১৮০০—১৮১৫ সালের দিকে এই আমঝুপিতে একটি নীলকুঠি নির্মিত হয়। বাংলার কৃষকদের প্রতি অত্যাচারের জন্য এই কুঠি কুখ্যাত হয়েছিল। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৭২ সালে অন্যতম ষড়যন্ত্রী তাজ উদ্দীন এই কুঠি পরিদর্শন করেন। 'আমঝুপি' নামের স্বার্থকতা রক্ষায় কুঠির আশেপাশে রোপন করেন প্রচুর আম গাছ। আসলে ইতিহাসেরও তো দায় আছে!

১৮। ৬৫’র সাফল্য একাত্তর ত্বরান্বিত করেছে
১৯৬৫ সালের ৫ আগস্ট থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় কাশ্মির যুদ্ধ। সম্ভবত পয়লা পদক্ষেপ পাকিস্তানই নিছিল, যেমনটা বলা হয় সব মহলেই। আইয়ুব খান কাশ্মির ইস্যুর একটা স্থায়ী সমাধান চাইছিলেন। হয়তো হঠকারিতাই ছিল সেটা। কিন্তু ভারত এই যুদ্ধটা কাশ্মির ফ্রন্টে খেলতে রাজি ছিল না। এটারে টেনে নিয়ে আসছিল পাঞ্জাবে। ৬ সেপ্টেম্বর ভারত লাহোর আর শিয়ালকোট আক্রমণ করে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই আক্রমণ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে। যার দরুণ বেশ কয়েকজন বাঙালি ফৌজি সিতারায়ে জুররাত ও তমঘায়ে জুররাত হাসিল করে। ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত-পাকিস্তান উভয়েই যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। পরে তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই যুদ্ধে দৃশ্যমান কোন পক্ষেরই বিজয় হয়নি। উভয়েরই ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। তবে সবার দৃষ্টি কাড়ে লাহোর প্রতিরক্ষা। এর আগ পর্যন্ত, ব্রিটিশ আমল থেকেই বাঙালিরা 'নন মার্শাল রেস' (অযোদ্ধা জাতি) হিসাবে বিবেচিত হতো। কারণ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না। এবার বাঙালি সিপাহিরাও দেখাতে পারল যে তারাও যুদ্ধ জানে, এমনকি ভয়ঙ্কর শত্রুরেও ভালোমতোই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতেও পারে। পরের বছর আবার সাইফুল আজম পাকিস্তানের হয়ে আরেক খেলা খেলছিলেন ইসরাইলে!
 
যুদ্ধে ভারতের সাফল্য ছিল কাশ্মীর হাতছাড়া হয়নি, পাকিস্তানের সাফল্য লাহোর হাতছাড়া হয়নি। পাকিস্তান এমনিতেই মাথা ব্যথা ছিলই, কিন্তু এই যুদ্ধ ভারতকে ভাবিয়ে তোলে মুসলমান আর ইসলামী আদর্শের বাঙালি ফৌজ নিয়া যা তার শরীরের এক কর্নারে বিষফোঁড়ার মতো। ভারত ইস্টার্ন ফ্রন্টে মনোযোগী হয়। এইটারে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে গঠন করে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং - র, ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। যা গঠনের মাত্র দুই বছরের মাথায় এনে দেয় চূড়ান্ত সফলতা। ইন্দিরা গান্ধীর ভাষায় - “We have taken the revenge of a thousand years.” অবশ্য র’ গঠনের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল চীন ও পাকিস্তানের উপর গোয়েন্দাগিরি। ভারত হাজার বছরের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়।
 
গত বছর ভারতের সাউদার্ন নেভাল কমান্ডের ফ্ল্যাগ অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ ভাইস অ্যাডমিরাল অনিল কুমার চাওলা এই যুদ্ধরে স্মরণ করে বলছিলেন, "It was mentioned that the war did not really start in December (1971). Actually, if you really go back into the literature and read, the thinking started actively after the 1965 war, on how to separate East Pakistan from West Pakistan."
 
ছয় দফা প্রস্তাব মানুষের সমর্থন আদায়ে এই যুদ্ধের একটা ভুল ভালো কাজে দিছিলো। ছয় দফার প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত দফা (৬. পাকিস্তানের দুই অংশের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্ব স্ব আয়ত্বাধীন প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠনের অধিকার থাকতে হবে) এই যুদ্ধের হঠকারিতা ও ব্যর্থতার দিকে ইশারা করে। দাবি করা হয় যে সে সময় ইস্টার্ন ফ্রন্টের নিরাপত্তায় তেমন একটা উদ্যোগ নেওয়া হয় নাই। ভারত চাইলেই পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিতে পারতো ওই সময়ে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ৬৫’র যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাফল্য পাক ফৌজে থাকা বেইমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়ে তুলছিল। যার কারণে ভারত পরিস্থিতি তৈরি করে দিলে পিছন থেকে তারা ছুরি মারতে সক্ষম হয়।
 
পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়া এই কারণেই বলছি যে, একাত্তরের যুদ্ধ ভারত পরিকল্পিতভাবেই বাঁধিয়েছে। যুদ্ধ মূলত শুরু হইছে ৩০ জানুয়ারি। যেদিন কথিত কাশ্মিরি মুজাহিদ ভারতীয় বিমান হাইজ্যাক করে লাহোর নিয়ে যায়। আর এই বাহানায় ভারত তার আকাশে পাকিস্তানি বিমান নিষিদ্ধ করে। যা পশ্চিম থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সাবেক র’ কর্মকর্তা আর. কে. যাদব ২০১৫ সালে dailyo তে এই ঘটনার বিবরণ দিয়া লিখছেন, "On January 30, 1971, an Indian Airlines plane Ganga was hijacked from Srinagar though a RAW source and taken to Lahore airport. All 26 passengers were released and the plane was set on fire. This was an outdated plane which was due to be dumped soon. The Indian government immediately banned over-flights going from West to East Pakistan. This action of Kao (র’ প্রধান আর.এন. কাও) hampered the transportation of men and material from air route although Pakistan continued it via Colombo but slowed down this process in view of the international outcry."
 
১৯। কেউ কেউ শেখ মুজিবের বকওয়াস প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে মনে করেন 'পাকিস্তানিরা' আমাদের 'পূর্ব বাংলা'র নাম বদলিয়ে 'পূর্ব পাকিস্তান' রেখেছিল। ১৯৫৭ সাল থেকেই এ নিয়ে শেখ মুজিব গ্যাঞ্জাম বাঁধানোর কোশেশ করে যাচ্ছিলেন। ওই বছর করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে এক বক্তৃতায় প্রথমবার এ নিয়ে কথার ফুলঝুরি ছোটান তিনি। ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ নামটির প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, "পূর্ব-বাংলা নামের একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। আর যদি পূর্ব-পাকিস্তান নাম রাখতেই হয়, তাহলে বাংলার মানুষের জনমত যাচাই করতে হবে। তারা নামের এই পরিবর্তন মেনে নিবে কিনা- সেজন্য গণভোট করতে হবে।"
 
পরে ১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি ঘোষণা করেন, "আমাদের স্বাধীন দেশটির নাম হবে বাংলাদেশ।" দিনটির স্মৃতিচারণ করে তিনি 'কারাগারের রোজনামচা'য় লিখেছেন—
"এক সময় এই দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।... একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোনও কিছুর নামের সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব-পাকিস্তান এর পরিবর্তে হবে শুধুমাত্র বাংলাদেশ।"
 
অথচ 'পূর্ব পাকিস্তান' নামটি (পশ্চিম) পাকিস্তানিদের আবিষ্কার নয়, বাঙালিরই আবিষ্কার। এমনকি 'পূর্ব পাকিস্তান' নামটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নয়, আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে গেছিল। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবে প্রস্তাবিত দেশটির কোন নাম ছিল না। কিন্তু এর আগে ১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলীর বুকলেটে 'পাক্সতান' নামটি প্রস্তাব করা হয়েছিল। একে আরেকটু পরিমার্জিত করে 'পাকিস্তান' করা হয়। মূলত, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হলে এ নামটি আলোচনায় আসে। বিশেষ করে হিন্দু পত্র-পত্রিকায় একে 'পাকিস্তান প্রস্তাব' হিসাবে উল্লেখ করা হতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৪৩ সালের ২৪ এপ্রিল মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে এই নামটি গ্রহণ করেন কায়েদে আযম। উল্লেখ্য, 'পাকিস্তান' দ্বারা পাঞ্জাব, আফগানিয়া, কাশ্মির, সিন্ধু এবং বালোচিস্তান প্রদেশ প্রস্তাব করা হয়েছিল। চৌধুরী রহমত আলী বাংলার নাম দিয়েছিলেন 'বাঙ্গিস্তান'/'বঙ্গস্তান' অথবা 'বাংলাস্তান'। 
 
কিন্তু খোদ কায়েদে আযম 'পাকিস্তান' গ্রহণ করার আগে বাঙালিরা 'পাকিস্তান' গ্রহণ করে বসেছিল। ১৯৪২ সাল থেকেই বাংলায় এ নামটি ব্যবহার হতে থাকে। সে বছর ঢাকায় 'পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ' যাত্রা শুরু করে। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন (পরবর্তীতে ঢাবি উপাচার্য) সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। একই বছর কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি'। এর সভাপতি ছিলেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ১৯৪৪ সালে এই সংগঠনটি প্রথম পরিষদ গঠন করে। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কে ছিলেন না? প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হাসান সোহরাওয়ার্দী, নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আকরাম খান, একে ফজলুল হক, আবুল কাসেম, মৌলভি তমিজউদ্দিন খান, শাহাদাত হোসেন, গোলাম মোস্তফা, এস ওয়াজিদ আলী, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আবুল হুসেন, গোলাম কুদ্দুস, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার। ছিলেন আরও অনেকেই। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন তখন এই সোসাইটির সাহিত্য শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।
 
এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান কায়েম হয়। কিন্তু 'বঙ্গ' প্রদেশের এই অর্ধেক অংশের নাম আর 'পূর্ব পাকিস্তান' রাখা হলো না। রাখা হলো 'পূর্ব বঙ্গ'। কারা রাখলেন? নাজিমুদ্দিন-নুরুল আমিনরা। তবে মুসলিম লীগের নাম হলো 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ'। মুসলিম ছাত্রলীগের নাম হলো 'নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত মুজিব ছাত্রলীগেরও নাম রাখা হলো 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন (ঘষেটী-মীর জাফর দিবস) গঠিত হলো আওয়ামীলীগ। তার নামও রাখা হলো 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'। পরবর্তীতে 'মুসলিম' বাদ দেওয়া হলেও 'পূর্ব পাকিস্তান' বাদ দেওয়া হয়নি কখনও।
 
মজার বিষয় হচ্ছে, এই আওয়ামীলীগের নেতৃত্বেই 'পূর্ববঙ্গ' প্রদেশের নামকরণ হয় 'পূর্ব পাকিস্তান'। আর তা হয় ১৯৫৫ সালের ৭ জুলাই পাকিস্তানের পাহাড়ি শহর মারীতে। সেদিন পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণ-পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। এ অধিবেশনে পাকিস্তানের সকল প্রদেশের নেতারা সংবিধান সম্পর্কে একটি সমঝোতা-চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই সমঝোতা চুক্তি মারী চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পিছনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী এবং আওয়ামীলীগীয় গণতন্ত্রের মানসপুত্র সোহরাওয়ার্দীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। সেদিন পাকিস্তানের দুই অংশকে একটি ইউনিটে পরিণত করার চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী এক ইউনিটের অধীনে 'পূর্ব পাকিস্তান' এবং 'পশ্চিম পাকিস্তান' নামে দুইটি প্রদেশ গঠন করা হবে। একইসাথে সংখ্যাসাম্য নীতিও গ্রহণ করা হয়, যা প্যারিটি নীতি হিসাবে পরিচিত ছিলো। এছাড়া সায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রভাষা নিয়েও এতে চুক্তি হয়। মারী চুক্তি অনুযায়ী ১৯৫৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের সকল প্রদেশকে এক ইউনিটে পরিণত করে দ্বিতীয় গণপরিষদে একটি বিল পাশ হয়। আর এ চুক্তির মাধ্যমেই মূলত ‘পূর্ব বাংলার’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়। ওপারের সকল প্রদেশ বিলুপ্ত করে একটি মাত্র প্রদেশ গঠিত হয় 'পশ্চিম পাকিস্তান'। এই চুক্তির আলোকেই পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। এই চুক্তিতে পূর্ব বাংলার পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এবং 'বঙ্গবন্ধু' শেখ মুজিবুর রহমান।

Share:

প্রোপাগাণ্ডার শিকার এক বাঙালি নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন


 
প্রোপাগাণ্ডার শিকার এক বাঙালি নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন। শান্ত-শিষ্টতা, নম্রতা আর ধার্মিকতা ছিল যার দুর্বলতা। বাঙালিরে কলিজা কেটে দিয়েও নুন কম হওয়ার পাহাড় সমান অভিযোগ যার বিরুদ্ধে। আজ ১৫ মার্চ। ১৯৪৮ সালের এই দিনে একদল ভাষিক সন্ত্রাসী পূর্ব পাক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শামসুল আলম। আরও ছিলেন এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের গডফাদার কথিত ইসলামপন্থী তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেম। ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী, নঈমুদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ প্রমুখ রাম-বামরা।

কিন্তু এই 'সভায়' খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন একা। তাঁর চিফ সেক্রেটারিকেও সভাকক্ষে উপস্থিত রাখতে পারেননি তিনি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বলা হয়, এদিন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে আট দফা 'চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এর আট দফা দেখেন! রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ অর্থাৎ দুই পক্ষের অপর পক্ষ কী কী করবেন তার কোন হদিস নেই। শুধু প্রধানমন্ত্রী কী করবেন তা-ই বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
আট দফা হলো
 
এক. পূর্ববঙ্গ পরিষদের চলতি অধিবেশনেই বাংলাকে পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা এবং সর্বস্তরের শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
দুই. বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ কেন্দ্রীয় সরকারে পাঠাতে হবে।
তিন. গ্রেফতাররকৃতদের মুক্তি দিতে হবে এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
চার. পুলিশি নির্যাতনের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
পাঁচ. ভাষা আন্দোলনকারীরা দেশপ্রেমিক, এ কথা সরকারিভাবে ঘোষণা দিতে হবে।
ছয়. গ্রেফতারি পরওয়ানা প্রত্যাহার করতে হবে।
সাত. আন্দোলনকারীরা কমিউনিস্ট কিংবা দেশের শত্রু— প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
আট. ‘আন্দোলনকারীরা বর্ডার অতিক্রম করে এসেছে’ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই বক্তব্যটি ভুল— তা সরকারিভাবে বলতে হবে।
 
আট নম্বর দফা মূল প্রস্তাবে ছিল না। বাম তোয়াহা জোর করে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের নিজ হাতে এই দফাটা লিখিয়ে নেয়। এই চুক্তিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের বিপক্ষে সই করে শামসুল আলম। ১৯ মার্চ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এলে ২৪ মার্চ এই সন্ত্রাসীরা তাঁর সাথে দেখা করে। তিনি নাজিমুদ্দিনের সাথে তাদের করা চুক্তি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'তাঁকে (পূর্ব-পাক প্রধানমন্ত্রীকে) uder duress সেটা সই করানো হয়েছে। এর একটা প্রমাণ এই যে, আট দফা চুক্তির মধ্যে শুধু নাজিমুদ্দিন কি করবেন তাই লেখা আছে। কিন্তু অন্য পক্ষের কর্তব্য সম্পর্কে কিছু নেই।’
 
এর পর কমরেড তোয়াহা, অলি আহাদরা কায়েদে আযমের সাথে বেয়াদবি করে। তাঁকে অপসারণের জন্য ব্রিটিশ রাণীর কাছে আবেদন করারও হুমকি দেয়। বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর একটি জমির অধিকার। খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান হলেও বাঙালিকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তিনিই পালন করেছেন। তাঁর বিশেষ উদ্যোগেই ১৯৩৫ সালে ‘বঙ্গীয় ঋণ সালিশি বোর্ড’ বিল এবং ১৯৩৬ সালে ‘বঙ্গীয় পল্লী উন্নয়ন বিল’ পাস হয়। যার সিলসিলায় ১৯৫০ সালে (তিনি তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল) নুরুল আমিন সরকার জমিদার প্রথা উচ্ছেদ করে বাঙালিকে পূর্ব পুরুষের হারানো জমি ফিরিয়ে দেন।
 
 
কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর
 
কায়েদে আযমের একান্ত স্নেহভাজন ছিলেন নাজিমুদ্দিন। বাংলা অঞ্চলে ত্রিশের দশকে মুসলিম লীগকে পুনর্জীবন দেওয়ার কৃতিত্ব তারই।
Share: