দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

ইখওয়ান ও আব্দুল্লাহ আযযাম: জিহাদের দর্শন ও সমাজ গঠন

পশ্চিম তীরের জেনিনের এক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন আব্দুল হাদী। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন মুয়াল্লিম হিসেবেও কাজ করতেন। একদিন মসজিদে বারো বছরের বিনয়ী, ইবাদতের ক্ষেত্রে সচেতন ও নম্র এক ছেলে তার নজর কাড়ে। তার নাম ছিলো আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযযাম। তিনি আযযামকে মুসলিম ব্রাদারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আস্তে আস্তে ব্রাদারহুডের রেভ্যুলিউশনারি সাহিত্য আযযামকে পরিণত করে সত্যিকার রেভ্যুলিউশনারিতে। এর কিছুদিন পরেই মারা যান আব্দুল হাদী। স্মৃতিকাতর আযযাম আব্দুল হাদীর জানাযায় এক হৃদয় বিদারক বক্তব্য দেন। আব্দুল হাদী তার মনে এতোটাই জায়গা করে নিয়েছিলেন যে এর এগারো বছর পরে দামেস্ক ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সের থিসিস তিনি উৎসর্গ করেন আব্দুল হাদীর নামে।
.
আব্দুল্লাহ আযযাম আগাগোড়া ইখওয়ানি ছিলেন। সাইয়্যেদ কুতুব, ইমাম হাসান আল বান্না, উমর তিলমেসানীরা ছিলেন তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তার বইগুলোতে প্রায় সময়েই ইখওয়ানের লিটারেচারগুলো সাইট করেছেন।
.
আব্দুল্লাহ আযযামের আফগানিস্তানের কর্মকান্ড বুঝতে হলে ইখওয়ানের জিহাদের কন্সেপ্টটা বুঝা লাগবে। আমি যদি আপনাকে প্রশ্ন করি জিহাদ আসলে কি? জিহাদ কিসের জন্য? কারা জিহাদ করবে? কেন করবে?
এই প্রশ্নগুলোর হয়তো স্থান কাল পাত্রভেদে বিভিন্ন উত্তর আছে। আ'ম অথবা খাস। জিহাদ মূলত একটা "ইসলামি" সমাজ তৈরি করার প্রচেষ্টা। সেই সমাজকে রক্ষার প্রচেষ্টা। সাইয়্যেদ কুতুব আমাদেরকে বলতেসেন বর্তমান সমাজ জাহেলিয়্যাতে নিমজ্জিত। আমরা যদি এই জাহেলী সমাজ থেকে মুক্ত হতে চাই তাহলে আমাদের নিজেদেরকেও একটা সমাজ বানাতে হবে। এই সমাজটাই হবে "দ্যা সোসাইটি অব ব্রাদার্স"। জিহাদ মূলত হবে এই সমাজটাকে কেন্দ্র করেই।
.
এইজন্য ইখওয়ানি ডিসকোর্সে সমাজ বিনির্মাণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা এলিমেন্ট। ইখওয়ান কি এই ডিস্কোর্স নিজ থেকে তৈরি করেছে? না। বরং আল্লাহর রাসূল (সা) স্বয়ং জিহাদের আগে একটা সমাজ তৈরি করতে চেয়েছেন। মদিনায় হিজরত ছিলো সেই সমাজের গোড়াপত্তন। এরপরের জিহাদ, কিতাল, চুক্তি সবকিছুই হয়েছে সেই সমাজকে কেন্দ্র করে। যারা এই সোসাইটিতে বিলং করে, যারা এই সোসাইটিকে নিজেদের এবং নিজেদেরকে এই সোসাইটির একটা অংশ মনে করে তারাই জিহাদ করবে।
.
ফলে সোসাইটি তৈরির প্রক্রিয়া ইখওয়ানি ডিস্কোর্সের আরেকটা কন্টেস্টেড এবং গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট। কোন প্রক্রিয়ায় একটা সোসাইটি তৈরি হবে, সেই সোসাইটির ব্যক্তিকতা, জেন্ডার রুলস, শিক্ষাব্যবস্থা, বিভিন্ন এন্টিটির মিথস্ক্রিয়া কিভাবে হবে এইসব বুঝাপড়া নিয়ে ইখওয়ানের বিভিন্ন ফ্যাকশনের কনফ্লিক্টিং পজিশন নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। তবে যেকোন সোসাইটি বিনির্মাণের অংশ হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবা ইখওয়ানি এন্ডেভ্যর এর অংশ।
.
এখন জিহাদের জন্য একটা সোসাইটি দরকার- এতটুকু যদি আপনি পারসিভ করতে পারেন তাহলে আমি দুইটা উদাহরণ দিবো।
প্রথম উদাহরণটা হচ্ছে ফিলিস্তিনের হা ম। (স র। ১৯৬৭ এর যুদ্ধে পরাজয়ের পর আরব রাষ্ট্রগুলো মিলিটারিলি ইসরাইলকে পরাজিত করার আশা প্রায় ছেড়ে দেয়। ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আগ্রাসন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বামপন্থী পিএলওর অবস্থানও নড়বড়ে হতে থাকে। ১৯৭৯ এর ইরান বিপ্লব ইসলামী দুনিয়াকে নাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে ইখওয়ানিদের একটা গ্রুপ নতুন সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করতে চাইলে শায়খ আহমেদ ইসমাইল ইয়াসিন সহ ইখওয়ানের ওল্ডগার্ডরা তাতে সায় দেননি। এতে ওল্ডগার্ডদের প্রতি নাখোশ হয়ে তারা ইখওয়ান থেকে বের হয়ে ১৯৮১ সালে নতুন সশস্ত্র দল তৈরি করে। সেই সশস্ত্র দল হচ্ছে প্যালেস্টানিয়ান ইসলামিক জিহাদ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আহমেদ ইয়াসিনের মতো মানুষ কেন তখন সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করার জন্য সায় দেননি? তিনি কি তবে জিহাদের বিরোধী ছিলেন?
আহমেদ ইয়াসিন খুব ভালো করেই জানতেন যেদিন থেকে মিলিটারি ভ্যানগার্ডের কার্যক্রম শুরু হবে সেদিন থেকেই ইসরাইলের সাথে প্রকাশ্য সংঘাত তৈরি হবে। তিনি বরং মিলিটারি স্ট্রাগল শুরু করার আগে এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে সশস্ত্র লড়াই বহু বছর চালিয়ে যেতে হবে। তাই তিনি গাজার প্রত্যেকটা অঞ্চলেই মসজিদ বানিয়েছেন, হাসপাতাল তৈরি করেছেন, ইসলামী ইউনিভার্সিটি অফ গাযা বানিয়েছেন। আজকের যেসব হা ma স নেতার নামে গণজোয়ার উঠে তারা সবাই ইসলামিক ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট, এইসব ফেসিলিটির আউটপুট। ইসলামিক জিহাদ তৈরির প্রায় আটবছর পরে ১৯৮৮ সালে হাম।স প্রতিষ্ঠিত হয় যখন হ।ম।সের জিহাদ করার মতো সকল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হয়। আজকে "ইসলামিক জিহাদ" তো বটেই পুরো গাজার সাধারণ মানুষ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের ফুয়েল এই ইনফ্রাস্ট্রাকচারগুলোই। অথচ আহমেদ ইয়াসিন যদি ঐসময়ে ইখওয়ানের একটা গ্রুপের কথায় প্রভাবিত হয়ে জিহাদ শুরু করতেন তাহলে হয়তো ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন আজকের দিনে এসেও বামপন্থীদের হাতে থাকতো।
.
তো যা বলতেসিলাম, থিওলজিক্যাল, মেটাফিজিক্যাল ও স্ট্রাকচারাল লেভেলে সোসাইটি কন্সট্রাক্ট করা জিহাদের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শায়েখ আহমেদ ইসমাইল ইয়াসিন ফিলিস্তিনে যে কাজ করেছেন আব্দুল্লাহ আযযামও আফগানিস্তানে একই কাজ করেছেন। আযযামের স্ত্রী আরব মুজাহিদীনদের সন্তানদের জন্য স্কুল চালাতেন। আযযাম নিজেও হিউম্যানিটারিয়ান এইড পৌছানোর পাশাপাশি মুজাহিদীনদের শিক্ষার জন্য আলাদা ইনিসিয়েটিভ নিয়েছেন। আফগানে যুদ্ধ করাতে আসা আরবদের জন্য একটা সফিস্টিকেটেড সোসাইটি তৈরির চেষ্টা করেছেন। আফগানিস্তানে একটা সাস্টেইনেবল সোসাইটি তৈরির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আযযাম কোন চমক লাগানো উদ্দেশ্য হাসিল বা এটেনশন সিকিং এক্টিভিটিজে বিশ্বাস করতেন না এবং এগুলো এন্টারটেইন করতেন না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিশরে যখন আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের সদস্যরা তখন আযযাম এই ধরণের কোন কার্যক্রমকেই সমর্থন করেন নি। এমনকি আযযামের লেখালেখিতেও জুহাইমান আল ওতায়বীর সিজ অফ কাবা কিংবা খালিদ ইস্লাম্বুলীর সাদাত হত্যাকান্ড কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারেনি। বরং আযযামের লেখালেখির অন্যতম বিষয়বস্তু ছিলো ইখওয়ান।
.
কিন্তু ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ বা এইদলের যারা পরবর্তীতে আল কা(য়দায় যোগদান করে তাদের কাছে সাদাত হত্যার মতো এটেনশন সিকিং বা চমক সৃষ্টিকারী ইভেন্ট তৈরি করতে পারাটা ছিলো প্রশংসনীয়। সাদাত হত্যাকান্ডের মূল প্রোটাগনিস্ট খালেদ আল ইসলাম্বুলী তাদের কাছে সেই সম্মান পেতো যে সম্মান আজকের বিজেপির কাছে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে পায়। এইধরণের ঘটনাকে তারা সেলিব্রেট করতো। এন্টারটেইন করতো। খালেদ আল ইস্লাম্বুলীর নামে তাদের একটা ব্রিগেডও ছিলো। কন্সিকুয়েন্স বিবেচনা না করে হেডলাইনে আসতে পারাটাই ছিলো তাদের কাছে সফলতা। নো নিড টু সে যে এই গ্রুপটাই ৯/১১ ঘটিয়েছিলো।
.
ইখওয়ানের এই সোসাইটি সেন্ট্রিক জিহাদের জন্যই আফগান জিহাদ বা আজকের ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন সারা পৃথিবীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পেরেছিলো। আব্দুল্লাহ আযযাম কখনো তোরাবোরায় বসে ব্রিফিং করেন নাই। বরং তিনি মক্কা থেকে নিউইয়র্ক, লন্ডন থেকে কাসাব্লাংকা পর্যন্ত বক্তব্য দিয়ে বেড়াতেন, ভলেন্টিয়ার রিক্রুট করতেন। খোদ আমেরিকাতেই আযযামের মাকতাব আল খিদমাতের মোট ৫২টি শাখা ছিলো। আযযাম কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না, অথবা ছিলেন না কোন সো কল্ড গুরাবা। আযযাম মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ পরিহার করে আফগানিস্তানে একটা ইন্সক্লুসিভ সোসাইটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
.
আপনি সোসাইটি ছাড়া নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত কিছুই করতে পারবেন না। "উম্মাহ" ধারণা ইসলামের খুবই সিগনিফিক্যান্ট একটা আইডিয়া যা সমাজ তৈরি করে। মক্কার সমাজ আর মদিনার সমাজ যেমন একই রকম ছিলো না তেমনি আজকের মিশরের সমাজ আর ফ্রান্সের সমাজও সেইম না। আপনি কোন সমাজে বিলং করেন সেইটার উপর ভিত্তি করে আপনার একশন নির্ধারিত হবে। যেকোন এটেনশন সিকিং বা মনযোগকামী কর্মকান্ড করার আগে ভাবা উচিত এর কন্সিকুয়েন্স কি আপনার "সোসাইটি" তৈরি করতে বাধা দিবে নাকি ভূমিকা রাখবে।
.
এখন অনেক তাকফিরী গ্রুপ বিশ্বাস করে আমাদের সবাইকে গুরাবা হতে হবে। আমাদেরকে কেউ চিনবেনা। এই জাহেল সোসাইটিতে আমাদের কোন কিছু কন্ট্রিবিউট করার নাই। এই সোসাইটিতে আমরা তো বিলংই করি না। সিস্টেমের বাইরে থেকে আমরা সিস্টেমের উপর হামলা চালাবো। স্লিপার সেল তৈরি করবো। আর যারাই নতুন সোসাইটি তৈরি করতে চাইবে তারাই আমাদের শত্রু। কারণ নতুন আরেকটা সোসাইটি তো জাহেলি সোসাইটিই হবে। মুখে মুখে কুতুবিস্ট দাবী করা তাকফিরী ইডিওলগদের বেধে দেয়া এই হাইপার ইন্ডিভিজ্যুয়াল সোসাইটির বিরুদ্ধে যারাই একটা নতুন সমাজ তৈরি করতে চেষ্টা করবে তারাই হবে জিহাদের শত্রু, গণতন্ত্রকামী মডারেট।
Share:

মুস্তাফা সালাবি: আযযামের লেগ্যাসি ধ্বংসের পথে আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায়

আব্দুল্লাহ আয যামের শাহাদাতের পর জিহাদী হিস্ট্রির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্র্যাজেডি হচ্ছে মুস্তাফা সালাবির শাহাদাত।

.
আব্দুল্লাহ আযযামের শাহাদাতের পরেও মাকতাব আল খেদমাত কয়েকটা মহাদেশে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ফলে আযযামের শাহাদাতের পরে একটা গোষ্ঠী জিহাদের অথরিটি নিজেদের হাতে নিতে চাইলে এপথে একমাত্র শত্রু হয়ে দাঁড়ায় আযযামের প্রতিষ্ঠা করা আফগান জিহাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মাকতাব আল খেদমাত। মাকতাব আল খিদমাতের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
.
মাকতাব আল খেদমাতের কর্মকান্ডের অন্যতন প্রধান কেন্দ্র ছিলো ইউএসএ। আযযাম প্রতি বছরেই ইউএস যেতেন আফগান জিহাদের বার্তা পৃথিবীর কাছে পৌছানোর জন্য। কোন সফরে আযযাম নিজে যেতে না পারলে তামীম আল আদনানীকে পাঠাতেন। আযযামের শাহাদাতের পর ইউএসএতে এই প্রতিষ্ঠানের দেখাশোনার দায়িত্বভার পরে মুস্তাফা সালাবির উপর।
.
১৯৯০ সালে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের সাথে এফিলিয়েটেড শায়েখ ওমর আব্দুর রহমান (চোখ অন্ধ থাকায় তিনি পরবর্তীতে ব্লাইন্ড শায়েখ নামে খ্যাতি লাভ করেন) নিউইয়র্কে বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন আযহারাইট। যদিও তিনি আব্দুল্লাহ আযযামের বিরোধীতা করতেন তবে একজন আযহারাইট মানবেতর জীবন যাপন করবেন সেটা আযযাম মেনে নিতে পারেন নি। আযযামের জীবদ্দশাতেই মাকতাব আল খেদমাত থেকে তার জন্য এলাওয়েন্স বরাদ্দ ছিলো।
.
যখন তিনি নিউইয়র্কে মুভ করেন তখনো তার এপার্টমেন্ট, টেলিফোন, কার ও ড্রাইভারের সকল ব্যয় বহন করে মাকতাব আল খিদমাত। কিন্তু ব্লাইন্ড শায়েখ চেয়েছিলেন আব্দুল্লাহ আযযামের এই সংগঠনকে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের জন্য উন্মুক্ত করে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে। কিন্তু মুস্তাফা সালাবী এতে রাজি হননি। এর কিছুদিন পরেই ব্লাইন্ড শায়েখ মুসতাফা সালাবীকে "অসৎ" আখ্যা দেন এবং মুস্তাফা সালাবীকে সমাজচ্যুত করার আহবান জানান।
.
মুস্তাফা সালাবী আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে তার স্ত্রীকে মিশর পাঠিয়ে দেন এবং তিনি নিজেও আফগানিস্তানে চলে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। কিন্তু নিউইয়র্কের এয়ারপোর্টে ব্লাইন্ড শায়েখের প্রতি অনুগতরা তাকে হত্যা করে। বলাই বাহুল্য, মুস্তাফা সালাবির মৃত্যুর পর ইউএসএতে মাকতাব আল খেদমাতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়।
.
মুস্তাফা সালাবির মৃত্যু একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিলো না, ছিলো শত শত মুজাহিদীনদের রক্ত দিয়ে তৈরি করা এক সংগঠনের মৃত্যু। যারা আযযামের জীবদ্দশায় পেশওয়ারে বসে কুৎসা রটাতো তারাই আযযামের মৃত্যুর পর তার সংগঠনকে ধ্বংসের জন্য একে একে জিহাদের মাস্টারমাইন্ডদেরকে খুজে খুজে হত্যা করেছে। আজকে এরা নিজেদের লেজিটিমেসির জন্য আযযামকে পূজা করে। আযযামের প্রিয়জনদের হত্যা করা তারাই নাকি আযযামের লেগ্যাসির ধারক ও বাহক।

Share:

সোভিয়েত আফগান জিহাদে পেশওয়ার: মুজাহিদীনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও তাকফিরী প্রভাব

সোভিয়েত আফগান জিহাদের শেষদিকে পেশওয়ারে কি হতো সেটা নিয়ে জিহাদী লিটারেচারগুলোতে অল্প বিস্তর আলোচনা আছে। ১৯৮৮, ১৯৮৯ সালের পেশওয়ার খুবই ঘটনা বহুল এবং ঐ সময়ের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা আরো স্পষ্টভাবে আযযাম ও তাকফিরি গ্রুপগুলোর পার্থক্য বুঝতে পারবো।

.
সোভিয়েত আফগান জিহাদে পেশোয়ার ছিলো মুজাহিদীনদের হাব। আফগান জিহাদে মুজাহিদীনদের অন্তত আটটি বড় গ্রুপ ছিলো। এই গ্রুপগুলোর প্রত্যেকটারই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে শক্ত উপস্থিতি ছিলো। এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক ওয়ারলর্ডরা ছিলো। আহমেদ শাহ মাসউদ ছাড়া বাকি সকল মুজাহিদীন গ্রুপগুলো পেশওয়ারে বসেই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো।
.
এই মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিলো প্রকট। জিহাদের জন্য আসা অর্থ কিভাবে বন্টন হবে, পেশওয়ারে কে কোথায় থাকবে, আফগানে কোথায় কোন গ্রুপ অপারেশন চালাবে এইগুলো নিয়ে মতপার্থক্য ছিলো নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। মুজাহিদীন গ্রুপগুলো শুধুমাত্র সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়াই করতোনা বরং আধিপত্য বিস্তারে তারা অন্য মুজাহিদীন গ্রুপের সাথেও লড়াই করতো।
.
মুজাহিদীনদের এই অন্তর্ঘাতী লড়াই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তো ছিলই, পাশাপাশি পেশওয়ারেও ছড়িয়ে পড়ে। ঐসময়ের সবচেয়ে ফরমিডেবল মুজাহিদীন কমান্ডার হেকমতিয়ারের বাহিনীর হাতে পেশওয়ারেই খুন হন প্রতিপক্ষ দলের কয়েকজন মুজাহিদীন। পেশওয়ারের মাটিতে এইসব খুনোখুনি কোনভাবেই পাকিস্তান পছন্দ করতোনা। আব্দুল্লাহ আযযাম নিজেও মুজাহিদীন ফ্যাকশনের নেগোসিয়েশনের জন্য বার বার চেষ্টা করতেন। যেহেতু আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে পাকিস্তান সরকার ও পেশওয়ারের মুজাহিদীন গ্রুপগুলোর সম্পর্ক ছিলো তাই এইসব ঘটনার জন্য আব্দুল্লাহ আযযামের উপর চাপ বাড়াতে থাকে পাকিস্তান সরকার।
.
পেশওয়ারের মুজাহিদীনদের কালচার ছিলো খুবই অনৈসলামিক। কোন মুজাহিদীন গ্রুপ যদি অন্য কোন মুজাহিদীন গ্রুপের কাউকে হত্যা করতে চাইতো তাহলে প্রথমেই তাকে সুযোগ বুঝে সৌদি সরকারের এজেন্ট বা ইরানিয়ান এজেন্ট হিসেবে ট্যাগ দেয়া হতো। এরপর তার ডিফেইমেশন এমনভাবে করা হতো যাতে এই প্রপাগান্ডা পেশওয়ারে থাকা ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের (সংক্ষেপে ইআইজি) গেস্টহাউজে পৌছায়। যেহেতু ইআইজি সৌদি সরকারসহ সকল মুসলিম দেশের শাসকদের মুরতাদ মনে করে তাই কোন মুজাহিদ এইসব সরকারের হয়ে কাজ করে শুধুমাত্র এই তথ্যই ঐ মুজাহিদকে হত্যার জন্য যথেষ্ট ছিলো। ফলে পেশওয়ারে থাকা ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের অনেকেই আফগানিস্তানে লড়াই না করে পেশওয়ারে বিভিন্ন মুজাহিদীন গ্রুপের ক্রীড়নক হয়ে অপর পক্ষের মুজাহিদীনদের হত্যা করতো। আর এ কারণেই পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতি বিরক্ত হয়ে ওঠে।
.
পেশওয়ারে মুজাহিদীনদের এই লড়াইয়ের কারণে আযযাম নিজেও চাপে পড়তেন। জিহাদের শেষদিকে অবস্থা এমন হয় যে পাকিস্তানের আইএসআই আযযামকে হান্ট করা শুরু করে। এর কিছুদিন পরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিখ্যাত জয়নাব আল গাজালী পাকিস্তান সফরে গেলে সেখানে তিনি আযযামকে হেনস্থা না করতে জিয়াউল হককে অনুরোধ করেন। জিয়াউল হক জয়নাব আল গাজালীর প্রতি খুবই শ্রদ্ধা রাখতেন মিশরের জেলে তার লৌহদৃঢ় ভূমিকার কারণে। ফলে আযযামকে হেনস্থা বন্ধ করে পাকিস্থান প্রশাসন।
.
দেখুন, পেশওয়ারে থাকা তাকফিরী দলের সদস্যরা বার বার জিহাদকে বিপদে ফেলেছে। তারা আরব মুজাহিদীনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব উস্কে দিতো। যেহেতু আরবরা সালাফি ছিলো তারা পেশওয়ারে বসে ফতোয়াবাজি করতো- "আফগানিস্তানের জিহাদ সহীহ জিহাদ না। আফগানরা শিরকে লিপ্ত।" এমনকি আল কা(য়দার ইডিওলগ আবু মুহাম্মদ আল মাকদিসি আব্দুল্লাহ আযযামকে ঘৃণা করতো কারণ আযযাম নাকি আফগানিস্তানে শিরকের বিস্তার রোধ করতে অনিচ্ছুক।
.
আব্দুল্লাহ আযযামের শাহাদাতের আগেও তার রক্ত হালাল করার জন্য একটা গ্রুপ পেশওয়ারে প্রচারণ চালায় আযযাম সৌদি আরবের দালাল। অথচ আযযাম জিহাদের শেষদিকে সৌদিতে গিয়ে বক্তব্য দিতে পারতেন না। পেশওয়ারের তাকফিরীরা অন্য মুজাহিদীনদের হত্যার আগে যেভাবে ট্যাগিং করতো আযযামের মৃত্যুর আগেও তারা আযযামকে ঐভাবে ট্যাগিং করেছে। এইজন্য অনেকেই সন্দেহ করে যে আযযামের শাহাদাতের পিছনে এই তাকফিরী গোষ্ঠীদের হাত ছিলো।
.
যদিও জিহাদী লিটারেচার এনালাইস করলে বুঝা যায় আযযামকে হত্যার ঘটনায় হয়তো তাকফিরীদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা কম তবে ১৯৮৯ সালে শাহাদাতের মাত্র একুশ দিন পূর্বেও আযযাম পেশওয়ারের যে মসজিদে খুতবা দিতেন সেই মসজিদের মিম্বারের নিচে বোমা পাওয়া গিয়েছিলো। ভাগ্যক্রমে মসজিদের এক খাদেম সেই বোমার সন্ধান পাওয়ায় সে যাত্রায় বেচে যান আযযাম। জিহাদী লিটারেচার মতে ঐ বোমা মসজিদের মিম্বারের নিচে পেশওয়ারের কোন তাকফিরী গ্রুপই রেখেছিলো সে সম্ভাবনা প্রবল।
Share:

দ্য ট্রায়াল অফ আব্দুল্লাহ আযযাম

 


আফগান জিহাদের ডাইভারসিটির কারণে মুজাহিদীনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে থাকলেও পেশওয়ারের আরব যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘাতের কারণ খুবই সিগনিফিক্যান্ট। আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে পেশওয়ারে থাকা কিছু আরবের দ্বন্দ্বের কারণ হিসেবে প্রধানত দুইটি ঘটনা দায়ী। এই সংঘাতের সুচনা হয় আহমেদ শাহ মাসউদকে কেন্দ্র করে। আর এই সংঘাত আরো প্রকট হয় তাহাদ্দি প্রজেক্ট কেলেংকারীতে।

.
আব্দুল্লাহ আযযাম মূলত আফগানিস্তানে আরব মুজাহিদীনদের জন্য ফান্ডরাইজ করতেন। এমনি একটা ফান্ডরাইজ প্রজেক্ট ছিলো তাহাদ্দি। এই প্রজেক্টে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন আব্দুল্লাহ আযযাম, তার একান্ত সহযোগী ওয়ায়েল জুলাইদান ও ইজিপশিয়ান কানাডিয়ান আহমেদ সাইদ খাদর। এই প্রজেক্টের মূল দায়িত্বে ছিলেন আহমেদ সাইদ খাদর। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য অফিস, টেলিফোন ও যাবতীয় খরচ বহন করেছিলেন আব্দুল্লাহ আযযাম। প্রজেক্টের ফান্ডরাইজিংয়ের জন্য খাদর আযযামের নিকট একটি এন্ডোর্সমেন্ট লেটার চাইলে আযযাম তার স্বাক্ষরিত একটি এন্ডোর্সমেন্ট লেটার দেন।
.
কিন্তু খাদরের ক্রমাগত মিস ম্যানেজমেন্টের জন্য বিদেশী দাতা সংস্থাগুলো এই প্রজেক্টে ফান্ডিং বন্ধ করে দেয়। প্রজেক্টের ব্যর্থতা ঠেকানোর জন্য আব্দুল্লাহ আযযাম ও জুলাইদান ম্যানেজেরিয়াল লেভেলে হস্তক্ষেপ শুরু করেন। এর মধ্যে জুলাইদান একটি প্রজেক্ট পেপার তৈরি করে খাদরকে দেন স্বাক্ষরের জন্য। পেপারে উল্লেখ ছিলো, স্টিয়ারিং কমিটি চাইলে এডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটিকে পরিবর্তন করতে পারবে। খাদর পুরো পেপার না পড়েই স্বাক্ষর করেন।
.
এর কিছুদিন পর স্টিয়ারিং কমিটির আব্দুল্লাহ আযযাম নিজেই তাহাদ্দি প্রজেক্টের পুরো দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন এবং খাদরের পদত্যাগ দাবি করেন। খাদর দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং কানাডায় চলে যান।
.
আব্দুল্লাহ আযযাম ও জুলাইদান নিশ্চিত হন খাদর কানাডায় গিয়ে প্রজেক্টের রিসোর্সের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছেন। আব্দুল্লাহ আযযামের অনুগত কয়েকজন পেশওয়ারে খাদরের অফিস তল্লাসি করে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট জব্দ করে ও প্রজেক্টের সকল সম্পদ সৌদি রেড ক্রিসেন্টের ওয়্যারহাউজে জমা দেয়। আযযামের অনুগতরা দাবি করে তারা খাদরের অফিস থেকে এমন নথি উদ্ধার করেছে যা থেকে স্পষ্টত বুঝা যায় খাদর এই প্রজেক্ট দখলের চেষ্টা করেছেন। তারা খাদরকে বহিষ্কারের একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করে তাহাদ্দি প্রজেক্টের সকল দাতাকে ফ্যাক্স করে।
.
এই ঘটনার কয়েকমাস পরেই খাদর পুনরায় পেশওয়ারে ফিরে আসেন। তাহাদ্দি প্রজেক্টের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রভাবশালী আব্দুল্লাহ আযযামের মোকাবেলায় তিনি পেশওয়ারের আরব- যারা আযযামকে অপছন্দ করতো তাদেরকে মোবিলাইজ করেন। তিনি সকল আফগান মুজাহিদীন নেতাদেরকে এপ্রোচ করেন এবং আযযামের সাথে সংঘাতের ব্যাপারে বিচারের আয়োজন করার অনুরোধ করেন।
.
১৯৮৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই বিচার অনুষ্ঠিত হয় যদিও আযযাম সেদিন সশরীরে হাজির ছিলেন না। জিহাদি লিটারেচারে এই বিচার "ট্রায়াল অফ আযযাম" নামে পরিচিত।
.
বিচারের ফলাফল কি হয়েছিলো সেটা নিয়ে যথেষ্ট ধোয়াশা আছে। বিভিন্ন জিহাদী লিটারেচারের বিবরণ অনুযারী বিচারকরা আব্দুল্লাহ আযযামের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন এবং খাদরের সকল সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আযযাম ও জুলাইদানকে আহবান জানিয়েছিলেন। একই সাথে খাদরকে তাহাদ্দি প্রজেক্টে পুনর্বহাল ও এর প্রজ্ঞাপন সকল ডোনারকে ফ্যাক্স করার জন্য বলা হয়।
.
বিচারের পর আযযাম ও জুলাইদান খাদরের সম্পদ ফিরিয়ে দিলেও তার মানহানি বা অফিস ভাঙ্গার জন্য কোন ক্ষতিপূরণ দেননি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আফগান জিহাদ থেকে বিরত থাকা পেশওয়ারের কিছু আরব আযযামের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুরু করে। এই প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের মূল নেতা ছিলেন ফাদল ও আয়মান আল জাওয়াহিরি।
.
ফাদল তার বইতে পরবর্তীতে এই ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে লিখেন- "আল্লাহর ইচ্ছায় আমি বিখ্যাত দায়ীদের মধ্যস্থতাকারী হয়েছিলাম। অতপর যখন সত্য উদ্ভাসিত হলো তখন তারা [আব্দুল্লাহ আযযাম ও ওয়ায়েল জুলাইদান] সত্য থেকে পালালো।"
.
২০০৮ সালে প্রকাশিত আয়মান আল জাওয়াহিরির বইয়েও এই ঘটনা উল্লেখ আছে। তবে জাওয়াহিরি ফাদলের সাথে আযযামের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন চালালেও তার বইয়ে তিনি ফাদলের সাথে দ্বিমত করেন এবং আযযামকে বেনিফিট অফ ডাউট দেন।
.
তাহাদ্দি প্রজেক্ট কেলেংকারির বহুবছর পরে প্রকাশিত জাওয়াহিরির বইয়ে তিনি ফাদলের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন আযযামের বিরুদ্ধে ফাদলের সহযোগি। এই ঘটনায় জাওয়াহিরির অবস্থান পরবর্তীতে আরো স্পষ্ট হয় জাওয়াহিরির প্রতি লেখা বিন লাদেনের এক চিঠিতে যেখান লাদেন জাওয়াহিরিকে আযযামের নিন্দাবাদ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। ফলে এটা প্রমাণিত হয় যে, জাওয়াহিরি বাস্তবে ফাদলের সাথে মিলে আযযামের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ছড়ালেও তার বইয়ে তিনি পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকতে চেয়েছেন।
Share:

একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ২

১৫. "যতটুকু মনে পড়ে কলকাতার সাধারণ মুসলমানরা আমাদের ভালভাবে নেয়নি৷ তারা আমাদের থেকে নিজেদের একটু দূরে সরিয়ে রাখত। কথা বলতে চাইত না। কফি হাউজে মুসলমান লেখকদের দুএকজনের সাথে দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিত। আমার কাছে বিষয়টা অস্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু পরে যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখেছি তাদের কাছে পাকিস্তান ছিল আশা-ভরসা ও অহংকারের কেন্দ্রভূমি। আমরা সে পাকিস্তান ভেঙে ফেলার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছি এটা তাদের কাছে মনে হয়েছে দুঃস্বপ্ন। আমি আমার 'উপমহাদেশে' বইয়ে এর কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি। একজন সামান্য মুসলমান পানের দোকানদার আমাদের কাছে খুশি মনে এক খিলি পানও বিক্রি করতে চাইত না। যদি বুঝতে পারত আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছি। সোজা বলে দিত আগে যাইয়ে। আমাদের প্রতি এ অবজ্ঞার ভাব লক্ষ্য করে আমি সাধারণত কলকাতার কোন মুসলিম দোকানে কোনো কিছু কিনতে যেতাম না।" — আল মাহমুদ


১৬। "পশ্চিম পাশে এসে আমি চমকে উঠলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল মসজিদ। এখন শূন্য। আমি মাঠ দৌড়িয়ে সেই মসজিদে পৌঁছলাম। দেখলাম কিছু লোক দীর্ঘক্ষণ সেজদায় পড়ে রয়েছে। কৌতূহলে এগিয়ে যেতেই জনৈক ব্যক্তি দৌঁড়ে এসে বললো, 'মসজিদ! ইয়ে মসজিদ হ্যায় ভাই রোখ যাও।'
আমি জবাব দিলাম, 'ম্যায় হু মুসলমান, ভাই সাব।'
সে চমকে দাঁড়ালো। তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, 'সাচ্চা মুসলিম হ্যায়? কোন মুলুক সে আয়া?'
আমি বললাম, 'বাংলাদেশ।'
সে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললো, 'ও, মাশরেকী পাকিস্তানী? মিল্লাত কি গাদ্দার! ভাগো ইহাসে। ভাগো।'
আমি অবাক হইনি। লক্ষ্ণৌ, বেনারস, দিল্লী, পাটনা, জম্মু, কাশ্মীর, ধানবাদ, আগ্রা, অমৃতসর- যেখানেই আমি মুসলমানদের সাথে আলাপ করেছি, তারা আমায়
গাদ্দার বলে ভর্ৎসনা করেছে। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিলো হাজার বছরের স্বপ্নের ইমারত; তাদের দিল ছিলো সেই ইমারতের কল্যাণ কামনায় পূর্ণ । বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তাই তারা মনে করে ফ্যান্টাসীর মৃত্যু অথবা আমাদের ঈমানী দুর্বলতা। আমি তাদের যতই বুঝাতে চেষ্টা করি, তারা ততই প্রতিবাদে টগবগ করে ওঠে। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের অপমানকে সহ্য করে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম।" — বুলবুল সরওয়ার, ঝিলাম নদীর দেশে।
 
১৭। মেহেরপুরের আমবাগান: মিথ থেকে বাস্তবে
মেহেরপুরে আমবাগান ঘেরা একটা গ্রাম 'আমঝুপি'। অভিশপ্ত বৈদ্যনাথতলা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটারের দূরত্বে। পলাশী থেকে সোজা দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। বলা হয়, এই আমঝুপি গ্রাম মোঘল সেনাপতি মানসিংহ ও নবাব আলীবর্দী খানের স্মৃতি বিজড়িত। তবে এসবকে ছাপিয়ে একটি তথ্য প্রচলিত আছে যে, পলাশীর যুদ্ধের সর্বশেষ নীলনকশা এই আমঝুপিতেই চূড়ান্ত হয়। জনশ্রুতি আছে, এখানে অনুষ্ঠিত হয় লর্ড ক্লাইভ এবং বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও অন্যান্যের সর্বশেষ ষড়যন্ত্র সভা। যার পরিণতি পলাশীর নাট্যমঞ্চে রূপায়িত হয়। যদিও এর সত্যতা ঐতিহাসিকরা জোরালোভাবে স্বীকার করতে পারেন না। তাদের প্রবণতা এটিকে উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষেই।
 
কিন্তু সেই পলাশী ষড়যন্ত্রের ২১৩ বছর পরে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে বৈদ্যনাথতলা গ্রামে এই মিথ সত্যে উপনীত হয়। ১৯৬২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলা গমনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়, ১৯৬৭ সালে বিদ্রোহের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং একাত্তরের মার্চের শেষ সপ্তাহে পুনরায় বিদ্রোহের যে ষড়যন্ত্র রচিত হয়, তার প্রত্যেকটিই নাকাম হয় সরকার ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে।
 
তবে তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলে উঠে দেশের অভ্যন্তরে থেকেই বাঙালি রেজিমেন্টের সৈন্যরা বিদ্রোহ করলেও তাদের সহযোগী ও যুদ্ধ পরিস্থিতির স্রষ্টা আওয়ামীলীগ নেতারা শেখ মুজিবের নির্দেশে নিরাপদে কোলকাতায় আশ্রয় নেন। কোলকাতার ভবানীপুরের রাজেন্দ্রপ্রসাদ রোডের ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর দপ্তর ও লর্ড সিনহা রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে প্রবাসী বাংলাদেশী সরকারের দপ্তরে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পর্ব শেষ হয়। যা ঘোষিত হয় ১০ এপ্রিল। আর ১৭ এপ্রিল তারই প্রকাশ্য অনুষ্ঠান ছিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম বাগান।
 
ভারতবন্ধুরা প্রথমে এই শপথ অনুষ্ঠান চুয়াডাঙ্গায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পাকিস্তান আর্মির কারণে চুয়াডাঙ্গায় এই অনুষ্ঠান সফল হয়নি। হয়েছে আমঝুপির কাছে। ১৮০০—১৮১৫ সালের দিকে এই আমঝুপিতে একটি নীলকুঠি নির্মিত হয়। বাংলার কৃষকদের প্রতি অত্যাচারের জন্য এই কুঠি কুখ্যাত হয়েছিল। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৭২ সালে অন্যতম ষড়যন্ত্রী তাজ উদ্দীন এই কুঠি পরিদর্শন করেন। 'আমঝুপি' নামের স্বার্থকতা রক্ষায় কুঠির আশেপাশে রোপন করেন প্রচুর আম গাছ। আসলে ইতিহাসেরও তো দায় আছে!

১৮। ৬৫’র সাফল্য একাত্তর ত্বরান্বিত করেছে
১৯৬৫ সালের ৫ আগস্ট থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় কাশ্মির যুদ্ধ। সম্ভবত পয়লা পদক্ষেপ পাকিস্তানই নিছিল, যেমনটা বলা হয় সব মহলেই। আইয়ুব খান কাশ্মির ইস্যুর একটা স্থায়ী সমাধান চাইছিলেন। হয়তো হঠকারিতাই ছিল সেটা। কিন্তু ভারত এই যুদ্ধটা কাশ্মির ফ্রন্টে খেলতে রাজি ছিল না। এটারে টেনে নিয়ে আসছিল পাঞ্জাবে। ৬ সেপ্টেম্বর ভারত লাহোর আর শিয়ালকোট আক্রমণ করে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই আক্রমণ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে। যার দরুণ বেশ কয়েকজন বাঙালি ফৌজি সিতারায়ে জুররাত ও তমঘায়ে জুররাত হাসিল করে। ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত-পাকিস্তান উভয়েই যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। পরে তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই যুদ্ধে দৃশ্যমান কোন পক্ষেরই বিজয় হয়নি। উভয়েরই ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। তবে সবার দৃষ্টি কাড়ে লাহোর প্রতিরক্ষা। এর আগ পর্যন্ত, ব্রিটিশ আমল থেকেই বাঙালিরা 'নন মার্শাল রেস' (অযোদ্ধা জাতি) হিসাবে বিবেচিত হতো। কারণ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না। এবার বাঙালি সিপাহিরাও দেখাতে পারল যে তারাও যুদ্ধ জানে, এমনকি ভয়ঙ্কর শত্রুরেও ভালোমতোই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতেও পারে। পরের বছর আবার সাইফুল আজম পাকিস্তানের হয়ে আরেক খেলা খেলছিলেন ইসরাইলে!
 
যুদ্ধে ভারতের সাফল্য ছিল কাশ্মীর হাতছাড়া হয়নি, পাকিস্তানের সাফল্য লাহোর হাতছাড়া হয়নি। পাকিস্তান এমনিতেই মাথা ব্যথা ছিলই, কিন্তু এই যুদ্ধ ভারতকে ভাবিয়ে তোলে মুসলমান আর ইসলামী আদর্শের বাঙালি ফৌজ নিয়া যা তার শরীরের এক কর্নারে বিষফোঁড়ার মতো। ভারত ইস্টার্ন ফ্রন্টে মনোযোগী হয়। এইটারে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে গঠন করে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং - র, ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। যা গঠনের মাত্র দুই বছরের মাথায় এনে দেয় চূড়ান্ত সফলতা। ইন্দিরা গান্ধীর ভাষায় - “We have taken the revenge of a thousand years.” অবশ্য র’ গঠনের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল চীন ও পাকিস্তানের উপর গোয়েন্দাগিরি। ভারত হাজার বছরের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়।
 
গত বছর ভারতের সাউদার্ন নেভাল কমান্ডের ফ্ল্যাগ অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ ভাইস অ্যাডমিরাল অনিল কুমার চাওলা এই যুদ্ধরে স্মরণ করে বলছিলেন, "It was mentioned that the war did not really start in December (1971). Actually, if you really go back into the literature and read, the thinking started actively after the 1965 war, on how to separate East Pakistan from West Pakistan."
 
ছয় দফা প্রস্তাব মানুষের সমর্থন আদায়ে এই যুদ্ধের একটা ভুল ভালো কাজে দিছিলো। ছয় দফার প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত দফা (৬. পাকিস্তানের দুই অংশের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্ব স্ব আয়ত্বাধীন প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠনের অধিকার থাকতে হবে) এই যুদ্ধের হঠকারিতা ও ব্যর্থতার দিকে ইশারা করে। দাবি করা হয় যে সে সময় ইস্টার্ন ফ্রন্টের নিরাপত্তায় তেমন একটা উদ্যোগ নেওয়া হয় নাই। ভারত চাইলেই পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিতে পারতো ওই সময়ে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ৬৫’র যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাফল্য পাক ফৌজে থাকা বেইমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়ে তুলছিল। যার কারণে ভারত পরিস্থিতি তৈরি করে দিলে পিছন থেকে তারা ছুরি মারতে সক্ষম হয়।
 
পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়া এই কারণেই বলছি যে, একাত্তরের যুদ্ধ ভারত পরিকল্পিতভাবেই বাঁধিয়েছে। যুদ্ধ মূলত শুরু হইছে ৩০ জানুয়ারি। যেদিন কথিত কাশ্মিরি মুজাহিদ ভারতীয় বিমান হাইজ্যাক করে লাহোর নিয়ে যায়। আর এই বাহানায় ভারত তার আকাশে পাকিস্তানি বিমান নিষিদ্ধ করে। যা পশ্চিম থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সাবেক র’ কর্মকর্তা আর. কে. যাদব ২০১৫ সালে dailyo তে এই ঘটনার বিবরণ দিয়া লিখছেন, "On January 30, 1971, an Indian Airlines plane Ganga was hijacked from Srinagar though a RAW source and taken to Lahore airport. All 26 passengers were released and the plane was set on fire. This was an outdated plane which was due to be dumped soon. The Indian government immediately banned over-flights going from West to East Pakistan. This action of Kao (র’ প্রধান আর.এন. কাও) hampered the transportation of men and material from air route although Pakistan continued it via Colombo but slowed down this process in view of the international outcry."
 
১৯। কেউ কেউ শেখ মুজিবের বকওয়াস প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে মনে করেন 'পাকিস্তানিরা' আমাদের 'পূর্ব বাংলা'র নাম বদলিয়ে 'পূর্ব পাকিস্তান' রেখেছিল। ১৯৫৭ সাল থেকেই এ নিয়ে শেখ মুজিব গ্যাঞ্জাম বাঁধানোর কোশেশ করে যাচ্ছিলেন। ওই বছর করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে এক বক্তৃতায় প্রথমবার এ নিয়ে কথার ফুলঝুরি ছোটান তিনি। ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ নামটির প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, "পূর্ব-বাংলা নামের একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। আর যদি পূর্ব-পাকিস্তান নাম রাখতেই হয়, তাহলে বাংলার মানুষের জনমত যাচাই করতে হবে। তারা নামের এই পরিবর্তন মেনে নিবে কিনা- সেজন্য গণভোট করতে হবে।"
 
পরে ১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি ঘোষণা করেন, "আমাদের স্বাধীন দেশটির নাম হবে বাংলাদেশ।" দিনটির স্মৃতিচারণ করে তিনি 'কারাগারের রোজনামচা'য় লিখেছেন—
"এক সময় এই দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।... একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোনও কিছুর নামের সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব-পাকিস্তান এর পরিবর্তে হবে শুধুমাত্র বাংলাদেশ।"
 
অথচ 'পূর্ব পাকিস্তান' নামটি (পশ্চিম) পাকিস্তানিদের আবিষ্কার নয়, বাঙালিরই আবিষ্কার। এমনকি 'পূর্ব পাকিস্তান' নামটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নয়, আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে গেছিল। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবে প্রস্তাবিত দেশটির কোন নাম ছিল না। কিন্তু এর আগে ১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলীর বুকলেটে 'পাক্সতান' নামটি প্রস্তাব করা হয়েছিল। একে আরেকটু পরিমার্জিত করে 'পাকিস্তান' করা হয়। মূলত, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হলে এ নামটি আলোচনায় আসে। বিশেষ করে হিন্দু পত্র-পত্রিকায় একে 'পাকিস্তান প্রস্তাব' হিসাবে উল্লেখ করা হতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৪৩ সালের ২৪ এপ্রিল মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে এই নামটি গ্রহণ করেন কায়েদে আযম। উল্লেখ্য, 'পাকিস্তান' দ্বারা পাঞ্জাব, আফগানিয়া, কাশ্মির, সিন্ধু এবং বালোচিস্তান প্রদেশ প্রস্তাব করা হয়েছিল। চৌধুরী রহমত আলী বাংলার নাম দিয়েছিলেন 'বাঙ্গিস্তান'/'বঙ্গস্তান' অথবা 'বাংলাস্তান'। 
 
কিন্তু খোদ কায়েদে আযম 'পাকিস্তান' গ্রহণ করার আগে বাঙালিরা 'পাকিস্তান' গ্রহণ করে বসেছিল। ১৯৪২ সাল থেকেই বাংলায় এ নামটি ব্যবহার হতে থাকে। সে বছর ঢাকায় 'পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ' যাত্রা শুরু করে। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন (পরবর্তীতে ঢাবি উপাচার্য) সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। একই বছর কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি'। এর সভাপতি ছিলেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ১৯৪৪ সালে এই সংগঠনটি প্রথম পরিষদ গঠন করে। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কে ছিলেন না? প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হাসান সোহরাওয়ার্দী, নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আকরাম খান, একে ফজলুল হক, আবুল কাসেম, মৌলভি তমিজউদ্দিন খান, শাহাদাত হোসেন, গোলাম মোস্তফা, এস ওয়াজিদ আলী, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আবুল হুসেন, গোলাম কুদ্দুস, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার। ছিলেন আরও অনেকেই। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন তখন এই সোসাইটির সাহিত্য শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।
 
এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান কায়েম হয়। কিন্তু 'বঙ্গ' প্রদেশের এই অর্ধেক অংশের নাম আর 'পূর্ব পাকিস্তান' রাখা হলো না। রাখা হলো 'পূর্ব বঙ্গ'। কারা রাখলেন? নাজিমুদ্দিন-নুরুল আমিনরা। তবে মুসলিম লীগের নাম হলো 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ'। মুসলিম ছাত্রলীগের নাম হলো 'নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত মুজিব ছাত্রলীগেরও নাম রাখা হলো 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন (ঘষেটী-মীর জাফর দিবস) গঠিত হলো আওয়ামীলীগ। তার নামও রাখা হলো 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'। পরবর্তীতে 'মুসলিম' বাদ দেওয়া হলেও 'পূর্ব পাকিস্তান' বাদ দেওয়া হয়নি কখনও।
 
মজার বিষয় হচ্ছে, এই আওয়ামীলীগের নেতৃত্বেই 'পূর্ববঙ্গ' প্রদেশের নামকরণ হয় 'পূর্ব পাকিস্তান'। আর তা হয় ১৯৫৫ সালের ৭ জুলাই পাকিস্তানের পাহাড়ি শহর মারীতে। সেদিন পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণ-পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। এ অধিবেশনে পাকিস্তানের সকল প্রদেশের নেতারা সংবিধান সম্পর্কে একটি সমঝোতা-চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই সমঝোতা চুক্তি মারী চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পিছনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী এবং আওয়ামীলীগীয় গণতন্ত্রের মানসপুত্র সোহরাওয়ার্দীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। সেদিন পাকিস্তানের দুই অংশকে একটি ইউনিটে পরিণত করার চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী এক ইউনিটের অধীনে 'পূর্ব পাকিস্তান' এবং 'পশ্চিম পাকিস্তান' নামে দুইটি প্রদেশ গঠন করা হবে। একইসাথে সংখ্যাসাম্য নীতিও গ্রহণ করা হয়, যা প্যারিটি নীতি হিসাবে পরিচিত ছিলো। এছাড়া সায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রভাষা নিয়েও এতে চুক্তি হয়। মারী চুক্তি অনুযায়ী ১৯৫৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের সকল প্রদেশকে এক ইউনিটে পরিণত করে দ্বিতীয় গণপরিষদে একটি বিল পাশ হয়। আর এ চুক্তির মাধ্যমেই মূলত ‘পূর্ব বাংলার’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়। ওপারের সকল প্রদেশ বিলুপ্ত করে একটি মাত্র প্রদেশ গঠিত হয় 'পশ্চিম পাকিস্তান'। এই চুক্তির আলোকেই পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। এই চুক্তিতে পূর্ব বাংলার পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এবং 'বঙ্গবন্ধু' শেখ মুজিবুর রহমান।

Share:

প্রোপাগাণ্ডার শিকার এক বাঙালি নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন


 
প্রোপাগাণ্ডার শিকার এক বাঙালি নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন। শান্ত-শিষ্টতা, নম্রতা আর ধার্মিকতা ছিল যার দুর্বলতা। বাঙালিরে কলিজা কেটে দিয়েও নুন কম হওয়ার পাহাড় সমান অভিযোগ যার বিরুদ্ধে। আজ ১৫ মার্চ। ১৯৪৮ সালের এই দিনে একদল ভাষিক সন্ত্রাসী পূর্ব পাক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শামসুল আলম। আরও ছিলেন এই ভাষিক সন্ত্রাসীদের গডফাদার কথিত ইসলামপন্থী তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেম। ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী, নঈমুদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ প্রমুখ রাম-বামরা।

কিন্তু এই 'সভায়' খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন একা। তাঁর চিফ সেক্রেটারিকেও সভাকক্ষে উপস্থিত রাখতে পারেননি তিনি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বলা হয়, এদিন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে আট দফা 'চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এর আট দফা দেখেন! রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ অর্থাৎ দুই পক্ষের অপর পক্ষ কী কী করবেন তার কোন হদিস নেই। শুধু প্রধানমন্ত্রী কী করবেন তা-ই বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
আট দফা হলো
 
এক. পূর্ববঙ্গ পরিষদের চলতি অধিবেশনেই বাংলাকে পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা এবং সর্বস্তরের শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
দুই. বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ কেন্দ্রীয় সরকারে পাঠাতে হবে।
তিন. গ্রেফতাররকৃতদের মুক্তি দিতে হবে এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
চার. পুলিশি নির্যাতনের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
পাঁচ. ভাষা আন্দোলনকারীরা দেশপ্রেমিক, এ কথা সরকারিভাবে ঘোষণা দিতে হবে।
ছয়. গ্রেফতারি পরওয়ানা প্রত্যাহার করতে হবে।
সাত. আন্দোলনকারীরা কমিউনিস্ট কিংবা দেশের শত্রু— প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
আট. ‘আন্দোলনকারীরা বর্ডার অতিক্রম করে এসেছে’ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই বক্তব্যটি ভুল— তা সরকারিভাবে বলতে হবে।
 
আট নম্বর দফা মূল প্রস্তাবে ছিল না। বাম তোয়াহা জোর করে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের নিজ হাতে এই দফাটা লিখিয়ে নেয়। এই চুক্তিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের বিপক্ষে সই করে শামসুল আলম। ১৯ মার্চ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এলে ২৪ মার্চ এই সন্ত্রাসীরা তাঁর সাথে দেখা করে। তিনি নাজিমুদ্দিনের সাথে তাদের করা চুক্তি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'তাঁকে (পূর্ব-পাক প্রধানমন্ত্রীকে) uder duress সেটা সই করানো হয়েছে। এর একটা প্রমাণ এই যে, আট দফা চুক্তির মধ্যে শুধু নাজিমুদ্দিন কি করবেন তাই লেখা আছে। কিন্তু অন্য পক্ষের কর্তব্য সম্পর্কে কিছু নেই।’
 
এর পর কমরেড তোয়াহা, অলি আহাদরা কায়েদে আযমের সাথে বেয়াদবি করে। তাঁকে অপসারণের জন্য ব্রিটিশ রাণীর কাছে আবেদন করারও হুমকি দেয়। বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর একটি জমির অধিকার। খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান হলেও বাঙালিকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তিনিই পালন করেছেন। তাঁর বিশেষ উদ্যোগেই ১৯৩৫ সালে ‘বঙ্গীয় ঋণ সালিশি বোর্ড’ বিল এবং ১৯৩৬ সালে ‘বঙ্গীয় পল্লী উন্নয়ন বিল’ পাস হয়। যার সিলসিলায় ১৯৫০ সালে (তিনি তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল) নুরুল আমিন সরকার জমিদার প্রথা উচ্ছেদ করে বাঙালিকে পূর্ব পুরুষের হারানো জমি ফিরিয়ে দেন।
 
 
কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর
 
কায়েদে আযমের একান্ত স্নেহভাজন ছিলেন নাজিমুদ্দিন। বাংলা অঞ্চলে ত্রিশের দশকে মুসলিম লীগকে পুনর্জীবন দেওয়ার কৃতিত্ব তারই।
Share:

একাত্তর: খুচরো কিছু কথা - পর্ব ১


 ১। “গোলাম আযম বলেন, আলেম ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর ব্যাপক হারে হামলা না হলে তারা আত্মরক্ষা ও পাকিস্তানের হেফাজতের জন্য রেজাকার, মুজাহিদ ও পুলিশ বাহিনীতে ভর্তি হয়ে সশস্ত্র হবার প্রয়োজন বোধ করতেন না।”
 
২. মহিউদ্দীন আহমদের বই 'পার্বত্য চট্টগ্রাম । শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন', পৃষ্ঠা ৯২।
 
 
৩। রাজাকার হায়দ্রাবাদ, রাজাকার পূর্ব পাক। দুই পরাজিত শক্তি। হায়দ্রাবাদ রাজাকার ছিল মজলিসে ইত্তিহাদুল মুসলিমিনের প্যারামিলিশিয়া। দেশ দখলের সময় দাঙ্গার আগুন থেকে এই ফিনিক্স পাখির জন্ম। প্রায় লক্ষাধিক কুরবানির মধ্য দিয়ে তার মৃত্যু ঘটে। পরে ইত্তেহাদের পুনর্জন্ম হয়। আসাদুদ্দিন ওয়াইসির দাদা আব্দুল ওয়াহেদ ওয়াইসির হাতে ইত্তেহাদের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে যান রাজাকার প্রতিষ্ঠাতা কাসেম রিজভী। ভারতের আধিপত্য বিরোধী এম‌আই‌এম নতুন করে অল ইন্ডিয়া মজলিসে ইত্তিহাদুল মুসলিমিন নামে রাজনীতি শুরু করে। মেনে নিতে হয় ভারতের 'অন্তর্ভুক্তি'।
 
পূর্ব পাক রাজাকার সেনা উদ্যোগে গঠিত হইছিল। রাজাকারের সমোচ্চারিত নাম আল বদর ও আল শামস। যেগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে প্রিয় সংগঠনের নাম। ওসমানাবাদ আর ঢাকার পতনের পর ভারতীয় আধিপত্যের অধীনে রাজনীতি সহজ ছিল না। তবে দৃশ্যমান সাফল্য খুব একটা না থাকলেও ওদিকে ওয়াইসি পরিবার, এদিকে জামায়াত সার্ভাইভাল দিক দিয়ে অবশ্যই বাজিমাত।
 


৪। “এবার যদি নিঃস্বার্থ হক্কানী আলেমদের ভোট না দেন, তবে এই পাকিস্তান হিন্দুস্থান, কিংবা চীন-রাশিয়ায় পরিণত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।” পীর সাহেব চরমোনাই
 

৫। অপারেশন সার্চলাইটের অব্যবহিত পূর্বে ২২ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামের পাশে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের নিয়ে সমাবেশ করেন এম‌এজি ওসমানী। একটি প্ল্যাকার্ডে ট্যাংক দিয়ে দেশকে সেনাবাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। পাশেই একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা 'অনেক রক্ত দিয়েছি এবার শোধ নেব।'


 
৬। "...(বিচারপতি) আবু সাঈদ চৌধুরী (তখন ঢাবি উপাচার্য) ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিকে ঢাকা ত্যাগ করেন সপরিবারে। তিনি তখন পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জেনেভায় জুরিস্টদের সভায় যোগ দিতে গিয়েছিলেন। পরিবারের সবাইকে কেনো নিয়ে গেলেন সেটা বুঝা গেলো যখন ২৫শে মার্চের অব্যবহিত পর তিনি বিবিসিতে এক ইন্টারভিউতে বলেন যে, পাকিস্তান আর্মি তার ইউনিভার্সিটির হাজার হাজার শিক্ষক ও ছাত্রকে খুন করেছে। এরপর তিনি আর ঐ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করতে পারেন না। তার এই চাঞ্চল্যকর বিবৃতিতে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বিশেষভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। কারণ ভাইস চ্যান্সেলর পদের মর্যাদা পাশ্চাত্য জগতে খুব বেশী। তার মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি অতিশয়োক্তি করতে পারেন এটা ওরা ভাবতে পারেন না। আশ্চর্যের কথা ২৫শে মার্চের ঘটনার পর শুধু বিদেশী পাকিস্তান বিরোধী প্রপাগান্ডার উপর নির্ভর করে আবু সাঈদ চৌধুরী যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাতে সন্দেহ হলো যে পূর্বাহ্নেই তিনি টের পেয়েছিলেন যে দেশে একটা গৃহযুদ্ধ বাঁধবে এবং তিনি কোন পক্ষ গ্রহণ করবেন তাও আগে থেকেই স্থির করা ছিলো। আরো বিস্ময়ের কথা ২৫ তারিখের আগেই তিনি তার ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছিলেন। এই ঘটনায় আমার মনে এ সন্দেহ বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা গৃহযুদ্ধ ঘটাবে বলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। শুধু আর্মির এ্যাকশনের আকস্মিকতায় তারা কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়ে।" একাত্তরের স্মৃতি, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
 


৭। আমাদের সামনে যে বয়ান হাজির আছে তাতে মনে হয় যে সাত কোটি বাঙালিই Indiapendence -এর পক্ষে যুদ্ধ করেছে। আর সাত কোটির অতিরিক্ত যে পাঁচ-ছয়জন ছিল তারা ঘাতক দালাল এবং কেবল মাইয়া মানুষ ধইরা নিয়া যাওয়ার কাজ নিছিল তারা। অথচ সাত কোটির মধ্যে Indiapendence বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল দুই লক্ষ। বিপরীতে Indiapendence এর বিপক্ষে ঠিক কতজন যুদ্ধ করেছে সে সংখ্যাটা এখনও জানা যায় না। কিন্তু ইউএস‌এআইডি’র (যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা) রিপোর্ট মতে, স্রেফ 'রাজাকার ফোর্স' -এই এ সংখ্যাটা ছিল ৬০ হাজার। এটা ৫ নভেম্বর পর্যন্ত তালিকা। কম হলেও Indiapendence বাহিনীর এক তৃতীয়াংশ!
 
এর বাইরে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত ছিল আল বদর ও আল শামস। আল শামস সম্পর্কে তেমন নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু আল বদর সারাদেশে সক্রিয় ছিল। আর যুদ্ধ না করা মানুষরে যেভাবে পোট্রে করা হয় যে তারা সবাই Indiapendence এর পক্ষে ছিল তার সত্যাসত্য আমার নানীর থেকে ভালো করে বুঝেছি। Indiapendence বাহিনী এলে 'জয় বাংলা' আর Indiapendence বিরোধী বাহিনী এলে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দিয়ে বের হত তারা।
 

 

৮। “১২ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যার নিউজ উইকে একটি ছবিতে দেখানো হয় একদল লোক হাসিমুখে একটি বিচ্ছিন্ন মাথা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটির শিরোনামে লেখা ছিল বাঙালি বিদ্রোহীরা সরকারি বাহিনীর একজন সৈনিকের বিচ্ছিন্ন মাথা প্রদর্শন করছে, তারা অবশ্যই মরবে। কিন্তু লে. আতাউল্লাহ আমাকে বলেছেন শিরচ্ছেদকৃত যে লোকটির ছবি তিনি ভারতে বন্দি থাকা অবস্থায় দেখেছিলেন তিনি সেনাবাহিনীর কেউ ছিলেন না, ওটি ছিল কুষ্টিয়ায় কর্মরত পশ্চিম পাকিস্তানী সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা ওয়াকার নাসিম বাটের ছবি। বাট পশ্চাদপসরণকারী সেনা ইউনিটের সাথে চলে যেতে অস্বীকার করে বলেছিলেন আমি যাদের সাথে দীর্ঘদিন একত্রে কাজ করেছি ও থেকেছি আমার সেই স্বদেশীরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে না।”
— শর্মিলা বসু, ডেড রেকনিং, পৃ. ৭৮




৯। "৭১-এর জানুয়ারি থেকেই আমার অনার্স পরীক্ষা চলছিল। ১ মার্চ মুহসীন হলের রুমে বসে আমি বইপত্র খুলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় খবর এলো, ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমি বুঝে নিয়েছিলাম, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। খোলা বই বন্ধ করারও সময় না দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে তখনই বেরিয়ে পড়েছিলাম রাজপথে। তখনই শুরু করে দিয়েছিলাম সশস্ত্র সংগ্রামের প্রত্যক্ষ প্রস্তুতি কাজ। মলোটভ ককটেল হাই এক্সপ্লোসিভ, বুবি ট্র্যাম্প ইত্যাদি তৈরির প্রকাশ্য প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে রাইফেল কাঁধে নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের এক বিশাল ব্রিগেড বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ থেকে বের হয়ে ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে সুসজ্জিত প্যারেড সংগঠিত করেছিল।" — কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

১০।  হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় বাঙালির গুরুত্বপূর্ণ দুইটি সিদ্ধান্ত তাকে মুক্তির মোহনায় মিলিত করে। সিদ্ধান্তের একটি সুলতানি ও মোঘল আমলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং অন্যটি সাতচল্লিশ। এর মাধ্যমে উপনিষদের কাল হতে ক্রমাগত আর্য-আগ্রাসনের প্রতি সুদীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম থেকে তার অবসর মেলে। হারানো জমি ফিরে পায় ব্রাহ্মণ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে।
 
কিন্তু মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই একদল কমিউনিস্ট ও রাম কুচক্রীর ফাঁদে পড়ে এই জমিনের সার্বভৌমত্ব পুনরায় আর্য-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের হাতে তুলে দিয়েছে বাঙালি। যারা এই চক্রান্তের বিরোধিতা করেছে, বাঙালিকে পুনরায় আর্য-আগ্রাসী শক্তির করতলে আত্মসমর্পণের মতো বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত কিংবা এই আত্মহত্যা থেকে ফেরাতে চেয়েছে তারা হয়েছে খলনায়ক। একাত্তরকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে। তবে এই জাতীয়-বোধের জায়গা থেকে সামান্য সরে দাঁড়ালে বৃহত্তর সংকট চোখে পড়বে। সাতচল্লিশে পাকিস্তান ইসলামের নামে হয় নাই, তা ঠিক। কিন্তু তা হয়েছিল মুসলমানের নামে। সেই দুর্মূল্যের বাজারে আন্তঃপ্রাদেশিক মুসলিম ঐক্যের দৃষ্টান্ত সামনে হাজির করেছিল পাকিস্তান। বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের ক্ষেত্রে যা আলোকবর্তিকা হয়ে সমগ্র মুসলিম জাহানে আশার আলো সঞ্চার করেছিল। আর তাই বাঙালির সেই পাকিস্তান ভেঙে দেওয়া আর বিশ্ব মুসলমানের সেই আশার, সেই স্বপ্নের ওপর কুঠারাঘাত করার মধ্যে কোন ফারাক নাই।
 
তবে একাত্তর নিজেদের পরে ক্ষতি করেছে প্রথমত পাকিস্তানকে। এই ট্রমা থেকে পাকিস্তান এখনও বের হতে পারেনি। এবং সমগ্র বিশ্বে পাকিস্তান ভিলেন হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আর সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে আটকে পড়া ভারতীয় মুসলমানের। সাতচল্লিশের আযাদীর সময় খণ্ডিত একটা পাকিস্তান কায়েদে আযম মেনে নিয়েছিলেন। মেনে নেওয়ার কারণ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের কবল থেকে মুসলমানকে উদ্ধার করা। কিন্তু বিশাল ভারতের সকল মুসলমানকে হেফাজত করা কিংবা এই খণ্ডিত পাকিস্তানে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব ছিল না। এক্ষেত্রে পূর্ববাংলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বার্গেনিং পয়েন্ট। উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ব্যালেন্স রাখার জন্য পাকিস্তান ছিল জরুরি, তেমনি জরুরি ছিল বাংলায় মুসলিম শাসন। অর্থাৎ এই অঞ্চলের হিন্দুদের উপর মুসলমানের কর্তৃত্ব ছিল আবশ্যিক। কিন্তু বাংলার সার্বভৌমত্ব শত্রুর হাতে তুলে দেওয়ায় এই ব্যালেন্স নষ্ট হয়েছে। ভারতের মুসলমানদের আজকের পরিণতি দিয়ে তাই একাত্তরকে ব্যাখ্যা করতেই হচ্ছে।
 
এ সংক্রান্ত দারুণ একটা অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে বুলবুল সরওয়ারের 'ঝিলাম নদীর দেশ' —এ। ১৯৮৪ সালে তিনি কাশ্মীর সফরে যান। সে সময় তিনি যেখানেই পরিচয় দিয়েছেন সবাই তাকে 'মাশরেকী পাকিস্তান' কিংবা 'ইস্ট পাকিস্তান' —এর ভাই বলে আলিঙ্গন করেছে। কিন্তু একটি জায়গায় তিনি আরেকটু গভীর সত্য উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। 'ঝিলাম নদীর দেশ' থেকেই তুলে ধরছি—
"পশ্চিম পাশে এসে আমি চমকে উঠলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল মসজিদ। এখন শূন্য। আমি মাঠ দৌড়িয়ে সেই মসজিদে পৌঁছলাম। দেখলাম কিছু লোক দীর্ঘক্ষণ সেজদায় পড়ে রয়েছে। কৌতূহলে এগিয়ে যেতেই জনৈক ব্যক্তি দৌঁড়ে এসে বললো, 'মসজিদ! ইয়ে মসজিদ হ্যায় ভাই রোখ যাও।'
আমি জবাব দিলাম, 'ম্যায় হু মুসলমান, ভাই সাব।'
 
সে চমকে দাঁড়ালো। তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, 'সাচ্চা মুসলিম হ্যায়? কোন মুলুক সে আয়া?'
আমি বললাম, 'বাংলাদেশ।'
 
সে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললো, 'ও, মাশরেকী পাকিস্তানী? মিল্লাত কি গাদ্দার! ভাগো ইহাসে। ভাগো।'
আমি অবাক হইনি। লক্ষ্ণৌ, বেনারস, দিল্লী, পাটনা, জম্মু, কাশ্মীর, ধানবাদ, আগ্রা, অমৃতসর- যেখানেই আমি মুসলমানদের সাথে আলাপ করেছি, তারা আমায়
 
গাদ্দার বলে ভর্ৎসনা করেছে। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিলো হাজার বছরের স্বপ্নের ইমারত; তাদের দিল ছিলো সেই ইমারতের কল্যাণ কামনায় পূর্ণ । বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তাই তারা মনে করে ফ্যান্টাসীর মৃত্যু অথবা আমাদের ঈমানী দুর্বলতা। আমি তাদের যতই বুঝাতে চেষ্টা করি, তারা ততই প্রতিবাদে টগবগ করে ওঠে। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের অপমানকে সহ্য করে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম।"
একাত্তরকে এখানেই দেখতে হবে— মুসলিম মিল্লাতের সাথে গাদ্দারী হিসাবে।

১১। "২৫শে মার্চের সেই ভয়াল রাতের হিংস্র ছোবলের সাথে সাথেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী এবং পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যবর্গ কি করে পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে পরিচিত ভারতের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণের জন্য ছুটে যেতে পারল? কোন সাহসে কিংবা কোন্ আস্থার উপর ভর করেই বা তারা দলে দলে ভারতের মাটিতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল? তাহলে কি গোটা ব্যাপারটাই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত? তাহলে কি স্বাধীনতা বিরোধী বলে পরিচিত ইসলামপন্থী দলগুলোর শঙ্কা এবং অনুমান সত্য ছিল? তাদের শঙ্কা এবং অনুমান যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে দেশপ্রেমিক কারা? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা না রাজাকার-আলবদর হিসেবে পরিচিত তারা। এ প্রশ্নের মীমাংসা আমার হাতে নয়, সত্যের উদ্ঘাটনই কেবল এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর নির্ধারণ করবে।" অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা ~ মেজর এম.এ. জলিল

 
১২। 'সামরিক জান্তা' 'স্বৈরশাসক' আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর। এর আগে গণতন্ত্র বহাল থাকা অবস্থায় চার গভর্নরের দুইজন বাঙালি, প্রধানমন্ত্রী ৭ জনের তিন জন। চারটা বছর স্বৈরাচার সইতে পারেননি শেমু। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি প্রথমবার তিনি আগরতলায় যান পাকিস্তান ভাঙতে। ৬৩তে আরেক দফা গিয়ে একদিন আগরতলা জেলেও থেকে আসেন। ২৩ বছরের শোষণের ইতিহাস।


 

১৩। "একবার কর্ণেল ওসমানিকে খোজাডাঙার ওপারে সাতক্ষীরার ভোমরায় নিয়ে যাই। সেখানে একটা মুক্তি ফৌজের ক্যাম্প ছিল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রধান সেনাপতিকে পেয়ে খুসি হল। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে তারা তাকে অভিযোগ জানাল। তারা সবাই বলল যে আধপেটা খেয়ে সেখানে তারা পাহাড়া দিচ্ছে। তারা তাদের প্রধান সেনাপতির কাছে অভিযোগ জানাল সাতক্ষীরার ব্যাঙ্ক লুট করে তারা ৬০,০০০০০ (ষাট লক্ষ) টাকা নেতাদের হাতে দিল। অথচ তারা সেখানে না খেয়ে থাকছে তা দেখতে কোনো নেতা আর সীমান্তে গেল না। এমনকি কোন খোঁজ খবরও নিচ্ছে না।" বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব ~ ডা. কালিদাস বৈদ্য

 
 ১৪। বগুড়া সাত মাথার মোড়। ৬৫'র পাক-ভারত যুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিতে নির্মিত সড়কদ্বীপ। এমন অনেক স্থাপনা তৈরি হয়েছিল ৪৭ থেকে একাত্তরে। সামান্য স্মৃতি জাগতে পারে এমন সব কিছুই মুছে দিয়েছে তারা। এখানেও ডিজাইনটা রদবদল করে এখন সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবি শোভা পায়।

আমাদের বুক ভরা স্মৃতি
নিয়ে গেছে সব তার বানে...


 
 
 লিংক:
Share:

পুর্ব পকিস্থান ছাত্রসংঘের প্রতিষ্ঠাতা খাজা মেহবুব এলাহী রহ. (১৯৩২-২০২৩)

 


১লা মে ২০২৩ ঈসায়ীতে ৯১ বছর বয়সী খাজা মেহবুব এলাহী আল্লাহ তা'লার কাছে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর পারিবারিক আবাস পাঞ্জাবে। সেখানেই তিনি ১৯৩২ ঈসায়ীর জুলাইয়ে জন্ম নেন। তার শৈশব কাটে পাটনা এবং কোলকাতায়। পাকিস্তান আজাদ হওয়ার পর তিনি তিনি তাঁর পিতামাতার সাথে পৈত্রিক নিবাসে ফিরে যান।

ইসলামী ছাত্রসংঘের একদম প্রথম দিককার কয়েকজন সদস্যের মধ্যে খাজা মেহবুব ছিলেন একজন। ১৯৫০ এর দিকে তিনি মাশরেকি পাকিস্তানে থিতু হন। মাশরেকি পাকিস্তানে তাঁর নানা মোহাম্মদ আমিন প্রতিষ্ঠা করেন আমিন জুট মিল। ইসলামী ছাত্রসংঘের [প্রাদেশিক] প্রধান হিসাবে তিনি ১৯৫১ ঈসায়ীতে লাহোরে জামাতে ইসলামীর বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি ধীরে ধীরে স্থানীয় বাঙ্গালীদের হাতে সাংগঠনিক দায়িত্বভার হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেন। খাজা মেহবুব এলাহী যোগ্যতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা অনুসারে মানুষ চিনতেন। এর ফলে মাশরেকি পাকিস্তানে ছাত্রসংঘ মজবুত ভিত্তি পায়। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রথমে সৈয়দ মুহাম্মাদ আলী এবং পরে কুরবান আলী ছাত্রসংঘের [প্রাদেশিক] প্রধান হন। তাঁর দাওয়াতে আব্দুল জব্বার, শাহ আব্দুল হান্নান (পরবর্তীতে সচিব), এবং সৈয়দ ফয়েজউদ্দিন আহমেদ ছাত্রসংঘে যোগ দেন। ছাত্রসংঘের পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও উপকরণে খাজা মাহবুবের ভূমিকা ছিল প্রথম দিকে।
 
খাজা মেহবুব ১৯৫৫-৫৬ ঈসায়ীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং যুক্তরাজ্যে গমন করেন। যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চার্টার্ড একাউন্টেন্ট কোয়ালিফিকেশন লাভ করেন। বেকার স্ট্রিটের ইসলামিক কালচারাল সেন্টারে তিনি একটা কুরানিক দার্‌স চক্র শুরু করেন। এই চক্রে আরব ইখওয়ানি ছাত্ররা অংশ নিত। তিনি ছাত্রসংঘের প্রতিভাবান কুরবান আলীকে লন্ডনে নিয়ে আসার এন্তাজাম করেন এবং ইনস অব কোর্টে আইন শিক্ষার আয়োজন করেন। খাজা মেহবুব কখনো এজন্য কৃতিত্ব দাবী করেন নাই, তবে ব্যারিস্টার কুরবান আলী সর্বদা এজন্য শুকরিয়া এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। লন্ডন থেকে কুরবান আলী নিয়মিত "লন্ডন থেকে চিঠি" শীর্ষক কলাম লিখতেন যা লাহোরের এশিয়া জার্নালে প্রকাশিত হত। বর্তমানে ঐসময়ের হাল হাকিকত জানার জন্য এই কলাম অন্যতম সূত্র হিসাবে বিবেচিত হয়। ১৯৬২ ঈসায়ীতে ইউকে ইসলামিক মিশন প্রতিষ্ঠায় কুরবান আলীর ভূমিকা অসামান্য।
লন্ডনে থাকাকালে ১৯৬০ ঈসায়ীতে খাজা মেহবুব খুবই হৃদয়স্পর্শকারী এক প্রবন্ধ লেখেন (চিরাগ-এ রাহ, নাজরিয়া পাকিস্তান নাম্বার, ১৯৬১, ১৬-২১) যাতে তিনি পাকিস্তান তৈরীর উদ্দেশ্য এবং পাকিস্তান তৈরীর পর সৃষ্ট হতাশা নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি খেয়াল করেন যে লন্ডনে তিনি কিছু পাকিস্তানী দেখেছেন যারা নিজেদের পাকিস্তানী বলতে লজ্জা পেত। তাঁর এই প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন মানুষকে উদ্ধৃত করেন। এতে করে তার নেটওয়ার্কের ব্যপ্তি সম্পর্কেও আমরা ধারণা পাই।
 
ত্রিনিদাদের এক মুসলমানকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেন,
"আমাদের জন্য পাকিস্তান আন্দোলন ছিল আজাদী আন্দোলনের মত। ১৯৪৬-৪৭ ঈসায়ীতে যখন হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব চলছিল তখন ত্রিনিদাদেও হিন্দু এবং মুসলমানরা মারামারি করত। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট আমরা মশাল জ্বালিয়ে আজাদী উদযাপন করেছি এমনভাবে যেন এটা আমাদের নিজেদের আজাদী। আমরা অপেক্ষা করছিলাম যে এবার একটা দৃষ্টান্তমূলক ইসলামিক নেশন হবে। এখন থেকে আমরা পাকিস্তান থেকে দ্বীনী পুস্তক এবং ওস্তাদ পেয়ে ভাল মুসলমান হব। ঐসময় কি আর আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে এসবই ছিল স্রেফ মরীচীকা?"
 
একই প্রবন্ধে খাজা মেহবুব লন্ডনে এক পাকিস্তানী পরিবারের সাথে তাঁর মোলাকাতের বর্ণনা দেন। তিনি পরিবারের কর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে আওলাদদের স্বার্থে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন জরুরী। এর উত্তরে খাজা মেহবুবকে শুনতে হয় যে লন্ডনেই অধিক সততা এবং ভদ্রতা আছে। খাজা মেহবুব এর সত্যতা উপলব্ধি করেন এবং স্বীকার করেন যে উনি নিজেও ভাবেন যে কেন তিনি মাতৃভূমে (ওয়াতান) প্রত্যাবর্তন করবেন-
"এই যে আমরা যেটাকে ওয়াতান বলি সেটা আসলে কি? পরিবার এবং ঘর, কাছের ও আপন, বন্ধু এবং সাথী, মুসলমান জীবন। 
 
পরিবার এবং ঘর? এটা তো যেকোন জায়গাতেই দ্রুত ও সহজে বানানো যায়। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলিতে।
কাছের এবং প্রিয়? মাশরেকি পাকিস্তানের বছরগুলির কারণে এরকম মোলাকাত তো দেখেছি। মোলাকাত তো বিদেশী জমিনে বসেও হতে পারে। বন্ধু এবং সাথী? এটাও তো যেকোনখানেই হতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, আমার এখানকার স্বল্পদিনের যাত্রাতেই আমি অনেক বিশ্বস্ত বন্ধুত্ব তৈরী করেছি। মুসলমান জীবন? এটাও তো যেকোন মুসলমান দেশেই পাওয়া যায়। আপনি যদি আরব জাতীয়তাবাদের ভয়ে মধ্যপ্রাচে না যান, তাহলেও কোন সমস্যা নাই। আফ্রিকাতে অনেক দেশ আছে। দক্ষিনপূর্ব এশিয়াতে অনেক দেশ আছে। খোদার পৃথিবী বিশাল। এই দেশগুলি জেনেরাস এবং আমাদের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দেয়।
 
না, এই সমস্ত কারণের মধ্যে এমন একটা কারণও নাই যার কারণে ওয়াতানে প্রত্যাবর্তন করা যায়। আমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক যার ডিমান্ড সর্বত্র। আমরা যদি পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করি, এটা অনেক বড় কোরবানি হবে। এই প্রত্যাবর্তন থেকে সমমানের কোন ম্যাটেরিয়াল বেনিফিট আমরা পাব না। এই কোরবানির বিনিময় কেবল একটাই হতে পারে। ইসলামের জন্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া জাতিতে ইসলামী হুকমত কায়েম করা। এক নয়া ব্যবস্থা জারি করা। যেই ব্যবস্থা আমাদের নিপীড়ত জনগনকে শান্তি ও আরাম দিবে এবং ভাল রাখবে। আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ায় সফলকাম করবে। এবং আমরা ফখরের সাথে বলতে পারব আমরা পাকিস্তানী..."
খাজা মেহবুব তাঁর ওয়াতানে (মাশরেকি পাকিস্তান) ফিরেছিলেন এবং আমিন জুট মিলের একাউন্টসের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
 
১৯৬৫ ঈসায়ীতে তিনি খুররম মুরাদ এবং অধ্যাপক খুরশিদ আহমেদের কাছে প্রস্তাব রাখেন যে মাওলানা আব্দুর রহীমকে মাশরেকি পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমীরের দায়িত্ব থেকে আজাদ করা হোক যাতে করে তিনি তাফহীমুল কোরানের বাংলা তরজমায় মনোনিবেশ করতে পারেন। খাজা মেহবুব তরজমার যাবতীয় খরচার দায়িত্ব নেন। এই খরচের মধ্যে ছিল প্রতি মাসে ৫০০ রুপি স্টাইপেন্ড মাওলানা আব্দুর রহীমকে দেওয়া। সেই সময়ের বিবেচনায় এটা বিশাল অংক। ১৯৬৬-৬৭ ঈসায়ীতে এই প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং মাওলানা আব্দুর রহীম দ্রুতই এই মহাযজ্ঞ সমাপ্ত করেন খুবই উচ্চমান বজায় রেখে।
 
১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহে আমিন জুট মিল লুট করা হয়। খাজা মেহবুব মাগরেবি পাকিস্তানে ফিরে যান। এখানে তিনি পারিবারিক শিল্প ও ব্যবসার দায়িত্ব নেন। এর মধ্যে Neelam Glass অন্যতম।
 
মাওলানা মওদূদী যে পাঁচ-ছয়জনকে বিশেষভাবে স্নেহ করতেন তার মধ্যে খাজা মেহবুব একজন। অন্যরা ছিলেন ইসরার আহমেদ, জাফর ইসহাক আনসারি, খুররম মুরাদ, খুরশিদ আহমেদ, এবং হুসেইন খান। মাওলানা মওদূদীর হজ্বের সফরসঙ্গী ছিলেন খাজা মেহবুব। জামাতের প্রকাশনা এবং সংবাদপত্রের অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য দায়িত্ব মেটাতে সর্বদা তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর বিবি সালমা ইয়াসমিন নাজমি সাহিবি তাঁর সহায়তায় বুতুল এবং আফত নামক দুইটা নারী ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন। বৈবাহিক সূত্রে তিনি খুররাম জাহ মুরাদের আত্মীয় ছিলেন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।
 
[লাহোর থেকে সেলিম মনসুর খালিদ (সম্পাদক, তরজমানুল কুরআন) এবং লন্ডন থেকে জামিল শরিফ (মুসলিম কাউন্সিল ব্রিটেন) ইংরেজী থেকে অনুবাদ মোঃ আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম]
 
Share: