দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

আসাহাব-ই-রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য-একেএম নাজির আহমেদ


মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে তিনি [তোফায়েল ইবনে আমর রাঃ ] ইসলাম গ্রহণ করেন ৷ কিছুদিন তিনি মক্কায় থাকেন এবং তখন পর্যন্ত যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছিল সেগুলো তিনি অবগত হন । এরপরে চলে যান নিজের এলাকায়। শুরু করলেন দাওয়াতে ইলাল্লাহ কাজ । বহু সংখ্যক ব্যক্তিকে তিনি মুসলিম বানিয়েছেন। তার মধ্যে এমন একজন ব্যক্তি আছেন যার নাম সারা দুনিয়ার সকল মুসলমানের কাছে পরিচিত। তিনি হলেন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু। তোফায়েল ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহুর প্রচেষ্টায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । মহানবী আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সংরক্ষণে যার অবদান সবথেকে বেশি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম হিজরত করে চলে গেলে, মদিনায় তোফায়েল ইবনে আমর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে দেখা করতে রওনা হলেন। তার সঙ্গে ছিল তার হাতে ইসলাম গ্রহণকারী 80 টি পরিবারের সদস্য। অসাধারণ যোগ্যতার অধিকারী তিনি ছিলেন। সাহাবীদের জীবনী দেখলে বহু বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। তারা দায়ী ইলাল্লাহ হিসেবে সেরা ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

মক্কার সেই সময়ে ঈমানের ঘোষণা দেওয়ার মানেই ছিল জীবনের ঝুঁকি নেওয়া ৷ কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা মানেননি আসহাবে রাসুল। নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েও তারা এক আল্লাহর একত্ব এবং সার্বভৌমত্বের কথা বলেই গেছেন। আবু বক্কর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু প্রচেষ্টায় যখন তালহা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করলেন। কয়েকজন লোক ধরে এক রশিতে বেধে খুব করে পিটানো এবং মক্কার অলিতে-গলিতে তাদেরকে ঘুরালো । উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু যখন ইসলাম গ্রহণ করেন । তার চাচা হাকাম খুব করে তাকে মারল এবং বলল, ইসলাম ত্যাগ কর , ইসলাম গ্রহণ করে তুমি আমার বংশে কলংক লেপন করেছ ৷ উত্তরে উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন, আপনার যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন কিন্তু ইসলাম ছেড়ে দাও আমার পক্ষে সম্ভব না ৷ ইতিহাস থেকে আমরা পাই যে তাকে কয়েকদিন পর্যন্ত খুঁটিতে বেঁধে রাখা হতো কিন্তু কোন ধরনের খাদ্য ও পানিয় দেওয়া হত না ৷ জীবন যায় যায় অবস্থা তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো ৷

আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু, ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। এলেন মক্কায় , তার বড় সাদ হলো তিনি মক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন ৷ কিন্তু কোরাইশ ছাড়া অন্য কারো স্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুমতি ছিল না, একটি পথ ছিল কোরাইশদের দশটি গোত্রের মধ্যে যে কোন একটির একটি সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হতো তাহলে তাকে মক্কায় বসবাস করতে দেওয়া হতো ৷ বনু মাখজুমের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তিনি । যার সাথে তিনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন ,তার এক দাসি ছিল সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা । তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি মক্কায় বসবাস করতে থাকেন ৷ গোড়ার দিকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী যারা ছিলেন তাদের মধ্যে তারা ছিলেন ৷ ইসলাম গ্রহণ করার ঘটনা জানাজানি হয়ে গেল, শাস্তির নির্দেশ দেওয়া হলো ৷ যতদিন পর্যন্ত তারা ঈমান ত্যাগ না করবে ততদিন পর্যন্ত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাবার চত্বরে রোদের মধ্যে তাদেরকে দাড় করিয়ে রাখা হবে ৷ গরমের মধ্যে রোদের মধ্যে দাড়িয়ে থাকা কি যে ভয়ঙ্কর শাস্তি তা এবারের গরমে আমরা টের পাচ্ছি । আর আরবের তাপমাত্রা প্রায় 48 ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছে যায় ৷ এই উত্তপ্ত গরমের মধ্যে কখনও তাদের কে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো কখনো শুইয়ে রাখা হতো ৷ দিনের পর দিন তারা এই যাতনা ভোগ করেছেন ৷ বারবার তাদেরকে চাপ দেয়া হয়েছে, যে তোমরা ইসলাম ত্যাগ করো তার পরেও তারা ইসলাম ত্যাগ করেননি ৷ একদিন আবু জেহেল একটি লাঠি নিয়ে আসে খুব মার দিল তাদেরকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য কিন্তু সম্মত হলেন না শেষ পর্যন্ত পেটাতে পেটাতে আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে শহীদ করে দেয়া হয় ৷ তার স্ত্রীর জন্যও একই শাস্তি , একদিন বিকেলবেলা শাস্তি ভোগ শেষে যখন, তাকে ছেড়ে দেয়া হলো তখন কোনমতে পা টেনে টেনে তিনি তার দিকে যাচ্ছিলেন । ঠিক এই সময় আবু জেহেল তার সামনে এসে দাঁড়ালো ৷ বলল ইসলাম ত্যাগ কর তিনি যখন রাজি হচ্ছিলেন না তখন আবু জেহেল একটি বল্লম তার দিকে ছুড়ে মারল ৷ সেই বল্লম তার লজ্জাস্থান ভেদ করে চলে গেল ৷ সেই আঘাতে তিনি তিনি শহীদ হয়ে যান । জীবন দিলেন ঈমান দিলেন না ৷

বিলাল ইবনে রাবাহ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর উপর অত্যাচার ৷ যত রকম অত্যাচার করা সম্ভব সব রকম অত্যাচার তার ওপর করা হয়েছে ৷ তাঁর জীবনীতে আমরা দেখতে পাই সারাদিন খালিপায়ে রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা ৷ কখনো কখনো রোদের মধ্যে কংকর এর উপর শুইয়ে রাখা ৷ আর রাত্রিবেলা খুঁটির সাথে বেঁধে চাবুক দিয়ে মারা ৷ এতে করে শরীরের জায়গায় জায়গায় ফেটে যেত এবং রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে মাটিতে পড়তো ৷

একদিন আবু জাহেলের নির্দেশ উদোম করে কংকরের উপরে শুইয়ে দিয়ে তার বুকের উপরে বিশাল বড় একটি পাথর চাপিয়ে দেওয়া হয় ৷ আবু জাহেল কাছে এসে বলে বাঁচতে যদি চাস মোহাম্মদের দল ত্যাগ কর ৷ কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে পিঠের উপর প্রচণ্ড চাপের কারনে ৷ ক্ষীণকণ্ঠে তিনি বললেন আহাদ -আহাদ-আহাদ ৷ দিনের পর দিন তিনি এভাবে লাঞ্চিত হয়েছেন কিন্তু তিনি ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা আদায় করা সম্ভব হয়নি তার কাছ থেকে ৷

উম্মে শুরাইক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা মক্কার একজন মহিলার ৷ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করার পরেই কোরাইশ নেতাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তিনি দাওয়াতী কাজ শুরু করেন ৷ তাদের সাথে খোশগল্প করেন আর মাঝে মধ্যে দু একটা আয়াত তাদের সামনে পেশ করেন ৷ বেশ কিছুদিন এভাবে চলতে থাকে একটা সময় আসে যখন কোরআন কুরাইশ নেতারা টের পেয়ে যায় তার দাওয়াতী কাজ ৷ তার জন্য শাস্তির বিধান হচ্ছে রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা ৷ পানি পানি বলে তিনি চিৎকার করতে থাকতেন কিন্তু নেতাদের ভয়ে কেউ তার কাছে পানি নিয়ে কাছে আসত না ৷

তৃতীয় দিন যখন তাঁকে দাঁড় করে দেওয়া হয় তখন দেখা যায় যে, তিনি আত্মভোলা হয়ে গেছেন স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে ৷ কে কি বলে তিনি কিছুই আর বোঝেন না ৷ এ অবস্থায় একজন লোক এসে অঙ্গভঙ্গি করে তাকে বুঝায় যে, তুমি যে এক আল্লাহর উপর ঈমান নিয়ে বসে আছো এই কারণেই তোমার উপরে অত্যাচার ৷ যদি তুমি সেখান থেকে সরে আসো তাহলে তোমাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে ৷ ওই লোকটি অঙ্গভঙ্গি করে যা বুঝাতে চাইলে তিনি তা বুঝতে পারলেন ৷ বুঝতে পেরেই তিনি চিৎকার দিয়ে বলে উঠেন , আল্লাহর কসম আমি ঈমানের প্রতি এখনো অটল আছি ৷
ঈমানী দৃরতা কি মানের ছিল তাদের ।

লুবাইনা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা ওমরের ক্রীতদাসী ৷ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তখন ইসলামের দুশমনদের একজন ৷ তিনি খুবই বলবান পুরুষ ৷ ওকাজের মেলায় প্রতিবছর যে ধরনের কর্মকাণ্ড হয়তো তার মধ্যে একটি ছিল ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা ৷ ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেতে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ৷ এত জোরে ঘোড়া দৌড়াতে পারতেন তিনি ৷ তার ক্রীতদাসী লুবাইনা ইসলাম গ্রহণ করেছে ৷

কিছুদিনের মধ্যে তিনি তার হাবভাব চালচলনে বুঝতে পারলেন যে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে ৷ চাপ দিলেন ইসলাম ত্যাগ করার জন্য ৷ কিন্তু লুবাইনা রাজি হচ্ছেন না ৷ একদিন তিনি যে চাবুক দিয়ে তিনি ঘোড়া চালানোর সময় ব্যবহার করতেন, সেই চাবুক দিয়ে লুবায়না রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুা কে কিছুক্ষণ ধরে পিটালে ৷ বললেন ইসলাম ত্যাগ কর ৷ তারপরও ত্যাগের ঘোষণা আদায় করা সম্ভব হলো না ৷ আবারো কতক্ষণ ধরে তিনি পিটালেন বললেন, ইসলাম ত্যাগ কর কিন্তু তার পরেও ইসলাম ত্যাগ করার ঘোষণা আদায় করা সম্ভব হলো না ৷ আবারো তিনি পিটাতে থাকলেন এভাবে পিটাতে পিটাতে , পিটাতে তার সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল ৷

এভাবে চলতে চলতে একটা সময়ে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ক্লান্ত হয়ে বসে গিয়ে বললেন , লুবায়না তোকে পিটানোর মত শক্তি আমার শরীরে আর নেই ৷ এই কথা শোনার পর লুবায়না বিধ্বস্ত অবস্থায় বললেন, আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ না করেন এর প্রতিশোধ আল্লাহতালা আপনার কাছ থেকে নিবেন । ওই অবস্থায় তিনি বলেছিলেন, কি রকম শক্ত ঈমান হলে ওরকম ওই আবস্থায় এমন কথা বলা সম্ভব ।

আব্দর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু মক্কার একজন ধনী ব্যাবসায়ী ,তার মক্কায় বড় বাড়ি ছিল । সবকিছু ত্যাগ করে তিনি মদিনায় চলে গেলেন। মক্কা বিজয়ের পর যখন তিনি বাড়ির সামনে দিয়ে যেতেন তখন তিনি ওই বাড়ির দিকে তাকাতেন না। মাথা নিচু করে চলে যেতেন । মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর ওফাতের পর এর ঘটনা । একবার মদিনাতে হইচই পড়ে গেল লোকেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। শহরে একটা কাফেলা ঢুকতেছে অনেকগুলো উঠ, প্রত্যেকটা উটের পিঠে বোঝাই করা শস্যদানার বস্তা । সাতশত উটের বিরাট কাফেলা মদিনার মধ্যে ঢুকছে ।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুা জিজ্ঞেস করলেন এই বাণিজ্য কাফেলা কার একজন বলল আব্দুর রহমান ইবনে আউফের। তখন আয়েশা রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহা বললেন যে, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, "আমি যেন আব্দর রহমান ইবনে আউফ কে পুলসিরাতের উপর একবার হেরে গিয়ে সোজা হয়ে উঠতে দেখলাম" । ওই ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে গিয়ে এই কথাটা বলে দিলো । তখন আব্দর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন , ইনশাআল্লাহ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ সোজা হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন ৷ তখন তিনি বললেন যে, এই সম্পদ গুলো সব মদিনাবাসী গরীবদের মধ্যে বিলি করে দাও এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই ৭০০ উটকে বন্টন করে দেওয়া হল ৷ কেমন ত্যাগী মানুষ । এ ধরনের ত্যাগী মানুষ আসহাবে কেরাম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ।

আমিরুল মু’মিনীন হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু খলিফার হওয়ার পর । তার জন্য ভাতা নির্ধারণ করা হয় । খলিফার বৈধভাবে অনেক অনেক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার সুযোগ ছিল৷ কিন্তু তারা নেননি ৷ এবং চাপাচাপি করে বছরে আড়াই হাজার দিরহাম হাতে নেওয়ার জন্য আবু বক্কর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে রাজি করানো যায় ৷ বায়তুলমাল থেকে প্রতি বছর তিনি দুই জোড়া পোশাক পেতেন । এবং তিনি এতে সন্তুষ্ট থাকতেন ৷ এই ছিল তাদের জীবনাচরণ তারা অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন ৷

হযরত জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বড় ব্যবসায়ী ৷ সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। বেশিরভাগ উপার্জিত অর্থ তিনি ফি সাবিলিল্লাহর পথে খরচ করতেন ৷ তার ১০০ ক্রীতদাস ছিল এই দাসদেরকে তিনি প্রতিদিন কাজ করাতেন আর তার ইনকাম ছিল এ দিয়ে হাজার হাজার দিরহাম ৷ ক্রীতদাসদের আয়কৃত একটি দিরহামও তিনি নিজের কাজে লাগাননি ৷ অকাতরে মানুষের মধ্যে বন্টন করে দিতেন ৷

সাঈদ ইবনে আমর আল-জুমাহি রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর জামানায় হিমসে গভর্নর করে তাকে পাঠানো হয় ৷ গভর্নর হিসাবে ভাতা তার জন্য নির্ধারিত ছিল কিন্তু তিনি তা নিজের জন্য ব্যবহার করতেন না , বিত্তহীন লোকদের মাঝে ব্যয় করে দিতেন বেশিরভাগ ৷ একবার হিমস থেকে কিছু লোক হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর সঙ্গে দেখা করতে আসেন ৷ আলাপের এক পর্যায়ে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন তোমাদের হিমসের গরিব মানুষ যারা তাদের একটা তালিকা তৈরি করে দিতে পারো ৷

তাহলে আমি তাদের জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ দেবো ৷ লোকের একটি তালিকা তৈরি করল এবং সেই তালিকাটি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর হাতে দিলেন ৷ তিনি পড়া শুরু করলেন, তালিকার প্রথম নাম টি ছিল সাঈদ ইবনু আমর ৷ তখন তিনি বললেন এ কোন সাইদ ? তখন লোকেরা বলল তিনি আমাদের কখন গভর্ণর ৷ তখন লোকেরা বলল আমিরুল মুমিনিন কখনো কখনো এমন দিন যায় যে, তার চুলোতে হাড়ি বসেনা ৷ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা এই কথা শুনে এত কান্না কেঁদেছিলেন যে তার চোখের পানিতে দাড়ি মোবারক ভিজে গিয়েছিল ৷ এরপর তিনি হিমসের গরিব ব্যক্তিদের জন্য এবং গভর্নর এর জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ করেন ৷ গভর্নরের জন্য বরাদ্দ করেন ১০০০ দিনার ৷

লোকগুলো নিজের এলাকায় সন্ধ্যার দিকে গিয়ে পৌছলেন এবং তারা গভর্নরের বাসায় গেলেন ,দিনারের থলেটি তার হাতে দেওয়া হল । থলেটির মুখ খুলে দেখেই তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন এবং পড়লেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন ৷ ঘরের মধ্য থেকে তাঁর স্ত্রী বল্‌ কি হয়েছে সাঈদ? হযরত ওমর কি ইন্তেকাল করেছেন ? তিনি বললেন না তার চেয়েও বড় বিপদ । তখন তার স্ত্রী বলল যে, তাহলে মুসলিম ভূখন্ডে কি হামলা শুরু হয়েছে ? সাঈদ বলল যে, না তার থেকে বড় বিপদ ৷ তখন তার স্ত্রী বলল যে, তার থেকে বড় বিপদ কি ৷ সাঈদ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন যে, আমার আখেরাতকে ধ্বংস করার জন্য দুনিয়া আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে ৷

সেই সন্ধ্যা থেকে এতগুলো স্বর্ণমুদ্রা আমি যদি ঘরে ঢুকে ঘুমায় তাহলে আমার স্রষ্টার প্রতি কি ধরনের মনোভাব প্রকাশ পায়। তার স্ত্রী বুঝতে পারলেন এগুলো মানুষকে না দিলে তার শান্তি হবেনা । তিনি বললেন, ঘুমান এত রাত্রে কোথায় আপনি লোক পাবেন। সকালে বিলি করবেন। পরদিন সকালে ছোট ছোট থলে তৈরি করে। তার অধীনস্থ গরীব-দুঃস্থ অধিবাসীদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন৷ একটি দিনার ও নিজের প্রয়োজনে রাখেননি ৷ এই হল আসহাবে রসুলের অল্পে তুষ্টি নমুনা ।

আবু জার গিফারী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর বাসায় এক নব মুসলিম গেলেন ৷ ঘরে বসতে দেয়া হয়েছিল সে ঘরটা কেমন যেন খালি খালি দেখা যাচ্ছিল ৷ তখন তিনি আবুজার গিফারী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে বললেন যে, আপনার ঘরের আসবাবপত্র কোথায় ৷ তখন আবুজার গিফারী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন যে, আখেরাতে আমার ঘর আছে আমার আসবাবপত্র সবই ওখানে পাঠিয়ে দিয়েছি ৷ এই হল আসহাবে রসুলের নমুনা ।

আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর জীবন থেকে আমরা পাই, তিনটি জিনিস ঠিক থাকলে তিনি সন্তুষ্ট, তলোয়ার টা ঠিক আছে কিনা, ঢালটা ঠিক আছে কিনা ঘোড়ার পিঠে বসার আসন টা ঠিক আছে কিনা ৷ এই তিনটে জিনিস ঠিক আছে তিনি সন্তুষ্ট তার কোন আর অভাব তার নেই ৷

আবার তারাই ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে অকুতোভয় বীরযোদ্ধা ৷ যুদ্ধের প্রাক্কালে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বক্তৃতা করেন ৷ এই বক্তৃতার প্রাক্কালে তিনি বলেন, এবার তৈরি হয়ে যাও সেই জান্নাতে যাওয়ার জন্য য, আর জান্নাতের বিস্তৃতী আকাশ এবং জমিনের মাঝখানে সমান ৷ একথা শুনে উবাই ইবনে হুমাম আল-আনসারী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ জান্নাতের বৃস্তৃতি কি আসমান এবং সমুদ্রের মাঝখানে সমান ৷ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ ৷ তখন তিনি বললেন, বাহ! বাহ! ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন যে, এখানে বাহ! বাহ! বলার কি আছে ৷ তখন আল আনসারী রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন, যে ইয়া রাসুল আল্লাহ আমি বলেছি এইজন্য যে, আমি এর অধিবাসী হতে চাই ৷ একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন, হা তুমি এর অধিবাসী হবে ৷ এরপর তিনি তার থলে থেকে খেজুর বের করে খেতে থাকলেন , খেতে খেতে ভাবলেন যে এতগুলো খেজুর খেতে তো বহুৎ সময় লেগে যাবে, এত সময় তো অপেক্ষা করা যাবে না এইজন্য খেজুরের থলে, তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং শাহাদত বরণ করলেন ৷

আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু, উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম একটি তলোয়ার হাতে নিয়ে বললেন এই তলোয়ার কে নেবে । সকালে বলল আমি নেব, আমি নেব, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম বললেন, এর হক আদায় করতে পারবে? তখন সবাই চুপ, তখন হযরত আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর প্রশ্ন করলেন ইয়া রসুলাল্লাহ এর হক কি ?

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন, এর হক হচ্ছে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো যাবেনা এবং কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না ৷ তখন আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন, ইয়া রাসুল্লাহ আমি আর হক আদায় করতে পারব ৷ তখন তাকে তলোয়ারটি দিয়ে দেওয়া হল ৷ যুদ্ধের মাঝখানে একটা সময় মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে লেগেছিল ৷ কিন্তু আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এক মুহূর্তের জন্য পিছনে ফিরে তাকন নাই, ওহুদের ময়দানে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শেষ পর্যন্ত ৷

মাদায়েন টাইগ্রিস নদীর পশ্চিম পাশে অবস্থিত ৷ ইরান সাম্রাজ্যের রাজধানী ৷ মুসলমানরা বিজয় হয়েছে শুনেই ইরানের সম্রাট তার বহু বহু সম্পদ বহু জন্তুর উপর তুলে পালানোর চেষ্টা করছে ৷ একথা যখন সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কাছে পৌঁছাল তখন তিনি তার সেনাবাহিনীর উদ্দেশে একটি ভাষণ দিলেন, " ও আল্লাহর বান্দারা, ওহে আল্লার সৈনিকরা! সাম্রাজ্যের শাসকেরা এক আল্লাহর দাসত্ব বাদ দিয়ে আগুন এবং সুর্যের পূজা করে ৷ জনগণের বহু কষ্টার্জিত সম্পদ তারা নিজেদের কাছে পুন্জিভূত করেছে ৷ তোমরা যখন তাদেরকে মুক্তি দিতে এসেছো তখন তারা জনগণের সম্পদ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছে ৷ আমরা এসেছছি তাদেরকে আমরা পালাতে দেবো না ৷ আমাদের যেন তাদের কাছে পৌঁছাতে না পারি এইজন্য তারা টাইগ্রিস নদীর পুল ভেঙে দিয়েছে ৷ কিন্তু তারা জানে না মানবতার সৈনিকরা আল্লাহর ছাড়া তারা কখনো পুল বা নৌকার উপরে ভরসা করে না ৷ আল্লাহর উপর ভরসা করে আমি আমার ঘোড়াটি নদীতে নামিয়ে দিচ্ছি, তোমরা আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ আমাদের সহায় হবেন" ।

এই বলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি নদীতে ৷ পেছনে পেছনে তার সৈনিকরাও ঝাঁপিয়ে পড়লো ৷ ওপারের পৌছার পরে চারিদিকে ত্রাস সৃষ্টি হয়ে গেল এবং খুব কম অল্প সময়ের মধ্যে মাদায়েন বিজয় হয়ে গেল৷ আসাহাবে কেরাম যুদ্ধের ময়দানে বীরযোদ্ধা সাহসী, যোদ্ধা অকুতোভয়, যোদ্ধা অসীম সাহসী যোদ্ধা ৷
আমাদের চলার বাঁকে বাঁকে আসহাবে রাসেলের দিকে আমাদের তাকানো প্রয়োজন ৷ বিরাট একটা সিড়ির সর্বোচ্চ অবস্থানে তারা আর সর্বনিম্ন অবস্থানে আমরা ৷ আমাদের উচিত এই সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরে থেকে ওঠা যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করা উচিত ৷ তাদের বৈশিষ্ট্য যদি আমরা ধারণ করতে পারি তাদেরকে যেমন ভয় করেছে তিনটি মহাদেশের শাসকেরা আমাদের কেউ তেমনি ভয় করবে, জাহেলিয়াতের ধ্বজাধারীরা প্রকম্পিত হবে ৷ আসুন আমরা আসুন আমরা আসহাবে রাসুলের জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করি ৷

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সেই তৌফিক দান করুক ৷ আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ৷
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ