আমাদের এখানে বন্দীরা মরে যাবার আগেই হাজার বার মরে। অন্তত এভাবেই আমি মিশরের কারাবন্দী মানুষগুলোর জীবনকে মুল্যায়ন করি। এ জুলুম আরো বেশি দুর্বিষহ হয়ে যায়, তাদের জন্য যাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা হয়ে গেছে। তারা প্রতিটি মুহুর্তেই মৃত্যুকে বরণ করে নেয়ার জন্য অপেক্ষা করে। সেই মৃত্যু যতক্ষন না আসে, ততক্ষন তাদের বারবার হত্যা করা হয়।
মিশরের কারাবন্দী মানুষগুলোকে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে হত্যা করা হচ্ছে- এ ঘটনাগুলোকে আপনি বলতে পারেন জুলুম, কিংবা নিপীড়ন অথবা ঠান্ডা মাথায় হত্যা। যাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষিত হয়েছে, তাদের পরিণতি বড্ড দুর্বিষহ। এদের অধিকাংশই রায় কার্যকরের আগেই নানা ধরনের ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হয়ে যায়।
তাদেরকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে একা একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। ঘরটি ছোট্ট, অন্ধকার। অনেকটা কবরের মতো। দুই থেকে তিন মিটার লম্বা হয় ঘরগুলো। ৭০ শতাংশ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তকে কয়েকজন ধরে বেধে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যেতে হয়। কারণ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে একটানা বসে থাকতে থাকতে তাদের হাটার ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিদিন একবার মাত্র সেলের দরোজা খোলা হয়। মানুষগুলো সারাদিনের চেপে রাখা টয়লেট থেকে তখনই নিষ্কৃতি পাওয়ার সুযোগ পায়। গোটা দিনে এক পিস মাত্র রুটি খান তারা। প্রতিটি মুহুর্তে তারা অপেক্ষা করেন, কারা কর্মকর্তা আসবে, তাদেরকে ফাঁসির মঞ্চে টেনে নিয়ে যাবে। দিন-রাতের হিসেব তারা বুঝেন না। কতদিন গেলো তারা জানেন না। তারা শুধু জানেন, কীভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
আমি ছিলাম ওয়াদি আল নাতরুন নামক মরু কারাগারে। আমার বন্ধুদের যখন সেল থেকে বের করা হলো, আমি তাদের বিদায় জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তারা বোধ হয় মুক্তি পাচ্ছে। তাদের সাথে আর কোনোদিন আমার আর দেখাও হয়নি। পরে জেনেছি, তাদের সকলকেই ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
২০১৫ সালে আমাকে নাতরুন থেকে কায়রোর আপীল কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। গিলোটিন রুমের পাশেই আমি থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। একদিন সকালের কথা। আমার ঘুম ভাঙলো প্রচন্ড আর্তনাদ আর চিৎকারের শব্দ শুনে। বেশ অনেকক্ষন চিৎকারটি শুনেছিলাম। তারপর শুধুই নিরবতা। মিশরে গিলোটিন রুমেই মৃত্যুদন্ডগুলো কার্যকরা করা হয়। একজন মানুষকে লোহার মেশিনের মাঝে ছেড়ে দিলে লোহার আঘাতে শরীরের হাড়গুলো একে একে সব ভেঙে গেলে যেমন শব্দ হয়, আমি অনেকবার এ শব্দগুলো শুনেছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, গিলোটিনে শেষ হয়ে যাওয়া মানুষটির সাথে সাথে আমার নিজেরও যেন মৃত্যু হয়েছে। আমি আজও ঘুমের ঘোরে মানুষের হাড়ভাঙার সেই শব্দ শুনি।
আমি মৃত্যুর আগে হত্যাকান্ডের সেই বিভৎসতার শব্দ আরো অনেকবার শুনেছি। গিলোটিন রুম কিংবা মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের সেল থেকে আমি কুরআন তেলাওয়াতের শব্দও শুনেছি বহুবার। প্রতিটি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ইখওয়ান নেতৃবৃন্দ অনবরত কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তাদের হাতে কুরআন দেয়া হতো না। তারা মুখস্থ তেলাওয়াত করতেন।
একদিনে আমি ৫ জনের মৃত্যুদন্ডও কার্যকর হতে দেখেছি। মানুষগুলো আস্ত শরীরে গিলোটিন রুমে ঢুকতেন। আর তাদের বিচ্ছিন্ন আর টুকরো টুকরো দেহ সেখান থেকে বের হতো। আমি নিজের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতাম। বার বার মনে হতো, মৃত্যুকে এত কাছ থেকে বারবার দেখা আর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে বরং মৃত্যুই অনেক বেশি সহজ, অনেক বেশি স্বস্তির।
(লিখেছেন আমর হাশাদ নামক একজন কারাবন্দী ও মানবাধিকার কর্মী- যিনি পরবর্তীতে কারামুক্ত হয়েছেন। অভিজ্ঞতাটি পড়ে আমাদের রাহবারদের কথা মনে পড়ে গেলো। আত্মিক অনুভূতি থেকেই লেখাটি অনুবাদ করলাম)

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন