দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

তাফহীমুল কুরআনের খুঁটিনাটি - সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ তোফায়েল

 তাফহিমুল কুরআন পড়লে একটা রেফারেন্স প্রায় সময় সামনে আসে তা হলো 'এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা'।মাওলানা মওদূদী এই এনসাক্লোপিডিয়া খরীদ করার পেছনে একটা সুন্দর ঘটনা আছে সেটা পরে বলবো। আগে তাফহিমুল কুরআন থেকে একটা মজার তথ্য বলি!

সুরা আল হিজরের ১৮ নাম্বার আয়াতের শেষ শব্দদ্বয় হলো-`শিহাবুম মুবিন` যার আভিধানিক অর্থ হলো-উজ্জ্বল আগুনের শিখা। কুরআনের অন্য জায়গায় একে বলা হয়েছে,অন্ধকার বিদীর্ণকারী অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এর মানে আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত জলন্ত নক্ষত্র হতে হবে,যাকে আমাদের ভাষায় 'উল্কাপিণ্ড' বলা হয় তেমন না। এটা অন্য কোনো ধরনের মহাজাগতিক রশ্মি অথবা এরচেয়েও তীব্র ধরনের কিছু হতে পারে যা সবার জ্ঞানের আওতার বাইরে।

আবার উল্কাপিণ্ড ও হতে পারে যাকে আমরা আকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে ছূটে আসতে দেখি। বর্তমানকালের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর দিকে যেসব উল্কা ছূটে আস্তে দেখা যায় তার সংখ্যা প্রতিদিন এক লক্ষ কোটি। এরমধ্যে দুই কোটি প্রতিদিন পৃথিবীর মধ্যাকর্ষন এলাকায় প্রবেশ করে পৃথিবীর দিকে ধাবিত হয়। তারমধ্যে কোনোরকম একটা ভূপৃষ্ঠে আসে।মহাশুণ্যে এর গতি হয় কমবেশি প্রতি সেকেন্ডে ২৬ মাইল আবার কখনো কখনো ৫০ মাইলেও পৌছায়।

এই যে এত দ্রুত গতীতে পৃথিবীতে এতো এতো উল্কাপিণ্ড পড়ে ভাবলেই গা শিউরে উঠে! তাহলে আমরা বেঁচে আছি কিভাবে? এত শক্তি ধারণ করে অসংখ্য অগনিত উল্কা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরেও যে আমরা বেঁচে আছি-এটা কিভাবে সম্ভব? উল্কাগুলো কি আদৌও পৃথিবীতে পড়ে? উল্কাপিণ্ড নিয়মিত পড়লে কি পৃথিবী থাকবে না কি ধ্বংস হয়ে যাবে? কি বলে কুরআনের অন্যন্য আয়াত? দেখা যায় যে,এই সুরার ৮ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-আকাশে আমি অনেক মজবুত দূর্গ নির্মাণ করেছি। প্রশ্ন আসতে পারে আকাশে কিরকম মজবুত দূর্গ!?

এখানে বুরুজ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ভাষায় দূর্গ, প্রাসাদ ও মজবুত ইমারাতকে বুরুজ বলা হয়। পূর্বের বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, এর অর্থ সম্ভবত উর্ধ্ব জগতের এমন সব অংশ যার মধ্যকার প্রত্যেকটি অংশকে অত্যন্ত শক্তিশালী সীমান্ত অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করে রেখেছে। যদিও সীমান্তরেখা মহাশূন্যে অদৃশ্যভাবে অংকিত হয়ে আছে তবুও সেগুলো অতিক্রম করে কোনো জিনিসের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাওয়া বেশ কঠিন। এ অর্থের প্রেক্ষিতে মাওলানা বুরুজ শব্দটিকে সংরক্ষিত অঞ্চলসমূহ বা Fortified spheres অর্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

এই যে বুরুজ বা দূর্গ বা সংরক্ষিত দেয়ালগুলোর বদৌলতেই প্রতিদিন গড়ে যে এক লক্ষকোটি উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর দিকে ছূটে আসে তা সব পথেই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এবং মাত্র একটি এসে পৃথিবী পৃষ্টে পড়তে সক্ষম হয়! পৃথিবীতে উল্কাপিন্ডের যেসব নমুনা সংরক্ষিত আছে তারমধ্যে সবচেয়ে বড়টির ওজন ৬৪৫ পাউন্ড। এ পাথরটি উপর থেকে পড়ে মাটির মধ্যে ১১ ফুট গভীরে প্রোথিত হয়েছিল!

এছাড়াও এক জায়গায় ৩৬.৫০ টনের একটি হোহার স্তুপ পাওয়া গেছে। ক্যান ইউ ইমাজিন দ্যাট! মহাশুন্য থেকে এত বড় উল্কাপিণ্ড পড়ে গিয়ে পৃথিবীতে ১১ ফুট গভীরে চলে যায় কিভাবে? তাও এত এত প্রটেকশন থাকার পরেও? এখন যদি বুরুজ বা সংরক্ষিত দেয়াল না থাকতো তাহলে এই পরিমাণ ওজনের উল্কা কত গভীরে গিয়ে দুনিয়ায় ভুমিকম্প হতো কল্পনা করা যায় কি? আর যদি সমস্ত উল্কা পৃথিবীতে এসে পড়তো তাহলে হয়তো একদিনের মধ্যেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত!

অনেক সময় খালি চোখেও এসব উল্কা দেখা যায়। এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটিনিকা ১৯৪৬ সালের ১৫ তম খন্ডের ৩৩৭-৩৩৯ পৃষ্টার হাওলায় মাওলানা মওদূদী বলেন, পুরাতন রেকর্ড থেকে জানা যায় ১৮৩৩ সালে ১৩ নভেম্বর উত্তর আমেরিকার পূর্ব এলাকায় শুধুমাত্র একটি স্থানে মাধ্য রাত থেকে প্রভাত পর্যন্ত ২ লক্ষ উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হতে দেখে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষের বসবাসের জন্য আল্লাহ তা'আলা সবসময় এগুলোকে সংরক্ষিত দেয়ালের মাধ্যমে সেখানেঈ আটকে দেন যেন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে না যায়। যেন আমরা আরোও সুযোগ পাই।

অর্থাৎ সহজ করে বললে, যে উল্কাপিণ্ড বা আলোকরশ্মি পৃথিবীর দিকে আসে, সেগুলো যদি ঠিকঠাক মতো পৃথিবীতে পড়তো। তাহলে আজকের উল্কাপিণ্ড দ্বারাই পৃথিবীটা আজকেই ধ্বংস হয়ে যেত। ফলে আমরা যে হতাশ হয়ে বলি-আল্লাহ কেন সাহায্য করেন না। এটা ভূল। কারণ সেই আল্লাহ কবেই সাহায্য করে বসে আছেন। একদিন শুধু একদিন যদি বুরুজে কাজ না করে তাহলে আগামীকালকে সূর্য দেখার সুযোগ আর আমাদের নাই। আল্লাহ আমাদের উপর যেন রহম করেন।

এবার আসা যাক, আমরা যে এনসাক্লোপিডিয়ার রেফারেন্স দেখলাম সেই এনসাক্লোপিডিয়া মাওলানা কিভাবে কিনেছিলেন সেই কথায়।মূলত মাওলানা খরীদ করেছিলেন নিজের অনুবাদের টাকা দিয়ে। তিনি উসমানিয়া ইউনিভার্সিটির তরজমা বিভাগের অনুরোধে আল্লামা সদরুদ্দিন সিরাজীর আরবী ভাষায় লিখিত দর্শন শাস্ত্রের জটিল কিতাবের শেষ দুই খন্ড অনুবাদ করেন। কিতাবটির নাম ছিল 'আল হিকমাতুল মুতা আলিয়া ফিল আসরাফিল আকালিয়া'।

সাড়ে তিন হাজার পৃষ্টার বই মাওলানা মাত্র ৮ মাসেই অনুবাদ করেন। এবং একটা মোটা অংকের পারিশ্রমিক পান। সেই টাকা দিয়েই মাওলানা অনেক তাফসীর কিনেন, পৃথিবীর বিখ্যাত গ্রন্থগুলো কিনেন এবং এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সবগুলো খন্ড কিনেন। যার ১৫ তম খন্ডের একটা রেফারেন্স পেশ করলাম।

ততকালীন সময়ে অনলাইনবীহিন একটা মানুষ এরকম অদ্ভুত সব তথ্য হাজির করে এভাবেই দুনিয়াকে অবাক করে দেন। আর এভাবেই আধুনিকতার ছোঁয়া ছাড়াই বিংশ শতাব্দীতে তিনি এনসাইক্লোপিডিয়া কে কাজে লাগান। যা নিজের অনুদিত কিতাবের টাকা দিয়েই কেনা। আর পারিশ্রমিকের বাকী ৫ হাজার টাকা মাওলানা দ্বীনের পরিকল্পিত কাজের জন্য রেখে দেন। এভাবেই মাওলানা অনুবাদের টাকাকে কাজে লাগান।

মাওলানা তাফহিমে যেসকল তথ্য দিয়ে থাকেন তা দেখলে অনেক মজা পাই। পড়তেও ভালো লাগে। আমি এখন দ্বিতীয় বারের মত তাফহীম পড়ছি। মনে হয় যেন কুরআনের সব বর্ণনা নিজের চোখের সামনেই ঘটছে।

আমরা মাওলানার কর্মী। নিজেকে দেখে লজ্জ্বা পাই।মাওলানার এই অনুবাদটা অনেক বড় বড় উস্তাদগণই করতে সাহস পান নি। কিন্তু মাওলানা করেছিলেন। এবং মাত্র ২৫ বছর বয়সে! আমরা কি এভাবে গড়ে উঠতে পারবো! নাকি অন্তত চেষ্টা করবো? আমরা হয়তো সেই চেষ্টাটাও করিনা!!

Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ