দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

আমার দৃষ্টিতে ক্ষমতা অর্জন : অন্যান্য ইসলামী দলের সাথে জামায়াতে ইসলামীর পার্থক্য

অন্যান্য স্কুল অব থট এবং জামায়াতের স্কুল অব থট এর মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা কমন পার্থক্য। ইসলামী হুকুমাত চান এমন সকল ভাই ব্রাদারদের এটা জানা একান্ত জরুরি। কোনো অবস্থার পরিবর্তনের জন্য যখন কোনো আন্দোলন পরিচালনা করতে হয় তখন সেই আন্দোলন দুইটা পদ্ধতিতে হতে পারে। এক. সশস্ত্র পন্থায় ও দুই. বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থায়।

সশস্ত্র পন্থায় আন্দোলনের জন্য কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা রচনার প্রয়োজন পড়েনা। জ্ঞান অর্জন, লোক গঠন ও সশস্ত্র বিপ্লব। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন বলতে কোনো আন্দোলন নিয়ে বুদ্ধিজীবীতা নয়। এর মানে এটা নয় যে, সবসময় বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করা হবে কিন্তু বিপ্লবের জন্য সামনে আগানো যাবেনা। এর অর্থ বরং ক্যাটাগরি করে লোক তৈরি করাকে বুঝায়। এবং অবশেষে একটা কার্যকরী বিপ্লব করা।
যারা সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করেন তারা মনে করেন খিলাফাতুন আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে জোর করে। আর জামায়াতে ইসলামী মনে করে খিলাফাতুন আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে মানুষের নৈতিক সমর্থন নিয়ে। জামায়াতে ইসলামী ও তাঁর প্রথম আমীর যখন খেলাফতের জন্য আন্দোলন শুরু করেন তখন জাতিরাষ্ট্র মাথাচাড়া দিয়ে মাত্র উঠছে। তাদের সামনে দুটি পদ্ধতিই খোলা ছিলো। হয় সশস্ত্রপন্থায় যাওয়া আর নাহয় সশস্ত্র পদ্ধতি ছাড়া নিয়মতান্ত্রিক পথ ধরে যাওয়া।

এখন আমরা দেখবো এই নিয়মতান্ত্রিক পথ বলতে মাওলানা মওদূদী কি বুঝাতেন?
মাওলানা মওদূদী তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়েছেন, রাসূল সা. কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও পদ্ধতির কথা। তিনি বলেছেন, "রাসূলে আকরাম সা. কে যে বাদশাহী প্রদানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তা ছিল এই শর্ত সাপেক্ষে যে,
`আপনি এই দ্বীন এবং এর প্রচার বন্ধ করুন-তাহলে আমরা সবাই মিলে আমাদের বাদশাহ বানিয়ে নেবো। যদি ইউসুফ আ. এর মত নিঃশর্ত ও প্রতিবন্ধকতাহীন ভাবে দেয়া হতো তাহলে রাসূল সা. সেই আহবান গ্রহণ করতেন এবং দ্বীন মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। যে জিনিস বিনা কারণে তাঁকে দেয়া হচ্ছিলো সেই জিনিস লড়াই করে নেয়ার প্রয়োজন পড়তোনা।`
নবীদের থেকে এই কর্মপদ্ধতি পেশ করার পরে তিনি বলেন, `একইভাবে জনমতের সাহায্যে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করে নিরেট ইসলামী বিধানের ভিত্তিতে তা পরিচালনা করার সুযোগ যদি আমাদেরও আসে তবে তা গ্রহণ করতে আমরা কোনো প্রকার দ্বিধা করবোনা।`
তিনি আরোও বলেছেন, নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া এবং পার্লামেন্টে যাওয়ার উদ্দেশ্য এটা নয় যে ধর্মহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করা। কিন্তু আমরা যদি কখনোও দেশের জনগণকে আমাদের আকিদা ও নীতির পক্ষে এতটা ব্যাপকভাবে একমত করতে পারি, যার ফলে আমাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সংবিধানে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে, তখন এ পন্থা অবলম্বন না করার কোনো কারণ থাকবেনা। আবারোও বলি, আমরা যদি দেশের জনগণকে আমাদের নীতি সম্মন্ধে এতটা একমত করতে পারি যার ফলে সংবিধানের পরিবর্তন আনা সম্ভব তাহলে এই পন্থা না নেয়ার কোনো কারণ নাই।
বিনা লড়াইতে সোজা পন্থায় যে জিনিস লাভ করা সম্ভব, তাকে বিনা কারণে বাঁকা আংগুলে বের করার হুকুম শরীয়াহ আমাদের দেয়নি। কিন্তু একথা ভালােভাবে বুঝে নিন, এ কর্মপন্থা আমরা কেবল তখনই অবলম্বন করবাে, যখন ?
এক. দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষে শুধু জনমত সৃষ্টি হলেই তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে;
দুই. দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে আমরা দেশবাসীর একটা বিরাট সংখ্যক লােককে আমাদের ধ্যান ধারণার সংগে একমত করতে পারবাে এবং অনৈসলামী রাষ্ট্র
ব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যে সর্ব সাধারণের পক্ষ থেকে দাবি উথাপিত হবে;
তিন. নির্বাচন এ উদ্দেশ্য অনুষ্ঠিত হবে যে, দেশের ভবিষ্যত রাষ্ট্র ব্যবস্থা কোন্ ধরনের শাসনতন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত করা হবে।"
উপরের কথাগুলো পড়লে বুঝা যায় ইসলামী শাসন কায়েম করার জন্য যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে সশস্ত্র পথ নেয়া হবে। কিন্তু মাওলানা এও আমাদেরকে বলেছেন যে, আন্ডারগ্রাউন্ড এ গিয়ে আইন ভঙ্গকারী কোনো সশস্ত্র দল গঠন করা যাবেনা। কারণ লোকজন যদি একবার আইন ভঙ্গ করা শিখে ফেলে তাহলে তাদেরকে আর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করা যাবেনা।
মাওলানা যে ঠিক বলেছেন, তা তো বর্তমান বিশ্বের সশস্ত্র দলের দিকে তাকালে দেখা যায়। প্রথমে মিশরে একদল শুধু সশস্ত্র পন্থা বেছে নেয়, পরে তালেবান। এর পরে তালেবান থেকে একিউ। একিউ থেকে আইএস। আইএস থেকে দায়েশ।
এর কারণ হলো তাদের পোশায় না। কোনো আইনেই তাদের পোশায় না। কিছুদিন যাওয়ার পরে তার কাছে মনে হয় তার শায়খ ভূল। ফলে সে ও তার মতের কয়েকজনকে নিয়ে আবারোও আরেকদল গঠন করে। একিউ তালেবকে, আইএস একিউকে, দায়েশ আইএস কে মুনাফেক, বিদয়াতী, মুরতাদ, কাফের রক্ত হালাল করা ফতোয়া দেয় এবং ছড়িয়ে দেয়, 'আপনার জন্য আমার বাবা মা কোরবান হোক ইয়া রাসুলুল্লাহ।' এভাবেই চলতে থাকে। আইন ভঙ্গ করা যাবেনা বলতে বুঝায়, বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রে কিছু আইন আছে যা আমাদের মানা ওয়াজিব। যেমন, হেলমেট পড়া, নয়েজ করে প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেয়া, ব্যক্তির ক্ষতি হয় এমন সরকারি নিষিদ্ধ জায়গায় না যাওয়া ইত্যাদি। এখন চাইলে কেউ বলতে পারে, কুফর রাষ্ট্রের এই আইনও মানিনা। কিন্তু সেটা তারই লস।
নিয়মতান্ত্রিক পন্থার যে ফিরিস্তি টানলাম তা শুধু এমন রাষ্ট্রে যেখানে মুসলমান শাসক অবস্থিত। মুসলমান ফাসেক ও জালেম রাষ্ট্রের জন্য। যেমন, ঈমান হোসাইন রা. ফাসেকের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিলেন কাফেরর না। ঈমাম আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের ফাসেকের বিরুদ্ধে খেলাফত রক্ষার জন্য লড়েছিলেন, কাফেরের বিরুদ্ধে না।
সুতরাং আমাদের আন্দোলন হলো নিয়মতান্ত্রিক ও কর্মপদ্ধতি বেইসড। এখানে এই আন্দোলনের জন্য কখনোও শত্রুকে ধৈর্য, ক্ষমা, সহনশীলতা, সম্মান করা হবে। আবার কখনোও চূড়ান্ত বাধা আসলে ন্যায়ভাবে, নৈতিক ও ধর্মীয় আহবানে সে বাধা পাড়ি দেয়া হবে, প্রয়োজনে কতলের আশ্রয় নেয়া হবে। প্রয়োজনটা নিছক কোনো প্রয়োজন নয়। নিছক প্রয়োজনে কাফের হত্যা করা বৈধ নয় এমনকি কোনো কাফের মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললে তারে ছেড়ে দিতে হয়।
যারা সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করেন তারা মনে করেন খিলাফাতুন আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে জোর করে। আর জামায়াতে ইসলামী মনে করে খিলাফাত আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে মানুষের নৈতিক সমর্থন নিয়ে।
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ