দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

সহজ ভাষায় দ্বীনে হক -সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ তোফায়েল

মুহাম্মদ সা. এর নবুয়্যত লাভের আগে পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্মন্ধে একটা স্বাভাবিক ভাবনা ছিল এই যে, ধর্ম জীবনের অনেকগুলো বিভাগগুলোর মধ্যে একটি। অর্থাৎ জীবনের অনেক বিভাগ আছে আর ধর্মও তেমনি একটি বিভাগ।তারা এও মনে করতো যে, ধর্ম হলো জীবনের একটা পরিশিষ্ট। এই ধর্ম হলো পরকালে মুক্তির একটি যুগান্তকারী মাধ্যম।

তারা আরোও ভাবতো যে, ধর্ম হলো খোদার সাথে মানুষের যে সম্পর্ক : ধর্ম মূলত তার সাথেই সংশ্লিষ্ট।
সুতরাং তারা মনে মনে ভাবতো যিনি পরকালীন মুক্তি চান তাকে উচিত অন্যন্য সব বিভাগের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে শুধুমাত্র এই বিভাগের সাথে সম্পর্ক রাখা। এই শ্রেণির মানুষকে বলা হতো বুযুর্গ বা মর্যাদাবান।তবে আরেকটি শ্রেণী ছিল যারা নিজেকে এত বেশি মর্যাদাবান ভাবতো না। তারা ভাবতো, তাদের হয়তো এতবড় মর্যাদাবান হওয়া কাম্য নয়। কোনো মতে পরকালে মুক্তির পাওয়ার আশাকেই তারা যথেষ্ট মনে করতো।

একই সাথে তারা চাইতো যেহেতু আমিও মুক্তি পাওয়ার আশায় কিছুটা খোদার সাথে সম্পর্ক রাখি সেহেতু খোদাও যেন আমার উপর একটু দৃষ্টি দেন। এবং তারা যেন দুনিয়ার জীবনে সুখ, শান্তি ও কায়কারবারে উন্নতি যেন পায় সেই আশাও রাখতো।তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল, দুনিয়ার যত কর্ম যে যে নিয়ম অনুযায়ী চালু রয়েছে সে সে নিয়মত অনুযায়ীই চলবে এবং তার সাথে কিছু ধর্মীয় অনুষ্টান ও রসম রেওয়াজ পালন করে খোদাকেও সন্তুষ্ট রাখা হবে।

মানুষ হিসেবে মানুষের সাথে, সামাজিক জীব হিসেবে সমাজের সাথে, পরিবেশ প্রতিবেশীর সাথে এবং রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রের সাথে তাদের নিজেদের যে সম্পর্ক রয়েছে, সে সম্পর্কের সাথে তার ও তার খোদার আলাদা কোনো সম্পর্ক নেই বলেই তারা ধরে নিত।তার ও তার খোদার মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল সেই সম্পর্কের মধ্যে এগুলোর আলাদা কোনো স্পেশালিটি নাই। এগুলো এগুলোর মত চলবে আর তার ও তার খোদার সম্পর্কও আলাদাভাবে চলবে।

এতক্ষণ যে আলোচনা করলাম ধর্ম সম্মন্ধে তা খুবই সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা। মনে হয় যেন এটাই ধর্ম। নিরপেক্ষ ও সহজ সরল প্রকৃতির। কিন্তু এই গোটা আলোচনা ছিল 'জাহেলি ধর্মীয় আলোচনা।' [এখনো পর্যন্ত ইসলাম আসেনি। তাই ধর্ম শব্দটাই ব্যবহার করছি আপাতত। ]এই যে ধর্মের সাথে পরিবেশ পরিস্থিতি ও সভ্যতার একটা সম্পর্কহীনতা, এর মাধ্যমেই অনেক বড়বড় ধর্মহীন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির যে দীর্ঘ ও বিলাসী প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে এর মূলে ছিল ধর্মহীনতা- চরিত্রহীনতা ও অনৈতিকতা।

ধর্মহীনতার মাধ্যমে কিভাবে এতবড় বড় সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে? এর কারণ আগে বলেছি, যারা নিজেদেরকে সত্যিকার ধার্মিক ভেবে পরকালীন মুক্তি চাইতো তারা দুনিয়ার সব বিভাগ বাদ দিয়ে শুধু পরকালের আশায় দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতো।আর দুনিয়াদারী যত কাজ কর্ম রয়েছে তা দুনিয়ার লোকেরা তাদের আপন ইচ্ছা ও বাসনায় এবং ত্রুটি নিয়ে যেমন খুশি তেমনভাবেই চালিয়েছেন। যেহেতু এরা চালাক সেহেতু একই সাথে তারা প্রয়োজনবোধে নিজেদের খোদাকে খুশি করার জন্য মাঝেমধ্যে কিছু ধর্মীয় আচার অনুষ্টানও পালন করতো।

এই তো গেল জাহেল যুগীয় ধর্মের আচার আচরণ ও অবস্থান। যদিও এখনকার অনেক মুসলমানদের সাথেও এই ভাবনার মিল পাওয়া যায় তবুও আসুন এ পর্যায়ে ধর্ম সম্মন্ধে দ্বীনের মৌলিক ধারণা বা দ্বীনে হক কি তা জেনে নেই।ইসলামকে বলা হচ্ছে একটি 'দ্বীন'। কুরআনে এসেছে এই ইসলাম হলো, একমাত্র দ্বীন। আদ দ্বীন বলা হয়েছে একে। অর্থাৎ এই ইসলাম জীবনের একটি পদ্ধতি দ্বীন নয়। বরং এই ইসলামই হচ্ছে একমাত্র দ্বীন।

ভালোকরে খেয়াল করেন নাহয় পরবর্তীতে পেঁচাবেন। বলা হচ্ছে, এই ইসলাম অন্যন্য পথের মত একটি পথ শুধু এমন নয় বরং এটিই একমাত্র পথ।সুতরাং দেখা গেল ধর্ম, সভ্যতা-সমাজ,কৃষ্টি - কালচার,বাজার-সদাই, ধর্মীয় আচার অনুষ্টান, রসম রেওয়াজ, ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবনসহ সবগুলো বিভাগ পরিচালনা ও সঠিক পথে রাখার জন্য একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ইসলাম।

আবার বলছি খেয়াল করেন, এখন বলছি কৃষ্টি কালচারের একমাত্র পথই হলো ইসলাম তাই মেনে নিচ্ছেন। যখন বলবো রাজনৈতিক কাজে শলা পরামর্শেও একমাত্র পথ হচ্ছে ইসলাম ও যখন এর ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক উদাহরণ দিব তখন ঠিকই পেঁচাবেন। তাই খেয়াল করুন ভালোভাবে।যেহেতু ইসলাম হচ্ছে এক কথা- এক মন- এক দৃষ্টিভঙ্গি-এক ভাবনা ও এক দর্শন সেহেতু ইসলামই হলো জীবনের সব কিছুর মূল কেন্দ্র। অর্থাৎ ইসলাম হলো একটি কেন্দ্রীয় শাখা।

ইসলাম আলাদা করে এক ব্যক্তি এক ব্যক্তির জীবনের পদ্ধতি নয়। একটি সমাজের পদ্ধতি নয়, একটি গোষ্টির পদ্ধতি নয়। একটি বিশেষ সময়ের পদ্ধতি নয়। বরং ইসলাম হলো গোটা সময় ও সমাজের পদ্ধতি।সুতরাং দেখা গেল ইসলাম একটা মূল দৃষ্টিকোণ যেখান থেকে ঢাল পালা ছড়িয়ে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পেশ ও প্রতিষ্টা করে থাকে। এই একই দৃষ্টিকোণ ও দৃষ্টিভঙ্গি জীবনের সমগ্র সমস্যা সমাধান করে দেয়।চাই তা তাহযীব- তমদ্দুন, ব্যক্তি-ব্যক্তি, মানুষের উপর খোদার অধিকার, তার নিজের উপর নিজের সত্ত্বার কি অধিকার, মা-বাবার অধিকার, প্রতিবেশির অধিকার, স্ত্রী-সন্তানদের অধিকার, আত্মীয়স্বজন, সম্পর্কের লোকজন, শত্রু-মিত্র, সমাজ ও রাজনীতি, পররাষ্ট্র ও অর্থনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি। এক কথায় সমগ্র মানবজাতির সমগ্র সত্ত্বার যা যা খুটিনাটি লাগে একেবারে জোতার ফিতা থেকে নিয়ে পৃথিবীর শেষ সীমানা পর্যন্ত এই বিধানের আওতায় রয়েছে।

আমার মনে হয় আরোও কিছু বিভাগ বললে আরোও ভালো হয়। এই ইসলাম মসজিদ থেকে নিয়ে বাজার ও কর্মক্ষেত্রে পর্যন্ত ইবাদাতের রীতিনীতি দিয়েছে। রেডিও চালানো থেকে নিয়ে বিমান পরিচালনা পদ্ধতি দিয়েছে, ওযু গোসলের নিয়ম দিয়েছে। পেশাব পায়খানার খুটিনাটি মাসয়ালা দিয়েছে। একেবারে পেশাব থেকে নিয়ে সমাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি -অর্থনীতি- রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কনীতি দিয়েছে।ইসলামের মূল সেন্টারেই রয়েছে সব দিক ও বিভাগের সমাধান। তাহলে হঠাৎ করে কেউ যখন এসে বলেন, রাজনীতি হবে রাজনীতি দিয়ে, কিংবা রাজনৈতিক বিজয় ও নৈতিক বিজয় আলাদা বিষয় তখন তিনি মূল থেক চ্যুত। ইসলাম থেকেই তিনি চ্যুত হয়ে যাবেন। যদি সে মুসলমান হিসেবেও থাকে তবুও সে বড়জোর আরবের বেদুঈন মুসলমানদের মত নিরিহ মুসলমান।
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ