দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

সহজ ভাষায় ইকামাতে দ্বীন - সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ তোফায়েল

 যেকোন ধরনের সংস্কারের নাম বিপ্লব নয়। বিপ্লব হলো একটা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের নাম। বিশ্বে অনেক সময় অনেক ধরনের বিপ্লব হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের বিপ্লব হয়। কেউ সরকারকে হত্যা করে বিপ্লব করে কেউ অন্য পন্থায়।

আরেক ধরনের বিপ্লব রয়েছে যা সমাজে হয়ে থাকে তার নাম সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের বিপ্লব। এটি মূলত আদর্শিক বিপ্লব। কারণ হলো যেকোন সমাজে বায়বীয় হলেও একটা আইন থাকে যা বিধান নামে পরিচিত। এই বায়বীয় বা অদৃশ্যমান বিধানের নামই আদর্শ। সেই আদর্শকে আরেকটি আদর্শ দিয়ে পরিবর্তনের নামই সামাজিক বিপ্লব।এখন জানা দরকার ইসলামী বিপ্লব কি?

এর প্রথম উত্তর বর্তমান সমাজব্যবস্থা পরিপূর্ণ ইসলাম মোতাবেক না। তাই ইসলাম মোতাবেক এই সমাজকে পরিচালনার জন্য দরকার ইসলামী বিপ্লবের। আমাদের সমাজে বিশাল একটা অংশ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের আইন ইসলামী না।যার কারণে ইসলামের আইনের সাথে কুফরী বা অস্বীকার করার মত আচরণ করা হয়। তথাপি এখানের মানুষের মাঝেও ফাসেকী ও মুনাফিকী বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং এই সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন করে এবং মানুষের মন থেকে ফাসেকী দূর করে। ইসলামের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ও ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্টার নামই হলো ইসলামী বিপ্লব বা ইসলামী আন্দোলন।

কুরআন মাজীদে এই সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে এভাবে, `আমি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছি এভাবে,যার হুকুম আমি দিয়েছিলাম নুহকে। আর (হে মুহাম্মাদ) এখন আমার ওহীর বার্তা তোমার কাছে পাঠিয়েছি।আর যার হেদায়েত আমি ইবরাহীম, মূসা ও ঈসার কাছে পাঠিয়েছিলাম। এই তাকীদ যে, "কায়েম করো এই দ্বীনকে" এবং এ ব্যাপারে বিচ্ছিন্ন হইয়োনা।`এই আয়াতের স্পষ্ট বাণী হলো নবীদের আগমনের মূল উদ্দেশ্যই হলো দ্বীনের বাস্তবায়ন বা আইনের বাস্তবায়ন। একেই বলা হয় ইকামাতে দ্বীন। যার অর্থ দ্বীন কায়েম করা দ্বীনের আইন চালু করা। আর যেহেতু এ সমাজে আমাদের বসবাস সুতরাং এ সমাজেই দ্বীনের আইন চালু করার তাগীদই আমাদেরকে দেয়া হচ্ছে।

ইসলামী বিপ্লবের কথা আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে এরকম করে যে, "লিইউজহিরাহু আলাদ্বীনি কুল্লি" অর্থাৎ অন্য সকল দ্বীনের উপর একে বিজয়ী করার জন্য। তাফসীরগুলোতে এরকম পাওয়া যায়, অন্য সকল মতবাদ ও দর্শন থেকে এই আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করে, আল্লাহর আইন চালু করার নামই হলো ইসলামী বিপ্লব। অন্য সব ধর্মীয় আইন ও মতবাদ থাকবে কিন্তু তার অবস্থান হবে দ্বীনের আইনের তলানিতে।আল কুরআনে মুমীনদেরকে ইসলামে পরিপূর্ণভাবে দাখিল হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, 'উদখুলু ফিসসিলমি কাফফা' অর্থাৎ তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। তার মানে আমরা মুসলমান হওয়ার পরেও প্রবেশ করিনি। করতে হবে কিভাবে? দ্বীনকে অন্য সকল মতবাদের উপরে স্থান দিয়ে, সেই নিয়ম চালু করে।

আবার আল্লাহ এই কথা বলার পরে বলছেন, "তোমরা যদি ইসলামের কিছু জিনিস মানো ও কিছু মানো না তাহলে তোমাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে রয়েছে আযাব।" এজন্য ইসলামে পুরোপুরি ঢুকতে হবে মানে হলো এই বিধান কায়েম করতে হবে এবং করতে হবে এর পরিপূর্ণ অনুসরণ। ইসলামী সমাজ কায়েম থাকলে মানুষের জন্য পরিপূর্ণভাবে ইসলামকে মানা ও অনুসরণ করা সহজতর হয়।সুতরাং এই দৃষ্টিতেই ইসলামী বিপ্লব মানেই হুকুমাতে ইলাহিয়া বা খেলাফতের ইলাহিয়া। এর অর্থই হলো আল্লাহর আইন(হুকুম) বা আল্লাহর খেলাফত সমাজে পুরোপুরি চালু করা। কুরআনে বলা হয়েছে মানব সমাজে শুধুই আইন চলবে আল্লাহর- ইনিল হুকমু ইল্লালিল্লাহ বা আল্লাহর আইন ছাড়া আর কারোও আইন চলবেনা। কুরআনে আরোও কঠোরভাবে বলা হয়েছে, "সাবধান! সৃষ্টি যেহেতু আল্লাহর হুকুমও চলবে আল্লাহরই।"

এই কাজটি যারা করবেন সে হোক কোনো গোষ্টি বা দল কিংবা কোনো জাতি তাদেরকেই কুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, উত্তম জাতি। আল্লাহ বলছেন, একটি দল এমন থাকাই লাগবে যার কাজ হবে দুনিয়ায় ভালো কাজের দিকে মানুষকে ডাকবে এবং খারাপ কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখবে। যেহেতু সমাজে ভালো ও খারাপ বিদ্যমান সুতরাং এই দল যখন এই কাজগুলো প্র্যাক্টিস করবে তখন তাদের লাগবে শক্তি।আর আমরা সবাই জানি দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় শক্তি হলো "রাষ্ট্রশক্তি"। এই রাষ্ট্র শক্তির জন্য স্বয়ং আল্লাহর রাসুল দোয়া করতেন। এবং বলতেন, "আমার পরওয়ারদিগার! আমাকে যেখানেই তুমি নিয়ে যাও সত্যতার সাথে নিয়ে যাও এবং যেখান থেকেই বের করো সত্যতার সাথে বের করো। এবং তোমার পক্ষ থেকে একটি কর্তৃত্বশীল পরাক্রান্ত শক্তিকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও।"

যখন দ্বীনের শক্তি বা রাষ্ট্রশক্তি দান করা হয় তখন আমাদেরকে বলা হয় এখন আমরা যেন প্রথমত ৪ টি কাজ করি। এক. নামাজ কায়েম করি। ২.যাকাদ আদায় করি। ৩. ভালো কাজের আদেশ দেই এবং ৪. মানুষকে অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখি।

যখন এইসবগুলো কাজ আমরা পরিপূর্ণ ভাবে পালন করতে পারবো। তখন আমাদেরকে আল্লাহর আরেকটি বিধানের কথা বলা হচ্ছে, জা আল হাক্কা ওয়াযাহা ক্বাল বাতিল,ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুক্বা। অর্থাৎ নিশ্চয়ই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হবেই।
Share:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আর্কাইভ