মাওলানার জবাব:
আপনার এই প্রশ্ন তো ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কে তাদের উদ্দেশ্যে ব্যাপারে নিরাশ করার একটি বক্তৃতা ৷ যদিও এর উদ্দেশ্য নিজে নিরাশ হওয়া এবং অন্যদেরকে নিরাশায় নিমজ্জিত করা নয় ৷বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা ভাবনা করার জরুরি ৷
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মত মহান মুরুব্বী নিজ সাথীদের সামনে যেমনভাবে শ্রেষ্ঠতম আদর্শ পেশ করেছিলেন, নিঃসন্দেহে কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানেরা সেরকম নেতৃত্ব লাভ করবে না ৷ একইভাবে তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যেভাবে উন্নত মানের কর্মীবাহিনী ইসলামী দাওয়াতের কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য তখন প্রস্তুত হয়েছিল , সেরকম কর্মী বাহিনী তৈরি করাও কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় ৷ কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, আমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব না ? এই কাজ থেকে বিরত হবার জন্য যদি এ ধরনের যুক্তি পেশ করা হয় ,তবে তার কেবল দুটিই পরিণতি হতে পারে ৷ হয়তো, পৃথিবী বাতির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকবে আর আমরা তার অনুগত হয়ে থাকবো ৷নয়তো, আমরা নিজেরাও বাতিল সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার কাজে আত্মনিয়োগ করব, যাতে করে পার্থিব স্বার্থ ও ও বিলাসের মধ্যে ভালোভাবে নিমগ্ন হয়ে থাকতে পারি ৷ এর জন্য কোন প্রকার উন্নত নৈতিক চরিত্রের প্রয়োজনি নেই৷ কেবল অধঃপতিত হওয়াই আসল কাজ৷ আরে কাজের জন্য কোন প্রকার চেষ্টা শ্রমিক প্রয়োজন হয় না, তা এমনিতেই লাভ করা যায় ৷
এই প্রশ্নের মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যারা নেক নিয়তের সাথে এ ধরনের চিন্তাভাবনা করেন ,আমি মনে করি ,তারা কখনো চিন্তা করে দেখেন নাই ধরনের চিন্তাভাবনা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে পৌঁছাবেন ৷ এর পরিবর্তে তারা যদি সোজা চিন্তা করতেন, তবে আমাদের সামনে সরল পথ পরিষ্কার হয়ে দেখা দিত ৷ মুমিনের জন্য সরল পথ সঠিক ৷
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীয়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর যতটা উন্নত মানের পৌঁছেছিলেন বলে তার দৃষ্টিগোচর হবে ৷ তিনি সেদিকে আরোহণ করার জন্য যতটা চেষ্টা করা সম্ভব করবেন এবং সারাজীবন করতে থাকবেন নিজের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোন প্রকার ত্রুটি করবেন না৷ এই উচুঁমানে আরোহন করার প্রাণান্তকর চেষ্টা এ নিরত থেকে যদি কেউ পড়ে মারাও যাই তবু সে সফলকাম হবে ৷কিন্তু, যদি কেউ এই চূড়ান্ত আরোহন করা অসম্ভব মনে করে নিচের দিকে নামতে শুরু করে ,তবে নামা হবে খুব সহজ বটে ৷ কিন্তু পড়বে এমন জায়গায় যেখানে পড়লে তার হাড়গোড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে৷
মনোযোগের সাথে কোরআন পড়ুন, দেখবেন কোরআনে মানুষকে নৈতিক চরিত্র উন্নয়ন করার কাজ থেকে নিরাশ করে না বরঞ্চ উৎসাহ দেয়, সাহস দেয় ৷“যে আল্লাহর পথে দান করল আল্লাহর হুকুম অমান্য করা থেকে আত্মরক্ষা করল এবং সত্য সুন্দর ও কল্যাণকে মেনে নিল আমি তাকে সহজ পথে চলার সহায়তা দান করব"( আল লাইল 5 - 7)আর যারা আমার পথে চেষ্টা সাধনা করবে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করব৷ (সুরা আনকাবুত 69 )
সুতরাং আমরা আপনারা আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা চালিয়ে যান এবং তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন ৷ এক একটি করে কাজের দুর্বলতা ও ত্রুটি চিহ্নিত করুন এবং তা দূর করার আপ্রাণ চেষ্টা করুন৷ নিজের মধ্যে যেসব উত্তম গুণ ও যোগ্যতা রয়েছে সেগুলো কে চিহ্নিত করুন ৷ এবং সেগুলোর উন্নতি সাধন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান৷
আত্মশুদ্ধির এই প্রক্রিয়ায় কোরআন হাদিস এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর সিরাত, সাহাবায়ে কিরাম ও উম্মতের শ্রেষ্ঠ মনিষীদের সেরা মনিষীদের জীবনী অধ্যায়ণের মাধ্যমে সাহায্য পাওয়া যাবে ৷ আন্দোলনে শরিক প্রত্যেক ব্যক্তি যদি এই প্রচেষ্টা আত্মনিয়োগ করে তবে তারাও প্রত্যেকে একে অপরকে সাহায্য করতে পারেন ৷
এভাবে নিজেকে নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত করা এবং নৈতিক মানে উন্নতির দিকে যাবার চেষ্টায়, আপনি আল্লাহর উপর ভরসা রেখে করতে পারেন ৷আল্লাহ তাআলা আপনাকে ততই উন্নতমানের পৌছাতে সাহায্য করবেন৷ এটা আল্লাহতালার ওয়াদা আর তিনি কখনোই নিজের ওয়াদা ভঙ্গ করেন না ৷৷
এ প্রসঙ্গে আর একটি কথা মনে রাখবেন ৷তা হলো, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করা টায় সংশোধন ও উন্নতি লাভের বড় উপায় ৷বরঞ্চ সঠিক কথা এই যে, ইসলামের কাম্য উন্নত নৈতিক মান কেবল বাতিল মোকাবেলায় সংগ্রাম করে যাওয়া এবং সত্যের উপর অবিচল থাকার প্রচেষ্টায় জানবাজি করার মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে ৷ এক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা মান মর্যাদা দেখে আপনার মধ্যে বিস্ময়ো হতাশার সৃষ্টি হয়েছে ,তাদের সেই উন্নত মান নির্জনে ধ্যান বা চিল্লার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি৷
বরং আল্লাহর দ্বীনের পথে কাজ করতে গিয়ে ,মার খেয়ে কেয়,অত্যাচার-নির্যাতন সয়ে সয়ে, জেল জুলুম বরদাস্ত করে করে, ক্ষুধা দারিদ্র্যের নিষ্পেষিত হয়ে হয়ে, অকাতরে সমস্ত পার্থিব ক্ষতি মেনে নিয়ে , বিপদ আর বিপদ মোকাবেলা মোকাবেলা করে করে এবং অকাতরে জানমালের কুরবানী দিয়ে দিয়েই তাদের উন্নত মান অর্জিত হয়েছে৷
কোন ব্যক্তির মধ্যে যদি আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি আকর্ষণ না থাকে তবে ,এ ধরনের মরুভূমি পাড়ি দিতে সে পারবে না আল্লাহ এবং তাঁর দ্বীনের প্রেমিকরা যখন বিপদের সাহারা পাড়ি দিতে আরম্ভ করে ৷তখন এই পথের প্রতিটি আঘাত খেয়ে খেয়ে তার প্রেম আরো অধিক বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ এভাবে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি প্রবল জোয়ার আসে৷ আর এই প্রেমের জোয়ারই তাকে মানব মর্যাদা চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যায়৷আপনি বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং তদস্থলে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জান বাজি রেখে কাজ করুন দেখবেন আল্লাহ আপনার সাথে কৃপণের মতো আচরণ করবেন না৷
আপনার ধারনা আমাদের মত দুর্বলদের দ্বারা ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় দুষ্কর৷ আর যদি হয় তবে তা তিরিশ বছর তো দূরের কথা 30 দিন টিকবে না৷ এ প্রসঙ্গে কেবল আপনাকে এতটুকুই বলতে পারি যে ,ইসলাম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেয়ার দায়িত্ব আপনার উপর অর্পণ করা হয়নি, বরঞ্চ এর জন্য জান বাজি রেখে প্রচেষ্টা সংগ্রাম করার দায়িত্ব আপনার উপর অর্পিত করা হয়েছে৷ ইসলামী বিপ্লব সাধিত হওয়া আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল৷ আর বিপ্লব সাধিত হলে তা কতদিন টিকবে তাও তার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল৷ সুতরাং এই ধরনের কথাবার্তা চিন্তা করে হতাশায় নিরাশায় নিমজ্জিত হওয়া বৈধ নয় ৷ আপনার উপর দিয়ে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে আপনার সাধ্য অনুযায়ী তার সর্বোত্তম পন্থায় সম্পাদন করে যাওয়ার চেষ্টা করুন ৷ আর যে দায়িত্ব আল্লাহর ,তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন।
@মাসিক পৃথিবী

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন