দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে জীবনের সাফল্য নিহিত

সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ইসলামের হুকুম কি?

এক যুবকের প্রশ্নঃ-মাওলানা! সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ইসলামের হুকুম কি?

মাওলানার উত্তরঃ-আল্লাহর নবী সা. বলেন,সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র উৎখাত করার জন্যে তাঁকে পাঠানো হয়েছে।
যুবকটি এবার কয়েকজন বুজর্গানে দ্বীনের নাম করে বলেন যে,তাঁদের একজন সেতার বাজাতেন।অন্যান্যরাও সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।এ সম্পর্কে কি বলা যেতে পারে?
মাওলানা বলেন,কোনো ব্যক্তির কথা ও কাজকে নবীর কথা ও কাজের মোকাবিলায় পেশ করা যেতে পারে না।
এবার আমি যদি মাওলানাকে প্রশ্ন করি, মাওলানা!কিছু লোক বলে যে,সংগীত রুহের খোরাক।এ ব্যাপারে কি বলবেন?
মাওলানা বলেন,সংগীত রুহের খোরাক হলে সর্বপ্রথম আম্বিয়ায়ে কেরাম [আ.] এর ব্যবস্থা করতেন।যেহেতু কোনো নবীই সংগীতের কোনো ব্যবস্থা করেননি,অতএব এর দ্বারা প্রমাণিত হয়না যে,সংগীত কখনো রুহের খোরাক হতে পারে।
মাওলানা আরোও বলেন,আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যেসব জিনিসেরই প্রয়োজন হতে পারে,আল্লাহর শেষ নবী [সা.] তা বলে দিয়েছেন।তারপর আমরা আত্মার খোরাকের জন্য অথবা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য এদিক ওদিক ছোটাছুটি করবো কেন?
Share:

ঘুরে ফিরে মুসলিম হত্যা করাই যেন টার্গেট...আলী আহমাদ মাবরুর

ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি, পিআরএস একটি গবেষণায় জানিয়েছিল, ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ওয়ার অন টেরর শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক হিসেবেই ৬০ লাখের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে, যার সিংহভাগ মুসলিম। ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে নানা অজুহাতে এ হত্যাকান্ডগুলো ঘটেছে।

Share:

আত্মনিয়ন্ত্রন-আলী আহমাদ মাবরুর

১। আত্মনিয়ন্ত্রনের অর্থ হলো, চারিপাশে যা কিছুই হয় তাতেই হুটহাট প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করা। বরং এমন বিষয়েই কথা বলা বা প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত, যে বিষয়ে আমাদের নিজেদের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে অথবা আমরা অন্য কারো কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি।

মানুষ তার এক জীবনে অসংখ্যবার এমন সময় পার করে যখন তাকে সক্রিয় থাকতে হয় আবার অনেক সময় এমনও আসে, যখন তাকে নিষ্ক্রিয় থাকতে হয়।
রাসুল সা. বলেছেন, “প্রতিটি কাজেরই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবেদন থাকে। তারপর সময় যখন চলে যায়, তখন আবেদনটাও নি:শেষ হয়ে যায়।” (ইবনে হিব্বান)
বর্তমান সময়ে আমাদের কার্যক্রম বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের ইস্যুভিত্তিক তাৎক্ষনিক সক্রিয়তা দেখে রাসুলের সা. এ হাদিসটির যথার্থতা যেন বারবার প্রমাণ হয়।
আমাদের এ ধরনের কাজে বেশি ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করা উচিত, যে কাজগুলো এখন হচ্ছে কিন্তু এর আবেদন ও প্রভাব অনেকদিন পরেও একইভাবে টিকে থাকে। আর এ ধরনের স্থায়ী পরিণামদর্শী অনেক কাজের পথ ইসলাম আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে।
যদি একটি কাঠামোকে চুড়ান্ত ও স্বার্থক পরিণতি দিতে হয়, তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে নগদ কাজেরও প্রয়োজন আছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করে কাজ করা প্রয়োজন।
 

২। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রা. প্রায় সময়ই বলতেন, “মানুষ আদিসূত্রে সকলেই এক। কেননা তাদের পিতা হলেন আদম আ. আর মা হলেন হাওয়া আ.। মানুষ গাঠনিকভাবেও সদৃশ। তাদের রূহের গন্তব্যও একই স্থানে। শরীরের হাড় ও গোশতও একইভাবে সজ্জিত।
প্রকৃতপক্ষে, মানুষে মানুষের পার্থক্য নিহিত থাকে তার জ্ঞানে। কিংবা কোন মানুষ কতজনকে হেদায়েতের পথে ধাবিত করতে পারলো, সেখানেই তার স্বার্থকতা। একজন ব্যক্তি যে কাজটি ভালোভাবে করতে পারে তাই তার জন্য সবচেয়ে বেশি স্বস্তির কারণ হয়। কারণ, মানুষের কর্মেই তার নামের পরিচিতি। অপরদিকে, মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু হলো তার অজ্ঞতা কারণ অজ্ঞ মানুষেরাই জ্ঞানীদেরকে অবমুল্যায়ন করে।”


Share:

আমার দৃষ্টিতে ক্ষমতা অর্জন : অন্যান্য ইসলামী দলের সাথে জামায়াতে ইসলামীর পার্থক্য

অন্যান্য স্কুল অব থট এবং জামায়াতের স্কুল অব থট এর মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা কমন পার্থক্য। ইসলামী হুকুমাত চান এমন সকল ভাই ব্রাদারদের এটা জানা একান্ত জরুরি। কোনো অবস্থার পরিবর্তনের জন্য যখন কোনো আন্দোলন পরিচালনা করতে হয় তখন সেই আন্দোলন দুইটা পদ্ধতিতে হতে পারে। এক. সশস্ত্র পন্থায় ও দুই. বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থায়।

সশস্ত্র পন্থায় আন্দোলনের জন্য কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা রচনার প্রয়োজন পড়েনা। জ্ঞান অর্জন, লোক গঠন ও সশস্ত্র বিপ্লব। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন বলতে কোনো আন্দোলন নিয়ে বুদ্ধিজীবীতা নয়। এর মানে এটা নয় যে, সবসময় বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করা হবে কিন্তু বিপ্লবের জন্য সামনে আগানো যাবেনা। এর অর্থ বরং ক্যাটাগরি করে লোক তৈরি করাকে বুঝায়। এবং অবশেষে একটা কার্যকরী বিপ্লব করা।
যারা সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করেন তারা মনে করেন খিলাফাতুন আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে জোর করে। আর জামায়াতে ইসলামী মনে করে খিলাফাতুন আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে মানুষের নৈতিক সমর্থন নিয়ে। জামায়াতে ইসলামী ও তাঁর প্রথম আমীর যখন খেলাফতের জন্য আন্দোলন শুরু করেন তখন জাতিরাষ্ট্র মাথাচাড়া দিয়ে মাত্র উঠছে। তাদের সামনে দুটি পদ্ধতিই খোলা ছিলো। হয় সশস্ত্রপন্থায় যাওয়া আর নাহয় সশস্ত্র পদ্ধতি ছাড়া নিয়মতান্ত্রিক পথ ধরে যাওয়া।

এখন আমরা দেখবো এই নিয়মতান্ত্রিক পথ বলতে মাওলানা মওদূদী কি বুঝাতেন?
মাওলানা মওদূদী তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়েছেন, রাসূল সা. কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও পদ্ধতির কথা। তিনি বলেছেন, "রাসূলে আকরাম সা. কে যে বাদশাহী প্রদানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তা ছিল এই শর্ত সাপেক্ষে যে,
`আপনি এই দ্বীন এবং এর প্রচার বন্ধ করুন-তাহলে আমরা সবাই মিলে আমাদের বাদশাহ বানিয়ে নেবো। যদি ইউসুফ আ. এর মত নিঃশর্ত ও প্রতিবন্ধকতাহীন ভাবে দেয়া হতো তাহলে রাসূল সা. সেই আহবান গ্রহণ করতেন এবং দ্বীন মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। যে জিনিস বিনা কারণে তাঁকে দেয়া হচ্ছিলো সেই জিনিস লড়াই করে নেয়ার প্রয়োজন পড়তোনা।`
নবীদের থেকে এই কর্মপদ্ধতি পেশ করার পরে তিনি বলেন, `একইভাবে জনমতের সাহায্যে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করে নিরেট ইসলামী বিধানের ভিত্তিতে তা পরিচালনা করার সুযোগ যদি আমাদেরও আসে তবে তা গ্রহণ করতে আমরা কোনো প্রকার দ্বিধা করবোনা।`
তিনি আরোও বলেছেন, নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া এবং পার্লামেন্টে যাওয়ার উদ্দেশ্য এটা নয় যে ধর্মহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করা। কিন্তু আমরা যদি কখনোও দেশের জনগণকে আমাদের আকিদা ও নীতির পক্ষে এতটা ব্যাপকভাবে একমত করতে পারি, যার ফলে আমাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সংবিধানে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে, তখন এ পন্থা অবলম্বন না করার কোনো কারণ থাকবেনা। আবারোও বলি, আমরা যদি দেশের জনগণকে আমাদের নীতি সম্মন্ধে এতটা একমত করতে পারি যার ফলে সংবিধানের পরিবর্তন আনা সম্ভব তাহলে এই পন্থা না নেয়ার কোনো কারণ নাই।
বিনা লড়াইতে সোজা পন্থায় যে জিনিস লাভ করা সম্ভব, তাকে বিনা কারণে বাঁকা আংগুলে বের করার হুকুম শরীয়াহ আমাদের দেয়নি। কিন্তু একথা ভালােভাবে বুঝে নিন, এ কর্মপন্থা আমরা কেবল তখনই অবলম্বন করবাে, যখন ?
এক. দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষে শুধু জনমত সৃষ্টি হলেই তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে;
দুই. দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে আমরা দেশবাসীর একটা বিরাট সংখ্যক লােককে আমাদের ধ্যান ধারণার সংগে একমত করতে পারবাে এবং অনৈসলামী রাষ্ট্র
ব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যে সর্ব সাধারণের পক্ষ থেকে দাবি উথাপিত হবে;
তিন. নির্বাচন এ উদ্দেশ্য অনুষ্ঠিত হবে যে, দেশের ভবিষ্যত রাষ্ট্র ব্যবস্থা কোন্ ধরনের শাসনতন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত করা হবে।"
উপরের কথাগুলো পড়লে বুঝা যায় ইসলামী শাসন কায়েম করার জন্য যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে সশস্ত্র পথ নেয়া হবে। কিন্তু মাওলানা এও আমাদেরকে বলেছেন যে, আন্ডারগ্রাউন্ড এ গিয়ে আইন ভঙ্গকারী কোনো সশস্ত্র দল গঠন করা যাবেনা। কারণ লোকজন যদি একবার আইন ভঙ্গ করা শিখে ফেলে তাহলে তাদেরকে আর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করা যাবেনা।
মাওলানা যে ঠিক বলেছেন, তা তো বর্তমান বিশ্বের সশস্ত্র দলের দিকে তাকালে দেখা যায়। প্রথমে মিশরে একদল শুধু সশস্ত্র পন্থা বেছে নেয়, পরে তালেবান। এর পরে তালেবান থেকে একিউ। একিউ থেকে আইএস। আইএস থেকে দায়েশ।
এর কারণ হলো তাদের পোশায় না। কোনো আইনেই তাদের পোশায় না। কিছুদিন যাওয়ার পরে তার কাছে মনে হয় তার শায়খ ভূল। ফলে সে ও তার মতের কয়েকজনকে নিয়ে আবারোও আরেকদল গঠন করে। একিউ তালেবকে, আইএস একিউকে, দায়েশ আইএস কে মুনাফেক, বিদয়াতী, মুরতাদ, কাফের রক্ত হালাল করা ফতোয়া দেয় এবং ছড়িয়ে দেয়, 'আপনার জন্য আমার বাবা মা কোরবান হোক ইয়া রাসুলুল্লাহ।' এভাবেই চলতে থাকে। আইন ভঙ্গ করা যাবেনা বলতে বুঝায়, বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রে কিছু আইন আছে যা আমাদের মানা ওয়াজিব। যেমন, হেলমেট পড়া, নয়েজ করে প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেয়া, ব্যক্তির ক্ষতি হয় এমন সরকারি নিষিদ্ধ জায়গায় না যাওয়া ইত্যাদি। এখন চাইলে কেউ বলতে পারে, কুফর রাষ্ট্রের এই আইনও মানিনা। কিন্তু সেটা তারই লস।
নিয়মতান্ত্রিক পন্থার যে ফিরিস্তি টানলাম তা শুধু এমন রাষ্ট্রে যেখানে মুসলমান শাসক অবস্থিত। মুসলমান ফাসেক ও জালেম রাষ্ট্রের জন্য। যেমন, ঈমান হোসাইন রা. ফাসেকের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিলেন কাফেরর না। ঈমাম আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের ফাসেকের বিরুদ্ধে খেলাফত রক্ষার জন্য লড়েছিলেন, কাফেরের বিরুদ্ধে না।
সুতরাং আমাদের আন্দোলন হলো নিয়মতান্ত্রিক ও কর্মপদ্ধতি বেইসড। এখানে এই আন্দোলনের জন্য কখনোও শত্রুকে ধৈর্য, ক্ষমা, সহনশীলতা, সম্মান করা হবে। আবার কখনোও চূড়ান্ত বাধা আসলে ন্যায়ভাবে, নৈতিক ও ধর্মীয় আহবানে সে বাধা পাড়ি দেয়া হবে, প্রয়োজনে কতলের আশ্রয় নেয়া হবে। প্রয়োজনটা নিছক কোনো প্রয়োজন নয়। নিছক প্রয়োজনে কাফের হত্যা করা বৈধ নয় এমনকি কোনো কাফের মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললে তারে ছেড়ে দিতে হয়।
যারা সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করেন তারা মনে করেন খিলাফাতুন আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে জোর করে। আর জামায়াতে ইসলামী মনে করে খিলাফাত আ'লা মিনহাজিন নবুয়্যত আসবে মানুষের নৈতিক সমর্থন নিয়ে।
Share:

মিশরের এক কারাবন্দীর হৃদয় বিদারক স্মৃতিচারণ - আলী আহমাদ মাবরুর



আমাদের এখানে বন্দীরা মরে যাবার আগেই হাজার বার মরে। অন্তত এভাবেই আমি মিশরের কারাবন্দী মানুষগুলোর জীবনকে মুল্যায়ন করি। এ জুলুম আরো বেশি দুর্বিষহ হয়ে যায়, তাদের জন্য যাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা হয়ে গেছে। তারা প্রতিটি মুহুর্তেই মৃত্যুকে বরণ করে নেয়ার জন্য অপেক্ষা করে। সেই মৃত্যু যতক্ষন না আসে, ততক্ষন তাদের বারবার হত্যা করা হয়।
মিশরের কারাবন্দী মানুষগুলোকে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে হত্যা করা হচ্ছে- এ ঘটনাগুলোকে আপনি বলতে পারেন জুলুম, কিংবা নিপীড়ন অথবা ঠান্ডা মাথায় হত্যা। যাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষিত হয়েছে, তাদের পরিণতি বড্ড দুর্বিষহ। এদের অধিকাংশই রায় কার্যকরের আগেই নানা ধরনের ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হয়ে যায়।
তাদেরকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে একা একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। ঘরটি ছোট্ট, অন্ধকার। অনেকটা কবরের মতো। দুই থেকে তিন মিটার লম্বা হয় ঘরগুলো। ৭০ শতাংশ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তকে কয়েকজন ধরে বেধে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যেতে হয়। কারণ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে একটানা বসে থাকতে থাকতে তাদের হাটার ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিদিন একবার মাত্র সেলের দরোজা খোলা হয়। মানুষগুলো সারাদিনের চেপে রাখা টয়লেট থেকে তখনই নিষ্কৃতি পাওয়ার সুযোগ পায়। গোটা দিনে এক পিস মাত্র রুটি খান তারা। প্রতিটি মুহুর্তে তারা অপেক্ষা করেন, কারা কর্মকর্তা আসবে, তাদেরকে ফাঁসির মঞ্চে টেনে নিয়ে যাবে। দিন-রাতের হিসেব তারা বুঝেন না। কতদিন গেলো তারা জানেন না। তারা শুধু জানেন, কীভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
আমি ছিলাম ওয়াদি আল নাতরুন নামক মরু কারাগারে। আমার বন্ধুদের যখন সেল থেকে বের করা হলো, আমি তাদের বিদায় জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তারা বোধ হয় মুক্তি পাচ্ছে। তাদের সাথে আর কোনোদিন আমার আর দেখাও হয়নি। পরে জেনেছি, তাদের সকলকেই ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
২০১৫ সালে আমাকে নাতরুন থেকে কায়রোর আপীল কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। গিলোটিন রুমের পাশেই আমি থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। একদিন সকালের কথা। আমার ঘুম ভাঙলো প্রচন্ড আর্তনাদ আর চিৎকারের শব্দ শুনে। বেশ অনেকক্ষন চিৎকারটি শুনেছিলাম। তারপর শুধুই নিরবতা। মিশরে গিলোটিন রুমেই মৃত্যুদন্ডগুলো কার্যকরা করা হয়। একজন মানুষকে লোহার মেশিনের মাঝে ছেড়ে দিলে লোহার আঘাতে শরীরের হাড়গুলো একে একে সব ভেঙে গেলে যেমন শব্দ হয়, আমি অনেকবার এ শব্দগুলো শুনেছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, গিলোটিনে শেষ হয়ে যাওয়া মানুষটির সাথে সাথে আমার নিজেরও যেন মৃত্যু হয়েছে। আমি আজও ঘুমের ঘোরে মানুষের হাড়ভাঙার সেই শব্দ শুনি।
আমি মৃত্যুর আগে হত্যাকান্ডের সেই বিভৎসতার শব্দ আরো অনেকবার শুনেছি। গিলোটিন রুম কিংবা মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের সেল থেকে আমি কুরআন তেলাওয়াতের শব্দও শুনেছি বহুবার। প্রতিটি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ইখওয়ান নেতৃবৃন্দ অনবরত কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তাদের হাতে কুরআন দেয়া হতো না। তারা মুখস্থ তেলাওয়াত করতেন।
একদিনে আমি ৫ জনের মৃত্যুদন্ডও কার্যকর হতে দেখেছি। মানুষগুলো আস্ত শরীরে গিলোটিন রুমে ঢুকতেন। আর তাদের বিচ্ছিন্ন আর টুকরো টুকরো দেহ সেখান থেকে বের হতো। আমি নিজের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতাম। বার বার মনে হতো, মৃত্যুকে এত কাছ থেকে বারবার দেখা আর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে বরং মৃত্যুই অনেক বেশি সহজ, অনেক বেশি স্বস্তির।
(লিখেছেন আমর হাশাদ নামক একজন কারাবন্দী ও মানবাধিকার কর্মী- যিনি পরবর্তীতে কারামুক্ত হয়েছেন। অভিজ্ঞতাটি পড়ে আমাদের রাহবারদের কথা মনে পড়ে গেলো। আত্মিক অনুভূতি থেকেই লেখাটি অনুবাদ করলাম)
Share:

ইসলামী আন্দোলন ও মাওলানা মওদুদীঃ কিছু প্রতিক্রিয়া ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ -মাওলানা জলিল আহসান নদভী


পিডিএফ লিংক : Download

[রামপুর  (ভারত) থেকে প্রকাশিত যিকরা পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ  মোঃ ইউসুফ যাদের যাদেরাহ ও রাহে আমল গ্রন্থদ্বয়ের প্রণেতা প্রণেতা বিখ্যাত আলেমেদ্বীন এবং কোরআন হাদিস ও আরবি ভাষার সুপণ্ডিত মাওলানা জলিল আহসান নদভী কে প্রশ্ন গুলো করেন । প্রশ্নের জবাব গুলো পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই মাওলানা মওদুদী রহ মৃত্যুবরণ করেন। মাওলানা নদভী রহসেসব প্রাথমিক লোকদের মধ্যে সামিল ছিলেন যারা মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী রহ দাওয়াতে ইকামাতে  দ্বিনে লাব্বাইক বলেন । ]

প্রশ্নঃ 

যখন আপনি জানতে পারলেন যে মাওলানা মওদুদী রহ একটি ইসলামী আন্দোলন কায়েম করেছেন তখন এ আন্দোলন ও তার প্রতিষ্ঠাতা যে হকের উপর প্রতিষ্ঠিত এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য একজন আলেমে দ্বীন হিসেবে আপনি কোন কোন বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বোধ করলেন এবং এতে কতটা সাফল্য লাভ করেন?  দেওবন্দে সে যুগে নির্ভরযোগ্য আলেমগনের নিকট থেকে আপনি দ্বীনি এলেম শিক্ষা করেন স্বয়ং দ্বীনদারী জীবনযাপন করেন এবং দ্বীনি এলেম শিক্ষা দিয়ে থাকেন এসব সত্ত্বেও কোন জিনিস আপনাকে বাধ্য করল যে আপনি এ নতুন আন্দোলন সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলনে শরিক হন ? 


সাধারণ ওলামায়ে কেরাম চেষ্টা এবং বহু মুসলিম সংগঠন থাকা সত্ত্বেও এমন কোন বিষয় এর অভাব ছিল যার জন্য জামায়াতে ইসলামী গঠন অপরিহার্য ছিল ? আর এমন কোন বিষয় কি ছিল যা জামায়াতে ইসলামী গঠন জায়েয হওয়ার কারণ পেশ করে ? 


চিন্তার ক্ষেত্রেও কার্যত জামায়াতে ইসলামীর এমনকি বৈশিষ্ট্য ছিল যা স্বয়ং আপনাকে এর সাথে সামিল হওয়ার জন্য বাধ্য করে না  বরঞ্চ আপন সহকর্মীদের মধ্যে অন্যান্য কেউ দাওয়াত দানে বাধ্য করে ? 


আপনি যুগের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছেন মাওলানা আখতার আহসান ইসলামীর মতো সমকক্ষহীন ওস্তাদ এর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন, দীর্ঘকাল যাবত কোরআনের উপর বিভিন্ন চিন্তাভাবনা করেছেন এবং এক জামানা থেকে কুরআনের ওস্তাদ হিসেবে কাজ করেছেন ।  আপনার পাণ্ডিত্যপূর্ণ অভিমত এ ব্যাপারে  কি যে-


(ক)  বর্তমানে তাফহিমুল কুরআনের তাফসীরের মর্যাদা কি?

(খ)  বর্তমান যূগের অন্যান্য উর্দু তাফসীরসমূহের তুলনায় এর কি ভূমিকা রয়েছে?

(গ)  ইসলামী আন্দোলনের  তৎপরতা বিশুদ্ধভাবে তুলে ধরতে ও বর্ধিত করতে এর ভূমিকা কতখানি ছিল? 

(ঘ)  ওলামায়ে কেরাম এবং বিশেষ করে আরবি তাফসির থেকে সাহায্য গ্রহণ করতে সক্ষম এমন বিজ্ঞ আলেমগণ  এ তাফসীরের কোন গুরুত্ব দেননি এটা কি তাদের সঠিক হয়েছে ? 


আপনি দ্বীনি এলেমে  গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন ।  বিগত অর্ধশতাব্দী আপনি দ্বীনি এলেম শিক্ষা দিয়ে আসছেন। আপনার মাওলানা মওদুদীর সাহিত্যের সাহিত্যের গুরুত্ব  আছে ? এই  সাহিত্য কি আপনাকেও  প্রভাবিত করেছে?  সর্বাধিক প্রভাব ও মূল্যবান গ্রন্থ আপনার দৃষ্টিতে কোনটি কোন বিশেষ গ্রন্থ কি আপনাকে প্রভাবিত করেছে?  বা নিছক এ আহ্বানের জন্য একটি আন্দোলন গড়ে  তুলেছেন?


দ্বীনি এলেম সম্পন্ন করা এবং তিনি এলেম শিক্ষা দানে  রত থাকা সত্বেও আপনি কি অনুভব করলেন যে কিছু কমতি রয়ে গেছে যা মওদুদী সাহেব পূরণ করেছেন ? যদি আপনার দৃষ্টিতে এমন কোন শূন্যতা ধরা পড়ে থাকে যা মওলানা মওদুদী তার চিন্তাধারার মাধ্যমে পূরণ করেছেন তাহলে তার উপর বিস্তারিত আলোকপাত করুন । 


মাওলানা মওদুদীর কোন  সে নেতৃত্বসুল্ভ বিশিষ্ট গুণ ছিল যা স্বাভাবিক ভাবে তাকে বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নেতা এবং  সমসাময়িক নেতৃবৃন্দের কাফেলার সালার বানিয়ে দিয়েছিল ? 


মাওলানা মওদুদীর সাহায্য লাভের সুযোগ  আপনারও হয়েছিল।  সহকর্মীগণ এর প্রতি তার আচরণ কেমন ছিল?  তিনি তাদের ধ্যান-ধারণা অনুভূতির কতটা খেয়াল রাখতেন?  তার খুব নিকটে যারা থাকতেন তারা তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়তেন, না দূরে থাকা কালিন ভক্তি-শ্রদ্ধা নিকটে আসার পর বিলীন হয়ে যেত?



 উত্তরঃ 

আপনার বিস্তারিত ও সার্বিক প্রশ্নমালা পেয়েছি।  তারপর আপনার পক্ষ থেকে ক্রমাগত স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে শক্তি সামর্থ্য ও স্বাস্থ্য ভালো থাকলে আপনার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতো না ।  আপনার ক্রমিক  প্রশ্নগুলো ক্রমানুসারে জবাব দিতে পারব না তবে চেষ্টা করব যে আপনি যা কিছু জানতে চান তা সব  এ সংক্ষিপ্তভাবে জবাবে এসে যাবে । 


আপনি জানেন যে আমার যাবতীয় শিক্ষা হয়েছিল তার সে নেজামিয়া পদ্ধতিতে ।  আমার সকল ওস্তাদ ছিলেন কাসেমী অথবা মাজাহিরি।  শেষের দিকে কতিপয়  নদভী।  তাদের অধিকাংশই ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।  এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান নেশনাল কংগ্রেস।  আমাদের এসব ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে বলতেন যে আযাদী আন্দোলন একটি অপরিহার্য ইসলামী দায়িত্ব।  প্রথম ইংরেজ শাসন খতম করো ।  তারপর ইসলামী হুকুমত কায়েম হবে।  তার কার্যপদ্ধতি কি হবে এ কথার জবাবে তারা বলতেন- পরিকল্পনা পরে করা হবে।  প্রথমে আমি মনের  মধ্যে উদ্বেগ আশংকা নিয়ে নীরব হয়ে যেতাম তাদের সাথে বিতর্কে যেতাম না।  আমার মনে উদ্বেগ এর সূচনা হয় কুদরির কাযা অধ্যায় থেকে।  জানতে পারলাম যে ইসলামে সুবিচার ব্যবস্থা রয়েছে।  যদি ইসলামে তা কায়েম না থাকে তাহলে এ সম্পর্কিত অধ্যায় কিভাবে পড়ানো হয়?  অতঃপর হেদায়া এবং হাদিস গ্রন্থাবলীতে ইমারত এবং আমির ও মামুরে অধিকার মামুনের অধিকার ও দদায়িত্ব এবং শাস্তি সীমারেখা প্রভৃতি আরো বাড়িয়ে দেয় ।  আমার ওস্তাদ গনের প্রতি অত্যাধিক শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও বুঝতে পারি না যে এসব  বুযুর্গানে সকল চেষ্টা চরিত্র  তুরস্কমুখী হয়ে আছে এবং ইংরেজ চলে যাবার পর তা আবার কাবামুখী কিভাবে হবে ।  যে দলের নেতৃত্বে এসব  লোকজন কাজ করছেন তার লক্ষ্য তা নয় যা আমাদের বুযুর্গানে  বলেছেন।  এক  জাতীয়তার কথা উভয়ই বলেন।  কিন্তু উভয়ের ধ্যান-ধারণা ও তার অর্থ পরস্পর বিরোধী।  এতে যারা নেতৃত্বের আসনে সমাসীন অবশ্যম্ভাবীরূপে তাদের ধ্যান-ধারণায় সাধারণ মানুষ প্রভাব বিস্তার করবে।  তারপর তো ইসলাম কায়েমের প্রশ্নই তো অবান্তর হয়ে পড়ে ? 


কখনো মনে হয় যে আমাদের হুজুরগ্ণ কোন ইসলামের ব্যাপক ও সার্বিক ব্যবস্থার ধারণাই নেই, তাদের কাছে রয়েছে কিছু বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন জ্ঞানের ভান্ডার।  কিন্তু তাদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা এ ধারণা করতে দেয় না।  কখনো কোনো কারনে পরিপূর্ণ ইসলামের দাওয়াত সহ ময়দানে নামার সাহস নেই । তারা কিছুতেই বুঝতে পারে না যে কিভাবে এদেশে ইসলামের দাওয়াত ছড়ানো যায় ।  তার কর্মসূচি বা কি হবে ?  এ অবস্থায় মনতো চায় যে বুজুর্গদের কিছু উদ্ধৃতি পেশ করি যাতে আমাদের হয়রানি পেরেশানি উদঘাটিত হয় ।  জনাব মাওলানা সিউহারী রহ  ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নামে একখান গ্রন্থ রচনা করেন।  এ গ্রন্থে তিনি ইসলামী অর্থব্যবস্থার অনেক মূল্যবান তথ্য পেশ করেছেন ।  কিন্তু পরিশিষ্টে তিনি বলেন বিপ্লব দুটি মতবাদ এর ভিত্তি হতে পারে একটি খাটি ইসলামী মতবাদ অপরটি সমাজতান্ত্রিক মতবাদ। অতঃপর তিনি তিরস্কারের ভয় না করে দাম্ভিকতার সুরে বলেন,  ইসলামী দূরদর্শিতাসহ এ কথা বলার সাহস রাখি যে,  দেশে প্রথম মতবাদ অর্থাৎ ইসলামী মতবাদ কার্যকর হতে পারে না বরঞ্চ আপর মতবাদ অর্থাৎ  সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠাই সম্ভব ।


হযরত মুফতি কেফায়াতুল্লাহ রহ  এরশাদের প্রতি লক্ষ্য করুনঃ 


মাওলানা মওদুদীর মতবাদ বহু প্রবন্ধের আসরে পত্র- পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে থাকে । আমার অবসর নিয়েছে তা পুরোপুরি পড়ে দেখি।  তার চোখে পড়েছে,  বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে তার বাস্তবায়ন অসম্ভব। আবশ্য আল্লাহ তাআলা ভালো জানেন ।  আমি বুঝতে পারিনা যে বর্তমান যুগ এবং পরিবেশে শরীয়তের বাধ্যবাধকতা আমাদের উপর প্রযোজ্য কিনা । জমিয়তে উলামা রাজনীতিতে যে পন্থা অবলম্বন করেছে তা সাধ্যমত ‘দুটি বিপদের মধ্যে কম বিপদ’ এর ভিত্তিতে । বর্তমানে চারপাশে যে ক্ষমতা ও শক্তি বিদ্যমান তাদের কর্মতৎপরতা তার উপরই নির্ভরশীল ।  মাওলানা মওদুদী দর্শন পেশ করেছে তা পরীক্ষা করে দেখার, তার সমালোচনা করার অথবা তার জবাব দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না । আর জবাব দেয়ার প্রয়োজন হলেও তার ফুসরত নেই । 


মাওদুদি মওদুদী সাহেব ও তার তাঁর সামর্থ্য তাদের চালাতে থাকুন ।  আমরা তাদের মোকাবেলা করবো না ।  যদি আমরা বুঝতে পারি যে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য সেই কর্মতৎপরতা শরীয়ত সম্মত ও কল্যাণকর তাহলে আমরা তার অনুসারী হয়ে যাব। নতুবা আমরা শরীয়ত ক্ষমা ( মা’যুর)  হবো । এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেনঃ  শরীয়তের বহু সামষ্টিক হুকুম আছে যা ইসলামী বাদশাহীর এর জন্য মওকুফ রাখা হয়েছে। এ হুকুমের জন্য যাদের সম্বোধন করা হয়েছে তারা ব্যক্তিবর্গ বা জনগণ নয় বরঞ্চ সুলতান ও ইসলামের খলিফাগণ । সুলতানত  না থাকলে তার উপর আমল করা ব্যক্তিবর্গ বা এক ব্যক্তির না ফরজ আর না মোবাহ । এমন অবস্থায় ব্যক্তির অপরিহার্য শুধু এতটুকু যে সে  সাধ্যমত চেষ্টা করবে যাতে ইসলামী হুকুমত কায়েম হয় । 


কোন মন্তব্য করার উদ্দেশ্যে আমরা  বুযুর্গের উপরুক্ত উদ্ধৃতি পেশ করে নি বরঞ্চ।  শুধু এ কথা বলার জন্য যে,  আমাদের উম্মাতের এসব নেতৃবৃন্দ ইসলামের দাওয়াত চালু করার সাহস রাখে না । পরিবেশ পরিস্থিতি প্রতিকূলতার কারণে যদিও তারা স্বীকার করেছে যে, এই উম্মাহর জন্য ফরজ যে তারা ইসলামী হুকুমত কায়েমের চেষ্টা করবে । এমন অবস্থায় যদি আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য একজনকে এ  ফরজ কাজের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়ার তৌফিক দেন ।  যিনি আলেমগনেরই একজন । কোন মিস্টার নন , বরঞ্চ আরবি ভাষায় আলেম,  কোরআন ও সুন্নাহর গভীর জ্ঞান রাখেন, তাহলে ওলামা হযরতের মস্তকই গর্বভরে সমুন্নত হতো যে তাদেরই একজন ফরজ আদায়ের তৌফিক লাভ করেছেন।  তার নেতৃত্ব মেনে না নিলেও তাকে স্নেহপূর্ণ ছোঁয়া পাওয়ার হকদার মনে করতেন ।  কিন্তু সর্বপ্রথম তো তারা তাকে আলেম শ্রেণী থেকেই বহিষ্কার করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন।  তারপর যা কিছু করেছেন তা সকলেরই জানা আছে সে মর্মান্তিক কাহিনী বর্ণনা করার সুযোগ এখানে নেই ।


আপনি জানেন যে, দরসে নেজামীয়ার আর মাদ্রাসাগুলোতে যে আরবী সাহিত্য পড়ানো হয় তার মধ্যে কিছু কাঁচাপাকা ও কিছু ভালো মন্দ সাহিত্য পড়ানো হয় । এখনো এসব মাদ্রাসায় এদিক দিয়ে তেমন বেশি সংস্কার সাধন করা হয়নি । এখনো তারা ‘মাকামাতে হারীরী’ ও ‘নাফখাতুল ইয়ামান’ আঁকড়ে ধরে আছেন যা সাহিত্যিক মানের নয় বরঞ্চ পুরোপুরি সাহিত্যিক মানের পরিপন্থী । আরবি রচনা ও তরজমা প্রচলন তো একেবারেই ছিল না । আমরা এ দুর্বলতা দূর করার জন্য দারুণ উলুম নদওয়াতুল ওলামা শরণাপন্ন হলাম। এখানে আলেমদের সমিতি জামিয়াতুল ইসলাহ তে বহু মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকা আসতো । আল-ইসলাহ এর টেবিলের উপর এই প্রথমবার তরজুমানুল কোরআন' দেখতে পেলাম । মাওলানা মওদুদীর সঙ্গে গায়েবেনা পরিচয় হয়ে গেল।
তরজুমানুল কোরআন আসে তা পড়ি এবং প্রভাবিত হতে থাকি। সেসময় মাওলানার ‘সিয়সী কাশমাকাশ’ পড়ার সুযোগ হলো। ফলে ধারণা হলো যে ভারতের মুসলমানরা বিরাট সংকটের সম্মুখীন। এরপর মুত্তাহিদা কাউমিয়া প্রচারপত্র দেখলাম । মনে হলো যে আমাদের বুযুর্গানে দ্বীনের চিন্তার ধরন ও কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য সঠিক নয় ।
বেরেলীতে শিক্ষকতা করা কালে আমার নামে তরজুমানুল কোরআন আসত। পড়ে প্রভাবিত হতাম। তখন জামায়াত ইসলাম কায়েম হয়ে গিয়েছিল। জনাব মাওলানা মনজুর নোমানী এখানেই থাকতেন । তিনি আল-ফোরকান এর মাধ্যমে জামায়াত ইসলামের দাওয়াত জোরালোভাবে পেশ করতেন । তিনি ছিলেন এ অঞ্চলে জামায়াতের দায়িত্বশীল । জামায়াতে থেকে তার বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা না ঘটলে তার হাতেই বায়াআত করতাম ।
জানা গেল যে , মাওলানা নোমানী সাহেব দাওয়াতের কেন্দ্র দারুল ইসলাম পাঠানকোটে স্থায়ীভাবে হিজরত করেছেন । একথা সকলের জানা ছিল যে মওলানারে হিজরত ইলাল্লাহ স্থায়ী হিজরত,সেখান থেকে তিনি জামায়াতের কাজ করবেন । আমরা কিন্তু মোটেও জানতাম না যে তিনি মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য যাচ্ছেন। আরে কথা তিনি কেন্দ্রকে জানিয়ে দিয়েছেন । তারপর খবর পাওয়া গেল যে ,মাওলানা মওদুদী সাহেব ও আঞ্চলিক দায়িত্বশীলদের মধ্যে বিরাট মতপার্থক্য হয়েছে । এ কারণে দিল্লিতে সম্মেলন হতে যাচ্ছে। মাওলানা পাঠানকোট থেকে চলে এসেছেন । শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং প্রচন্ড জ্বর নিয়ে দিল্লি সম্মেলনে শরিক হন । তার অভিমত ছিল যে মাওলানা মওদুদী সাহেব জামায়াতের আমীর হওয়ার যোগ্য নন । এজন্য জামায়াতের বর্তমান কাঠামো বহাল রাখার দরকার নেই। বরঞ্চ কয়েকটি জামায়াত ইসলামী হয়ে যাক। আঞ্চলিক আমীরগণ স্থায়ী আমীর হয়ে থাকবেন । বছরে দু তিনবার কোন এক স্থানে একত্র হয়ে সকলের গ্রহণযোগ্য কার্যপ্রণালী নির্ণয় করবেন । এ এক ধরনের ফেডারেল জামায়াত ইসলামী হবে।
মাওলানা মওদুদী এ প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন । তিনি দিল্লি সম্মেলনে সকল প্রস্তাব পেশ করেন । তিনি স্বয়ং এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তিনি জামাআত থেকে ইস্তফা দিতে পারতেন কিন্তু দাওয়াত ইলাল্লাহ কাজ বন্ধ হয়ে যাক এটা তিনি কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারেন না। জামায়াতের পতন ঘটাতে পারে সকল বিকল্প তিনি বৈঠক বৈঠকে পেশ করেন। এসবের মধ্যে সেসব প্রস্তাব ছিল যেগুলো আপনি নোমানী প্রস্তাব বলতে পারেন । আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, যেহেতু ১০০ বছর পর দাওয়াতে ইলাল্লাহ কাজ শুরু হয়েছে সেজন্য দাওয়াত একই থাকবে এবং জামায়াতও একই থাকবে । আমীর মাওলানা মওদুদীই থাকবেন । তার ইমারতের প্রতি যাদের আস্থা নেই তারা ইস্তফা দিতে পারেন। অতএব এ ধরনের লোকেরা ইস্তফা দেন এবং তাদের মধ্যে মাওলানা নোমানীও ছিলেন।
তারপর মাওলানা নোমানী বেরেলী চলে আসেন। জানাজানি হয়ে গেলে যে মাওলানা জামায়াত থেকে আলাদা হয়েছেন। আর এধরনের খবর আমাদের কাছে পৌঁছলো যে মাওলানা মওদুদী সাহেব ইমারতের যোগ্য নন। কারণ তিনি নামাজের ব্যাপারে বেপরোয়া এবং বিলম্বে নামাজ পড়েন । ফজরের নামাজ প্রায় কাযা হয় , খানিক বেলা হলে ঘুম থেকে ওঠেন। এসব শোনার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পরলাম। কারণ দাওয়াতের কাজ তো বুঝি ভেস্তে গেল। এজন্য মাওলানা হামেদ কে নিয়ে মাওলানা নোমানীর বাসস্থানে পৌঁছলাম। তারপর সবকিছু জানতে চাইলাম। আমার যতটুকু মনে আছে মাওলানা সঙ্গে সঙ্গে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে বললেন , এসব নিছক অপপ্রচার । মাওলানা মওদুদী সাহেব তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ইমামতি করেন। যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারার আশঙ্কা হলে অন্য কাউকে ইমামতির জন্য বলে পাঠান।
তারপর তিনি বলেন, তিনি যেমন স্থির মনের প্রশান্তি সহ নামাজ পড়েন কম লোককে এভাবে নামাজ পড়তে দেখেছি। আর কোরআন তো এমন থেমে থেমে পড়েন যে, এমন ভাবে আমি পড়লেও সুরা ফাতেহাতেই ভুল করে ফেলব।
মাওলানা হামেদ জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে জামায়াত থেকে বেরিয়ে আসলেন কেন । আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম আপনি যেসব বিষয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়ে ছিলেন তা তো শুনলেন। এখন চলুন যাই। তারপর আমরা নিজেদের বাসস্থানের ফিরে এলাম। তার পরপরই আমি জামাতে শামিল হওয়ার দরখাস্ত কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিলাম।
উল্লেখ্য যে মাওলানা মাওলানা মওদুদী সাহেবের নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতের সত্য শোনার পর মাওলানা নোমানীর মর্যাদা ও তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল । পৃথক হওয়ার পর মানুষের মনস্তত্ত্ব এরূপ হয়ে থাকে যে ,আপন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, শেখানো বুলি আওড়ায়,আবোলতাবোল কথা বলে অথবা উল্টাপাল্টা সাক্ষ্য দেয় ।
মাওলানা নোমানী যখন দারুল ইসলামে গিয়েছিলেন । মাওলানার সেখানে পৌঁছার পূর্ব থেকেই সেখানে একজন ফেতনা সৃষ্টিকারী লোক ছিলেন। তিনি বাকচাতুর্য এবং চটকদার গল্পগুজবে পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন বেনারসের বাসিন্দা। তিনি মাওলানা নোমানীকে ঘেরাও করে রাখা শুরু করেন। মাওলানা নোমানী ফলে তার কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়তেন যদিও তিনি জামাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন । বেনারসি সাহেব মাওলানা নোমানী কে বলেন যে, মওলানা মওদুদী বিলাস জীবন-যাপন করেন, চাদির পানদার ব্যবহার করেন। ঘরে এক মানুষ সমান আয়না আছে । বিবি কে নিয়ে বেপর্দা চলাফেরা করেন ।
এদিকে মাওলানা মওদুদীর উদারতা দেখুন, যখন নোমানী সাহেব দারুল ইসলাম থেকে আল-ফোরকান বের করার অভিলাষ ব্যক্ত করেন । তখন মাওলানা মওদুদী সাহেব বলেন, একই স্থান থেকে দু'টি মুখপাত্রের প্রকাশ আমি বুঝতে পারছি না । আল-ফরকান কেই জামায়াতের মুখপত্র বানিয়ে নেওয়া হোক । কিন্তু অন্যান্য পরামর্শদাতারা তাতে রাজি হননি।
মাওলানা নোমানী সাহেব প্রস্তাব করেন, জামায়াতের লোকদের জন্য তাহাজ্জুদ বাধ্যতামূলক করা হোক। মওদুদী সাহেব বলেন, বাধ্যবাধকতা আরোপ করা ঠিক হবে না। অবশ্য আপনি ও আমি মিলে এর জন্য প্রেরণা দান করতে পারি। তিনি জিকির-আজকার বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন। তাহাজ্জোতের প্রস্তাবে যে জবাব দেয়া হয়েছিল এবারও তাই দেয়া হয় । মাওলানা নোমানীর তরবিয়ত এ ধরনের মুরুব্বিদের অধীনেই হয়েছিল। মোটকথা এসব কথায় তার মনে আঘাত লাগে। ওদিকে তার প্রতি বেনারসি ইনজেকশন তো চলছেই। এ ধরনের বহু কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত জামায়াত ত্যাগ করেন। এখন তার যে অবস্থান তা আপনি জানেন এবং অন্যান্যও জানেন।
এ অবস্থায় মাওলানা নোমানী সাহেব কে আবেদন করতে মন চায় যে, মাওলানা মওদুদী সাহেবের জবাব তো প্রকাশিত হয়েছে। তার কাছে লিখিত আপনার পত্রও প্রকাশিত হওয়া উচিত। তারপর আপনার এবং মাওলানা মাসুদ আলম নাভীর মধ্যে যে দীর্ঘ পত্রের আদান-প্রদান হয় তাও প্রকাশিত হওয়া উচিত । এতে করে পাঠকদের কাছে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সহায়ক হবে।
এখন রইল বিলাসিতা জীবন যাপনের অভিযোগ। সত্য কথা এই যে তিনি হায়দ্রাবাদে ৮০০ টাকার চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পাঠানকোটে একটি নিভৃত পল্লীতে এসে পড়েন। বিলাসপরায়ণ লোক কি এমন কিছু করে যা মওলানা সাহেব করেছিলেন। এটাও জানতে পারা যায় যে ,হায়দ্রাবাদে থাকাকালীন তার মাসিক খরচ হতো চৌদ্দশ টাকা( ওসমানিয়া মুদ্রায়) এবং দাওয়াতে ইলাল্লাহ মহাব্বতে তার মাসিক খরচ ১২০ টাকায় নেমে আসে।

আমাদের দ্বীনদার শরিয়তন্থীগ্ণ  কি একেবারে এতটা নিম্ন স্তরে নেমে আসতে পারে ? তার পানদার আমিও দেখেছি। তা ছিল মুরাদাবাদী (চাঁদির নয়)। তার বিবির পানদার ছিল চাঁদির যা বিয়েতে উপঢৌকন হিসেবে পান।  আয়নাটি ও ছিল বিয়ের উপহার। 


এখন রইল বিবিসহ বেপর্দা চলাফেরা । তার বিবি দারুল ইসলাম থেকে বোরকা পরিধান করেই বের হতেন। আসর নামাজ পড়ে বনের ধারে এমন সময় পৌঁছাতেন যখন সেখানে তার স্বামী ছাড়া আর কোনো জনপ্রাণী থাকত না।  এখন বলুন একি কোন অভিযোগ করার বিষয় ?


আপনি জানতে চান মাওলানা মওদুদীর কোন বই আমাকে প্রভাবিত করে।  জবাব এই যে তার প্রতিটি লেখায় আমাকে প্রভাবিত করেছে ।  তার লেখাগুলো আমাকে যদি প্রভাবিত না করতো তাহলে আমার পরিচিত বুযুর্গানে রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্ম থেকে সরে পড়ে এমন এক ব্যক্তির দাওয়াত কেন কবুল করতাম এবং তার জামায়াতে কেন সামিল হতাম যাকে আমি তখন পর্যন্ত দেখিনি । আর না কোনভাবে তার সাথে আমার পরিচয় ছিল । কিন্তু আমাকে  সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে তার  গ্রন্থ ‘কোরআন কি চার বুনিয়াদী ঈসতেলাহ “ (বাংলায়ঃ কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা) । 


এর মজার কাহিনী এই যে,  বেরেলী তে শিক্ষকতা করার সময় তরজমানুল কোরআন আমার কাছে আসতো । তাতে উক্ত  গ্রন্থের প্রবন্ধাবলী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতো । তার ভূমিকা পাঠ করার পর আমার উপর এমন প্রভাব পড়ল যে মাওলানা মওদুদী সাহেব আমাদের বর্তমান অবস্থার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন । শিক্ষা সমাপ্তির পর ‘জালালাইন’  ও ‘বায়যাবী’  নির্দিষ্ট সিলেবাস পরিমাণ পড়ি ,তারপর সাহিত্য ও রচনার বিষয় শিক্ষকতা করছিলাম ।  মেধার দিক দিয়ে বোকাও ছিলাম না । সে  সময় পর্যন্ত জানতাম  ইলাহ এর অর্থ মাবুদ, মাবুদের এর অর্থ যার এবাদত করা যায়।  আর এবাদত এর অর্থ নামাজ, যাকাত, রোজা, হজ ব্যাস এতোটুকুই । 


এ শব্দের  আভিধানিক গবেষণা,  তার কোরআনী  প্রয়োগ এবং তার ব্যাপক ধারণা মোটেই ছিল না। রব এর অর্থ পারওয়ারদিগার এবং দ্বীনকে ধর্ম ও মাযহাব জানতাম। মোটকথা ভূমিকা পড়ার পর ধারণা করলাম যে গ্রন্থাকার আমাদের আপন যুগের চিত্র তুলে ধরেছেন ।  আমি আল্লাহকে সাক্ষী করে আরজ করছি যে আমার মনের কোনে এ ধারণা স্থান পায়নি যে,  মাওলানা মওদুদী ওলামায়ে উম্মত, মুফাসসিরীন ও মুহাদ্দিসীন এবং ফুকাহায়ে কোরআনকে জাহেল মনে করেছেন । এ ধারণাই হয়েছিল মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর নিম্নলিখিত লেখা পড়ে। এ খেয়াল হয়নি যে, তিনি অতীতের আলেমগণকে বোকা মনে করেছেন ।  তিনি বলেনঃ


এ এক দুঃখজনক সত্য যে ইসলামী দাওয়াতের ব্যাপকতা যা মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগে পরিব্যপ্ত, সংকুচিত হতে হতে কিছু বিশ্বাস ও এবাদাত পর্যন্ত সীমিত হয়ে রয়ে গেছে।


লক্ষ্য করুন যে , যদি কেউ এ কথাগুলো কে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে “ফেতনায়ে নদভীয়াত” বলে আখ্যায়িত করতে চায় । তো কে তার কলম  চেপে ধরবে ? 


আমি যখন জানতে পারলাম যে হযরত মাওলানা আলী মিয়া (সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী)  জামায়াতের চিন্তাধারার সমালোচনা করে একখানি বই লিখেছেন, তখন ইচ্ছা হলো যে এমন কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য তাকে অনুরোধ করি । তারপর মনে হলো যে তিনি আবেগপ্রবণ ব্যক্তি নন। ক্ষতি কি বই আসুক না ! সম্ভবত জামায়াতের চিন্তাধারার মধ্যে কোনো সংস্কারযোগ্য কথা এসে যাবে ।  তারপর জামায়াতের দায়িত্বশীল তা সংশোধন করে নেবেন। 


“আসরে  হাযেম মে দ্বীন কি তাফহিম ও তাশরিহ” নামে বইটি প্রকাশিত হলো । মোবাল্লেগণ তা ‘ইকরামে মুসলিমিন’  এর প্রাথমিক দাবী হিসেবে ব্যাপকভাবে ছড়াতে থাকেন । আমার জানামতে এখন পর্যন্ত তার ফয়েজ জারি আছে। 


তারপর মাওলানা সাইয়েদ আহমদ কাদেরী তার পর্যালোচনা করলেন । তাও পুস্তক আকারে প্রকাশিত হল। এ পর্যায়ে আমার শুধু এতোটুকুই বলার,  যে নসিহত করেছেন, হাদিসের বরাত দিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন । সে আশঙ্কা এই যে,  জামায়াতের সংশ্লিষ্ট লোকেরা কেতাব ও সুন্নাহ ও রাসুলের আদর্শ, আখেরাতের চিন্তা এবং ঈমান ও ইসলামের রাজপথ থেকে সরে পড়ে নিছক দলীয় সংগঠন এবং মুসলমানদের জন্য শাসন ক্ষমতার পথে বসেছেন এবং তারপর সে পথ থেকে ফিরে আসা বড়ই কঠিন হবে । 


জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গনের কাছে আমার আবেদন, মাওলানার শংকা যেন সত্যে পরিণত না হতে দেয় । অবশ্যি জামায়তের লোক কিতাব ও সুন্নাত, সিরাত ও উসওয়ায়ে রসূল থেকে সরে পড়েছেন এবং নিছক  দলীয় সংগঠন ও মুসলমানদের জন্য শাসন ক্ষমতা লাভের পথে চলেছেন একথা এখন পর্যন্ত আমার বোধগম্য হয়নি । 


একবার হযরত মাওলানা আলী মিয়াকে (সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী) জিজ্ঞেস করতে চেয়েছি । কিন্তু দুটি কারণে সাহস হয়নি । এক এই যে, এখন আর জিজ্ঞেস করে লাভ কি যখন উভয় পক্ষ থেকে বই ও তার জবাবে বই প্রকাশিত হয়েছে ।  দ্বিতীয়তঃ তিনি আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী পৃষ্ঠপোষক ।  তার সাথে আর কি বিতর্ক করব?  অবশ্য তার খেদমতে এই অভিযোগ পেশ করতে হয় যে,  যখন তিনি মাওলানা মওদুদীর ওফাতের অল্পকাল পূর্বে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যান তখন আশংকা  সৃষ্টিকারী কথাগুলি তার কাছে পেশ করেন নি কেন ?  পেশ করে থাকলে তিনি তার কি জবাব  দিয়েছিলেন ? তার উল্লেখ আসরে  হাযেরে থাকা উচিত ছিল । তার ফলে সকলে জানতে পারত যে মাওলানা মওদুদী কি সকল ওলামা উম্মত,  মুহাদ্দেসীন , ফুকাহা ও মুফাসসিরিন কে বোকা মনে করেছেন । না সাইয়েদ সাহেবের উপরোক্ত কথাগুলো রংয়ের অবচেতন মনের সীমিত মর্মের চিত্র আকছেন। 


আলোচনার সময় যদি তিনি অনুভব করতেন যে কথাগুলো অবোধগম্য রয়ে গেছে তাহলে অবশ্যই তিনি তা সংশোধন করার ওয়াদা করতেন।  এসব কথার উল্লেখ থাকলে তা অত্যন্ত প্রভাব সৃষ্টিকারী হত  এবং আমাদেরকে একথা বলতে হতো না যে , এ বইখানি মাওলানা আলী মিয়া লেখেননি, বরঞ্চ তার দ্বারা লেখানো হয়েছে ।  এবং তার মেজাজ প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়,  ইতিপূর্বে যেসব বই লেখা হয়েছে, এ বইখানি সে সবেরই ব্যাখ্যা ও সমর্থন কিন্তু প্রকাশভঙ্গিতে । মনের উপর জবরদস্তি করে এতটুকু লিখলাম।  ব্যাপারটা এমন যে , যার জন্য আমার বড় দুঃখ হয়।  মাওলানা আলী মিয়া ভূমিকায় যে কথাগুলো গোটা উম্মতের মধ্যে ছড়িয়েছেন তার ফলে কিছু এমন ধরনের হয়রানি-পেরেশানি সৃষ্টি হয় যেমন হয়েছিল গঠনতন্ত্রের দফা ৬ এর উপর মাওলানা মাদানীর সমালোচনা করার ফলে। আমি চিন্তা করতে পারি না যে,  এ শব্দমালার আঘাত সাহাবায়ে কেরাম (রা) এর উপর কেউ করবে। ছয় দফা এর বাক্য রচনার সময় রচনাকারীর ধারণা পরিসীমায় সাহাবা (রা)  ছিলেন না। আমি  ভাবতেও পারতাম না যে মাওলানা আলী মিয়া জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা মূলক বই লিখে তা প্রকাশ করবেন এবং অপর পক্ষ থেকে তার জবাবও প্রকাশিত হবে ।


এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে চাই যে ‘আসরে  হাযের’ প্রকাশিত হল এবং গ্রন্থকার হাদিয়া স্বরূপ একখানা আমার নিকটে পাঠালেন,  তখন আমি মাওলানা মওদুদী সাহেবের নিকট এসে কথাগুলো এবং তার সকল প্রতিক্রিয়া ও তজ্জনিত আশঙ্কাও পেশ করলাম ।  আমার পত্র ছিল বেশ দীর্ঘ । তিনি সংক্ষেপে কয়েক ছত্রে যে জবাব দেন তা,  আমার এক ছাত্রের  অবহেলার কারণে নষ্ট হয়ে যায় । অবশ্য অভিজ্ঞতার মর্ম নিজের ভাষায় পেশ করছি । তিনি বলেনঃ


মাওলানা আলী মিয়ার বই ও তার পত্র উভয়েই ইতিপূর্বে আমার নিকট পৌঁছেছে । আপনি কি মনে করেন, আমি কি শুধু এই একখানা বই-ই  লিখেছি? আমি তার বিরুদ্ধে কিছু লিখব না ।  যিকরাতে যে পত্র প্রকাশিত হয়েছে তা আমার বিনা অনুমতিতে এবং আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। আমি তার বিরুদ্ধেও  কিছু বলব না। 


আমি মাওলানা মুফতি সাহেবকে অনুরোধ করেছিলাম, “  তার বই এর জবাবে সংক্ষিপ্ত কিছু ব্যাখ্যা প্রকাশিত হওয়া উচিত, অবশ্যি আপনি যা ভালো মনে করেন ।”  আমার অনুরোধের জবাবে তিনি  উক্ত কথা বলেন ।


‘তাফহীমুল কুরআন’ সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব এই যে, এ বর্তমান যুগের এক বিরাট উন্নত মানের তাফসীর। এ একটি দাওয়াত ও আন্দোলনের গ্রন্থ। একটি পথপ্রদর্শক তাফসীর। বর্তমান যুগে দাওয়াত ইলাল্লাহ কাজ কিভাবে করা যায় তা এ বলে দেয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইসলাম বৈরী পণ্ডিতগণ যেসব কন্টক বিদ্ধ করে করে রেখেছে তা বেছে বেছে বের করে দেয় এ তাফসীরখানি। এ তাফসীর আধুনিক শিক্ষিত মহল এবং বিশেষ করে শিক্ষিত যুব সমাজের জন্য এক বিরাট ইহসান ও অবদান যার মর্যাদা ও মূল্য তারাই উপলব্ধি করতে পারে। এ গ্রন্থ প্রাচীন ওলামায়ে তাফসীরের অভিমত ও বক্তব্যের কোন একটিকে অবলম্বন করে। কদাচিৎ কোন প্রাচীন তাফসীরকারক এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে থাকলে তাঁর বলিষ্ঠ যুক্তিও পেশ করেছে। কিন্তু তাফিহীম প্রণেতা একজন মানুষ। তারও ভুল হয়েছে যেমন অন্যান্য মানুষেরাও ভুল হয়েছে, যারা গ্রন্থ রচনার খেদমত করেছেন। যার লেখা অসংখ্য পৃষ্টা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে, তার ভুল হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। কোরআনের খেদমগণ প্রাচীন যুগের হোক আর আধুনিক যুগের, কোরআন শিক্ষার্থীদের এর থেকে এবং অন্যান্য সকল তাফসীরে থেকে ফায়দা হাসিল করা উচিত। একবারে চোখ খুলে, চোখ বন্ধ করে নয় ।
প্রত্যেক তাফসীরের নিজস্ব একটা রং ও রুপ আছে। প্রত্যেক ফুলের সুবাস পৃথক পৃথক।
কোরআন অধ্যয়নে শিক্ষার্থীদের কে মৌমাছির মত হওয়া উচিত, যে ফুল থেকে মধু আহরণ করে। সাধারণ মাছের মত হওয়া উচিত নয় যে শুধু নোংরা বস্তুর প্রতি অনুরাগ রাখে।
প্রাচীন কোন রায় যদি দুর্বল মনে হয় তো কখনো তার প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ঠিক হবে না। কি কারণে তারা এ রায় প্রকাশ করেছেন তার যুক্তি আপনাদের সামনে নেই। কিন্তু তাই বলে তাফসীরকারের প্রতি কখনো অবজ্ঞা প্রকাশ করবেন না। একথাও উপলব্ধি করা উচিত যে কেতাবের খাদেমগণের কোন বক্তব্য জ্ঞাতসারে বিকৃত করা অথবা বদ নিয়ত আরোপ করার অর্থ নিজেকে বঞ্চিত করার ঘোষণা করা। তাফহীমুল কুরআনের প্রতি সমসাময়িক আলেমগনের একটি শ্রেণীর যে আচরণ করে আসছে তার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করার অবকাশ এ প্রবন্ধে কোথায়?
মাওলানা মওদুদী সাহেব বেরেলীতে আমাকে এক পত্রে জানান, নৌ বিভাগের একজন ইঞ্জিনিয়ার জামায়াতের শুভকাঙ্খী। আরবি ভাষা শিখতে চান। আপনি এখানে আসতে পারেন কি?
আমি সম্মত হয়ে দারুল ইসলাম পৌছালাম। আমার এই প্রথম সাক্ষাৎ মাওলানা সাথে এমন অবস্থায় হয় যখন তিনি ভলিবলের দোল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তার সহকর্মীগণ খেলছিলেন। সালাম মুসাফার পর মাওলানা বললেন, আমি খেলোয়াড়দের খেলায় নেতৃত্ব দিচ্ছি। সকলেই হেসে ফেললেন। বুঝলাম মাওলানা বড় রসিক মানুষ।
পরবর্তী সাক্ষাৎ সেদিন হয়েছিল, যেদিন মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী সাহেব মাদরাসাতুল ইসলাহ থেকে স্থায়ী হিজরত করে দারুল ইসলাম আসছিলেন। কিছু লোক তাকে নিয়ে আসতে রেলস্টেশন গিয়েছিলেন। মাওলানা মওদুদী মসজিদের উত্তর ধারে দাঁড়িয়ে মেহমানের অপেক্ষা করছিলেন। ইসলাহী সাহেব তাসরিফ আনলেন। সালাম মুসাফা হলো। মাওলানা তার নৌবহর লটবহর ও গোসলের বন্দোবস্ত করার হুকুম দিলেন। মাওলানা ইসলাহী সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর দেখলাম মাওলানা চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে- আনন্দের অশ্রু। বললেন, এখন পর্যন্ত আমি একা ছিলাম। একাই সব কাজ করতাম। আল্লাহর শোকর যে তিনি আমাকে একটি শক্তিশালী বাহু দান করেছেন…. আমার সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালে আমি তার মধ্যে যেসব গুণাবলী দেখলাম যা দলীয় ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য জরুরী।
দারুল ইসলামে বসবাসকারী বন্ধুগণ বললেন যে,মাওলানা অত্যন্ত সহনশীল। সহকর্মীদের ভুলভ্রান্তি ক্রমাগত দেখতে থাকেন এবং মৃদু মধুর ভাষায় বুঝাতেন। তার গুণাবলীর কথা আর কত বলবো? এত বলা আমার ঠিক নয়, তার ওফাতে আমি সবচেয়ে বেশি শোককাতর হয়ে পড়েছি। তবে তিনদিন পর্যন্ত কিছুক্ষণ পরপর হৃদপিণ্ড ধরফর করতে থাকে প্রত্যেকবারই হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা হত।
মাওলানা মওদুদী সাহেবের দুটি অবদান আতি বিরাট। একটি এই যে, তিনি দাওয়া ইলাল্লাহ পথ দেখিয়েছিলেন এমন এক সময়ে যখন সারা ভারতের ওলামা,মুহাদ্দিসীন ফুকাহা জানতেন না- হ্যাঁ ঠিকই জানতেন না যে এ দেশে এ পরিবেশ-পরিস্থিতি ইসলামী দাওয়াত নিয়ে কিভাবে ময়দানে নামা যায়। আর যদি কেউ জেনেও থাকেন তো ময়দানে নামার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। আমার দৃষ্টিতে এ ছিল তার বিরাট অবদান। দ্বিতীয় বৃহত্তর অবদান ছিল যে তিনি মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহীকে ১৬ টি বছর যাবত তার সাথে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন ।
সর্বশেষে আমি জামায়াত ও তাদের সাথে সম্পৃক্ত ভাইদের কাছে আরোয করতে চাই যে,
“আসরে হাযেরে” মাওলানা আলী মিয়া যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তা যেন সত্যে পরিণত হতে না দেন। কঠোরভাবে নিজেদের আত্মসমালোচনা করতে থাকবেন। যদি কেউ আপনাকে বলে তুমিতো মুত্তাকী নও। জবাবে আপনি কি একথা বলবেন, না জনাব আমি তাকওয়ার উচ্চস্তরে সমাসীন? না, বরঞ্চ এ বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যে ধৈর্যধারণ করবেন এবং খোদা মুখি হয়ে যাবেন। আপনার বিষয়টি আপনার সাথে সংশ্লিষ্ট। যদি হকের রাজপথ থেকে সরে পড়েন তাহলে তার পাকড়াও থেকে কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। আর যদি বিশুদ্ধ না ও হক অনুসৃত পুঁজি নিয়ে আপন রবের দরবারে হাজির হতে পারেন তাহলে কে আপনাকে তার প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করতে পারে? আপনি অবশ্যই খোদার মাহবুব হয়ে যাবেন, তা সারা দুনিয়ার ফতোয়ার কেন্দ্রগুলো থেকে আপনার বিরুদ্ধে যতই গোমরাহীর ফতোয়া জারি করা হোক না কেন । চেষ্টা করতে থাকুন যেন আখেরাতে আল্লাহর স্নেহ-ভালবাসা ও রহমত থেকে বঞ্চিত না হন যদিও দুনিয়াতে কিছু আলেমের ভালোবাসা ও দোয়া থেকে বঞ্চিত থাকেন।

Share:

'দ্বীনি ভাই' ও 'দ্বীনি পরিবার' এর অর্থ কি?

 আবাসিক ইউনিটে সাংগঠনিক কাজ করতে বের হলে মাঝেমধ্যে কিছু কিছু বাসায় লেখা দেখতে পাই, "শুধুমাত্র দ্বীনি পরিবারের জন্য বাসা ভাড়া দেয়া হবে"

মূলত এরকম বাসা এলিট শ্রেণির মুসলমানদের হয়ে থাকে। তবে অবশ্যই বড় আলেম অথবা মুফতী কিংবা সামাজিক পরিচয়ে পরিচিত ওলী আউলিয়া এমন কারোও বাসা।যদি প্রশ্ন করতাম যিনি রাজনীতি করেন, তাকে ভাড়া দিবেন কিনা? তিনি হয়তো বলবেন,না দ্বীনি পরিবারকে দিতে চাই। উনার দৃষ্টিতে, নামায রোযা,পর্দা ইত্যাদিই শুধু দ্বীন হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ ঘরের কর্তা নামাযী বউ পর্দানশিন মানেই 'দ্বীনি পরিবার।' বাস্তবেও পেয়েছি এমন।

আবার ইদানীং কিছু সংস্কৃতি প্রচার হচ্ছে এভাবে যে, নব্য কিছু কথিত সাহিত্য, পোশাক ও দোকানের মাধ্যমে সফট কিছু ইসলাম প্রচার করা হচ্ছে। তারাও একে অপরকে 'দ্বীনি ভাই' বলে ডাকছে। সচেতনও তারা। কেউ তাদের সাথে বুকে হাত দিয়ে নামাজ না পড়লে আবার তাকে 'দ্বীনি ভাই' ডাকেনা।। মানে তারা অলরেডি 'দ্বীন' এ ঢুকে গেছে।আবার এমন কিছু ভাই ব্রাদার আছেন যারা যেকোনো ধরনের মুসলমানদেরকে দ্বীনি ভাই বলেই ডাকেন। অবশ্য যে কাউকে দ্বীনি ভাই বলে ডাকলে আমার আপত্তি নাই। কিন্তু আমি এতে দ্বিমত পোষণ করি। কারণ আমি বুঝি, যে কাউকে চাইলেই দ্বীনি ভাই ডেকে তাত্ত্বিকভাবে তাকে 'ভূয়া উচু' নামে ভূষিত করা ঠিক না।

এতে প্রকৃত অর্থে যিনি 'দ্বীনি ভাই' তাকে কিছুটা ছোট করা হয়। অথবা দ্বীনি ভাই শব্দটাই একেবারে ছোট করা হয়ে যায়। যেকোনো ব্যক্তিকে ইসলামপন্থী(১) ডেকে যেভাবে ইসলামপন্থীদের নষ্ট করা হচ্ছে ঠিক সেভাবে -যে কাউকে দ্বীনি ভাই ডেকেও দ্বীনি ভাইয়ের মান নষ্ট করা হয়।এখন আমরা আলোচনা করবো কে দ্বীনি ভাই? কাকে দ্বীনি ভাই বলা হয়? এবং কেন বলা হবে?

আরবীতে دين শব্দটির কয়েকটি অর্থ আছে। যার এক অর্থ হলো-প্রভূত্ব ও প্রাধান্য, শক্তি ও আধিপত্য। দুই. আনুগত্য ও দাসত্ব। তিন. প্রতিফল ও কর্মফল এবং চার. পথ পন্থা ব্যবস্থা ও আইন।
সূরা আলে ইমরানে যেভাবে এসেছে- ইন্নাদ্দিনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম। অর্থ-ইসলাম আল্লাহ‌র নিকট একমাত্র দ্বীন বা জীবন বিধান।এখানে যদি ভালোভাবে খেয়াল করি তাহলে দেখবো যে, আল্লাহ বলেছেন الدِّیْنَ অর্থাৎ একমাত্র দ্বীন। শুধু দ্বীন বলেননি। যদিও শুধু দ্বীন বললেও হয় তবুও আল্লাহ আদ-দ্বীন বলেছেন। আমি যদি আরোও সহজ করে বুঝাই তাহলে ব্যাপারটি দ্বারায় এভাবে।

আরবীতে যখন আমরা বলি, 'বাইতুন' (بيت) তখন এর অর্থ দ্বারায় 'একটি ঘর'। কিন্তু সেই 'বাইতুন' (بيت) কে যদি আমরা 'আল বাইত' (البيت) বলি তাহলে অর্থ দ্বারায় 'ঘরটি'। অর্থাৎ প্রথমটির অর্থ- একটি ঘর আর দ্বিতীয়টির অর্থ- ঘরটি মানে এটিই একমাত্র ঘর।ঠিক তেমনি আল্লাহ বলেছেন, আদ-দ্বীন(الدِّیْنَ) মানে হলো- একমাত্র পথ। দ্বীন (دين) অর্থ পথ। যেকোনো পথ হতে পারে। আর আদ-দ্বীন অর্থ একমাত্র পথ। এখন কথা হলো ইসলাম আমাদের জন্য 'একমাত্র পথ' কি- না। জ্বী,একমাত্র পথ। আল্লাহ আদ-দ্বীন বলে আর কোনো সুযোগ রাখেননি।

প্রশ্ন হলো, যদি ইসলাম একমাত্র পথ হয়ে থাকে তাহলে তো সেইপথে সবকিছুই বিদ্যমান থাকবে। হে, ইসলামের সব কিছুই আছে। ইসলামে আনুষ্ঠানিক ইবাদাত ছাড়াও আছে রাজনীতি, আইন, বিচারনীতি, অর্থনীতি,সমাজনীতি,রাষ্ট্রনীতি, জীবনব্যবস্থা, দর্শন-ধ্যাণ,সাহিত্য, সংস্কৃতি, যুদ্ধ ও সন্ধি,আন্তর্জাতিক নীতি সহ সবকিছুই ইসলামে আছে।তাহলে যে আলেম বা মুরুব্বি বাসা ভাড়া দেয়ার জন্য দ্বীনি পরিবার খুঁজতেছেন বা সাহিত্যওয়ালা ভাইয়েরা দ্বীনি ভাই বলতে যাদের বুঝান। তারা কি আদোও এরকম একজন পরিপূর্ণ ইসলাম মানা ব্যক্তিকে বুঝিয়ে থাকেন? নাকি শুধু নামাজ দাড়ী পর্দাকেই মানদণ্ড হিসেবে দেখেন? দেখা গেলো সেই পরিবার ও সেই ভাই হয়তো রাজনীতিকেই হারাম মনে করেন। তাহলে কি দাঁড়ালো?

তাহলে দাড়ালো আদৌও আমরা দ্বীন শব্দটার সহী ব্যবহার করছিনা। দ্বীন অর্থ হলো পথ। সেই পথই একমাত্র পথ। যেখানে মানব জীবনের সবকিছুই বিদ্যমান রয়েছে।প্রত্যকে কালের ও অধ্যায়ের সমগ্র মানবজাতির পৃথিবীতে বাস করার জন্য এবং জীবনের সমগ্র বিভাগের জন্য একটি মাত্রই পথ, পন্থা ও পদ্ধতিই আল্লাহর কাছে মনোনীত। সেই পন্থার নামই হচ্ছে ইসলাম বা দ্বীন।

সুতরাং যে কাউকে 'দ্বীনি ভাই' বলতে ভাবতে হবে। দ্বীনি ভাই ও পরিবারের যথার্থ ব্যবহার করতে হবে। এমন পরিবারকে দ্বীনি পরিবার হিসেবে বাসা ভাড়া দিব যিনি রাজনীতি সচেতন, যিনি আল্লাহর দল করেন।যিনি ইসলামকে একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে দেখেন এবং সেই ইসলামকে প্রতিষ্টিত করা জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এবং সেই চেষ্টায় তিনি নিয়মিত সময় দান করেন এবং প্রকৃতভাবে সময় দেন (খন্ডকালীন নয়) তিনিই একমাত্র দ্বীনি ভাই। এবং যে পরিবার এর নেতৃত্ব দেয় সেই পরিবারই একমাত্র দ্বীনি পরিবার।

আল্লাহ আমাদেরকে সঠীক বুঝ দান করুন। আমীন।

Share:

আত্মশুদ্ধির ইসলামী পদ্ধতি - সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী

ইসলাম ব্যক্তিসত্তার উন্নয়ন ও ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণতার প্রত্যাশী । ইসলাম ব্যক্তির উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছে ।  আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে । অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্যের বোঝা ব্যক্তির পিঠে চাপিয়ে দিয়েছে । আদেশ নিষেধের বিধান করা হয়েছে ব্যক্তিকে । আনুগত্য করলে ব্যক্তিকে তার পুরস্কার প্রদানের আশা দেয়া হয়েছে আবার নাফরমানি পাপ কাজে লিপ্ত হলে ব্যক্তিকেই দেওয়া হয়েছে শাস্তির হুমকি ।  চিন্তা ও কর্ম ব্যবস্থায় এমন একটি মূর্তি স্থান অধিকার করেছে, শুরুতে কর্মসম্পাদনকারী এবং শেষ কর্মফল ভোগ কারী হিসেবে মৌলিক গুরুত্বের অধিকারী । তার বুদ্ধিবৃত্তি ও আবেগের কাছে আবেদন জানানো হয় ।  তাকে হেদায়েত ও সঠিক পথ নির্দেশ দান করা হয় । তারই কল্যাণ কামনা করা হয় এবং তাকেই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা হয় । 


ব্যক্তি যদি তার নিজের পরিমণ্ডলে অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং নিজের ব্যক্তিসত্তার অধঃপতনের গভীর গর্তে নিক্ষেপ করে তাহলে যে সমাজ ও ব্যবস্থার সাথে সে দুনিয়ার সম্পর্কিত ছিল তাদের কোন প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব, গুণপনা ও উন্নত কর্মধারা চূড়ান্ত ফয়সালা ক্ষেত্রে তার কোনো উপকার করতে পারবে না ।

বরং যদি সে ভালো সমাজ ও  সমাজ ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত থেকেও নিজের ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণতা ও ব্যক্তির উন্নয়নের সহজ সুযোগগুলো কাজে লাগাতে সক্ষম না হয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে এটি আরেকটি শক্তিশালী প্রমাণ রূপে গণ্য করা হবে  এবং তাকে অধিকতর ক্ষতির সম্মুখীন করবে ।  বিপরীত পক্ষে নিজের প্রচেষ্টার মাধ্যমে সে যদি সম্ভাব্য পরিপূর্ণতায় পৌঁছাতে পারতো এবং নিজের ব্যক্তিত্বের সম্ভাব্য উন্নততর বিকাশ সাধনে সক্ষম হতো তাহলে সমাজ ব্যবস্থার ত্রুটি ও তার সাফল্য ও ও মুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হতো । বরং এটি কার জন্য একটি প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতো কারণ একটি প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য অবস্থান করেও সে এহেন সফল প্রচেষ্টা চালাতে সক্ষম হয়েছিল। সূরা আল মায়েদা নিম্নোক্ত আয়াতটির মধ্যে বক্তব্যেরই শ্রুত হয়ঃ


عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
নিজেদের হেফাজত করা তোমাদের অপরিহার্য কর্তব্য তোমরা যখন সঠিক পথে থাকবে তখন কেউ পথ ভ্রষ্ট হলে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। (সূরা আল মায়েদা 104)। আবার নিম্নোক্ত আয়াতটির মধ্যে এর সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে উঠেছেঃ  'তোমরা নিজেরা যখন পথভ্রষ্ট হয়েছে তখন অন্যের  সঠিক পথ লাভ তোমাদের জন্য লাভজনক হবে না ।‘ 
Share:

তাফহীমুল কুরআনের খুঁটিনাটি - সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ তোফায়েল

 তাফহিমুল কুরআন পড়লে একটা রেফারেন্স প্রায় সময় সামনে আসে তা হলো 'এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা'।মাওলানা মওদূদী এই এনসাক্লোপিডিয়া খরীদ করার পেছনে একটা সুন্দর ঘটনা আছে সেটা পরে বলবো। আগে তাফহিমুল কুরআন থেকে একটা মজার তথ্য বলি!

সুরা আল হিজরের ১৮ নাম্বার আয়াতের শেষ শব্দদ্বয় হলো-`শিহাবুম মুবিন` যার আভিধানিক অর্থ হলো-উজ্জ্বল আগুনের শিখা। কুরআনের অন্য জায়গায় একে বলা হয়েছে,অন্ধকার বিদীর্ণকারী অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এর মানে আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত জলন্ত নক্ষত্র হতে হবে,যাকে আমাদের ভাষায় 'উল্কাপিণ্ড' বলা হয় তেমন না। এটা অন্য কোনো ধরনের মহাজাগতিক রশ্মি অথবা এরচেয়েও তীব্র ধরনের কিছু হতে পারে যা সবার জ্ঞানের আওতার বাইরে।

আবার উল্কাপিণ্ড ও হতে পারে যাকে আমরা আকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে ছূটে আসতে দেখি। বর্তমানকালের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর দিকে যেসব উল্কা ছূটে আস্তে দেখা যায় তার সংখ্যা প্রতিদিন এক লক্ষ কোটি। এরমধ্যে দুই কোটি প্রতিদিন পৃথিবীর মধ্যাকর্ষন এলাকায় প্রবেশ করে পৃথিবীর দিকে ধাবিত হয়। তারমধ্যে কোনোরকম একটা ভূপৃষ্ঠে আসে।মহাশুণ্যে এর গতি হয় কমবেশি প্রতি সেকেন্ডে ২৬ মাইল আবার কখনো কখনো ৫০ মাইলেও পৌছায়।

এই যে এত দ্রুত গতীতে পৃথিবীতে এতো এতো উল্কাপিণ্ড পড়ে ভাবলেই গা শিউরে উঠে! তাহলে আমরা বেঁচে আছি কিভাবে? এত শক্তি ধারণ করে অসংখ্য অগনিত উল্কা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরেও যে আমরা বেঁচে আছি-এটা কিভাবে সম্ভব? উল্কাগুলো কি আদৌও পৃথিবীতে পড়ে? উল্কাপিণ্ড নিয়মিত পড়লে কি পৃথিবী থাকবে না কি ধ্বংস হয়ে যাবে? কি বলে কুরআনের অন্যন্য আয়াত? দেখা যায় যে,এই সুরার ৮ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-আকাশে আমি অনেক মজবুত দূর্গ নির্মাণ করেছি। প্রশ্ন আসতে পারে আকাশে কিরকম মজবুত দূর্গ!?

এখানে বুরুজ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ভাষায় দূর্গ, প্রাসাদ ও মজবুত ইমারাতকে বুরুজ বলা হয়। পূর্বের বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, এর অর্থ সম্ভবত উর্ধ্ব জগতের এমন সব অংশ যার মধ্যকার প্রত্যেকটি অংশকে অত্যন্ত শক্তিশালী সীমান্ত অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করে রেখেছে। যদিও সীমান্তরেখা মহাশূন্যে অদৃশ্যভাবে অংকিত হয়ে আছে তবুও সেগুলো অতিক্রম করে কোনো জিনিসের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাওয়া বেশ কঠিন। এ অর্থের প্রেক্ষিতে মাওলানা বুরুজ শব্দটিকে সংরক্ষিত অঞ্চলসমূহ বা Fortified spheres অর্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

এই যে বুরুজ বা দূর্গ বা সংরক্ষিত দেয়ালগুলোর বদৌলতেই প্রতিদিন গড়ে যে এক লক্ষকোটি উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর দিকে ছূটে আসে তা সব পথেই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এবং মাত্র একটি এসে পৃথিবী পৃষ্টে পড়তে সক্ষম হয়! পৃথিবীতে উল্কাপিন্ডের যেসব নমুনা সংরক্ষিত আছে তারমধ্যে সবচেয়ে বড়টির ওজন ৬৪৫ পাউন্ড। এ পাথরটি উপর থেকে পড়ে মাটির মধ্যে ১১ ফুট গভীরে প্রোথিত হয়েছিল!

এছাড়াও এক জায়গায় ৩৬.৫০ টনের একটি হোহার স্তুপ পাওয়া গেছে। ক্যান ইউ ইমাজিন দ্যাট! মহাশুন্য থেকে এত বড় উল্কাপিণ্ড পড়ে গিয়ে পৃথিবীতে ১১ ফুট গভীরে চলে যায় কিভাবে? তাও এত এত প্রটেকশন থাকার পরেও? এখন যদি বুরুজ বা সংরক্ষিত দেয়াল না থাকতো তাহলে এই পরিমাণ ওজনের উল্কা কত গভীরে গিয়ে দুনিয়ায় ভুমিকম্প হতো কল্পনা করা যায় কি? আর যদি সমস্ত উল্কা পৃথিবীতে এসে পড়তো তাহলে হয়তো একদিনের মধ্যেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত!

অনেক সময় খালি চোখেও এসব উল্কা দেখা যায়। এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটিনিকা ১৯৪৬ সালের ১৫ তম খন্ডের ৩৩৭-৩৩৯ পৃষ্টার হাওলায় মাওলানা মওদূদী বলেন, পুরাতন রেকর্ড থেকে জানা যায় ১৮৩৩ সালে ১৩ নভেম্বর উত্তর আমেরিকার পূর্ব এলাকায় শুধুমাত্র একটি স্থানে মাধ্য রাত থেকে প্রভাত পর্যন্ত ২ লক্ষ উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হতে দেখে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষের বসবাসের জন্য আল্লাহ তা'আলা সবসময় এগুলোকে সংরক্ষিত দেয়ালের মাধ্যমে সেখানেঈ আটকে দেন যেন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে না যায়। যেন আমরা আরোও সুযোগ পাই।

অর্থাৎ সহজ করে বললে, যে উল্কাপিণ্ড বা আলোকরশ্মি পৃথিবীর দিকে আসে, সেগুলো যদি ঠিকঠাক মতো পৃথিবীতে পড়তো। তাহলে আজকের উল্কাপিণ্ড দ্বারাই পৃথিবীটা আজকেই ধ্বংস হয়ে যেত। ফলে আমরা যে হতাশ হয়ে বলি-আল্লাহ কেন সাহায্য করেন না। এটা ভূল। কারণ সেই আল্লাহ কবেই সাহায্য করে বসে আছেন। একদিন শুধু একদিন যদি বুরুজে কাজ না করে তাহলে আগামীকালকে সূর্য দেখার সুযোগ আর আমাদের নাই। আল্লাহ আমাদের উপর যেন রহম করেন।

এবার আসা যাক, আমরা যে এনসাক্লোপিডিয়ার রেফারেন্স দেখলাম সেই এনসাক্লোপিডিয়া মাওলানা কিভাবে কিনেছিলেন সেই কথায়।মূলত মাওলানা খরীদ করেছিলেন নিজের অনুবাদের টাকা দিয়ে। তিনি উসমানিয়া ইউনিভার্সিটির তরজমা বিভাগের অনুরোধে আল্লামা সদরুদ্দিন সিরাজীর আরবী ভাষায় লিখিত দর্শন শাস্ত্রের জটিল কিতাবের শেষ দুই খন্ড অনুবাদ করেন। কিতাবটির নাম ছিল 'আল হিকমাতুল মুতা আলিয়া ফিল আসরাফিল আকালিয়া'।

সাড়ে তিন হাজার পৃষ্টার বই মাওলানা মাত্র ৮ মাসেই অনুবাদ করেন। এবং একটা মোটা অংকের পারিশ্রমিক পান। সেই টাকা দিয়েই মাওলানা অনেক তাফসীর কিনেন, পৃথিবীর বিখ্যাত গ্রন্থগুলো কিনেন এবং এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সবগুলো খন্ড কিনেন। যার ১৫ তম খন্ডের একটা রেফারেন্স পেশ করলাম।

ততকালীন সময়ে অনলাইনবীহিন একটা মানুষ এরকম অদ্ভুত সব তথ্য হাজির করে এভাবেই দুনিয়াকে অবাক করে দেন। আর এভাবেই আধুনিকতার ছোঁয়া ছাড়াই বিংশ শতাব্দীতে তিনি এনসাইক্লোপিডিয়া কে কাজে লাগান। যা নিজের অনুদিত কিতাবের টাকা দিয়েই কেনা। আর পারিশ্রমিকের বাকী ৫ হাজার টাকা মাওলানা দ্বীনের পরিকল্পিত কাজের জন্য রেখে দেন। এভাবেই মাওলানা অনুবাদের টাকাকে কাজে লাগান।

মাওলানা তাফহিমে যেসকল তথ্য দিয়ে থাকেন তা দেখলে অনেক মজা পাই। পড়তেও ভালো লাগে। আমি এখন দ্বিতীয় বারের মত তাফহীম পড়ছি। মনে হয় যেন কুরআনের সব বর্ণনা নিজের চোখের সামনেই ঘটছে।

আমরা মাওলানার কর্মী। নিজেকে দেখে লজ্জ্বা পাই।মাওলানার এই অনুবাদটা অনেক বড় বড় উস্তাদগণই করতে সাহস পান নি। কিন্তু মাওলানা করেছিলেন। এবং মাত্র ২৫ বছর বয়সে! আমরা কি এভাবে গড়ে উঠতে পারবো! নাকি অন্তত চেষ্টা করবো? আমরা হয়তো সেই চেষ্টাটাও করিনা!!

Share:

আর্কাইভ